২২ ব্যাংকের পুঞ্জীভূত লোকসান ২ লাখ ৫৩ হাজার কোটি টাকা, বেড়েছে খেলাপি ঋণ

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
২২ ব্যাংকের পুঞ্জীভূত লোকসান ২ লাখ ৫৩ হাজার কোটি টাকা, বেড়েছে খেলাপি ঋণ
প্রতীকী ছবি

দেশের ২২টি ব্যাংকের পুঞ্জীভূত লোকসানের মোট পরিমাণ মার্চ শেষে ২ লাখ ৫৩ হাজার ৯৩৮ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। আর খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫ লাখ ৮১ হাজার কোটি টাকা।

রবিবার (৪ অক্টোবর) অর্থ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের (ব্যাংক) বর্তমান অবস্থা নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের দেওয়া প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। জাতীয় সংসদ ভবনে এই সংসদীয় কমিটির বৈঠক হয়।

সংসদ সচিবালয় থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত ব্যাংক খাতের পরিচালন মুনাফার পরিমাণ ৭৮৯ কোটি টাকা। তবে নিট ক্ষতি আরও বেশি, ৮ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা। ব্যাংক খাতের সম্পদ ও মূলধনের বিপরীতে আয়ও নেতিবাচক অবস্থায় রয়েছে। একই সময়ে ব্যাংক খাতের সম্পদের ওপর উপার্জন হার ঋণাত্মক ১.০৩ শতাংশ এবং মূলধনের ওপর উপার্জন হার ঋণাত্মক ৪৪.২২ শতাংশ নির্ণীত হয়েছে।

লোকসানে থাকা ২২টি ব্যাংকের মধ্যে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন চারটি বাণিজ্যিক ব্যাংক রয়েছে। সেগুলো হলো- জনতা, অগ্রণী, রূপালী ও বেসিক ব্যাংক। আর দুটি বিশেষায়িত ব্যাংক হলো- বিকেবি ও রাকাব। এছাড়া ১৫টি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক রয়েছে। সেগুলো হলো- এবি ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স, এক্সিম, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, আইসিবি ইসলামিক, আইএফআইসি, ইসলামী, মেঘনা, ন্যাশনাল, গ্লোবাল ইসলামী, পদ্মা, সীমান্ত, সোশ্যাল ইসলামী, দি প্রিমিয়ার ও ইউনিয়ন এবং একটি বিদেশি ব্যাংক- ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান। এই ২২ ব্যাংকের পুঞ্জীভূত লোকসানের পরিমাণ ২ লাখ ৫৩ হাজার ৯৩৮ কোটি টাকা।

উচ্চ শ্রেণিকৃত ঋণ, প্রয়োজনীয় প্রভিশনিং, মূলধন ঘাটতি এবং দুর্বল সম্পদমান ব্যাংকগুলোর উপার্জন ক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ফলে পরিচালন পর্যায়ে মুনাফা অর্জিত হলেও প্রভিশন, অন্যান্য ব্যয় ও সম্ভাব্য ঋণজনিত ক্ষতি সমন্বয়ের পর এই ক্ষতি হয়েছে।

খেলাপি ঋণ ৫ লাখ ৮১ হাজার কোটি টাকা

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ আরও বেড়েছে। জুন শেষে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮১ হাজার ২৩৭ কোটি টাকা। যা মোট ঋণের ৩১.৪১ শতাংশ। তিন মাস আগে, অর্থাৎ ৩১ মার্চ খেলাপি ঋণ ছিল ৫ লাখ ৬৪ হাজার ১০৫ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। অর্থাৎ তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ১৩১ কোটি ৯২ লাখ টাকা।

এর মধ্যে রাষ্ট্র মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ৪৭.৩০ শতাংশ ঋণ শ্রেণিকৃত। আর বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকে এ হার ৩০.৭৪ শতাংশ।

শ্রেণিকৃত ঋণের বিপরীতে সম্ভাব্য ক্ষতি সামাল দিতে যে অর্থ আলাদা করে রাখতে হয়, সেই প্রভিশনে পুরো ব্যাংক খাতের ঘাটতি ছিল ২ লাখ ২২ হাজার ৩৫৮ কোটি টাকা।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের মার্চ ভিত্তিতে তফসিলি ব্যাংকগুলোর মধ্যে ৪০টি ব্যাংক ন্যূনতম প্রয়োজনীয় মূলধন সংরক্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। আর ১৫টি ব্যাংকের মূলধন ঋণাত্মক।

১২ ব্যাংককে ৮৪ হাজার ৯৪৬ কোটি টাকা সহায়তা

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘ল্যান্ডার অব লাস্ট রিসোর্ট’ হিসেবে ১২টি ব্যাংককে জরুরি তারল্য সহায়তা বা ডিমান্ড লোন দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮৪ হাজার ৯৪৫ কোটি ৭১ লাখ টাকা।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের আগস্ট শেষে ব্যাংক ব্যবস্থার মোট তরল সম্পদ দাঁড়িয়েছে ৮.৫ লাখ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের আগস্ট শেষে এর পরিমাণ ছিল ৩.১ লাখ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, সামগ্রিকভাবে ব্যাংক খাতে তারল্য উদ্বৃত্ত থাকলেও এর বণ্টন সুষম নয়। কিছু প্রচলিত ব্যাংক এবং অধিকাংশ ইসলামী ধারার ব্যাংকে তারল্য ঘাটতি রয়েছে।

শেষ আশ্রয়ের ঋণদাতা বা ‘লেন্ডার অব লাস্ট রিসোর্ট’ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক এসব অর্থ দিয়েছে।

‘৯০ দিনকে ২৭০ দিন করার’ বিরোধিতা

বৈঠকে ঋণ শ্রেণিকরণের সময়সীমা পরিবর্তনের সম্ভাব্য উদ্যোগ নিয়ে আপত্তি উঠেছে। আগে ৯০ দিনের মধ্যে যারা ঋণ পরিশোধ করতো না, তাদের ঋণ খেলাপি ঘোষণা করা হতো। সেটাকে পরিবর্তন করে এখন ২৭০ দিনের একটা বিধিতে পরিণত করার প্রচেষ্টা চলছে। অনেকেই এটার বিরোধিতা করছেন। এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র আড়াল হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কমিটির সভাপতি মুশফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে বৈঠকে আরও অংশ নেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি, জালাল উদ্দিন, মঈনুল ইসলাম খান, সফিকুর রহমান কিরন, সাইফুল আলম, সৈয়দ জয়নুল আবেদীন এবং হাসনাত আব্দুল্লাহ।

বৈঠক শেষে জামায়াতে ইসলামীর এমপি সাইফুল আলম বলেন, আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য দলের পক্ষ থেকে তারা ব্যাংকের সংখ্যা কমানোর প্রস্তাব দিয়েছেন। এতটুকু দেশে এত ব্যাংক দরকার নেই। বর্তমানে বাংলাদেশে ব্যাংকের সংখ্যা প্রায় ৬৩টি।

তিনি আরও বলেন, কোনো ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি), অতিরিক্ত এমডি, ডিএমডিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়া চেয়ারম্যান বা পরিচালনা পর্ষদ অপসারণ করতে পারবে না বলেও প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

বৈঠকে এনসিপির এমপি হাসনাত আব্দুল্লাহ অর্থঋণ ও উচ্চ আদালতে আটকে থাকা ৭৪ হাজার ৬৭৯টি মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। প্রয়োজনে পৃথক বেঞ্চ গঠনের কথা বলেছেন তিনি। হাসনাত বলেন, খেলাপি ঋণে জড়িত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মূল ঋণ পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত নতুন ঋণের সুযোগ দেওয়া যাবে না। এ বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতিনির্ধারণের জন্য তিনি অর্থমন্ত্রীর কাছে দাবি জানান বলে বৈঠক সূত্রে জানা গেছে।