শিরোনাম

লোডশেডিংয়ে বিপাকে পোলট্রি খামারি, বাড়ছে উৎপাদন খরচ

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
লোডশেডিংয়ে বিপাকে পোলট্রি খামারি, বাড়ছে উৎপাদন খরচ
মুরগি সুস্থ রাখার জন্য খামারের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি

দেশের বিভিন্ন এলাকায় সম্প্রতি বিদ্যুতের লোডশেডিং বেড়েছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে প্রতিদিন কমপক্ষে ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন পোলট্রি খামারিরা। তারা বলছেন, মুরগি পালন মানেই শুধু উৎপাদন নয়, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির বাড়তি খরচ সামলানোর লড়াইও। ব্যয় যেভাবে বাড়ছে, তাতে কাঙ্ক্ষিত লাভ থাকছে না। কখনো উল্টো লোকসানও গুনতে হয়।

বিদ্যুৎ না থাকায় অনেক খামারি কিছুক্ষণ পরপর জেনারেটর চালিয়ে ভেতরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছেন। বিদ্যুৎ ফিরলে জেনারেটর বন্ধ হচ্ছে, আবার লোডশেডিং শুরু হলে সেটি চালু করতে হচ্ছে। এভাবেই কাটছে দিনের পর দিন।

কেবল জেনারেটর নয়, বিদ্যুৎ বিলও এখন খামারিদের জন্য বড় ব্যয়ের খাত। একদিকে বিদ্যুতের দাম বেড়েছে, অন্যদিকে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ না পাওয়ায় সে ঘাটতি পূরণ করতে হচ্ছে ডিজেল দিয়ে। এতে উৎপাদন খরচের ওপর পড়ছে দ্বিমুখী চাপ।

পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের তথ্যমতে, শনিবার (৮ আগস্ট) সন্ধ্যার পিক আওয়ারে (৭টা) দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৭ হাজার ১ মেগাওয়াট। কিন্তু সরবরাহ না থাকায় ২ হাজার ৬৫৫ মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে হয়। সবচেয়ে বেশি ৫৩৭ মেগাওয়াট লোডশেডিং ছিল ঢাকা জোনে। এরপর ৪৮৬ মেগাওয়াট ছিল ময়মনসিংহ জোনে।

আগের দিন শুক্রবার একই সময়ে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ৫৮ মেগাওয়াট। বিপরীতে লোডশেডিং ছিল ১ হাজার ৪২ মেগাওয়াট। একইভাবে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় পিক আওয়ারে সারা দেশে চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ৬৮৯ মেগাওয়াট। ওই সময় ১ হাজার ৪০৫ মেগাওয়াট লোডশেডিং ছিল।

এদিকে যশোরের অভয়নগরে টানা ৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় গত শনিবার একটি পোলট্রি খামারের চার শতাধিক মুরগি মারা গেছে বলে জানিয়েছেন সেটির উদ্যোক্তা ও যমজ ভাই মো. হাসান ও মো. হোসেন। এতে তাদের ৩ লক্ষাধিক টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেন তারা। উদ্যোক্তারা জানান, তাদের খামারে আড়াই হাজারের মতো মুরগি ছিল। শুক্রবার রাত ১২টা থেকে শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ৮ ঘণ্টা পুরো এলাকায় বিদ্যুৎ ছিল না। এ সময়ের মধ্যে বিক্রির উপযোগী চার শতাধিক মুরগি মারা যায়।

২০২০ সালের আগে দেশে প্রায় ২ লাখ পোলট্রি খামারি ছিলেন। কিন্তু ধারাবাহিক লোকসান, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, বাজারমূল্যের অস্থিতিশীলতা, সহজ শর্তে অর্থায়নের অভাব এবং বিভিন্ন ধরনের কাঠামোগত চ্যালেঞ্জের কারণে বর্তমানে খামারের সংখ্যা কমে ১ লাখ ৩৬ হাজারে নেমে এসেছে।

নওয়াপাড়া পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর ডিজিএম সনজিৎ কুমার মণ্ডল জানিয়েছেন, গ্রামের বিদ্যুতের তারের ওপর শুক্রবার রাতে গাছ পড়ে। এতে একটি তার ছিঁড়ে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। অনেক রাতের ঘটনা হওয়ায় তারা কিছুই করতে পারেননি।

বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিআইএ) দাবি, ফিড, বাচ্চা, ওষুধ, ভ্যাকসিন, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পরিবহনসহ প্রতিটি উৎপাদন উপকরণের দাম বেড়েছে। এতে খামারিদের উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। কিন্তু এ বৃদ্ধির সঙ্গে মুরগি ও ডিমের খামার পর্যায়ে বাজারমূল্যের কোনো সামঞ্জস্য নেই। ফলে প্রান্তিক খামারিরা প্রতিনিয়ত লোকসানের বোঝা টানছেন। অনেকেই তাই পেশা ছাড়ছেন।

২০২০ সালের আগে দেশে প্রায় ২ লাখ পোলট্রি খামারি ছিলেন। কিন্তু ধারাবাহিক লোকসান, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, বাজারমূল্যের অস্থিতিশীলতা, সহজ শর্তে অর্থায়নের অভাব এবং বিভিন্ন ধরনের কাঠামোগত চ্যালেঞ্জের কারণে বর্তমানে খামারের সংখ্যা কমে ১ লাখ ৩৬ হাজারে নেমে এসেছে। অর্থাৎ মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে প্রায় ৬৪ হাজার খামারি এ খাত থেকে ঝরে পড়েছেন।

বিপিআইএর যুগ্ম মহাসচিব আলমগীর হোসেন জানান, দুই বছর ধরে টানা লোকসানে রয়েছেন ডিম উৎপাদনকারী পোলট্রি খামারিরা। খরচের এ তালিকা আরো বড় করেছে লোডশেডিং। আগে যে খামারির মাসে ২ হাজার টাকা জেনারেটরের পেছনে ব্যয় হতো, এখন দেখা যাচ্ছে তার ২০ হাজার টাকা ব্যয় হচ্ছে। গ্রামে একেবারেই বিদ্যুৎ থাকে না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পূর্ণবয়স্ক ব্রয়লার মুরগি ২২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরের তাপমাত্রায় অস্বস্তিতে ভোগে। সে জন্য মুরগিকে ঠাণ্ডা পরিবেশ দিতে হয়। গরমের তীব্রতা বাড়লে মুরগির খাদ্যগ্রহণ কমে যায়। এতে মাংস উৎপাদনে প্রভাব পড়ে। আবার তাপমাত্রা বেশি হলে হিট স্ট্রোকে মারা যাওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পোলট্রি সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শওকত আলীর পরামর্শ, তাপ নিয়ন্ত্রণে ঘরের চালে কিছুক্ষণ পরপর পানি ছিটানো কিংবা পাটের চট দিয়ে ঢেকে রাখা যেতে পারে। এতে ঘর গরম কম হবে। এছাড়া মুরগির খাবারের পানির সঙ্গে লেবুর রস ও গ্লুকোজ মিশিয়ে দেয়া যেতে পারে।

পোলট্রি খামারিরা বলছেন, বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব শেষ পর্যন্ত বাজারেও পড়তে পারে। বাড়তি উৎপাদন ব্যয়ের কারণে খামারিরা টিকে থাকতে না পারলে বাজারে মুরগি ও ডিমের সরবরাহ কমার ঝুঁকি তৈরি হবে।

/এফসি/