বিদেশ থেকেও উড়ে আসে দুর্ধর্ষ ভাড়াটে ডাকাতরা

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
বিদেশ থেকেও উড়ে আসে দুর্ধর্ষ ভাড়াটে ডাকাতরা
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর

চাঁদপুরের দক্ষিণ বালিয়া থানার সামাদ গাজী বাড়ির মো. খোরশেদ। ৬ জুলাই দুবাই প্রবাসী ভাইয়ের পাঠানো ১৭ ভরি স্বর্ণালংকার ও অন্যান্য মালামাল নিয়ে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বাড়ি ফিরছিলেন। শাহবাগ পৌঁছাতেই ডিবি পুলিশ পরিচয়ে একদল ডাকাত তাকে একটি কালো গাড়িতে তুলে নেয়। এরপর চোখ ও হাত-পা বেঁধে ৩৮ লাখ টাকার মালামাল লুট করে তাকে গাজীপুরের রাজেন্দ্রপুরে ফেলে যায়।

শুধু খোরশেদ নন, বিমানবন্দর ও এর আশপাশের সড়কগুলো ঘিরে প্রবাসফেরত যাত্রী ও ব্যবসায়ীদের নিয়মিত টার্গেট করছে সংঘবদ্ধ ডাকাত চক্র। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে এসব অপরাধে অংশ নিচ্ছে চুক্তিতে ভাড়ায় খাটা দুর্ধর্ষ ডাকাতরা। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে এসে, এমনকি বিদেশ থেকে উড়ে এসেও ডাকাতি শেষে ফের চলে যাচ্ছে তারা। সম্প্রতি একাধিক চাঞ্চল্যকর ডাকাতির মামলার তদন্তে নেমে ভয়ংকর এসব চক্রের সন্ধান পেয়েছে গোয়েন্দা পুলিশ।

ভাড়াটে ডাকাতদের একজন পাবনার চাটমোহর থানার নবীন পূর্বপাড়ার বাসিন্দা মো. শহিদুল ইসলাম (৪৩)। সিরাজগঞ্জ জেলার তাড়াশে তার ‘মেসার্স কৃষি ভান্ডার’ নামে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সবার কাছে তিনি ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত হলেও বাস্তবে দুর্ধর্ষ ডাকাত। ডাকাতিতে ব্যবহৃত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পোশাক, হাতকড়া, ওয়াকিটকি সবই রয়েছে তার।

শাহজালাল বিমানবন্দর ও এর আশপাশের এলাকায় ডাকাতিতে ভাড়ায় খাটেন শহিদুল। ডাকাতি শেষে আবার নিজ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বসেন। তার বিরুদ্ধে ঢাকার সাভার, সিরাজগঞ্জ ও বগুড়ায় তিনটি ডাকাতিসহ মোট ৫টি মামলা রয়েছে।

শহিদুলের সঙ্গে আরও ৬ থেকে ৭ জন রয়েছে, তারাও ভাড়াটে ডাকাত। চক্রটি গত ২৩ জুলাই উত্তরা পশ্চিম থানা এলাকায় মোহাম্মদ রিয়াজ নামের এক ব্যবসায়ীর ১৫ লাখ টাকা লুটে নেয়। রতন চৌধুরী ওরফে ডালিম নামের এক মাফিয়া তাদের ভাড়া করেছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ।

৫ থেকে ১০ লাখ টাকার বিনিময়ে ভাড়ায় ডাকাতি করে চক্রগুলো। তবে বিমানবন্দর দিয়ে চোরাচালানের মাধ্যমে বাংলাদেশে আসা স্বর্ণের বড় চালান ডাকাতিতে কোটি টাকারও চুক্তি হয়।

বাগেরহাটের বাসিন্দা সৈয়দ নাসির উদ্দিন থাকেন ফ্রান্সে। সেখান থেকে ভারতে আসেন বিমানে। ভারত থেকে চোরাই পথে বাংলাদেশে প্রবেশ করে ডাকাতি করেন। তার সঙ্গে থাকেন শ্যালক শামীমসহ ভাড়াটে কিছু ডাকাত। ডাকাতি শেষে ফের একই রুটে চলে যান ফ্রান্সে। এভাবেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দেন নাসির। সবশেষ উত্তরায় এক স্বর্ণের দোকানে ডাকাতির ঘটনায় তিনি ডিবির হাতে ধরা পড়েন।

সূত্র বলছে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ভাড়াটে ডাকাতদের ব্যবহার করছে মাফিয়া চক্র। তবে ওই মাফিয়ারা বরাবরই অধরা থেকে যায়।

শাহজালাল বিমানবন্দর ও এর আশপাশের এলাকায় ভাড়ায় ডাকাতি করে বেশ কয়েকটি চক্র। এর মধ্যে আল আমীন গ্রুপ, শাওন গ্রুপ ও ডিবির সাবেক সোর্স ডাকাত শহীদ গ্রুপ অন্যতম। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চাকরিচ্যুত কিছু সদস্যও জড়িয়ে পড়েছে এই ডাকাতিতে। তারা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে থাকে। চক্রের সদস্যরা ডাকাতি শেষে ফের গ্রামে ফিরে যায়।

৫ থেকে ১০ লাখ টাকার বিনিময়ে ভাড়ায় ডাকাতি করে চক্রগুলো। তবে বিমানবন্দর দিয়ে চোরাচালানের মাধ্যমে বাংলাদেশে আসা স্বর্ণের বড় চালান ডাকাতিতে কোটি টাকারও চুক্তি হয়।

ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা উত্তরা বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মো. ইলিয়াস কবির বলেন, বিমানবন্দরসহ উত্তরা এলাকায় অপরাধ সংঘটিত করেই অপরাধীরা দ্রুত ঢাকার বাইরে চলে যায়। অনেক কষ্টে তাদের গ্রেপ্তার করলে অল্প সময়ে তারা জামিনে বের হয়ে আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ে।

জানা গেছে, কোনো কারণে গ্রেপ্তার হলে জামিনে বের করার জন্যও এক শ্রেণির আইনজীবীদের সঙ্গে রয়েছে তাদের চুক্তি। অনেক সময় বাকিতে কাজ করেন ওইসব আইনজীবী।

স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী বলেন, বিমানবন্দর ও আশপাশের এলাকায় ডাকাতি, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধ ঠেকাতে এসআরবি নিয়মিত গোয়েন্দা নজরদারি, টহল ও অভিযান চালাচ্ছে।

তিনি বলেন, অপরাধীরা অনেক সময় স্থান, সময় ও কৌশল পরিবর্তন করে অপরাধ সংঘটনের চেষ্টা করে। এ ধরনের অপরাধ পুরোপুরি নির্মূল করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর সমন্বিত ও ধারাবাহিক কার্যক্রমের মাধ্যমে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।

/এফসি/