নির্দোষ প্রমাণিত হলেও রায় দেখে যেতে পারেননি পরেশ

নির্দোষ প্রমাণিত হলেও রায় দেখে যেতে পারেননি পরেশ
নিজস্ব প্রতিবেদক

ফরিদপুরে জনতা ব্যাংকের করপোরেট শাখার ভল্ট থেকে প্রায় এক কোটি টাকা লুটের ঘটনায় অভিযুক্ত হয়ে দীর্ঘ ১৬ বছর আইনি লড়াই চালিয়েছেন নিরাপত্তাপ্রহরী পরেশ চন্দ্র দাস। শেষ পর্যন্ত উচ্চ আদালতে তিনি নির্দোষ হিসাবে স্বীকৃতি পেলেও সেই রায় দেখে যেতে পারেননি। হাইকোর্টে খালাস পাওয়ার আগেই তার মৃত্যু হয়।
এদিকে একই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে অর্থ উদ্ধারের লক্ষ্যে জনতা ব্যাংক কর্তৃপক্ষ যে দেওয়ানি মামলা করেছিল, সেই মামলায়ও ব্যাংকের করা আপিল খারিজ করে দিয়েছেন হাইকোর্ট। পাশাপাশি পরেশের পরিবারকে হয়রানি ও ভোগান্তির জন্য ৫০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। এর সঙ্গে নিম্ন আদালতে ধার্য করা ১০ হাজার টাকাও বহাল রাখা হয়েছে।
আদালতের নথি অনুযায়ী, ২০১০ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি রাতে জনতা ব্যাংকের ফরিদপুর করপোরেট শাখার ভল্ট থেকে ৯৪ লাখ ১৯ হাজার ৫৯০ টাকা চুরি বা লুট হয়। ঘটনার সময় পরেশ চন্দ্র দাস ওই শাখার নিরাপত্তাপ্রহরী হিসাবে কর্মরত ছিলেন। পরদিন শাখা ব্যবস্থাপক কোতোয়ালি থানায় মামলা দায়ের করলে পরেশকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তিনি জামিনে মুক্তি পান।
ফৌজদারি মামলার বিচার চলাকালে ২০১৩ সালের ৪ আগস্ট ব্যাংক কর্তৃপক্ষ চুরি হওয়া অর্থ উদ্ধারের জন্য ফরিদপুরের প্রথম যুগ্ম জেলা জজ আদালতে একটি মানি স্যুট দায়ের করে। তবে ২০১৬ সালের ২৯ জুন আদালত সেই মামলা খারিজ করে দেন এবং ব্যাংক কর্তৃপক্ষের ওপর ১০ হাজার টাকা খরচ আরোপ করেন।
নিম্ন আদালতের ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে একই বছর হাইকোর্টে প্রথম আপিল করে জনতা ব্যাংক। বিচারপতি মো. ইকবাল কবির ও বিচারপতি মো. রিয়াজ উদ্দিন খানের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ চলতি বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি আপিলটি খারিজ করে রায় দেন। আদালত নিম্ন আদালতের আরোপিত ১০ হাজার টাকা খরচ বহাল রাখার পাশাপাশি অতিরিক্ত ৫০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে নির্দেশ দেন।
রায়ে হাইকোর্ট তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে কঠোর পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। আদালত বলেন, ব্যাংকের ভল্ট কীভাবে খোলা হয়েছিল, সে বিষয়ে অর্থবহ কোনো তদন্ত হয়নি। বিপুল পরিমাণ অর্থ লুট হওয়ার পরও প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত ও বিচারের আওতায় আনতে তদন্তকারী সংস্থা এবং প্রসিকিউশন ব্যর্থ হয়েছে।
রায়ে আরও উল্লেখ করা হয়, ভল্টের চাবি যাঁদের নিয়ন্ত্রণে ছিল কিংবা ঘটনার দিন পিকনিক শেষে যেসব কর্মকর্তা পুনরায় ব্যাংকে প্রবেশ করেছিলেন, তাদের ভূমিকা যথাযথভাবে তদন্ত করা হয়নি। বরং কেবল পরেশকে দায়ী করার প্রবণতা দেখা গেছে। এতে প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করার যৌক্তিক সন্দেহ তৈরি হয়।
হাইকোর্টের মতে, অন্যান্য সম্ভাব্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা উপেক্ষা করে শুধু একজন নিরাপত্তাপ্রহরীকে দায়ী করার চেষ্টা আদালতের কার্যপ্রণালির অপব্যবহারের শামিল। এ কারণেই আপিলটি খরচাসহ খারিজ করা হয়েছে।
পরেশের পরিবারের পক্ষে শুনানিতে অংশ নেওয়া আইনজীবী চঞ্চল কুমার বিশ্বাস বলেন, আদালত স্পষ্টভাবে বলেছেন যে চুরি বা লুট হওয়া অর্থ উদ্ধারের জন্য এ ধরনের দেওয়ানি মামলা গ্রহণযোগ্য নয়। মূল মামলাটিই ভুল ধারণার ভিত্তিতে দায়ের করা হয়েছিল। তার মতে, ভল্টের চাবির দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের মামলায় অন্তর্ভুক্ত না করে শুধুমাত্র একজন নিরাপত্তাপ্রহরীকে জড়ানো হয়েছিল, যা প্রকৃত ঘটনা আড়াল করার ইঙ্গিত দেয়। তিনি এই অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় জড়িত প্রকৃত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নতুন করে তদন্তের দাবি জানান।
অন্যদিকে জনতা ব্যাংকের পক্ষে শুনানি করা আইনজীবী মো. আরিফ বিল্লাহ বলেন, রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি এখনো হাতে আসেনি। অনুলিপি পাওয়ার পর ব্যাংক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করা হবে।
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে পরেশ দাবি করেছিলেন, ঘটনার রাতে তিনি ব্যাংকের ভেতরে ঘুমিয়ে ছিলেন। গভীর রাতে কয়েকজন ব্যক্তি এসে তাকে ভয়ভীতি দেখিয়ে চুপ থাকতে বাধ্য করেন। তাদের মধ্যে তপু ও জাহিদ নামে দুজনকে তিনি চিনতেন বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ওই ব্যক্তিরা নিয়মিত ব্যাংকের সামনে আসা-যাওয়া করতেন এবং তার সঙ্গে পরিচিত ছিলেন। ঘটনার দিন তাঁরা তাকে পাঁচ হাজার টাকা দেন, যা পরে পুলিশ তার স্ত্রীর কাছ থেকে উদ্ধার করে।
তবে পরবর্তী সময়ে পুলিশের দেওয়া অভিযোগপত্রে জাহিদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। আর তপু বিচারিক আদালতে খালাস পেয়ে যান।
ফৌজদারি মামলায় ২০২০ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ফরিদপুরের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত পরেশকে চার বছরের কারাদণ্ড দেন। সেই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করলে ২০২৩ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর দায়রা আদালত তার সাজা কমিয়ে দুই বছর নির্ধারণ করেন।
পরে ওই রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে ফৌজদারি রিভিশন আবেদন করেন পরেশ। শুনানি শেষে ২০২৫ সালের ২৮ জানুয়ারি হাইকোর্ট দায়রা আদালতের রায় বাতিল করে তাকে সম্পূর্ণ খালাস দেন। এর ফলে মামলার সব দায় থেকে তিনি মুক্তি পান।
তবে এই রায় ঘোষণার প্রায় এক বছর আগেই, ২০২৪ সালের ২৬ জানুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন পরেশ চন্দ্র দাস। ফলে দীর্ঘদিনের আইনি লড়াইয়ে নির্দোষ প্রমাণিত হলেও নিজের মুক্তির রায় দেখে যেতে পারেননি তিনি।
পরেশের মৃত্যুর পর অর্থ উদ্ধারসংক্রান্ত মামলায় তার স্ত্রী রিতা রানী দাস, ছেলে প্রণব কুমার দাস এবং মেয়ে লিপি রানী দাসকে বিবাদী হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
পরেশের ছেলে প্রণব কুমার দাস বলেন, দীর্ঘ ১৬ বছরের আইনি লড়াই তাদের পরিবারকে চরম মানসিক, সামাজিক ও আর্থিক ভোগান্তির মধ্যে ফেলেছে। তার ভাষায়, বাবা শেষ পর্যন্ত নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন, কিন্তু সেই রায় নিজের চোখে দেখে যেতে পারেননি। এ কষ্ট আমাদের সবসময় তাড়া করবে। প্রকৃত অপরাধীরা এখনো ধরা-ছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে।
তিনি আরও বলেন, ঘটনার সময় তার বাবার চাকরিজীবনের প্রায় দুই দশক পার হয়ে গিয়েছিল। এখন পরিবার আশা করছে, আদালতের রায়ের পর ব্যাংক কর্তৃপক্ষ পরেশ চন্দ্র দাসের চাকরি-পরবর্তী সব প্রাপ্য সুবিধা যথাযথভাবে পরিশোধ করবে।

ফরিদপুরে জনতা ব্যাংকের করপোরেট শাখার ভল্ট থেকে প্রায় এক কোটি টাকা লুটের ঘটনায় অভিযুক্ত হয়ে দীর্ঘ ১৬ বছর আইনি লড়াই চালিয়েছেন নিরাপত্তাপ্রহরী পরেশ চন্দ্র দাস। শেষ পর্যন্ত উচ্চ আদালতে তিনি নির্দোষ হিসাবে স্বীকৃতি পেলেও সেই রায় দেখে যেতে পারেননি। হাইকোর্টে খালাস পাওয়ার আগেই তার মৃত্যু হয়।
এদিকে একই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে অর্থ উদ্ধারের লক্ষ্যে জনতা ব্যাংক কর্তৃপক্ষ যে দেওয়ানি মামলা করেছিল, সেই মামলায়ও ব্যাংকের করা আপিল খারিজ করে দিয়েছেন হাইকোর্ট। পাশাপাশি পরেশের পরিবারকে হয়রানি ও ভোগান্তির জন্য ৫০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। এর সঙ্গে নিম্ন আদালতে ধার্য করা ১০ হাজার টাকাও বহাল রাখা হয়েছে।
আদালতের নথি অনুযায়ী, ২০১০ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি রাতে জনতা ব্যাংকের ফরিদপুর করপোরেট শাখার ভল্ট থেকে ৯৪ লাখ ১৯ হাজার ৫৯০ টাকা চুরি বা লুট হয়। ঘটনার সময় পরেশ চন্দ্র দাস ওই শাখার নিরাপত্তাপ্রহরী হিসাবে কর্মরত ছিলেন। পরদিন শাখা ব্যবস্থাপক কোতোয়ালি থানায় মামলা দায়ের করলে পরেশকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তিনি জামিনে মুক্তি পান।
ফৌজদারি মামলার বিচার চলাকালে ২০১৩ সালের ৪ আগস্ট ব্যাংক কর্তৃপক্ষ চুরি হওয়া অর্থ উদ্ধারের জন্য ফরিদপুরের প্রথম যুগ্ম জেলা জজ আদালতে একটি মানি স্যুট দায়ের করে। তবে ২০১৬ সালের ২৯ জুন আদালত সেই মামলা খারিজ করে দেন এবং ব্যাংক কর্তৃপক্ষের ওপর ১০ হাজার টাকা খরচ আরোপ করেন।
নিম্ন আদালতের ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে একই বছর হাইকোর্টে প্রথম আপিল করে জনতা ব্যাংক। বিচারপতি মো. ইকবাল কবির ও বিচারপতি মো. রিয়াজ উদ্দিন খানের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ চলতি বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি আপিলটি খারিজ করে রায় দেন। আদালত নিম্ন আদালতের আরোপিত ১০ হাজার টাকা খরচ বহাল রাখার পাশাপাশি অতিরিক্ত ৫০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে নির্দেশ দেন।
রায়ে হাইকোর্ট তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে কঠোর পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। আদালত বলেন, ব্যাংকের ভল্ট কীভাবে খোলা হয়েছিল, সে বিষয়ে অর্থবহ কোনো তদন্ত হয়নি। বিপুল পরিমাণ অর্থ লুট হওয়ার পরও প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত ও বিচারের আওতায় আনতে তদন্তকারী সংস্থা এবং প্রসিকিউশন ব্যর্থ হয়েছে।
রায়ে আরও উল্লেখ করা হয়, ভল্টের চাবি যাঁদের নিয়ন্ত্রণে ছিল কিংবা ঘটনার দিন পিকনিক শেষে যেসব কর্মকর্তা পুনরায় ব্যাংকে প্রবেশ করেছিলেন, তাদের ভূমিকা যথাযথভাবে তদন্ত করা হয়নি। বরং কেবল পরেশকে দায়ী করার প্রবণতা দেখা গেছে। এতে প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করার যৌক্তিক সন্দেহ তৈরি হয়।
হাইকোর্টের মতে, অন্যান্য সম্ভাব্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা উপেক্ষা করে শুধু একজন নিরাপত্তাপ্রহরীকে দায়ী করার চেষ্টা আদালতের কার্যপ্রণালির অপব্যবহারের শামিল। এ কারণেই আপিলটি খরচাসহ খারিজ করা হয়েছে।
পরেশের পরিবারের পক্ষে শুনানিতে অংশ নেওয়া আইনজীবী চঞ্চল কুমার বিশ্বাস বলেন, আদালত স্পষ্টভাবে বলেছেন যে চুরি বা লুট হওয়া অর্থ উদ্ধারের জন্য এ ধরনের দেওয়ানি মামলা গ্রহণযোগ্য নয়। মূল মামলাটিই ভুল ধারণার ভিত্তিতে দায়ের করা হয়েছিল। তার মতে, ভল্টের চাবির দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের মামলায় অন্তর্ভুক্ত না করে শুধুমাত্র একজন নিরাপত্তাপ্রহরীকে জড়ানো হয়েছিল, যা প্রকৃত ঘটনা আড়াল করার ইঙ্গিত দেয়। তিনি এই অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় জড়িত প্রকৃত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নতুন করে তদন্তের দাবি জানান।
অন্যদিকে জনতা ব্যাংকের পক্ষে শুনানি করা আইনজীবী মো. আরিফ বিল্লাহ বলেন, রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি এখনো হাতে আসেনি। অনুলিপি পাওয়ার পর ব্যাংক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করা হবে।
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে পরেশ দাবি করেছিলেন, ঘটনার রাতে তিনি ব্যাংকের ভেতরে ঘুমিয়ে ছিলেন। গভীর রাতে কয়েকজন ব্যক্তি এসে তাকে ভয়ভীতি দেখিয়ে চুপ থাকতে বাধ্য করেন। তাদের মধ্যে তপু ও জাহিদ নামে দুজনকে তিনি চিনতেন বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ওই ব্যক্তিরা নিয়মিত ব্যাংকের সামনে আসা-যাওয়া করতেন এবং তার সঙ্গে পরিচিত ছিলেন। ঘটনার দিন তাঁরা তাকে পাঁচ হাজার টাকা দেন, যা পরে পুলিশ তার স্ত্রীর কাছ থেকে উদ্ধার করে।
তবে পরবর্তী সময়ে পুলিশের দেওয়া অভিযোগপত্রে জাহিদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। আর তপু বিচারিক আদালতে খালাস পেয়ে যান।
ফৌজদারি মামলায় ২০২০ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ফরিদপুরের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত পরেশকে চার বছরের কারাদণ্ড দেন। সেই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করলে ২০২৩ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর দায়রা আদালত তার সাজা কমিয়ে দুই বছর নির্ধারণ করেন।
পরে ওই রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে ফৌজদারি রিভিশন আবেদন করেন পরেশ। শুনানি শেষে ২০২৫ সালের ২৮ জানুয়ারি হাইকোর্ট দায়রা আদালতের রায় বাতিল করে তাকে সম্পূর্ণ খালাস দেন। এর ফলে মামলার সব দায় থেকে তিনি মুক্তি পান।
তবে এই রায় ঘোষণার প্রায় এক বছর আগেই, ২০২৪ সালের ২৬ জানুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন পরেশ চন্দ্র দাস। ফলে দীর্ঘদিনের আইনি লড়াইয়ে নির্দোষ প্রমাণিত হলেও নিজের মুক্তির রায় দেখে যেতে পারেননি তিনি।
পরেশের মৃত্যুর পর অর্থ উদ্ধারসংক্রান্ত মামলায় তার স্ত্রী রিতা রানী দাস, ছেলে প্রণব কুমার দাস এবং মেয়ে লিপি রানী দাসকে বিবাদী হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
পরেশের ছেলে প্রণব কুমার দাস বলেন, দীর্ঘ ১৬ বছরের আইনি লড়াই তাদের পরিবারকে চরম মানসিক, সামাজিক ও আর্থিক ভোগান্তির মধ্যে ফেলেছে। তার ভাষায়, বাবা শেষ পর্যন্ত নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন, কিন্তু সেই রায় নিজের চোখে দেখে যেতে পারেননি। এ কষ্ট আমাদের সবসময় তাড়া করবে। প্রকৃত অপরাধীরা এখনো ধরা-ছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে।
তিনি আরও বলেন, ঘটনার সময় তার বাবার চাকরিজীবনের প্রায় দুই দশক পার হয়ে গিয়েছিল। এখন পরিবার আশা করছে, আদালতের রায়ের পর ব্যাংক কর্তৃপক্ষ পরেশ চন্দ্র দাসের চাকরি-পরবর্তী সব প্রাপ্য সুবিধা যথাযথভাবে পরিশোধ করবে।

নির্দোষ প্রমাণিত হলেও রায় দেখে যেতে পারেননি পরেশ
নিজস্ব প্রতিবেদক

ফরিদপুরে জনতা ব্যাংকের করপোরেট শাখার ভল্ট থেকে প্রায় এক কোটি টাকা লুটের ঘটনায় অভিযুক্ত হয়ে দীর্ঘ ১৬ বছর আইনি লড়াই চালিয়েছেন নিরাপত্তাপ্রহরী পরেশ চন্দ্র দাস। শেষ পর্যন্ত উচ্চ আদালতে তিনি নির্দোষ হিসাবে স্বীকৃতি পেলেও সেই রায় দেখে যেতে পারেননি। হাইকোর্টে খালাস পাওয়ার আগেই তার মৃত্যু হয়।
এদিকে একই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে অর্থ উদ্ধারের লক্ষ্যে জনতা ব্যাংক কর্তৃপক্ষ যে দেওয়ানি মামলা করেছিল, সেই মামলায়ও ব্যাংকের করা আপিল খারিজ করে দিয়েছেন হাইকোর্ট। পাশাপাশি পরেশের পরিবারকে হয়রানি ও ভোগান্তির জন্য ৫০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। এর সঙ্গে নিম্ন আদালতে ধার্য করা ১০ হাজার টাকাও বহাল রাখা হয়েছে।
আদালতের নথি অনুযায়ী, ২০১০ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি রাতে জনতা ব্যাংকের ফরিদপুর করপোরেট শাখার ভল্ট থেকে ৯৪ লাখ ১৯ হাজার ৫৯০ টাকা চুরি বা লুট হয়। ঘটনার সময় পরেশ চন্দ্র দাস ওই শাখার নিরাপত্তাপ্রহরী হিসাবে কর্মরত ছিলেন। পরদিন শাখা ব্যবস্থাপক কোতোয়ালি থানায় মামলা দায়ের করলে পরেশকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তিনি জামিনে মুক্তি পান।
ফৌজদারি মামলার বিচার চলাকালে ২০১৩ সালের ৪ আগস্ট ব্যাংক কর্তৃপক্ষ চুরি হওয়া অর্থ উদ্ধারের জন্য ফরিদপুরের প্রথম যুগ্ম জেলা জজ আদালতে একটি মানি স্যুট দায়ের করে। তবে ২০১৬ সালের ২৯ জুন আদালত সেই মামলা খারিজ করে দেন এবং ব্যাংক কর্তৃপক্ষের ওপর ১০ হাজার টাকা খরচ আরোপ করেন।
নিম্ন আদালতের ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে একই বছর হাইকোর্টে প্রথম আপিল করে জনতা ব্যাংক। বিচারপতি মো. ইকবাল কবির ও বিচারপতি মো. রিয়াজ উদ্দিন খানের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ চলতি বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি আপিলটি খারিজ করে রায় দেন। আদালত নিম্ন আদালতের আরোপিত ১০ হাজার টাকা খরচ বহাল রাখার পাশাপাশি অতিরিক্ত ৫০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে নির্দেশ দেন।
রায়ে হাইকোর্ট তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে কঠোর পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। আদালত বলেন, ব্যাংকের ভল্ট কীভাবে খোলা হয়েছিল, সে বিষয়ে অর্থবহ কোনো তদন্ত হয়নি। বিপুল পরিমাণ অর্থ লুট হওয়ার পরও প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত ও বিচারের আওতায় আনতে তদন্তকারী সংস্থা এবং প্রসিকিউশন ব্যর্থ হয়েছে।
রায়ে আরও উল্লেখ করা হয়, ভল্টের চাবি যাঁদের নিয়ন্ত্রণে ছিল কিংবা ঘটনার দিন পিকনিক শেষে যেসব কর্মকর্তা পুনরায় ব্যাংকে প্রবেশ করেছিলেন, তাদের ভূমিকা যথাযথভাবে তদন্ত করা হয়নি। বরং কেবল পরেশকে দায়ী করার প্রবণতা দেখা গেছে। এতে প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করার যৌক্তিক সন্দেহ তৈরি হয়।
হাইকোর্টের মতে, অন্যান্য সম্ভাব্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা উপেক্ষা করে শুধু একজন নিরাপত্তাপ্রহরীকে দায়ী করার চেষ্টা আদালতের কার্যপ্রণালির অপব্যবহারের শামিল। এ কারণেই আপিলটি খরচাসহ খারিজ করা হয়েছে।
পরেশের পরিবারের পক্ষে শুনানিতে অংশ নেওয়া আইনজীবী চঞ্চল কুমার বিশ্বাস বলেন, আদালত স্পষ্টভাবে বলেছেন যে চুরি বা লুট হওয়া অর্থ উদ্ধারের জন্য এ ধরনের দেওয়ানি মামলা গ্রহণযোগ্য নয়। মূল মামলাটিই ভুল ধারণার ভিত্তিতে দায়ের করা হয়েছিল। তার মতে, ভল্টের চাবির দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের মামলায় অন্তর্ভুক্ত না করে শুধুমাত্র একজন নিরাপত্তাপ্রহরীকে জড়ানো হয়েছিল, যা প্রকৃত ঘটনা আড়াল করার ইঙ্গিত দেয়। তিনি এই অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় জড়িত প্রকৃত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নতুন করে তদন্তের দাবি জানান।
অন্যদিকে জনতা ব্যাংকের পক্ষে শুনানি করা আইনজীবী মো. আরিফ বিল্লাহ বলেন, রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি এখনো হাতে আসেনি। অনুলিপি পাওয়ার পর ব্যাংক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করা হবে।
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে পরেশ দাবি করেছিলেন, ঘটনার রাতে তিনি ব্যাংকের ভেতরে ঘুমিয়ে ছিলেন। গভীর রাতে কয়েকজন ব্যক্তি এসে তাকে ভয়ভীতি দেখিয়ে চুপ থাকতে বাধ্য করেন। তাদের মধ্যে তপু ও জাহিদ নামে দুজনকে তিনি চিনতেন বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ওই ব্যক্তিরা নিয়মিত ব্যাংকের সামনে আসা-যাওয়া করতেন এবং তার সঙ্গে পরিচিত ছিলেন। ঘটনার দিন তাঁরা তাকে পাঁচ হাজার টাকা দেন, যা পরে পুলিশ তার স্ত্রীর কাছ থেকে উদ্ধার করে।
তবে পরবর্তী সময়ে পুলিশের দেওয়া অভিযোগপত্রে জাহিদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। আর তপু বিচারিক আদালতে খালাস পেয়ে যান।
ফৌজদারি মামলায় ২০২০ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ফরিদপুরের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত পরেশকে চার বছরের কারাদণ্ড দেন। সেই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করলে ২০২৩ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর দায়রা আদালত তার সাজা কমিয়ে দুই বছর নির্ধারণ করেন।
পরে ওই রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে ফৌজদারি রিভিশন আবেদন করেন পরেশ। শুনানি শেষে ২০২৫ সালের ২৮ জানুয়ারি হাইকোর্ট দায়রা আদালতের রায় বাতিল করে তাকে সম্পূর্ণ খালাস দেন। এর ফলে মামলার সব দায় থেকে তিনি মুক্তি পান।
তবে এই রায় ঘোষণার প্রায় এক বছর আগেই, ২০২৪ সালের ২৬ জানুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন পরেশ চন্দ্র দাস। ফলে দীর্ঘদিনের আইনি লড়াইয়ে নির্দোষ প্রমাণিত হলেও নিজের মুক্তির রায় দেখে যেতে পারেননি তিনি।
পরেশের মৃত্যুর পর অর্থ উদ্ধারসংক্রান্ত মামলায় তার স্ত্রী রিতা রানী দাস, ছেলে প্রণব কুমার দাস এবং মেয়ে লিপি রানী দাসকে বিবাদী হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
পরেশের ছেলে প্রণব কুমার দাস বলেন, দীর্ঘ ১৬ বছরের আইনি লড়াই তাদের পরিবারকে চরম মানসিক, সামাজিক ও আর্থিক ভোগান্তির মধ্যে ফেলেছে। তার ভাষায়, বাবা শেষ পর্যন্ত নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন, কিন্তু সেই রায় নিজের চোখে দেখে যেতে পারেননি। এ কষ্ট আমাদের সবসময় তাড়া করবে। প্রকৃত অপরাধীরা এখনো ধরা-ছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে।
তিনি আরও বলেন, ঘটনার সময় তার বাবার চাকরিজীবনের প্রায় দুই দশক পার হয়ে গিয়েছিল। এখন পরিবার আশা করছে, আদালতের রায়ের পর ব্যাংক কর্তৃপক্ষ পরেশ চন্দ্র দাসের চাকরি-পরবর্তী সব প্রাপ্য সুবিধা যথাযথভাবে পরিশোধ করবে।



