১১৫০ টাকার নামজারিতে ৭০ হাজার টাকা দাবি, তহশিলদার সাময়িক বরখাস্ত

সিজেডএন ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
১১৫০ টাকার নামজারিতে ৭০ হাজার টাকা দাবি, তহশিলদার সাময়িক বরখাস্ত
ভূমি উপসহকারী কর্মকর্তা (তহশিলদার) আবদুস সোবাহান

পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলা ভূমি অফিসের দায়িত্বপ্রাপ্ত ভূমি উপসহকারী কর্মকর্তা (তহশিলদার) আবদুস সোবাহানের বিরুদ্ধে নামজারির জন্য নির্ধারিত ১ হাজার ১৫০ টাকা ফির বাইরে এক সেবাগ্রহীতার কাছে ৭০ হাজার টাকা দাবি করার অভিযোগ উঠেছে। এ–সংক্রান্ত একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি আলোচনায় আসে।

ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, চারটি পৃথক জমির দলিলের বিপরীতে নতুন খতিয়ান খোলার জন্য এক ব্যক্তির কাছে ৭০ হাজার টাকা দাবি করছেন তহশিলদার সোবাহান। ওই ব্যক্তি এত টাকা দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, সার্ভেয়ার-কানুনগোসহ মোট আটটি টেবিলে টাকা দিতে হবে।

ভিডিওতে ওই সেবাগ্রহীতাকে বলতে শোনা যায়, ‘১ হাজার ১৫০ টাকার কাজে ৭০ হাজার টাকা লাগবে কেন? এত টাকা দিতে হলে তো জমি বিক্রি করতে হবে।’

পরে দর-কষাকষির একপর্যায়ে দুটি দলিলের বিপরীতে একটি খতিয়ান খোলার জন্য ২০ হাজার টাকায় সমঝোতা হয়। এর মধ্যে ১০ হাজার টাকা নগদ নেন তহশিলদার। বাকি ১০ হাজার টাকা বিকাশে পাঠানোর কথা বলা হলে তিনি তাতে আপত্তি জানান এবং হাতে হাতে টাকা দেওয়ার কথা বলেন।

অভিযোগকারী মহিউদ্দিন খন্দকার রাঙ্গাবালীর চরমোন্তাজ এলাকার বাসিন্দা। তিনি বলেন, চারটি পৃথক দলিলের জমি একই খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য স্থানীয় ইউনিয়ন ভূমি অফিসে গিয়ে তহশিলদার আবদুস সোবাহানের সঙ্গে কথা বলেন। তখন নির্ধারিত ১ হাজার ১৫০ টাকা ফির পরিবর্তে তার কাছে ৭০ হাজার টাকা দাবি করা হয়।

মহিউদ্দিনের ভাষ্য, পরে দর-কষাকষি করে ২০ হাজার টাকায় কাজটি করে দেওয়ার কথা হয়। চুক্তি অনুযায়ী তিনি ১০ হাজার টাকা অগ্রিম দেন এবং কাজ শেষে আরও ১০ হাজার টাকা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কয়েক মাস ঘোরানোর পর চারটি দলিলের মধ্যে দুটি বাদ দিয়ে অন্য দুটি দলিলের বিপরীতে একটি খতিয়ান করে দেওয়া হয়। এরপরও তাকে সরকারি ১ হাজার ১৫০ টাকা ফি পরিশোধের জন্য চাপ দেওয়া হয়।

মহিউদ্দিন বলেন, তহশিলদারের আচরণ সন্দেহজনক মনে হওয়ায় টাকা দেওয়ার সময় গোপনে মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করেন। পরে হয়রানির অভিযোগে ক্ষুব্ধ হয়ে ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন তিনি।

এদিকে তহশিলদার আবদুস সোবাহানের বিরুদ্ধে আরও একটি পুরোনো ঘুষের অভিযোগ সামনে এসেছে। রাঙ্গাবালীর বড়বাইশদিয়া ইউনিয়নের গাব্বুনিয়া গ্রামের ২৬ একর জমির বিএস রেকর্ড সংশোধন করে দেওয়ার কথা বলে প্রায় ২০ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ করেছেন আতিকুর রহমান খান ও তার চাচা মো. জাকির হোসেন খান।

আতিকুর রহমান বলেন, পটুয়াখালী সদর উপজেলার মৌকরণ ইউনিয়নে দায়িত্ব পালনের সময় আবদুস সোবাহান তাদের ২৬ একর জমির বিএস রেকর্ড সংশোধন করে দেওয়ার কথা বলেন। এ জন্য প্রথমে ২৬ লাখ টাকা দাবি করা হলেও পরে ২০ লাখ টাকায় সমঝোতা হয়।

জাকির হোসেন খান বলেন, তহশিলদার সোবাহান তাদের দূরসম্পর্কের আত্মীয় হওয়ায় তারা তাকে বিশ্বাস করেছিলেন। পরে ধাপে ধাপে ৭ লাখ টাকা নগদ দেওয়ার পাশাপাশি সোবাহানের নিজের ব্যাংক হিসাবে আরও সাড়ে ১২ লাখ টাকা জমা দেন। তবে টাকা নেওয়ার পর সোবাহান যে কাগজপত্র তৈরি করে দিয়েছিলেন, পরে সেগুলো জাল বলে প্রমাণিত হয়।

তবে দুই অভিযোগই অস্বীকার করেছেন আবদুস সোবাহান। মহিউদ্দিন খন্দকারের অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘অভিযোগকারী মহিউদ্দিন খন্দকার আমার কাছে আসেননি এবং জমিসংক্রান্ত কোনো কাগজপত্রও জমা দেননি।’

২০ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে তার দাবি, ওই অর্থ কোনো কাজের বিনিময়ে নেওয়া হয়নি। এটি তাঁর শ্বশুরবাড়ির দলিলসংক্রান্ত পারিবারিক লেনদেন।

রাঙ্গাবালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) পদে অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা নাজমুল হাসান বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তহশিলদার সোবাহানের বিষয়টি নজরে আসার পর তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে জেলা প্রশাসক তাকে সাময়িক বরখাস্ত করেছেন। কারণ দর্শানোর নোটিশের জবাব পাওয়ার পর পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের রাজস্ব শাখা সূত্রে জানা গেছে, বৈধভাবে জমির মালিকানা পরিবর্তনের পর সরকারি রেকর্ড বা খতিয়ানে নতুন মালিকের নাম অন্তর্ভুক্ত বা হালনাগাদ করার প্রক্রিয়াকে নামজারি বা মিউটেশন বলা হয়। এ জন্য সরকার নির্ধারিত ফি ১ হাজার ১৫০ টাকা।

/এমআর/