শিরোনাম

গ্রামবাসীর অর্থায়নে নির্মাণ হচ্ছে চান্দাই জনতা এক্সপ্রেস

পাবনা প্রতিনিধি
পাবনা প্রতিনিধি
গ্রামবাসীর অর্থায়নে নির্মাণ হচ্ছে চান্দাই জনতা এক্সপ্রেস
গ্রামের খোলা মাঠে চলছে ৮২ হাত দৈর্ঘ্যের নৌকা তৈরির কাজ। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

গ্রাম বাংলার মানুষের কাছে নৌকাবাইচ কেবল একটি খেলা নয়, এটি তাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য, আবেগ ও গৌরবের প্রতীক। বিল-নদী বেষ্টিত পাবনা জেলার মানুষের কাছে নৌকাবাইচ একটা ঐতিহ্য ও ভালবাসার উৎসবের নাম।

দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যকে আরও সমৃদ্ধ করতে একটি গ্রামের সব পরিবারের আর্থিক সহযোগিতায় নির্মাণ করা হচ্ছে ৮২ হাত দৈর্ঘ্যের নৌকা চান্দাই জনতা এক্সপ্রেস। মূলত নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে এই নৌকা বানানো হচ্ছে।

পাবনার আটঘরিয়া উপজেলার চান্দাই গ্রামে নির্মিত হচ্ছে নৌকাটি। প্রায় ১৫ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন নৌকাটির কাজ আগামী এক মাসের মধ্যে শেষ হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সরেজমিনে চান্দাই গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, গ্রামের খোলা একটি স্থানে চলছে নৌকা তৈরির কাজ। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত একদল দক্ষ কারিগর শাল, গর্জন, সেগুন ও চাপালিশ কাঠ কাটা, আগুনের তাপে বাঁকানো, কাঠের অংশগুলো নিখুঁতভাবে জোড়া লাগানো এবং নৌকার কাঠামো তৈরিতে ব্যস্ত রয়েছেন। নৌকা নির্মাণে ব্যবহৃত সব কাঠ গাজীপুর থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। নৌকার স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে লোহার পেরেক, বোল্ট, বিশেষ আঠা ও জলরোধী প্রলেপ ব্যবহার করা হচ্ছে।

কারিগরদের মতে, বড় আকারের নৌকা তৈরিতে কাঠের মান, ভারসাম্য এবং কারিগরি দক্ষতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সামান্য ত্রুটিও প্রতিযোগিতায় নৌকার গতি ও নিয়ন্ত্রণে প্রভাব ফেলতে পারে।

নৌকা নির্মাণে নিয়োজিত প্রধান কারিগর সুকুমার চন্দ্র সূত্রধর বলেন, আমার বাবা প্রায় ৮০ বছর এই পেশায় ছিলেন। আমি নৌকা তৈরির কাজ তার কাছ থেকে শিখেছি। গত ৫৫ বছর ধরে এই কাজ করছি। এখন পর্যন্ত প্রায় ১৫০টি বাইচের নৌকা নির্মাণ করেছি।

তিনি আরও বলেন, বাইচের নৌকা তৈরির কাজ শুধু পেশা নয়, এটি একটি শিল্প। একটি ভালো নৌকা তৈরিতে অভিজ্ঞতা, ধৈর্য ও নিখুঁত কারিগরি দক্ষতার প্রয়োজন হয়। সেই কাজটিই আমরা করছি।

নৌকার প্রধান মাঝি আবু সাঈদ মোল্লা বলেন, আমি ১৯৮০ সাল থেকে বাইচের নৌকার মাঝি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। বর্তমানে আমার বয়স ৬০ বছর। দীর্ঘ এই সময়ে হাদল, হাটগ্রাম, গোরোরী, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছি। বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন ও রানারআপ হওয়ার গৌরবও অর্জন করেছি।

তিনি বলেন, নতুন চান্দাই জনতা এক্সপ্রেস নিয়েও আমরা বড় বড় প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে চাই। আমাদের লক্ষ্য শুধু বিজয় অর্জন নয়, চান্দাই গ্রামের ঐতিহ্যকে আরও সমৃদ্ধ করা এবং পাবনার আটঘরিয়ার নাম দেশজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়া।

নৌকা পরিচালনা কমিটির অন্যতম সদস্য আব্দুল মান্নান বলেন, চান্দাই গ্রামের নৌকা বাইচের ইতিহাস অনেক পুরোনো। এই নৌকা শুধু একটি প্রতিযোগিতার বাহন নয়, এটি আমাদের গ্রামের ঐক্য, সংস্কৃতি ও গৌরবের প্রতীক। গ্রামের প্রতিটি পরিবারের অনুদানে চান্দাই জনতা এক্সপ্রেস নির্মাণ করা হচ্ছে।

নৌকা পরিচালনা কমিটির আরেক সদস্য আসাদুল মেম্বার জানান, এই নৌকা নির্মাণের পেছনে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের একক অর্থায়ন নেই। গ্রামের প্রতিটি পরিবার তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী অর্থ দিয়েছে। এ কারণেই নৌকার নামের সঙ্গে জনতা শব্দটি যুক্ত করা হয়েছে। এটি চান্দাই গ্রামের মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ।

গ্রামবাসীর মতে, নৌকাবাইচ শুধু বিনোদন নয়, এটি বাংলার শতবর্ষের লোকজ ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে নতুন প্রজন্মকেও নৌকাবাইচের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তরুণদের আগ্রহ ও প্রবীণদের অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে চান্দাই গ্রামের নৌকাবাইচের ঐতিহ্য আরও শক্ত ভিত্তি পাবে বলে তাদের আশা।

/এসআর/