আড়াই বছরের ছেলেকে বুকের সঙ্গে বেঁধে অটোরিকশা চালান অসহায় বাবা

এম এস রহমান, পাবনা
এম এস রহমান, পাবনা
আড়াই বছরের ছেলেকে বুকের সঙ্গে বেঁধে অটোরিকশা চালান অসহায় বাবা
শিশুসন্তানকে এভাবেই বুকের সঙ্গে গামছা দিয়ে বেঁধে অটোরিকশা চালান রবিউল ইসলাম। ছবি: সিটিজেন জার্নাল

দুই হাতে অটোরিকশার হ্যান্ডেল, বুকের সঙ্গে গামছা দিয়ে শক্ত করে বাঁধা আড়াই বছরের ছেলে। যাত্রীদের গন্তব্যে পৌঁছে দিতে শহরের অলিগলিতে ছুটে চলছে সেই অটোরিকশা। কখনো হাতে থাকা দুধের বোতল থেকে দুধ পান করছে শিশুটি, কখনো আবার অবাক চোখে তাকিয়ে দেখছে চারপাশের ব্যস্ততা। এমন দৃশ্য আবেগ আপ্লুত করছে অনেককেই।

‎অন্য শিশুদের মতো মায়ের সঙ্গে দুষ্টু মিষ্টি খুনসুটিতে মেতে থাকার কথা ছিল আলফে সানির। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাসে মাত্র দুই বছর বয়সেই মায়ের আদর-ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত নিষ্পাপ শিশুটি। বাবাই এখন তার একমাত্র আশ্রয়।

পাবনা সদর উপজেলার দক্ষিণ রামচন্দ্রপুর গ্রামের অটোরিকশাচালক রবিউল ইসলাম ও তার দুই বছরের ছেলে আলফে সানির জীবনযুদ্ধের গল্পটা এমনই।

রবিউল ইসলামের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পারিবারিকভাবে ২০২৩ সালের ২৩ জানুয়ারি বিয়ে হয় রবিউল ইসলাম ও রুমিয়া খাতুনের। ২০২৪ সালের ১ মে তাদের ঘরে জন্ম নেয় ছেলে আলফে সানি। শিশুটির বয়স এখন আড়াই বছর। চলতি বছরের গত ৫ মে নিজের বুকের ধন শিশু সন্তানকে ফেলে চলে যায় তার মা। এরপর থেকে তাকে আগলে রাখার প্রাণান্ত চেষ্টা বাবা রবিউলের।

প্রতিদিন ছেলেকে গামছা দিয়ে বুকের সঙ্গে বেঁধে অটোরিকশা চালাচ্ছেন তিনি। হাতে থাকছে দুধ ভর্তি একটি ফিডার। সময় হলেই বাড়ি ফিরে ছেলেকে যত্ন করছেন, চেষ্টা করছেন মায়ের অভাব পুষিয়ে দিতে। ছেলের যত্ন করতে গিয়ে উপার্জন কমেছে রবিউলের। কিন্তু হার মানেননি দারিদ্র্যের কাছে।

সন্তানকে নিজ হাতে খাবার খাওয়াচ্ছেন অটোরিকশা চালক রবিউল ইসলাম। ছবি: সিটিজেন জার্নাল
সন্তানকে নিজ হাতে খাবার খাওয়াচ্ছেন অটোরিকশা চালক রবিউল ইসলাম। ছবি: সিটিজেন জার্নাল

গত ২৬ অক্টোবর দুপুরে তার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় ছেলেকে খাওয়াচ্ছেন রবিউল। ভাঙাচোরা ছোট্ট টিনের ঘরে বসবাস তাদের। বৃষ্টির সময় পানি ঠেকাতে রীতিমতো যুদ্ধ করতে হয়। নিজের বসতবাড়ি বা জমি বলতে কিছু নেই রবিউলের। খালাতো ভাইয়ের ছেলের ভাঙাচোরা দুটি টিনের ঘরের একটিতে ছেলেকে নিয়ে সীমাহীন কষ্টের মধ্যে দিন কাটছে তার।

আগে একটি সরিষার তেলের মিলে কাজ করতেন রবিউল। মিলটি বন্ধ হয়ে গেলে সংসারের খরচ চালাতে বাধ্য হয়ে অটোরিকশা চালানো শুরু করেন। নিজের মায়ের কাছ থেকে পাওয়া আধা কাঠা জমি বিক্রি করে ৮০ হাজার টাকা দিয়ে একটি অটোরিকশা কেনেন। অটোরিকশা চালিয়ে প্রতিদিন তার আয় হতো আনুমানিক ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা। সেই আয়ে ভালোই চলছিল তাদের সংসার। ‎তবে গত ৫ মে হঠাৎ করে স্ত্রী চলে যাওয়ার পর পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।

আগেই বাবা-মাকে হারানো রবিউল বলেন, আড়াই বছরের শিশুকে একা রেখে বাইরে কাজে বের হতে পারেন না। আবার সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে অটোরিকশা চালাতেও কষ্ট হয়। একদিকে সন্তানের দেখাশোনা, অন্যদিকে জীবিকার তাগিদ; প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করতে হচ্ছে তাকে।

শিশুসন্তানকে সঙ্গে নিয়েই চলে অটোরিকশাচালক রবিউল ইসলামের জীবিকার যুদ্ধ। ছবি: সিটিজেন জার্নাল
শিশুসন্তানকে সঙ্গে নিয়েই চলে অটোরিকশাচালক রবিউল ইসলামের জীবিকার যুদ্ধ। ছবি: সিটিজেন জার্নাল

রবিউল বলেন, ‘আর দশটা ছেলের মতো আমার সন্তানেরও সুন্দর ও সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার অধিকার আছে। আমি চাই তার মা ফিরে আসুক নিজের সন্তানের কথা ভেবে। আর না এলে সরকারের কাছে আমার দাবি, আমার সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য কিছু করেন। আমার একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই নাই। ছেলেকে নিয়ে সব সময় সব জায়গায় কীভাবে চলাচল করবো। তাকে তো একটা সুন্দর জীবন দিতে হবে। সেটা তো আমি পারছি না।’

রবিউল ইসলামের প্রতিবেশীরা বলেন, ছোট বেলা থেকেই রবিউল অসহায়। বিয়ের পর অটোরিকশা চালিয়ে মোটামুটি চলছিল। কিন্তু স্ত্রী চলে যাওয়ার পর খুব কষ্টের মধ্যে দিন কাটছে তার। ছেলেকে ঠিকমতো মানুষ করতে পারছে না, আবার উপার্জনও ঠিকমতো করতে পারছে না। এভাবে তো একটা মানুষের জীবন চলতে পারে না। সরকার যেন রবিউল ও তার ছেলের পাশে দাঁড়ায়, তাদের জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখে; এই দাবি জানান তারা।

ভাঙা ঘরের সামনে শিশুসন্তানসহ অটোরিকশা চালক রবিউল ইসলাম। ছবি: সিটিজেন জার্নাল
ভাঙা ঘরের সামনে শিশুসন্তানসহ অটোরিকশা চালক রবিউল ইসলাম। ছবি: সিটিজেন জার্নাল

এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে পাবনার জেলা প্রশাসক মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘রবিউল আর তার শিশু সন্তানের বিষয়টি আপনাদের মাধ্যমে জেনেছি। যেহেতু রাষ্ট্র এবং সরকার দুস্থ আর অসহায় দরিদ্র মানুষের পাশে থাকে, সে কারণে তাদের জন্য প্রয়োজনীয় যা যা করা দরকার, সরকারিভাবে আমরা করবো। তার নিজস্ব জায়গা থাকলে সেখানে আমরা একটি ঘর করে দেবো। আর রবিউল ও তার স্ত্রীর পরিবারের সঙ্গে কথা বলে তাদের মধ্যে কী সমস্যা আছে, তা জেনে সমাধানের চেষ্টা করা হবে।’