বর্জ্য স্টেশন হচ্ছে ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানে, হুমকিতে বন্যপ্রাণী

বর্জ্য স্টেশন হচ্ছে ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানে, হুমকিতে বন্যপ্রাণী
গাজীপুর সংবাদদাতা

ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান। এটি দেশের হাতেগোনা কয়েকটি শালবনের মধ্যে অন্যতম। মহাসড়কজুড়ে বনের সীমানা ঘেঁষে বছরের পর বছর ফেলা হচ্ছে গৃহস্থালি বর্জ্য। কিন্তু ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের সীমানার ঠিক মাঝখানে তাকালে আরও ভয়াবহ এক দৃশ্য চোখে পড়ে। সেখানে সীমানাপ্রাচীরের একটি অংশ ভাঙা। এখান থেকে বনের ভেতরে একটি রাস্তা চলে গেছে একটি আধা-নির্মিত অবকাঠামোর দিকে–একটি বর্জ্য স্থানান্তর কেন্দ্র, যা সংরক্ষিত বনের ঠিক মাঝখানে। এর পাশেই সরকারের '২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি'র একটি প্রচারণামূলক সাইনবোর্ড। স্টেশনটি নির্মাণ করছে গাজীপুর সিটি করপোরেশন। তারা একে শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সমস্যার সমাধান হিসেবে উপস্থাপন করছে।
ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান গাজীপুরের প্রায় ৫,০২২ হেক্টর শালবনজুড়ে বিস্তৃত। হরিণ, বুনো শুকর, বেজি এবং বিভিন্ন প্রজাতির পাখি ও সরীসৃপের আবাস এই বন। এই বন ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ঠিক রাখা এবং কার্বন শোষণের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হিসেবে কাজ করে।
গত বছরের মার্চে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের একটি ডাম্প ট্রাককে বনের ভেতরে বর্জ্য ফেলার সময় হাতেনাতে ধরা হয়। তখন একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা লিখিত অঙ্গীকার করেছিলেন এমনটি আর ঘটবে না। তবে সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে।
এ বছরের ১১ এপ্রিল বিকালে বিশ্বজিৎ এন্টারপ্রাইজ নামের এক ঠিকাদারের অধীনে একদল শ্রমিক উদ্যানের সীমানাপ্রাচীরের কাছে হাজির হয়। চিঠিপত্র অনুযায়ী, তাদের গাজীপুর সিটি করপোরেশন নিয়োগ দিয়েছিলো। রেঞ্জ কর্মকর্তা তাদের কাছে অনুমোদনের কাগজপত্র দেখতে চাইলে তারা তা দেখাতে পারেননি। তা সত্ত্বেও তারা কাজ চালিয়ে যান।
নথিপত্র অনুযায়ী, পরের দিন রাতে শ্রমিকরা এক্সকাভেটর দিয়ে পার্কের সীমানাপ্রাচীর ভেঙে ফেলে এবং সেই গর্ত মাটি দিয়ে ভরাট করে। পরের দিন বন কর্মকর্তারা কাজ বন্ধ করার চেষ্টা করলে ঘটনাস্থলে প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ শ্রমিক এবং রাজনৈতিক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি জড়ো হন। সেই ভিড়ের কারণে নির্মাণকাজ বন্ধের চেষ্টা অসম্ভব হয়ে পড়ে। কয়েক দিন পর একটি যৌথ পরিদর্শনে দেখা যায়, সংরক্ষিত বনের একটি অংশে আগুনও ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
চিঠিপত্রে বলা হয়েছে, এই প্রকল্পের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তর বা বন বিভাগ, কারো কাছ থেকেই কোনো অবস্থানগত বা পরিবেশগত ছাড়পত্র চাওয়া হয়নি।
উদ্যানের সীমানার ভেতরে কিছু ব্যক্তিগত মালিকানাধীন জমি (জোত) রয়েছে। এসব জমি চাষাবাদ বা অন্য কাজে ব্যবহার করেন মালিকরা, যা বনের কোনো ক্ষতি করে না। এই জমিগুলো বনের সীমানার ভেতরে হওয়ায় আইনত সেখানে মালিকদের করার মতো কিছু নেই, সরকারি নীতি অনুযায়ী বছরের পর বছর ধরে এসব জমি কেবল কৃষিকাজে ব্যবহারের জন্য সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে। গাজীপুর সিটি করপোরেশন শেষ পর্যন্ত এমনই একটি জায়গার ওপর তাদের বর্জ্য ডাম্পিং স্টেশনটি নির্মাণ করেছে।
মে মাসের শুরুর দিকে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) বিষয়টি হাইকোর্টে নিয়ে যায়। তাদের রিট পিটিশনে সরকার, পরিবেশ মন্ত্রণালয়, বন বিভাগ এবং গাজীপুর সিটি করপোরেশনকে রেসপনডেন্ট রাখা হয়। আবেদনে যুক্তি দেওয়া হয় যে ভাওয়ালের ভেতরে নির্মাণকাজ এবং বারবার বর্জ্য ফেলা ১৯২৭ সালের বন আইন এবং ২০২৬ সালের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইনের লঙ্ঘন।

৪ মে হাইকোর্ট বিষয়টিকে আমলে নেন। আদালত উদ্যানের অভ্যন্তরে তিনটি নির্দিষ্ট প্লটে শেড, রাস্তা বা গভীর নলকূপসহ সব ধরণের নির্মাণকাজ থেকে গাজীপুর সিটি করপোরেশন এবং তাদের ঠিকাদারকে বিরত থাকার নির্দেশ দেন। সেই সঙ্গে আগামী ছয় মাসের জন্য ভাওয়ালের আশেপাশে বর্জ্য ফেলা নিষিদ্ধ করা হয়।
বেলার প্রধান নির্বাহী এবং সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান মনে করেন, জমিটি ব্যক্তিগত মালিকানাধীন হওয়াতে বিশেষ কিছু পরিবর্তন হয় না। বর্তমান আইনি কাঠামো, এমন কী সম্প্রতি প্রণীত আইনগুলোও এই ধরণের ঘটনা রোধ করার জন্য যথেষ্ট।
তিনি বলেন, 'জমিটি ব্যক্তিগত দাবি করা হলেও এর ব্যবহারের ওপর আইনি বিধিনিষেধ জারি করা হয়েছিলো। তাই এখানে আইনি কোনো ফাঁকফোকর নেই। আইন একটি হাতিয়ার হতে পারে, কিন্তু কাণ্ডজ্ঞান সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। জমিটি যদি বনভূমি হিসেবে বিজ্ঞপ্তিভুক্ত নাও হয়, তবুও আপনি কি একটি জাতীয় উদ্যানের সীমানার ভেতরে বর্জ্য স্টেশন নির্মাণ করতে পারেন?'
গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) তানজিলা খানম বলেন, 'আমরা ময়লা কোথায় নেবো? রাস্তায় ময়লা পড়ে থাকাও পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।'
সংরক্ষিত বন ও উদ্যান থেকে দূরে কেন এই স্টেশন তৈরি করা হলো না– এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, 'আমরা বেশ কয়েকটি সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন (এসটিএস) নির্মাণ করতে চাই, কিন্তু জমি পাচ্ছি না। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য আমাদের বহু জমি প্রয়োজন, কিন্তু আমরা তা পাচ্ছি না। কেউ আমাদের জমি দিতে চায় না।'
তবে ভাওয়ালের বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এম কে এম ইকবাল হোসেন চৌধুরী বলেন, 'যদি ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের ভেতরে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বর্জ্য, প্যাথলজিক্যাল ও হাসপাতালের বর্জ্য, গৃহস্থালি ময়লা, পচা ডিম, পোল্ট্রি ফার্মের বর্জ্য, সিরিঞ্জ, কাচের টুকরো এবং পলিথিন ক্রমাগত ফেলা হতে থাকে, তবে এটি পরিবেশ ও বাতাসকে মারাত্মকভাবে দূষিত করবে।'
তিনি আরও বলেন, 'বনের বন্যপ্রাণীরা এসব বর্জ্য ও ফেলে দেওয়া খাবার খেয়ে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হবে এবং মারা যাবে। এটি উদ্যানের বন্যপ্রাণীদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি এবং পরিবেশগত বিপর্যয়ের একটি সতর্কবার্তা।'

ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান। এটি দেশের হাতেগোনা কয়েকটি শালবনের মধ্যে অন্যতম। মহাসড়কজুড়ে বনের সীমানা ঘেঁষে বছরের পর বছর ফেলা হচ্ছে গৃহস্থালি বর্জ্য। কিন্তু ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের সীমানার ঠিক মাঝখানে তাকালে আরও ভয়াবহ এক দৃশ্য চোখে পড়ে। সেখানে সীমানাপ্রাচীরের একটি অংশ ভাঙা। এখান থেকে বনের ভেতরে একটি রাস্তা চলে গেছে একটি আধা-নির্মিত অবকাঠামোর দিকে–একটি বর্জ্য স্থানান্তর কেন্দ্র, যা সংরক্ষিত বনের ঠিক মাঝখানে। এর পাশেই সরকারের '২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি'র একটি প্রচারণামূলক সাইনবোর্ড। স্টেশনটি নির্মাণ করছে গাজীপুর সিটি করপোরেশন। তারা একে শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সমস্যার সমাধান হিসেবে উপস্থাপন করছে।
ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান গাজীপুরের প্রায় ৫,০২২ হেক্টর শালবনজুড়ে বিস্তৃত। হরিণ, বুনো শুকর, বেজি এবং বিভিন্ন প্রজাতির পাখি ও সরীসৃপের আবাস এই বন। এই বন ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ঠিক রাখা এবং কার্বন শোষণের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হিসেবে কাজ করে।
গত বছরের মার্চে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের একটি ডাম্প ট্রাককে বনের ভেতরে বর্জ্য ফেলার সময় হাতেনাতে ধরা হয়। তখন একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা লিখিত অঙ্গীকার করেছিলেন এমনটি আর ঘটবে না। তবে সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে।
এ বছরের ১১ এপ্রিল বিকালে বিশ্বজিৎ এন্টারপ্রাইজ নামের এক ঠিকাদারের অধীনে একদল শ্রমিক উদ্যানের সীমানাপ্রাচীরের কাছে হাজির হয়। চিঠিপত্র অনুযায়ী, তাদের গাজীপুর সিটি করপোরেশন নিয়োগ দিয়েছিলো। রেঞ্জ কর্মকর্তা তাদের কাছে অনুমোদনের কাগজপত্র দেখতে চাইলে তারা তা দেখাতে পারেননি। তা সত্ত্বেও তারা কাজ চালিয়ে যান।
নথিপত্র অনুযায়ী, পরের দিন রাতে শ্রমিকরা এক্সকাভেটর দিয়ে পার্কের সীমানাপ্রাচীর ভেঙে ফেলে এবং সেই গর্ত মাটি দিয়ে ভরাট করে। পরের দিন বন কর্মকর্তারা কাজ বন্ধ করার চেষ্টা করলে ঘটনাস্থলে প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ শ্রমিক এবং রাজনৈতিক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি জড়ো হন। সেই ভিড়ের কারণে নির্মাণকাজ বন্ধের চেষ্টা অসম্ভব হয়ে পড়ে। কয়েক দিন পর একটি যৌথ পরিদর্শনে দেখা যায়, সংরক্ষিত বনের একটি অংশে আগুনও ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
চিঠিপত্রে বলা হয়েছে, এই প্রকল্পের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তর বা বন বিভাগ, কারো কাছ থেকেই কোনো অবস্থানগত বা পরিবেশগত ছাড়পত্র চাওয়া হয়নি।
উদ্যানের সীমানার ভেতরে কিছু ব্যক্তিগত মালিকানাধীন জমি (জোত) রয়েছে। এসব জমি চাষাবাদ বা অন্য কাজে ব্যবহার করেন মালিকরা, যা বনের কোনো ক্ষতি করে না। এই জমিগুলো বনের সীমানার ভেতরে হওয়ায় আইনত সেখানে মালিকদের করার মতো কিছু নেই, সরকারি নীতি অনুযায়ী বছরের পর বছর ধরে এসব জমি কেবল কৃষিকাজে ব্যবহারের জন্য সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে। গাজীপুর সিটি করপোরেশন শেষ পর্যন্ত এমনই একটি জায়গার ওপর তাদের বর্জ্য ডাম্পিং স্টেশনটি নির্মাণ করেছে।
মে মাসের শুরুর দিকে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) বিষয়টি হাইকোর্টে নিয়ে যায়। তাদের রিট পিটিশনে সরকার, পরিবেশ মন্ত্রণালয়, বন বিভাগ এবং গাজীপুর সিটি করপোরেশনকে রেসপনডেন্ট রাখা হয়। আবেদনে যুক্তি দেওয়া হয় যে ভাওয়ালের ভেতরে নির্মাণকাজ এবং বারবার বর্জ্য ফেলা ১৯২৭ সালের বন আইন এবং ২০২৬ সালের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইনের লঙ্ঘন।

৪ মে হাইকোর্ট বিষয়টিকে আমলে নেন। আদালত উদ্যানের অভ্যন্তরে তিনটি নির্দিষ্ট প্লটে শেড, রাস্তা বা গভীর নলকূপসহ সব ধরণের নির্মাণকাজ থেকে গাজীপুর সিটি করপোরেশন এবং তাদের ঠিকাদারকে বিরত থাকার নির্দেশ দেন। সেই সঙ্গে আগামী ছয় মাসের জন্য ভাওয়ালের আশেপাশে বর্জ্য ফেলা নিষিদ্ধ করা হয়।
বেলার প্রধান নির্বাহী এবং সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান মনে করেন, জমিটি ব্যক্তিগত মালিকানাধীন হওয়াতে বিশেষ কিছু পরিবর্তন হয় না। বর্তমান আইনি কাঠামো, এমন কী সম্প্রতি প্রণীত আইনগুলোও এই ধরণের ঘটনা রোধ করার জন্য যথেষ্ট।
তিনি বলেন, 'জমিটি ব্যক্তিগত দাবি করা হলেও এর ব্যবহারের ওপর আইনি বিধিনিষেধ জারি করা হয়েছিলো। তাই এখানে আইনি কোনো ফাঁকফোকর নেই। আইন একটি হাতিয়ার হতে পারে, কিন্তু কাণ্ডজ্ঞান সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। জমিটি যদি বনভূমি হিসেবে বিজ্ঞপ্তিভুক্ত নাও হয়, তবুও আপনি কি একটি জাতীয় উদ্যানের সীমানার ভেতরে বর্জ্য স্টেশন নির্মাণ করতে পারেন?'
গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) তানজিলা খানম বলেন, 'আমরা ময়লা কোথায় নেবো? রাস্তায় ময়লা পড়ে থাকাও পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।'
সংরক্ষিত বন ও উদ্যান থেকে দূরে কেন এই স্টেশন তৈরি করা হলো না– এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, 'আমরা বেশ কয়েকটি সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন (এসটিএস) নির্মাণ করতে চাই, কিন্তু জমি পাচ্ছি না। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য আমাদের বহু জমি প্রয়োজন, কিন্তু আমরা তা পাচ্ছি না। কেউ আমাদের জমি দিতে চায় না।'
তবে ভাওয়ালের বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এম কে এম ইকবাল হোসেন চৌধুরী বলেন, 'যদি ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের ভেতরে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বর্জ্য, প্যাথলজিক্যাল ও হাসপাতালের বর্জ্য, গৃহস্থালি ময়লা, পচা ডিম, পোল্ট্রি ফার্মের বর্জ্য, সিরিঞ্জ, কাচের টুকরো এবং পলিথিন ক্রমাগত ফেলা হতে থাকে, তবে এটি পরিবেশ ও বাতাসকে মারাত্মকভাবে দূষিত করবে।'
তিনি আরও বলেন, 'বনের বন্যপ্রাণীরা এসব বর্জ্য ও ফেলে দেওয়া খাবার খেয়ে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হবে এবং মারা যাবে। এটি উদ্যানের বন্যপ্রাণীদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি এবং পরিবেশগত বিপর্যয়ের একটি সতর্কবার্তা।'

বর্জ্য স্টেশন হচ্ছে ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানে, হুমকিতে বন্যপ্রাণী
গাজীপুর সংবাদদাতা

ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান। এটি দেশের হাতেগোনা কয়েকটি শালবনের মধ্যে অন্যতম। মহাসড়কজুড়ে বনের সীমানা ঘেঁষে বছরের পর বছর ফেলা হচ্ছে গৃহস্থালি বর্জ্য। কিন্তু ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের সীমানার ঠিক মাঝখানে তাকালে আরও ভয়াবহ এক দৃশ্য চোখে পড়ে। সেখানে সীমানাপ্রাচীরের একটি অংশ ভাঙা। এখান থেকে বনের ভেতরে একটি রাস্তা চলে গেছে একটি আধা-নির্মিত অবকাঠামোর দিকে–একটি বর্জ্য স্থানান্তর কেন্দ্র, যা সংরক্ষিত বনের ঠিক মাঝখানে। এর পাশেই সরকারের '২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি'র একটি প্রচারণামূলক সাইনবোর্ড। স্টেশনটি নির্মাণ করছে গাজীপুর সিটি করপোরেশন। তারা একে শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সমস্যার সমাধান হিসেবে উপস্থাপন করছে।
ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান গাজীপুরের প্রায় ৫,০২২ হেক্টর শালবনজুড়ে বিস্তৃত। হরিণ, বুনো শুকর, বেজি এবং বিভিন্ন প্রজাতির পাখি ও সরীসৃপের আবাস এই বন। এই বন ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ঠিক রাখা এবং কার্বন শোষণের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হিসেবে কাজ করে।
গত বছরের মার্চে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের একটি ডাম্প ট্রাককে বনের ভেতরে বর্জ্য ফেলার সময় হাতেনাতে ধরা হয়। তখন একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা লিখিত অঙ্গীকার করেছিলেন এমনটি আর ঘটবে না। তবে সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে।
এ বছরের ১১ এপ্রিল বিকালে বিশ্বজিৎ এন্টারপ্রাইজ নামের এক ঠিকাদারের অধীনে একদল শ্রমিক উদ্যানের সীমানাপ্রাচীরের কাছে হাজির হয়। চিঠিপত্র অনুযায়ী, তাদের গাজীপুর সিটি করপোরেশন নিয়োগ দিয়েছিলো। রেঞ্জ কর্মকর্তা তাদের কাছে অনুমোদনের কাগজপত্র দেখতে চাইলে তারা তা দেখাতে পারেননি। তা সত্ত্বেও তারা কাজ চালিয়ে যান।
নথিপত্র অনুযায়ী, পরের দিন রাতে শ্রমিকরা এক্সকাভেটর দিয়ে পার্কের সীমানাপ্রাচীর ভেঙে ফেলে এবং সেই গর্ত মাটি দিয়ে ভরাট করে। পরের দিন বন কর্মকর্তারা কাজ বন্ধ করার চেষ্টা করলে ঘটনাস্থলে প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ শ্রমিক এবং রাজনৈতিক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি জড়ো হন। সেই ভিড়ের কারণে নির্মাণকাজ বন্ধের চেষ্টা অসম্ভব হয়ে পড়ে। কয়েক দিন পর একটি যৌথ পরিদর্শনে দেখা যায়, সংরক্ষিত বনের একটি অংশে আগুনও ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
চিঠিপত্রে বলা হয়েছে, এই প্রকল্পের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তর বা বন বিভাগ, কারো কাছ থেকেই কোনো অবস্থানগত বা পরিবেশগত ছাড়পত্র চাওয়া হয়নি।
উদ্যানের সীমানার ভেতরে কিছু ব্যক্তিগত মালিকানাধীন জমি (জোত) রয়েছে। এসব জমি চাষাবাদ বা অন্য কাজে ব্যবহার করেন মালিকরা, যা বনের কোনো ক্ষতি করে না। এই জমিগুলো বনের সীমানার ভেতরে হওয়ায় আইনত সেখানে মালিকদের করার মতো কিছু নেই, সরকারি নীতি অনুযায়ী বছরের পর বছর ধরে এসব জমি কেবল কৃষিকাজে ব্যবহারের জন্য সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে। গাজীপুর সিটি করপোরেশন শেষ পর্যন্ত এমনই একটি জায়গার ওপর তাদের বর্জ্য ডাম্পিং স্টেশনটি নির্মাণ করেছে।
মে মাসের শুরুর দিকে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) বিষয়টি হাইকোর্টে নিয়ে যায়। তাদের রিট পিটিশনে সরকার, পরিবেশ মন্ত্রণালয়, বন বিভাগ এবং গাজীপুর সিটি করপোরেশনকে রেসপনডেন্ট রাখা হয়। আবেদনে যুক্তি দেওয়া হয় যে ভাওয়ালের ভেতরে নির্মাণকাজ এবং বারবার বর্জ্য ফেলা ১৯২৭ সালের বন আইন এবং ২০২৬ সালের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইনের লঙ্ঘন।

৪ মে হাইকোর্ট বিষয়টিকে আমলে নেন। আদালত উদ্যানের অভ্যন্তরে তিনটি নির্দিষ্ট প্লটে শেড, রাস্তা বা গভীর নলকূপসহ সব ধরণের নির্মাণকাজ থেকে গাজীপুর সিটি করপোরেশন এবং তাদের ঠিকাদারকে বিরত থাকার নির্দেশ দেন। সেই সঙ্গে আগামী ছয় মাসের জন্য ভাওয়ালের আশেপাশে বর্জ্য ফেলা নিষিদ্ধ করা হয়।
বেলার প্রধান নির্বাহী এবং সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান মনে করেন, জমিটি ব্যক্তিগত মালিকানাধীন হওয়াতে বিশেষ কিছু পরিবর্তন হয় না। বর্তমান আইনি কাঠামো, এমন কী সম্প্রতি প্রণীত আইনগুলোও এই ধরণের ঘটনা রোধ করার জন্য যথেষ্ট।
তিনি বলেন, 'জমিটি ব্যক্তিগত দাবি করা হলেও এর ব্যবহারের ওপর আইনি বিধিনিষেধ জারি করা হয়েছিলো। তাই এখানে আইনি কোনো ফাঁকফোকর নেই। আইন একটি হাতিয়ার হতে পারে, কিন্তু কাণ্ডজ্ঞান সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। জমিটি যদি বনভূমি হিসেবে বিজ্ঞপ্তিভুক্ত নাও হয়, তবুও আপনি কি একটি জাতীয় উদ্যানের সীমানার ভেতরে বর্জ্য স্টেশন নির্মাণ করতে পারেন?'
গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) তানজিলা খানম বলেন, 'আমরা ময়লা কোথায় নেবো? রাস্তায় ময়লা পড়ে থাকাও পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।'
সংরক্ষিত বন ও উদ্যান থেকে দূরে কেন এই স্টেশন তৈরি করা হলো না– এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, 'আমরা বেশ কয়েকটি সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন (এসটিএস) নির্মাণ করতে চাই, কিন্তু জমি পাচ্ছি না। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য আমাদের বহু জমি প্রয়োজন, কিন্তু আমরা তা পাচ্ছি না। কেউ আমাদের জমি দিতে চায় না।'
তবে ভাওয়ালের বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এম কে এম ইকবাল হোসেন চৌধুরী বলেন, 'যদি ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের ভেতরে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বর্জ্য, প্যাথলজিক্যাল ও হাসপাতালের বর্জ্য, গৃহস্থালি ময়লা, পচা ডিম, পোল্ট্রি ফার্মের বর্জ্য, সিরিঞ্জ, কাচের টুকরো এবং পলিথিন ক্রমাগত ফেলা হতে থাকে, তবে এটি পরিবেশ ও বাতাসকে মারাত্মকভাবে দূষিত করবে।'
তিনি আরও বলেন, 'বনের বন্যপ্রাণীরা এসব বর্জ্য ও ফেলে দেওয়া খাবার খেয়ে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হবে এবং মারা যাবে। এটি উদ্যানের বন্যপ্রাণীদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি এবং পরিবেশগত বিপর্যয়ের একটি সতর্কবার্তা।'









