শিরোনাম

চুড়িহাট্টা অগ্নিকাণ্ডের সাত বছরেও বিচার মেলেনি

নিজস্ব প্রতিবেদক
চুড়িহাট্টা অগ্নিকাণ্ডের সাত বছরেও বিচার মেলেনি
চুড়িহাট্টায় অগ্নিকাণ্ডের ভয়ঙ্কর সেই রাত। ছবি: রয়টার্স

পুরান ঢাকার চুড়িহাট্টায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দায়ের করা মামলার বিচার চলছে ধীরগতিতে। সাত বছর আগের ওই ঘটনার পর বিচার শুরু হয়েছে, তা-ও তিন বছর হয়ে গেছে। এই তিন বছরে সাক্ষ্য নেওয়া গেছে কেবল ৬ জনের।

কবে নাগাদ বিচার শেষ হবে, কেউ তা নির্দিষ্ট করে বলতে পারছেন না। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা আশ্বাস দিচ্ছেন। স্বজন হারানো মানুষেরা বিচারের আশায় রয়েছেন। আসামিপক্ষও চাইছে বিচার শেষ হোক, তবে তা যেন ‘ন্যায়বিচার’ হয়।

২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে চকবাজারের চুড়িহাট্টা মোড়ের কাছে চারতলা ওয়াহেদ ম্যানশন থেকে লাগা আগুন আশপাশের কয়েকটি ভবনে ছড়িয়ে পড়ে। গায়ে গায়ে লেগে থাকা ভবনগুলোতে রাসায়নিক দ্রব্য, প্লাস্টিক ও পারফিউমের দোকান-গুদাম থাকায় মুহূর্তেই গোটা এলাকা পরিণত হয় অগ্নিকুণ্ডে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই অনেকে ছাই হয়ে যান। আগুনের প্রচণ্ডতায় দুমড়ে-মুচড়ে যায় দোকান-পাট, রিকশা-গাড়ি।

ফায়ার সার্ভিসের ৩৭টি ইউনিট ১৪ ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার পর ৬৭ জনের পোড়া লাশ উদ্ধার করা হয়। পরে মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় ৭১ জনে।

পুরান ঢাকার চুড়িহাট্টায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত ভবন। ছবি: সংগৃহীত
পুরান ঢাকার চুড়িহাট্টায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত ভবন। ছবি: সংগৃহীত

ওই ঘটনায় নিহত চকবাজারের ওয়াটার ওয়াকর্স রোডের ৩২/৩৩ নম্বর বাড়ির বাসিন্দা জুম্মনের ছেলে মো. আসিফ আহমেদ ‘অবহেলার কারণে সৃষ্ট অগ্নিসংযোগের ফলে মৃত্যু ঘটাসহ ক্ষতিসাধনের’ অভিযোগে চকবাজার মডেল থানায় মামলা করেন।

মামলায় বলা হয়, ওয়াহেদ ম্যানশনের মালিকের দুই ছেলে তাদের চারতলা বাড়ির বিভিন্ন ফ্লোরে দাহ্য পদার্থ রাখতেন। মানুষের জীবনের ঝুঁকি জেনেও অবৈধভাবে রাসায়নিকের গুদাম করার জন্য ব্যবসায়ীদের কাছে বাসা ভাড়া দেন তারা।

মামলাটি তদন্ত করে তিন বছর পর ২০২২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি ৮ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র জমা দেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা চকবাজার মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ আবদুল কাইউম।

অভিযোগপত্রে আসামি করা হয়– হাসান ওরফে হাসান সুলতান, সোহেল ওরফে শহীদ ওরফে হোসেন সুলতান, ইমতিয়াজ আহমেদ, মোজাম্মেল ইকবাল, মোজাফফর উদ্দিন, জাওয়াদ আতিক, মোহাম্মদ নাবিল ও মোহাম্মদ কাশিফকে।

তাদের মধ্যে দুই ভাই হাসান সুলতান ও হোসেন সুলতান হলেন ওয়াহেদ ম্যানশনের মালিক। ১০ কাঠা জমিতে নির্মিত ভবনটির দোতলার পুরোটা জুড়েই ছিল গুদাম। অন্যান্য তলায় ছিল বিভিন্ন দোকান।

বাকি আসমিরা সবাই পার্ল ইন্টারন্যাশনাল নামে একটি প্রতিষ্ঠানে মালিক-কর্মকর্তা-কর্মচারী। পার্লের গুদাম থেকেই আগুন ছড়িয়েছিল।

আসামিদের মধ্যে ইমতিয়াজ পার্ল ইন্টারন্যাশনালের মালিক, ইকবাল পরিচালক এবং মোজাফফর ব্যবস্থাপক। জাওয়াদ আতিক, নাবিল ও কাশিফ পার্ল ইন্টারন্যাশনালের কর্মী।

পুরান ঢাকার চুড়িহাট্টায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর উদ্ধার অভিযান। ছবি: সংগৃহীত
পুরান ঢাকার চুড়িহাট্টায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর উদ্ধার অভিযান। ছবি: সংগৃহীত

অভিযোগপত্রে বলা হয়, দুই ভাই হাসান ও হোসেন অবৈধ জেনেও আবাসিক ভবনে রাসায়নিকের গুদাম ভাড়া দিয়েছিলেন ‘পার্ল ইন্টারন্যাশনাল’কে। আর ওই প্রতিষ্ঠানের মালিক-কর্মীরা জান-মালের ক্ষতি হতে পেরে জেনেও দাহ্য পদার্থের মজুত, সংমিশ্রণের কাজ করতেন। তাদের অবহেলার কারণেই এত মানুষের করুণ মৃত্যু ঘটেছে।

বাড়িওয়ালা হাসান সুলতান আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে বলেন, পার্ল ইন্টারন্যাশনাল ভাড়া নেওয়ার সময় জানিয়েছিল তারা বিভিন্ন প্রকার পারফিউম, বডি লোশন, অলিভ অয়েল, বেবি পাউডার, বেবি লোশন, কটন বাড, ডায়াপার ইত্যাদির ব্যবসা করে। প্রতিষ্ঠানের ‘বিহারি’ মালিক গুদামে তেমন একটা আসতেন না। ‘বিহারি’ দুই ভাই নাবিল ও কাশিফ ওই কোম্পানির সেলসম্যানের কাজ করতেন।

তবে অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, সেলসম্যান হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হলেও নাবিল ও কাশিফ দুই ভাই ওই কোম্পানির অংশীদার বলে সাক্ষীদের কাছ থেকে জানা গেছে।

অগ্নিকাণ্ডের পর পুলিশ আসামিদের আটজনকেই গ্রেপ্তার করেছিল। তবে তাদের কয়েকজন পরে জামিনে ছাড়া পেয়ে যান ।

২০২৩ সালের ৩১ জানুয়ারি অভিযোগ গঠন করে আসামিদের বিচার শুরুর আদেশ দেয় আদালত। বর্তমানে ঢাকার অষ্টম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ খোরশেদ আলমের আদালতে মামলাটি সাক্ষ্যগ্রহণের পর্যায়ে রয়েছে।

পুরান ঢাকার চুড়িহাট্টায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা। ছবি: সংগৃহীত
পুরান ঢাকার চুড়িহাট্টায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা। ছবি: সংগৃহীত

সর্বশেষ গত ১২ নভেম্বর মামলার সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য ছিল। ওইদিন কোনো সাক্ষী আদালতে হাজির হননি। আগামী ২৯ মার্চ সাক্ষ্যগ্রহণের পরবর্তী দিন ধার্য রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট আদালতের বেঞ্চ সহকারী মিলন হোসেন।

সেলিম আহমেদ লিটন নামে এক সাক্ষী সর্বশেষ গত বছরের ৩১ জুলাই সাক্ষ্য দেন। এরপর দুটি ধার্য দিনে কোনো সাক্ষীকে আদালতে হাজির করতে পারেনি রাষ্ট্রপক্ষ। মামলার ১৬৭ সাক্ষীর মধ্যে মাত্র ৬ জনের সাক্ষ্য শুনেছে আদালত।

মামলার বাদী আসিফ আহমেদ বলেন, বছরে একবার সরকার এসে খোঁজ নেয়, শোডাউন দিয়ে ছবি তুলে চলে যায়। অথচ ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক সহায়তা বা কর্মসংস্থানের কোনো উদ্যোগ নেয় না। এখন পর্যন্ত তো বিচারই হয়নি, সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়নি। আমাদের মনে হয় না, বাংলাদেশে আমরা সুষ্ঠু বিচার পাব। তবে নতুন সরকারের কাছে একটাই চাওয়া, তারা যেন বিচারটা শেষ করে।

আসামি হাসান ও হোসেনের আইনজীবী মো. মোস্তফা পাঠান (ফারুক) বলেন, মামলার সাক্ষ্য চলছে। ঘটনাস্থলের আশপাশে যারা ছিলেন, তারা সাক্ষ্য দিচ্ছেন। সরকারি লোক ক্রমান্বয়ে সাক্ষ্য দেবে। আমারা মক্কেলরা নিজেরা ভিকটিম। তাদের ভবন পুড়ে গেছে। আগুনে তাদের মা আহত হন। পরে মারা যান।

তিনি অভিযোগ করেন, চুড়িহাট্টার মামলাকে বিশালভাবে দেখিয়ে দেশের মানুষের টোটাল মুভমেন্ট অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিয়েছিল তখনকার সরকার। যদিও বিগত সময়ে যারা এটি সাজিয়েছিল, তারা একটি গ্রুপ ছিল। তিনি বলেন, কাউকে তো মামলার আসামি দিতে হবে। যারা ভিকটিম, তাদের আসামি করেছে। যাদের ক্ষতি হল, তারাই আসামি হলো।

/এফসি/