শিরোনাম

অফসাইডের সিদ্ধান্ত নিতে বিশ্বকাপে যুক্ত হচ্ছে নতুন প্রযুক্তি

সিটিজেন ডেস্ক
অফসাইডের সিদ্ধান্ত নিতে বিশ্বকাপে যুক্ত হচ্ছে নতুন প্রযুক্তি
পতাকা তুলতে আর দেরি নয়, অফসাইড ধরবে রিয়েল-টাইম প্রযুক্তি। ছবি: বিবিসি

ফুটবলে অফসাইড সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। অনেক সময় কোনো খেলোয়াড় স্পষ্টভাবে অফসাইড অবস্থানে থাকলেও সহকারী রেফারিকে পতাকা তুলতে কয়েক সেকেন্ড অপেক্ষা করতে দেখা যায়। এতে খেলা অপ্রয়োজনীয়ভাবে চলতে থাকে, বাড়ে বিভ্রান্তি ও চোটের ঝুঁকিও। ২০২৬ বিশ্বকাপে সেই সমস্যার সমাধানে নতুন প্রযুক্তি নিয়ে আসছে ফিফা।

বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা জানিয়েছে, এবার ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) ব্যবস্থার সঙ্গে আরও উন্নত আধা-স্বয়ংক্রিয় (সেমি-অটোমেটেড) অফসাইড প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। এর ফলে অফসাইডের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে আগের চেয়ে অনেক দ্রুত এবং সহকারী রেফারিরা তাৎক্ষণিকভাবে সংকেত পেয়ে পতাকা তুলতে পারবেন।

নতুন ব্যবস্থায় কোনো খেলোয়াড় যদি ১০ সেন্টিমিটারের বেশি অফসাইড অবস্থানে থাকেন, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে সহকারী রেফারির কাছে অডিও অ্যালার্ট পৌঁছে যাবে। ফলে স্পষ্ট অফসাইডের ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় খেলা চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন হবে না।

এর আগে ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপ ও ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপে এই প্রযুক্তির পরীক্ষামূলক সংস্করণ ব্যবহার করা হয়েছিল। তখন ৫০ সেন্টিমিটারের বেশি অফসাইড হলে কেবল সংকেত পাঠানো হতো। নতুন সংস্করণে সেই সীমা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা হয়েছে।

তবে প্রযুক্তি সহায়তা দিলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা মাঠের রেফারি ও সহকারী রেফারির হাতেই থাকবে। কোনো প্রযুক্তিগত ত্রুটি বা বিশেষ পরিস্থিতির সন্দেহ হলে তারা সংকেত উপেক্ষা করেও সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। ফিফার ভাষ্য, ভুল সিদ্ধান্তের ঝুঁকি কমাতে প্রযুক্তিতে একাধিক সুরক্ষাব্যবস্থা সংযোজন করা হয়েছে।

রয়েছে সীমাবদ্ধতাও

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রযুক্তিটি খুব সূক্ষ্ম বা ‘গায়ে গায়ে’ অফসাইড শনাক্ত করতে পুরোপুরি সক্ষম নয়। এছাড়া খেলোয়াড়রা যদি মাঠে পড়ে থাকেন বা একাধিক ফুটবলার খুব কাছাকাছি অবস্থান করেন, তাহলে কিছু ক্ষেত্রে প্রযুক্তির কার্যকারিতা সীমিত হতে পারে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই প্রযুক্তি কেবল খেলোয়াড়ের অবস্থান নির্ধারণ করতে পারবে। কোনো খেলোয়াড় সরাসরি বল স্পর্শ না করেও প্রতিপক্ষকে প্রভাবিত করেছেন কি না, কিংবা খেলার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন কি না—এ ধরনের ব্যাখ্যামূলক সিদ্ধান্ত রেফারিকেই নিতে হবে।

এআই অবতারে দেখা যাবে খেলোয়াড়দের

বিশ্বকাপের প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের আরেকটি বড় অংশ হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক থ্রিডি অবতার। টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়া ৪৮ দলের ২৬ সদস্যের স্কোয়াডের মোট ১ হাজার ২৪৮ জন খেলোয়াড়ের প্রত্যেকের ডিজিটাল স্ক্যান তৈরি করা হবে।

এর জন্য খেলোয়াড়দের একটি বিশেষ স্ক্যানিং চেম্বারে প্রবেশ করতে হবে। পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে সময় লাগবে মাত্র এক সেকেন্ড। টুর্নামেন্ট শুরুর আগে আনুষ্ঠানিক ফটোসেশনের সময় একবারই এই স্ক্যান করা হবে।

ফিফার মতে, এর ফলে অফসাইড সিদ্ধান্তগুলো টেলিভিশন সম্প্রচার ও স্টেডিয়ামের জায়ান্ট স্ক্রিনে আরও বাস্তবসম্মত ও নির্ভুল থ্রিডি অ্যানিমেশনের মাধ্যমে দেখানো সম্ভব হবে। দর্শকেরাও সহজে বুঝতে পারবেন সিদ্ধান্তটি কীভাবে নেওয়া হয়েছে।

বল মাঠের বাইরে গেছে কি না, তাও ধরা পড়বে

অফসাইড প্রযুক্তির পাশাপাশি বল মাঠের সীমারেখা অতিক্রম করেছে কি না, সেটিও আরও নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা হবে। গোললাইন প্রযুক্তির মতো থ্রিডি অ্যানিমেশনের মাধ্যমে বলের সঠিক অবস্থান প্রদর্শন করা হবে।

এই প্রযুক্তি চালুর পেছনে সাম্প্রতিক কয়েকটি বিতর্কিত সিদ্ধান্তও ভূমিকা রেখেছে। গত ফেব্রুয়ারিতে ব্রেন্টফোর্ডের বিপক্ষে অ্যাস্টন ভিলার একটি গোল বাতিল হওয়া নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। কারণ, বলটি মাঠের বাইরে গিয়েছিল কি না, তা খালি চোখে নিশ্চিতভাবে বোঝা যায়নি।

কর্নার ও টাচের সিদ্ধান্তেও সহায়তা

নতুন ব্যবস্থায় বলের ভেতরে থাকা বিশেষ সেন্সর বা চিপের মাধ্যমে শনাক্ত করা যাবে, কোন খেলোয়াড় সর্বশেষ বল স্পর্শ করেছেন। এর ফলে কর্নার, গোল কিক কিংবা থ্রো-ইনের মতো সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করাও সহজ হবে।

ভিএআর কর্মকর্তারা দ্রুত যাচাই করতে পারবেন, কর্নারের সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল কি না অথবা বল কার স্পর্শে মাঠের বাইরে গেছে।

চোটের ঝুঁকি কমার আশা

ফিফা মনে করছে, নতুন প্রযুক্তির ফলে শুধু সিদ্ধান্তের গতি ও নির্ভুলতাই বাড়বে না, কমবে খেলোয়াড়দের অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকিও। কারণ, স্পষ্ট অফসাইড অবস্থার পরও খেলা চলতে থাকায় অনেক সময় দুর্ঘটনা ঘটে।

এর একটি আলোচিত উদাহরণ ২০২৫ সালের মে মাসে দেখা যায়। সে সময় ইংলিশ ক্লাব নটিংহাম ফরেস্টের স্ট্রাইকার তাইও আওনিয়ি অফসাইডের পতাকা দেরিতে ওঠায় খেলা চালিয়ে যান এবং গোলপোস্টে ধাক্কা লেগে গুরুতর আহত হন। পরে তাকে কোমায় নেওয়া হয়েছিল।

ফিফার আশা, ২০২৬ বিশ্বকাপে এই নতুন প্রযুক্তিগুলোর সমন্বিত ব্যবহার ম্যাচ পরিচালনাকে আরও স্বচ্ছ, দ্রুত এবং নির্ভুল করে তুলবে। একই সঙ্গে রেফারিং নিয়ে বিতর্ক কমিয়ে দর্শক ও খেলোয়াড়দের অভিজ্ঞতাও উন্নত করবে।

/এমআর/