হাদিসে বর্ণিত দোয়া কবুলের ৭ আমল, কোনটি কখন করবেন

ধর্ম ডেস্ক
ধর্ম ডেস্ক
হাদিসে বর্ণিত দোয়া কবুলের ৭ আমল, কোনটি কখন করবেন
দোয়া। ছবি: সংগৃহীত

বিপদে পড়লে, অসুস্থ হলে কিংবা জীবনের কোনো গুরুত্বপূর্ণ চাওয়া পূরণের জন্য মানুষ মহান আল্লাহর কাছে সাহায্য চায়। কখনো জীবিকার বরকত, কখনো মানসিক প্রশান্তি, আবার কখনো গুনাহ থেকে মুক্তি ও পরকালের কল্যাণ কামনায় মুমিন দুই হাত তুলে দোয়া করেন। তবে দোয়া শুধু চাওয়ার বিষয় নয়; এর সঙ্গে রয়েছে আল্লাহর ওপর দৃঢ় বিশ্বাস, আনুগত্য এবং তাঁর নির্দেশিত পথে চলার অঙ্গীকার।

পবিত্র কোরআন ও হাদিসে দোয়া করার গুরুত্ব তুলে ধরার পাশাপাশি এমন কিছু জিকির ও আমলের কথা বর্ণিত হয়েছে, যেগুলোর মাধ্যমে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করার বিশেষ ফজিলত রয়েছে। ঘুম থেকে জেগে জিকির করা, বিপদে ইউনুস (আ.)-এর দোয়া পাঠ করা, আল্লাহর মহান নামের মাধ্যমে প্রার্থনা করা এবং বিপদের সময় উত্তম প্রতিদান চাওয়ার মতো আমলগুলো এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর যখন আমার বান্দারা আমার সম্পর্কে তোমাকে জিজ্ঞাসা করে, তখন (বলে দাও) নিশ্চয়ই আমি নিকটবর্তী। যে আমাকে ডাকে আমি তার ডাকে সাড়া দেই। সুতরাং তারা যেন আমারে ডাকে সাড়া দেয় এবং আমার প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস রাখে।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৮৬)

হাদিসে বর্ণিত এমন সাতটি আমল ও দোয়া তুলে ধরা হলো।

১. ঘুম থেকে জেগে জিকির ও দোয়া করা

রাতের ঘুম থেকে জেগে ওঠার পর আল্লাহকে স্মরণ করা এবং তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা বিশেষ ফজিলতপূর্ণ আমল। সহিহ বুখারির একটি হাদিসে এসেছে, রাতে ঘুম থেকে জেগে নির্দিষ্ট জিকির পাঠ করার পর কেউ আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করলে এবং দোয়া করলে তার দোয়া কবুল করা হয়। এরপর অজু করে নামাজ আদায় করলে তার নামাজও কবুল হয়।

জিকিরটি হলো—

আরবি:

لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ، وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ، سُبْحَانَ اللَّهِ، وَالْحَمْدُ لِلَّهِ، وَلَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، وَاللَّهُ أَكْبَرُ، وَلَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ، اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي

উচ্চারণ: লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু, ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন কাদির। সুবহানাল্লাহি, ওয়ালহামদু লিল্লাহি, ওয়া লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়াল্লাহু আকবার। ওয়া লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ। আল্লাহুম্মাগফির লি।

অর্থ: একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই। তাঁর কোনো শরিক নেই। রাজত্ব তাঁরই, সমস্ত প্রশংসাও তাঁরই। তিনি সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান। আল্লাহ পবিত্র-মহান। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর। আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই। আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ। আল্লাহর সাহায্য ছাড়া গুনাহ থেকে বাঁচার কোনো উপায় এবং নেক কাজ করার কোনো শক্তি নেই। হে আল্লাহ, আমাকে ক্ষমা করুন।

(সহিহ বুখারি, হাদিস: ১১৫৪)

২. ইউনুস (আ.)-এর দোয়া পাঠ করা

কঠিন বিপদ, দুশ্চিন্তা কিংবা সংকটের মুহূর্তে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দোয়া হলো হজরত ইউনুস (আ.)-এর দোয়া। মাছের পেটে গভীর অন্ধকারে অবস্থানকালে তিনি মহান আল্লাহর কাছে এই দোয়া করেছিলেন। আল্লাহ তাঁর প্রার্থনা কবুল করেন এবং তাঁকে বিপদ থেকে মুক্তি দেন।

দোয়াটি হলো—

আরবি:

لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ

উচ্চারণ: লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনায-যালিমিন।

অর্থ: আপনি ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই। আপনি পবিত্র-মহান। নিশ্চয়ই আমি জালিমদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম।

(সুরা : আম্বিয়া, আয়াত : ৮৭)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ইউনুস (আ.)-এর এই দোয়ার মাধ্যমে কোনো মুসলিম কোনো বিষয়ে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করলে আল্লাহ তার ডাকে সাড়া দেন। (জামে তিরমিজি, হাদিস : ৩৫০৫)

৩. ইসমে আজমের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা

আল্লাহ তাআলার সুন্দর নামগুলোর মাধ্যমে তাঁকে ডাকা এবং তাঁর কাছে প্রার্থনা করা দোয়া করার গুরুত্বপূর্ণ একটি পদ্ধতি। হাদিসে এমন একটি দোয়ার কথা এসেছে, যাতে আল্লাহর মহত্ত্ব, একত্ব ও মহান গুণাবলির উল্লেখ রয়েছে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) এক ব্যক্তিকে এই দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতে শুনে বলেন, সে আল্লাহর এমন মহান নামের মাধ্যমে তাঁকে ডেকেছে, যার মাধ্যমে ডাকা হলে তিনি সাড়া দেন এবং প্রার্থনা করা হলে দান করেন।

দোয়াটি হলো—

আরবি:

اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ بِأَنَّ لَكَ الْحَمْدَ، لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ وَحْدَكَ لَا شَرِيكَ لَكَ، الْمَنَّانُ، يَا بَدِيعَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ، يَا ذَا الْجَلَالِ وَالْإِكْرَامِ، يَا حَيُّ يَا قَيُّومُ، إِنِّي أَسْأَلُكَ الْجَنَّةَ وَأَعُوذُ بِكَ مِنَ النَّارِ

উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকা বিআন্না লাকাল হামদু, লা ইলাহা ইল্লা আনতা ওয়াহদাকা লা শারিকা লাক, আল-মান্নানু, ইয়া বাদিআস-সামাওয়াতি ওয়াল আরদি, ইয়া যাল-জালালি ওয়াল ইকরাম, ইয়া হাইয়্যু ইয়া কাইয়্যুম, ইন্নি আসআলুকাল জান্নাতা ওয়া আউযু বিকা মিনান-নার।

অর্থ: হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে প্রার্থনা করছি। সমস্ত প্রশংসা আপনারই। আপনি ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই। আপনি একক, আপনার কোনো শরিক নেই। আপনি মহান দানশীল। হে আসমান ও জমিনের অভিনব স্রষ্টা! হে মহিমা ও সম্মানের অধিকারী! হে চিরঞ্জীব, হে সমস্ত সৃষ্টির ধারক ও রক্ষণাবেক্ষণকারী! আমি আপনার কাছে জান্নাত চাই এবং জাহান্নাম থেকে আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করি।

(সুনান আবু দাউদ, হাদিস : ১৪৯৫; জামে তিরমিজি, হাদিস : ৩৫৪৪)

৪. বিপদের সময় উত্তম প্রতিদান চেয়ে দোয়া করা

জীবনে প্রিয়জন হারানো, অসুস্থতা কিংবা অন্য কোনো বিপদের মুখোমুখি হলে ধৈর্য ধারণ করা এবং আল্লাহর কাছে উত্তম প্রতিদান চাওয়া মুমিনের গুরুত্বপূর্ণ আমল। বিপদে হতাশ না হয়ে আল্লাহর রহমতের আশা রাখা উচিত।

হজরত উম্মে সালামা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কোনো মুসলিম বিপদে আক্রান্ত হলে আল্লাহর নির্দেশিত দোয়া পাঠ করে উত্তম প্রতিদান চাইলে আল্লাহ তাকে সেই বিপদের বিনিময়ে উত্তম কিছু দান করেন। উম্মে সালামা (রা.) তাঁর স্বামী আবু সালামা (রা.)-এর মৃত্যুর পর এই দোয়া পাঠ করেছিলেন। পরে আল্লাহ তাঁকে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মতো উত্তম স্বামী দান করেন।

দোয়াটি হলো—

আরবি:

إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ، اللَّهُمَّ أْجُرْنِي فِي مُصِيبَتِي، وَأَخْلِفْ لِي خَيْرًا مِنْهَا

উচ্চারণ: ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। আল্লাহুম্মা আজুরনি ফি মুসিবাতি, ওয়াখলুফ লি খাইরাম মিনহা।

অর্থ: নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহরই এবং নিশ্চয়ই আমরা তাঁর কাছেই ফিরে যাব। হে আল্লাহ! আমার বিপদে আমাকে প্রতিদান দিন এবং এর পরিবর্তে আমাকে এর চেয়ে উত্তম কিছু দান করুন।

(সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৯১৮)

৫. বেশি বেশি আল্লাহর জিকির করা

আল্লাহর জিকির মুমিনের অন্তরে প্রশান্তি আনে এবং তাকে প্রতিপালকের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। নিয়মিত জিকিরের মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা, আনুগত্য ও নির্ভরতা প্রকাশ করে। তাই দৈনন্দিন জীবনে কাজের ফাঁকে এবং সকাল-সন্ধ্যায় আল্লাহর জিকির করার অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত।

আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেছেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে অধিক পরিমাণে স্মরণ করো।’ (সুরা : আহজাব, আয়াত : ৪১)

অন্য আয়াতে তিনি বলেন, ‘জেনে রেখো, আল্লাহর জিকিরের মাধ্যমেই অন্তর প্রশান্ত হয়।’ (সুরা : রাদ, আয়াত : ২৮)

তাই সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এবং ইস্তিগফারের মতো জিকির নিয়মিত পাঠ করা যেতে পারে। পাশাপাশি সকাল-সন্ধ্যার মাসনুন জিকির ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো দোয়াগুলোও আমল করা উচিত।

৬. কোরআন তিলাওয়াত করে আল্লাহর কাছে দোয়া করা

পবিত্র কোরআন মানুষের জন্য হেদায়েত, রহমত ও উপদেশের উৎস। কোরআন তিলাওয়াতের পাশাপাশি এর অর্থ ও নির্দেশনা বোঝার চেষ্টা করা এবং সে অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর আমি কোরআন নাজিল করি, যা মুমিনদের জন্য আরোগ্য ও রহমত।’ (সুরা : ইসরা, আয়াত : ৮২)

কোরআনে নবী-রাসুল ও নেক বান্দাদের অনেক দোয়া বর্ণিত হয়েছে। এসব দোয়া অর্থসহ পাঠ করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা, হেদায়েত, কল্যাণ ও জান্নাত কামনা করা যেতে পারে। একই সঙ্গে নিজের ভুল-ত্রুটি সংশোধন এবং আল্লাহর নির্দেশ মেনে চলার চেষ্টা করতে হবে।

৭. জমজমের পানি পান করে দোয়া করা

মক্কা মুকাররমায় অবস্থিত জমজমের পানি মুসলমানদের কাছে বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ। হজরত ইসমাইল (আ.) ও তাঁর মা হজরত হাজেরা (আ.)-এর স্মৃতিবিজড়িত এই পানির ফজিলত সম্পর্কে হাদিসে বর্ণনা এসেছে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, ‘জমজমের পানি যে উদ্দেশ্যে পান করা হয়, তা পূরণের জন্যই।’ (সুনান ইবন মাজাহ, হাদিস: ৩০৬২)

এই হাদিসের আলোকে জমজমের পানি পান করার সময় আল্লাহর কাছে আন্তরিকভাবে দোয়া করা যেতে পারে। কেউ সুস্থতা, উপকারী জ্ঞান, নেক আমল, ক্ষমা কিংবা দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ চাইতে পারেন। তবে দোয়া কবুলের জন্য আল্লাহর ওপর আস্থা রাখা এবং তাঁর নির্দেশনা অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করাও গুরুত্বপূর্ণ।

দোয়া কবুলের আশায় যে বিষয়গুলো মনে রাখবেন

দোয়া ও জিকিরের এসব আমলের পাশাপাশি আল্লাহর প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস, আন্তরিকতা, ধৈর্য এবং হালাল উপার্জনের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। দোয়া করার পর তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাশিত ফল না পেলেও হতাশ হওয়া উচিত নয়। আল্লাহ যেভাবে ও যখন কল্যাণ নির্ধারণ করেন, সেই বিষয়ে তাঁর ওপর ভরসা রাখতে হবে।

/এবি/