রাজনৈতিক দলগুলো কোথা থেকে এত টাকা পায়: টিআইবি

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজনৈতিক দলগুলো কোথা থেকে এত টাকা পায়: টিআইবি
সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান

রাজনৈতিক দলগুলোর প্রকাশিত আয়-ব্যয়ের হিসাবের সঙ্গে দল পরিচালনার সম্ভাব্য ব্যয়ের বড় পার্থক্য রয়েছে। দলের সদস্যদের নিয়মিত চাঁদা থেকে যে অর্থ পাওয়া যেতে পারে, তা সংগঠন পরিচালনার সম্ভাব্য ব্যয়ের তুলনায় অনেক কম। এই ঘাটতি পূরণে রাজনৈতিক দলগুলো আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক উভয় ধরনের অর্থায়নের ওপর নির্ভর করে। বিশেষ করে স্থানীয় পর্যায়ে দলীয় কার্যক্রমের বড় অংশের ব্যয় বহন করেন স্থানীয় নেতা ও বিত্তবান ব্যক্তিরা। এসব অর্থ দলের আর্থিক প্রতিবেদনে দলীয় আয়-ব্যয় হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হয় না।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক গবেষণায় রাজনৈতিক দলগুলোর অর্থায়নের এই চিত্র উঠে এসেছে।

রবিবার (১ নভেম্বর) রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবির কার্যালয়ে সংস্থাটির এক সংবাদ সম্মেলনে ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলের প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন’ শীর্ষক এ গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বিদ্যমান রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দলগুলোর কার্যক্রম পরিচালনায় বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয়। এই অর্থের ব্যবস্থাপনা অনানুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় হয়, যা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ব্যক্তিনির্ভর। ফলে সেখানে স্বচ্ছতার ঘাটতি থাকে। দলগুলোর আনুষ্ঠানিক আয়-ব্যয়ের হিসাবের সঙ্গেও বাস্তবতার বিশাল পার্থক্য রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলগুলোতে ক্ষমতার অপব্যবহার, কালোটাকা ও রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের কারণে অন্তর্দ্বন্দ্ব বিকশিত হচ্ছে। এসব কারণে অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বা দলীয় অবস্থান একটি ‘ক্ষমতা-কেন্দ্রিক বিজনেস মডেলে’ পরিণত হচ্ছে।

টিআইবি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে দলীয় কার্যালয় ও সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনার সম্ভাব্য বার্ষিক ব্যয় নির্ধারণ করেছে। সাংগঠনিক বিস্তৃতি অনুযায়ী তিন ধরনের হিসাব তুলে ধরা হয়েছে গবেষণায়।

প্রথম হিসাবে, নিবন্ধনের জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম সাংগঠনিক কাঠামো– ২২টি জেলা ও ১০১টি উপজেলা বা থানায় কার্যালয় থাকা একটি দলের বার্ষিক ব্যয় ধরা হয়েছে ১৪ থেকে ২৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে কার্যালয় পরিচালনার ব্যয় সাড়ে ৫ কোটি থেকে প্রায় ৭ কোটি টাকা। আর রাজনৈতিক কর্মসূচি পরিচালনার জন্য ব্যয় হতে পারে সাড়ে ৮ কোটি থেকে ১৮ কোটি টাকা।

দ্বিতীয় হিসাবে, দেশের ৬৪ জেলার ৪ হাজার ৫৫৩ ইউনিয়ন পর্যন্ত সাংগঠনিক কাঠামো থাকা একটি দলের বার্ষিক ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে প্রায় ৩০২ থেকে ৩৯৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে কার্যালয় পরিচালনার ব্যয় প্রায় ৮৪ থেকে ১১৪ কোটি এবং কর্মসূচি পরিচালনায় প্রায় ২১৮ থেকে ২৭৯ কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে।

তৃতীয় হিসাবে, সংগঠন ইউনিয়নের ওয়ার্ড পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত হলে বার্ষিক ব্যয় দাঁড়াতে পারে প্রায় ১ হাজার ৫৩২ থেকে ২ হাজার ১৮৮ কোটি টাকা। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন পর্যায়ের কার্যালয় পরিচালনা, সভা-সমাবেশ, প্রচার-প্রচারণা, যাতায়াত এবং সাংগঠনিক সমন্বয়ের খরচ বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

গবেষণায় কার্যালয় পরিচালনার ক্ষেত্রে ভাড়া, বিদ্যুৎ, পানি, আপ্যায়নসহ নিয়মিত খরচ এবং কর্মসূচির ক্ষেত্রে বছরে ন্যূনতম ৫টি কর্মসূচির ব্যয় ধরা হয়েছে। তবে কার্যালয়ের মালিকানা, কর্মসূচির ধরন, স্থান ও সময়ভেদে এসব ব্যয়ের তারতম্য হতে পারে বলে জানিয়েছে টিআইবি।

শুধু সদস্যদের চাঁদার ওপর নির্ভর করে এ ধরনের বিস্তৃত সাংগঠনিক কাঠামো পরিচালনা করা সম্ভব নয় বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। তবে এসব হিসাব সম্ভাব্য আয় ও ব্যয়ের প্রাক্কলন। কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের প্রকৃত আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়। চাঁদার পাশাপাশি অনুদান, মনোনয়ন ফি, বিশেষ তহবিল সংগ্রহ এবং অন্যান্য উৎসের অর্থ এই আয়ের প্রাক্কলনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

রাজনৈতিক দলগুলোর আয়ের ঘোষিত প্রধান উৎস সদস্যদের চাঁদা, অনুদান এবং সাংগঠনিক কার্যক্রম থেকে পাওয়া অর্থ। কিন্তু শুধু সদস্যদের চাঁদার ওপর নির্ভর করে দল পরিচালনা করা কতটা সম্ভব, তারও একটি হিসাব করেছে টিআইবি।

গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত দুটি রাজনৈতিক দলের গঠনতন্ত্রে নির্ধারিত সদস্যসংখ্যা ও চাঁদার হারের ভিত্তিতে এই প্রাক্কলন করা হয়েছে। সেই হিসাবে, ন্যূনতম নিবন্ধন শর্ত পূরণকারী একটি দলের সদস্যদের চাঁদা থেকে সম্ভাব্য বার্ষিক আয় প্রায় ২৬ লাখ টাকা। অথচ একই ধরনের সাংগঠনিক কাঠামো পরিচালনায় সম্ভাব্য ব্যয় ১৪ থেকে ২৫ কোটি টাকা।

একইভাবে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ সাংগঠনিক কাঠামো থাকা দলের সদস্যদের চাঁদা থেকে বছরে প্রায় সাড়ে ৩৭ কোটি টাকা আয় হতে পারে। আর ইউনিয়নের ওয়ার্ড পর্যায় পর্যন্ত সংগঠন থাকলে এই আয় হতে পারে ১১৬ কোটি টাকা।

শুধু সদস্যদের চাঁদার ওপর নির্ভর করে এ ধরনের বিস্তৃত সাংগঠনিক কাঠামো পরিচালনা করা সম্ভব নয় বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। তবে এসব হিসাব সম্ভাব্য আয় ও ব্যয়ের প্রাক্কলন। কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের প্রকৃত আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়। চাঁদার পাশাপাশি অনুদান, মনোনয়ন ফি, বিশেষ তহবিল সংগ্রহ এবং অন্যান্য উৎসের অর্থ এই আয়ের প্রাক্কলনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

গবেষণার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ক্ষমতাসীন বা ক্ষমতায় যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এমন রাজনৈতিক দলগুলোর অর্থায়নে ব্যবসায়ী ও বিত্তবান ব্যক্তিদের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের কাছ থেকে জোরপূর্বক অর্থ আদায় করা হয়। আবার অনেকে দলীয় পদ, নির্বাচনী মনোনয়ন বা ভবিষ্যতে সুযোগ-সুবিধা লাভের প্রত্যাশায় বড় অঙ্কের অর্থ দেন।

গবেষণায় বলা হয়েছে, রাজনৈতিক দলগুলোর অর্থ সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনা অনেকাংশে ব্যক্তিনির্ভর। অধিকাংশ দল সভা, সম্মেলন, কর্মসূচি, আন্দোলন কিংবা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রয়োজন অনুযায়ী তাৎক্ষণিকভাবে অর্থ সংগ্রহ করে।

বিশেষত স্থানীয় পর্যায়ে দলীয় কার্যালয় পরিচালনা, সভা-সমাবেশ আয়োজন, কর্মীদের যাতায়াত এবং অন্যান্য সাংগঠনিক কার্যক্রমের অর্থ স্থানীয় নেতারাই অনেক ক্ষেত্রে জোগান দেন। এর ফলে স্থানীয় পর্যায়ের এসব ব্যয় কেন্দ্রীয় আয়-ব্যয়ের হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হয় না।

গবেষণার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ক্ষমতাসীন বা ক্ষমতায় যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এমন রাজনৈতিক দলগুলোর অর্থায়নে ব্যবসায়ী ও বিত্তবান ব্যক্তিদের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের কাছ থেকে জোরপূর্বক অর্থ আদায় করা হয়। আবার অনেকে দলীয় পদ, নির্বাচনী মনোনয়ন বা ভবিষ্যতে সুযোগ-সুবিধা লাভের প্রত্যাশায় বড় অঙ্কের অর্থ দেন।

অন্যদিকে কিছু রাজনৈতিক দল তৃণমূল পর্যায়ে গণচাঁদা বা ক্রাউড ফান্ডিংয়ের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করে। দলগুলো মনোনয়নপত্র বিক্রি, প্রকাশনা বিক্রি এবং দলীয় সম্পত্তি থেকেও আয় করে থাকে।

গবেষণার পর্যবেক্ষণ হলো, বিপুল আর্থিক চাহিদা ও স্বচ্ছ অর্থায়ন কাঠামোর সীমাবদ্ধতা রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন এবং অপরাধের রাজনীতিকরণের ঝুঁকি তৈরি করছে।

আইন অনুযায়ী, নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোকে প্রতিবছর নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন নির্বাচন কমিশনে জমা দিতে হয়। কিন্তু টিআইবির গবেষণায় বলা হয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে এই নিরীক্ষা কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকে। প্রকৃত আর্থিক লেনদেন, আয়ের উৎস ও ব্যয়ের পরিমাণ নিরীক্ষা প্রতিবেদনে প্রতিফলিত হয় না।

রাজনৈতিক দলগুলোর ঘোষিত আয়-ব্যয়ের হিসাব ও সম্ভাব্য সাংগঠনিক ব্যয়ের মধ্যে বড় পার্থক্য তুলে ধরেছে টিআইবি। গবেষণায় বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত ৪টি রাজনৈতিক দলের ২০২৫ সালের আর্থিক হিসাব বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, দলগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন ঘোষিত আয় ১ কোটি ৮২ লাখ এবং সর্বোচ্চ ২৩ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। অন্যদিকে সর্বনিম্ন ব্যয় প্রায় ১ কোটি ৮৭ লাখ এবং সর্বোচ্চ ২৩ কোটি ৯১ লাখ টাকা।

টিআইবির পর্যবেক্ষণ, রাজনৈতিক দলগুলোর জাতীয় পর্যায়ের কর্মসূচি, সাংগঠনিক বিস্তৃতি ও নির্বাচনী কার্যক্রম বিবেচনায় এসব ঘোষিত হিসাব প্রকৃত আয়-ব্যয়ের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য।

আইন অনুযায়ী, নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোকে প্রতিবছর নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন নির্বাচন কমিশনে জমা দিতে হয়। কিন্তু টিআইবির গবেষণায় বলা হয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে এই নিরীক্ষা কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকে। প্রকৃত আর্থিক লেনদেন, আয়ের উৎস ও ব্যয়ের পরিমাণ নিরীক্ষা প্রতিবেদনে প্রতিফলিত হয় না।

সংবাদ সম্মেলনে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, জুলাই আন্দোলনের প্রত্যাশা ছিল ক্ষমতার রাজনীতির চর্চার অবসান ঘটবে। কিন্তু বাস্তবে সেই পরিবর্তন হয়নি। রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে সুশাসনের ঘাটতি, অর্থ ও পেশিশক্তির ব্যবহার এবং জবাবদিহির অভাবের কারণে ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি অব্যাহত রয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন টিআইবির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো মো. জুলকারনাইন, রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট কাওছার আহমেদ ও কাজী আমিনুল হাসান।

আরও উপস্থিত ছিলেন টিআইবির উপদেষ্টা-নির্বাহী ব্যবস্থাপনা অধ্যাপক সুমাইয়া খায়ের, গবেষণা ও পলিসি বিভাগের পরিচালক মুহাম্মদ বদিউজ্জামান এবং আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম।

/এফসি/