৭ ইসলামি দলের ঐক্য, রূপরেখার কিছু শর্ত নিয়ে মতানৈক্য

সিজেডএন ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
৭ ইসলামি দলের ঐক্য, রূপরেখার কিছু শর্ত নিয়ে মতানৈক্য
কওমি ধারার সাতটি ইসলামি দলের প্রস্তাবিত রাজনৈতিক ঐক্য নিয়ে বৈঠকে দলগুলোর নেতারা

কওমি ধারার সাতটি ইসলামি দলের প্রস্তাবিত রাজনৈতিক ঐক্যের রূপরেখা নিয়ে আলোচনা এগোলেও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এখনো মতৈক্যে পৌঁছাতে পারেনি দলগুলো। সাতদলীয় ঐক্যের আহ্বায়ক ও সদস্যসচিব কে হবেন, নেতৃত্ব কত দিন পরপর পরিবর্তন হবে এবং কোনো দল অন্য রাজনৈতিক জোটে থাকলে বা ভবিষ্যতে নতুন কোনো জোটে যেতে চাইলে কী ধরনের শর্ত প্রযোজ্য হবে এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়নি। ফলে সাত দলের প্রস্তাবিত ঐক্য এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

তবে ঐক্য প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে ২৪ সদস্যের একটি লিয়াজোঁ কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব আল্লামা সাজিদুর রহমানকে এই কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে। কমিটিতে সাত দলের তিনজন করে প্রতিনিধি এবং হেফাজতে ইসলামের আরও দুজন নেতা থাকবেন।

আগামী দুই দিনের মধ্যে সাত দলকে নিজেদের প্রতিনিধিদের নাম হেফাজতের মহাসচিবের কাছে পাঠাতে বলা হয়েছে। আগামী ২২ অক্টোবর ঢাকায় বৈঠক করে লিয়াজোঁ কমিটি ঐক্যের রূপরেখা চূড়ান্ত করার কথা রয়েছে।

এই ঐক্য প্রক্রিয়ায় থাকা সাতটি দল হলো—ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, ইসলামী ঐক্যজোট ও বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান বলেন, বৈঠকে সাত দলের প্রতিনিধিরা নিজ নিজ মতামত তুলে ধরেছেন। ঐক্য গঠনের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। তবে কিছু বিষয়ে আরও পর্যালোচনার প্রয়োজন থাকায় লিয়াজোঁ কমিটি গঠন করা হয়েছে।

বৈঠকে যা আলোচনা হলো

বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, আজ রোববার সকাল ১১টায় চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদ্রাসায় সাত দলের প্রতিনিধিদের বৈঠক শুরু হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী।

সাত দলের প্রতিটি থেকে পাঁচজন করে মোট ৩৫ জন প্রতিনিধি বৈঠকে অংশ নেন। এ ছাড়া কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা মুহাম্মদ মাহফুজুল হক এবং ঐক্য প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে হেফাজতে ইসলামের গঠিত উপকমিটির নেতারা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠক চলে বেলা একটার পর পর্যন্ত। শুরুতেই হেফাজতে ইসলামের গঠিত উপকমিটি সাত দলের জন্য তৈরি করা ঐক্যের রূপরেখার খসড়া উপস্থাপন করে। এরপর প্রতিটি দলকে নিজেদের দলীয় ফোরামে খসড়া নিয়ে আলোচনা করার জন্য আধা ঘণ্টা সময় দেওয়া হয়। পরে দলগুলোর প্রতিনিধিরা নিজ নিজ মতামত ও আপত্তির বিষয়গুলো তুলে ধরেন। এতে কয়েকটি বিষয়ে পরস্পরবিরোধী মতামত উঠে আসে।

এর আগে সাত দলের ঐক্যের রূপরেখা তৈরির জন্য হেফাজতে ইসলাম সাত সদস্যের একটি উপকমিটি গঠন করেছিল। কমিটিতে ছিলেন হেফাজতের মহাসচিব সাজিদুর রহমান, চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদ্রাসার জ্যেষ্ঠ মুফতি আল্লামা জসিম উদ্দিন, হেফাজতের নায়েবে আমির আবদুল হামিদ (মধুপুর পীর) ও সালাহউদ্দিন নানুপুরী, সাংগঠনিক সম্পাদক মুফতি বশির উল্লাহ, নারায়ণগঞ্জ জেলার সভাপতি মাওলানা আবদুল আউয়াল এবং হেফাজত আমিরের ছেলে মুফতি আইয়ুব বাবুনগরী।

এই উপকমিটি সাত দলের কাছ থেকে ঐক্যের রূপরেখা নিয়ে প্রস্তাব সংগ্রহ করে। সেসব প্রস্তাবের ভিত্তিতে একটি খসড়া তৈরি করা হয়। আজকের বৈঠকে সেই খসড়া নিয়েই আলোচনা হয়েছে।

মুফতি বশির উল্লাহ বলেন, সাত দলের ঐক্য প্রক্রিয়া অনেকটাই এগিয়েছে। যেসব বিষয়ে আরও আলোচনা প্রয়োজন, সেগুলো নিয়ে কাজ করার জন্য লিয়াজোঁ কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটিই ঐক্যের রূপরেখা চূড়ান্ত করবে।

যেসব বিষয়ে মতানৈক্য

বৈঠক সূত্র জানায়, খসড়া রূপরেখা নিয়ে আলোচনার সময় সাতদলীয় ঐক্যের আহ্বায়ক ও সদস্যসচিবের দায়িত্ব কারা প্রথমে পালন করবেন, ছয় মাস পরপর নেতৃত্ব পরিবর্তনের পদ্ধতি কী হবে এবং কোনো দল অন্য কোনো রাজনৈতিক জোটে থাকলে বা ভবিষ্যতে অন্য জোটে যেতে চাইলে কী শর্ত মানতে হবে এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।

এসব প্রশ্নে সাত দলের প্রতিনিধিদের মধ্যে অভিন্ন মত পাওয়া যায়নি। ফলে বৈঠকে ঐক্যের রূপরেখা চূড়ান্ত করা সম্ভব হয়নি।

ঐক্য প্রক্রিয়ায় থাকা একাধিক দলের নেতা বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে দলগুলোর জোট ও রাজনৈতিক সমঝোতার ধরন সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। এ কারণে কোনো দলের অন্য রাজনৈতিক দল বা জোটের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা যাবে না এ ধরনের শর্ত বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, সেটি আরও পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি দলের শীর্ষস্থানীয় একজন নেতা বলেন, বৈঠকের আগে দলগুলোর হাতে খসড়া রূপরেখা দেওয়া হয়নি। বৈঠকের সময় সেটি দেওয়া হয়েছে। তাই কয়েকটি বিষয়ে নিজ নিজ দলীয় ফোরামে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

হেফাজতের ভূমিকা নিয়েও আলোচনা

সাত দলের রাজনৈতিক ঐক্য প্রক্রিয়ায় হেফাজতে ইসলামের ভূমিকা ভবিষ্যতে কতটা থাকবে, তা নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

কয়েকজন নেতা মনে করেন, ঐক্য চূড়ান্ত হওয়ার পর সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় হেফাজতের সরাসরি ভূমিকা না থাকাই ভালো। তাঁদের যুক্তি, হেফাজতে ইসলাম একটি অরাজনৈতিক সংগঠন। ফলে রাজনৈতিক দলগুলোর কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দলগুলোর নিজস্ব ফোরামের স্বাধীনতা থাকা প্রয়োজন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি দলের শীর্ষস্থানীয় একজন নেতা বলেন, অরাজনৈতিক কোনো সংগঠন রাজনৈতিক দলগুলোর সিদ্ধান্ত গ্রহণে সরাসরি যুক্ত থাকলে ভবিষ্যতে জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাঁর মতে, দলগুলোর মধ্যে বিরোধ বা বিশৃঙ্খলা দেখা দিলে হেফাজত মধ্যস্থতাকারী বা সমন্বয়কের ভূমিকা রাখতে পারে। তবে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে দলগুলোর নিজস্ব স্বাধীনতা থাকা উচিত।

/এমআর/