ফ্যাসিস্ট আমলের কালো ছায়া রয়ে গেছে, জেলে গিয়ে প্রমাণ পেয়েছি: গাজী সালাউদ্দিন

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
ফ্যাসিস্ট আমলের কালো ছায়া রয়ে গেছে, জেলে গিয়ে প্রমাণ পেয়েছি: গাজী সালাউদ্দিন
ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন এনসিপির যুগ্ম আহবায়ক সারোয়ার তুষারসহ অন্যরা। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাবেক যুগ্ম সদস্য সচিব গাজী সালাউদ্দিন তানভীর বলেছেন, বাংলাদেশের রাষ্ট্রযন্ত্র এবং সরকারের মধ্যে খুনি ফ্যাসিস্ট হাসিনার আমলের কালো ছায়া আগের মতোই রয়ে গেছে। জেলে গিয়ে আমি তার প্রমাণ পেয়েছি।

তিনি বলেন, ৫ আগস্ট থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জেলে এবং রিমান্ডে আমাকে চরম নির্যাতন করা হয়েছে। এছাড়াও হুমকি দেওয়া হয়েছে নির্যাতনের কথা বাইরে বললে আমার পরিবারের সদস্যদের গুম করে ফেলা হবে।

শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) শফিকুল কবির মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

গাজী সালাউদ্দিন তানভীরের পক্ষ থেকে লিখিত বক্তব্যটি পাঠ করেছেন এনসিপির মিডিয়া সেলের দায়িত্বে থাকা ইয়াসির আরাফাত।

লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, ২ আগস্ট সাইবার সুরক্ষা আইনে আমার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়, অথচ ৫ আগস্ট বাংলাদেশের দ্বিতীয় স্বাধীনতার দিনে আমাকে গ্রেপ্তার করা হয়। বগুড়া সদর থানা বিএনপির সভাপতি এইচ এস মাফুতুন আহমেদ খান এই মামলার বাদী। ৫ আগস্ট আমাকে বগুড়ায় কারাগারের এমন একটি সেলে নেওয়া হয়, যেটি চরম অপরিচ্ছন্ন এবং আলো-বাতাসহীন। কারেন্টসহ একটা ফ্যানও নেই। এছাড়া, কারারক্ষীরাও আওয়ামী লীগের। তাদের বেশিরভাগই সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের এবং তারা আমাকে জুলাই জঙ্গি বলে গালিগালাজ করত, আশপাশের কয়েদিরাও সন্ত্রাসী সংগঠন আওয়ামী লীগের আসামি। তারাও যা তা বলে সম্বোধন করত।

তিনি বলেন, ৫ আগস্ট যেদিন প্রথম জেলে নেওয়া হলো জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবসে সবাইকে ভালো খাবার দেওয়া হলো কিন্তু আমাকে দুইদিনের পচা খাবার দিল। কারাগারে এমন পচাবাসী খাবার দেওয়া হতো, যা খাওয়ার অযোগ্য। একপর্যায়ে আমার ডায়রিয়া হয়ে যায়। চিকিৎসার জন্য শহীদ জিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে ডাক্তার যে ওষুধ লিখেছেন, সেটা আমাকে দেওয়া হয়নি।

শরীরে অসংখ্য ইনজেকশন পুশ করার অভিযোগ তুলে ধরে তিনি বলেন, এসব কীসের ইনজেকশন তা আমি জানি না। আমাকে অন্তত ৭০ থেকে ৮০টি ইনজেকশন দেওয়া হয়েছে। সারাক্ষণ জ্বর থাকত। একদিন হাত পা কাপছিল, ডাক্তার এসে ইনজেকশন দিল এবং আমার ডান হাত আর ডান পা অবশ হয়ে গেল, বাধ্য হয়ে শহীদ জিয়া মেডিকেলে নিয়ে গেল। ডাক্তার সেখানে বলেছে, আমার স্ট্রোক হয়েছে কিন্তু কারা কর্তৃপক্ষ বলল, কিছুই হয়নি।

সালাউদ্দিন তানভীর বলেন, মেডিকেলে আমার সিটি স্ক্যান করানো হলো রিপোর্ট কী আসল জানি না, কারা কর্তৃপক্ষ বলল, কোন সমস্যা নাই সব ঠিক আছে। পরে বলল, এমআরআই করাতে হবে, শহীদ জিয়া মেডিকেলের এমআরআই মেশিনটা নষ্ট, তারপরও সেখানে আমাকে ঢুকালো। আমি ওটার ভেতরে থাকা অবস্থায় বিকট আওয়াজ হয়ে সেটি বন্ধ হয়ে গেল। আমার কোমর থেকে পা পর্যন্ত প্যারালাইজড হয়ে গেল। আমি ১০ থেকে ১২ ঘন্টা অজ্ঞান ছিলাম। পরে দেখি শহীদ জিয়া মেডিকেলের প্রিজন সেলে এবং আমার শরীরে প্রসাব-পায়খানা। একজন কোন রকমে পরিষ্কার করে দিল।

তিনি বলেন, পরে উন্নত চিকিৎসার কথা বলে ঢাকায় আনা হলো। কেরানীগঞ্জে যেখানে রাখা হলো ওটাও খুবই খারাপ সেল। পিজি হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য আনা হলো। এখানে ডাক্তার দেখিয়ে জেলে নেওয়ার সময় গাড়িতে হঠাৎ সাদা পোশাকে কয়েকজন লোক উঠে আসে, তারা আমাকে টর্চার করে এবং তাদের মধ্যে একজন বসুন্ধরার কথা বলে। আমাকে বলে, বসুন্ধরার মালিককে তুই তুকারি করেছিলি এত বড় সাহস তোর। বসুন্ধরার মালিক আহমেদ আকবর সোবহান এবং তার ছেলে আনভীরের নাম বলে আমাকে নির্যাতন করা হয়েছে। এই মাফিয়া গোষ্ঠীর হাত এতটাই লম্বা তারা কারাবন্দি একজনকে এভাবে নির্যাতন করতে পারে। তাদের কী কোন বিচার হবে না? জাতির কাছে আমার প্রশ্ন।

এনসিপির সাবেক এই নেতা বলেন, পরে কারাগারে গিয়েও সেল থেকে আরেকটি অন্ধকার কক্ষে নিয়ে নির্যাতন করা হতো। সেখানে টর্চারের সময় নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূইয়া এবং সালাহউদ্দিন আম্মারের নাম ধরে ধরে বলা হতো, জুলাইয়ের সবাইকে এরকম নির্যাতন করা হবে বলা হতো। ওখানে যে কক্ষে আমাকে রাখা হয়েছিল আওয়ামী লীগের লোকজন কীভাবে আছে তা দেখা যেত। তারা রাজার হালে জেলখানায় আছে, ফোনে কথা বলে, ভালো খাবার-দাবার খায় পরিবারের লোকজনের সঙ্গে নিয়মিত দেখাসাক্ষাৎ করে। রাতের বেলা আওয়ামী লীগের নেতাদের গাড়িতে করে বাইরে নেওয়া হয় এবং ভোরে আনা হয়, এটা আমি দেখেছি। এই দেখাটাই হয়তো আমার জন্য কাল হয়েছে।

তিনি বলেন, আমার ওপর এতটাই নির্যাতন করা হয়েছে যে, বর্তমানে আমার প্রসাব-পায়খানা ব্যাগে ও প্যাডে করতে হচ্ছে। একটি প্রাইভেট হাসপাতালে ভর্তি আছি, আমাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হয়েছে, জানি না চিকিৎসার কী হবে। মহান আল্লাহর ওপর ভরসা করে আছি, আপনাদের কাছে দোয়া চাই।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন এনসিপির যুগ্ম আহবায়ক সারোয়ার তুষারসহ আরও অনেকে।

/এসআর/