চে গুয়েভারাকে নিয়ে বিশ্ব চলচ্চিত্রে যত আখ্যান

সিজেডএন ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
চে গুয়েভারাকে নিয়ে বিশ্ব চলচ্চিত্রে যত আখ্যান
চে গুয়েভারা

মোটরসাইকেলে চেপে দক্ষিণ আমেরিকা ঘুরে বেড়ানো এক তরুণ থেকে কিউবার বিপ্লবী নেতা, তারপর বলিভিয়ার জঙ্গলে লড়াই- চে গুয়েভারার জীবন বারবার ফিরে এসেছে রূপালি পর্দায়। মাথায় তারকা চিহ্নিত কালো বেরেট, মুখভরা দাড়ি আর দূরে তাকিয়ে থাকা চোখ। এই ছবিটি দেখেননি, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। টি-শার্ট থেকে পোস্টার, দেয়ালচিত্র থেকে নানা পণ্যে ছড়িয়ে আছে এরনেস্তো ‘চে’ গুয়েভারার সেই বিখ্যাত প্রতিকৃতি।

চে গুয়েভারা ছিলেন চিকিৎসাবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী, বিপ্লবী যোদ্ধা ও রাজনৈতিক নেতা। কিউবা বিপ্লবে তার ভূমিকা তাকে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত করে তোলে। ১৯৬৭ সালের ৯ অক্টোবর বলিভিয়ায় মৃত্যুর পরও থেমে থাকেনি তাকে ঘিরে আলোচনা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি হয়ে ওঠেন চলচ্চিত্র নির্মাতাদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু।

চে-কে নিয়ে নির্মিত সিনেমায় উঠে এসেছে তার জীবনের নানা অধ্যায়। কোনো ছবিতে দেখা যায় বিপ্লবী হয়ে ওঠার আগের তরুণকে, কোনো ছবিতে কিউবার বিপ্লবের লড়াই, আবার কোনোটাতে ফুটে ওঠে বলিভিয়ায় তার শেষ দিনগুলোর বাস্তবতা। সব নির্মাতা তাকে একই চোখে দেখেননি। কারও কাছে তিনি আদর্শের জন্য লড়াই করা এক বিপ্লবী, আবার কারও কাছে তার জীবন সশস্ত্র রাজনীতি ও ক্ষমতার জটিলতা বোঝার একটি উদাহরণ। তাকে নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্রগুলো হলো;

Che! (১৯৬৯): মৃত্যুর পরপরই হলিউডের পর্দায় চে

চে গুয়েভারার মৃত্যুর মাত্র দুই বছরের মাথায় নির্মিত হয় Che। রিচার্ড ফ্লেইশার পরিচালিত ছবিতে চে-র চরিত্রে অভিনয় করেন ওমর শরিফ। কিউবার বিপ্লব থেকে বলিভিয়ায় তার শেষ অভিযান পর্যন্ত জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো এতে তুলে ধরা হয়েছে। মুক্তির পর তুমুল সমালোচিত হয় ছবিটি। অভিযোগ উঠে, কিউবার বিপ্লবকে সঠিকভাবে ছবিতে উপস্থাপন করা হয়নি এবং প্রকৃত চে গুয়েভার জীবনীকেও আড়াল করা হয়েছে।

Ernesto Che Guevara, the Bolivian Diary (১৯৯৪): শেষ দিনগুলোর খোঁজে

চে গুয়েভারার জীবনের শেষ অধ্যায় জানতে হলে তার বলিভিয়া অভিযানের দিনলিপি আসবেই। ওই দিনলিপিকে কেন্দ্র করে নির্মিত রিশার দিনদোর Ernesto Che Guevara, the Bolivian Diary গুরুত্বপূর্ণ একটি তথ্যচিত্র। বলিভিয়ায় গেরিলা সংগ্রামের সময় চে দলের পরিস্থিতি, খাদ্যসংকট, সামরিক তৎপরতা এবং প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা লিখতেন। তার লেখা দিনলিপি পরবর্তী সময়ে ওই অভিযানের ইতিহাস বোঝার অন্যতম উৎস হয়ে ওঠে।

El Día Que Me Quieras (১৯৯৭): একটি ছবির আড়ালে ইতিহাস

চে গুয়েভারার মৃত্যুর পর তোলা একটি ছবি তাকে বিশ্বের সবচেয়ে পরিচিত রাজনৈতিক প্রতীকগুলোর একটিতে পরিণত করেছে। সেই ছবিকে ঘিরেই নির্মিত হয়েছে লিয়ান্দ্রো কাটজের El Día Que Me Quieras।

একটি ছবি কীভাবে একজন মানুষের পরিচয়কে ছাড়িয়ে যায়? কীভাবে একটি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক বক্তব্য, স্মৃতি ও প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে ওঠে? এ তথ্যচিত্রের আলোচনায় এমন প্রশ্নই সামনে আসে।

The Motorcycle Diaries (২০০৪): যে ভ্রমণ বদলে দিয়েছিল এক তরুণের দৃষ্টিভঙ্গি

চে গুয়েভারাকে নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্রের কথা উঠলে প্রথমেই আসে ওয়াল্টার সালেস পরিচালিত The Motorcycle Diaries। গায়েল গার্সিয়া বার্নাল অভিনীত ছবিটি চে-র জীবনের বিপ্লবী হয়ে ওঠার আগের গল্প।

১৯৫২ সালে চিকিৎসাবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী এরনেস্তো গুয়েভারা তার বন্ধু আলবার্তো গ্রানাদোর সঙ্গে মোটরসাইকেলে দক্ষিণ আমেরিকা ভ্রমণে বের হন। আর্জেন্টিনার আটলান্টিক উপকূল ধরে আন্দিজ পার হয়ে চিলি, সেখান থেকে পেরু, কলম্বিয়া ও শেষে ভেনিজুয়েলার কারাকাস। এক বছরের অধিক সময় তারা পরিভ্রমণ করেন লাতিন আমেরিকার আনাচে-কানাচে। প্রায় ১২,০০০ মাইল পাড়ি দেন। যাত্রার শুরুতে এটি ছিল দুই বন্ধুর কাছে নতুন জায়গা দেখার, মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার আর পৃথিবীকে কাছ থেকে জানার এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। কিন্তু পথ যত এগোয়, তাদের সামনে অন্য এক বাস্তবতা ধরা দেয়। দারিদ্র্য, সামাজিক বৈষম্য, শ্রমজীবী মানুষের অনিশ্চিত জীবন আর প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বঞ্চনা তাদের ভাবতে বাধ্য করে। যে ভ্রমণ শুরু হয়েছিল ব্যক্তিগত আনন্দ আর কৌতূহল থেকে, সেটিই ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে সমাজকে নতুনভাবে দেখার অভিজ্ঞতা।

Che (২০০৮): বিপ্লবের উত্থান থেকে বলিভিয়ার শেষ লড়াই

চে গুয়েভারাকে নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে স্টিভেন সোডারবার্গের Che বিশেষভাবে আলোচিত। বেনিসিও দেল তোরো অভিনীত চলচ্চিত্রটি দুটি অংশে নির্মিত- The Argentine এবং Guerrilla। চে-র চরিত্রে অভিনয়ের জন্য দেল তোরো ২০০৮ সালের কান চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা অভিনেতার পুরস্কার পান।

প্রথম অংশে দেখা যায় কিউবার বিপ্লবের গল্প। ১৯৫৬ সালে ফিদেল কাস্ত্রো ও তার সঙ্গীরা কিউবায় ফিরে বাতিস্তা সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করেন। সেই দলে ছিলেন আর্জেন্টিনার চিকিৎসক এরনেস্তো গুয়েভারা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি হয়ে ওঠেন দলের গুরুত্বপূর্ণ যোদ্ধা ও কমান্ডার।

দ্বিতীয় অংশে গল্পের পটভূমি বদলে যায় বলিভিয়ায়। কিউবার বিপ্লবের পর চে নতুন করে গেরিলা সংগ্রাম গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। কিন্তু কিউবার মতো পরিস্থিতি সেখানে পাননি। স্থানীয় মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা, দলের নানা সমস্যা এবং সরকারি বাহিনীর অভিযান তার অবস্থানকে ক্রমেই দুর্বল করে তোলে। শেষ পর্যন্ত এ অভিযান ব্যর্থ হয় এবং চে ধরা পড়েন। ১৯৬৭ সালের ৯ অক্টোবর তাকে হত্যা করা হয়।

Che: Rise & Fall (২০০৬): স্মৃতিতে বিপ্লবীকে ফিরে দেখা

একজন মানুষের মৃত্যুর পর তার সম্পর্কে নানা গল্প ছড়িয়ে পড়ে, আর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যুক্ত হয় নানা ব্যাখ্যা। Che: Rise & Fall তথ্যচিত্রে চে গুয়েভারার জীবনকে ফিরে দেখার চেষ্টা করা হয়েছে তার সঙ্গে পরিচিত ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের স্মৃতির মধ্য দিয়ে।

চে-কে নিয়ে নির্মিত জীবনীভিত্তিক সিনেমায় সাধারণত তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সাজিয়ে গল্প বলা হয়। কিন্তু এ তথ্যচিত্রে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা, সাক্ষাৎকার এবং স্মৃতিচারণের মাধ্যমে অতীতকে বোঝার চেষ্টা করা হয়।

চে-র সঙ্গে যারা কাজ করেছেন বা তার জীবনকে কাছ থেকে দেখেছেন, তাদের স্মৃতিতে কেমন ছিলেন তিনি? বিপ্লবী নেতার পরিচয়ের বাইরে তার ব্যক্তিগত আচরণ, সহযোদ্ধাদের সঙ্গে সম্পর্ক এবং দৈনন্দিন জীবনের কোন দিকগুলো মনে রেখেছেন তারা? এ ধরনের প্রশ্ন তথ্যচিত্রটিকে আলাদা করে। চে-র জীবন নিয়ে আগ্রহীদের জন্য এ ধরনের ছবি তার ব্যক্তিগত পরিচয় এবং মৃত্যুর পর তাকে ঘিরে তৈরি হওয়া স্মৃতির জগৎ বুঝতে সাহায্য করবে।

The Hands of Che Guevara (২০০৬): মৃত্যুর পরও যে গল্প থামেনি

চে গুয়েভারার মৃত্যুর পর তার পরিচয় শনাক্তকরণ নিয়ে নানা ঘটনা রয়েছে। The Hands of Che Guevara তথ্যচিত্রে সে ইতিহাসের একটি বিশেষ দিক তুলে ধরা হয়েছে। চে-র মৃত্যু তাকে নিয়ে আলোচনা থামিয়ে দেয়নি। বরং তার জীবন, মৃত্যু এবং স্মৃতিকে ঘিরে নতুন নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এ তথ্যচিত্র চে-র জীবনের পরিচিত ঘটনাগুলোর বাইরে গিয়ে তার মৃত্যুর পরের ইতিহাস তুলে ধরে।

/এমএকে/