শিরোনাম

শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে বিমানবন্দর থেকেই ফাঁসির মঞ্চে: নাহিদ

সিজেডএন ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে বিমানবন্দর থেকেই ফাঁসির মঞ্চে: নাহিদ
‘শহীদ পরিবার ও আহতদের কণ্ঠে জনতার ১ দফা’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় বক্তব্য দেন নাহিদ ইসলাম

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মো. নাহিদ ইসলাম বলেছেন, ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফিরলে তাঁকে বিমানবন্দর থেকে সরাসরি ফাঁসির মঞ্চে নিয়ে যাওয়া হবে।

আজ সোমবার (৩ জুলাই) দুপুরে রাজধানীর কাকরাইলের ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশের (আইডিইবি) মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত ‘শহীদ পরিবার ও আহতদের কণ্ঠে জনতার ১ দফা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এ কথা বলেন। সভার আয়োজন করে এনসিপি।

বক্তব্যের এক পর্যায়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘যদি শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে আসে, সেই ডিসেম্বরে আসার জন্য যদি ব্যবস্থা তারেক রহমান (প্রধানমন্ত্রী) করে দেন, তাহলে আপনারা (জুলাই যোদ্ধা ও আহত ব্যক্তিরা) প্রস্তুত আছেন তো? আমরা সবাই প্রস্তুত। এয়ারপোর্ট থেকে সরাসরি ফাঁসির মঞ্চে, কোনো কথা হবে না। সেদিন বাংলাদেশের মানুষ ঢাকার রাজপথে থাকবে। ফাঁসি কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত রাজপথ ছেড়ে কেউ ঘরে ফিরবে না।’

নাহিদ ইসলাম বলেন, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের ‘এক দফা’ শুধু শেখ হাসিনার পতনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; এর লক্ষ্য ছিল ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠা করা। তবে দুই বছর পরও সেই লক্ষ্য পূরণ হয়নি বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, এক দফার আংশিক বাস্তবায়ন হলেও রাষ্ট্রসংস্কার, বিচার ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্য এখনো অপূর্ণ।

এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়িত না হওয়ায় দেশের প্রত্যাশিত পরিবর্তন আসেনি। তাঁর অভিযোগ, শহীদ পরিবারের সদস্যরা এখনো বিচার পাননি, আহত ব্যক্তিদের পুনর্বাসন শেষ হয়নি এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন খাতে দলীয়করণ, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি অব্যাহত রয়েছে। তাঁর দাবি, এক দফার লক্ষ্য বাস্তবায়িত হলে এসব সমস্যার পুনরাবৃত্তি হতো না।

সরকারের সমালোচনা করে নাহিদ ইসলাম বলেন, বিচার ও সংস্কারের প্রশ্নে বর্তমান সরকার জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। তাঁর অভিযোগ, জুলাই গণহত্যা, গুম-খুন এবং আন্দোলন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ঘটনার বিচারপ্রক্রিয়া কার্যত থমকে আছে। আহত ব্যক্তিদের জন্য ঘোষিত স্বাস্থ্যসেবার সুবিধাও কার্যকর হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।

রাষ্ট্র সংস্কারের প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম বলেন, বিদ্যমান রাষ্ট্র কাঠামো ও সংবিধান বহাল রেখে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন সম্ভব নয়। তিনি নতুন গণতান্ত্রিক সংবিধান প্রণয়নের দাবি পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, সংস্কার কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হলে নতুন সংবিধানের দাবিতে আবারও আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।

সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, জুলাই গণহত্যার বিচার এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য দ্রুত একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণা করতে হবে। অন্যথায় চলমান আন্দোলন আরও তীব্র হবে। তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনের শহীদেরা কোনো ব্যক্তি বা দলকে ক্ষমতায় বসানোর জন্য জীবন দেননি; তাঁরা বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রের প্রত্যাশায় আত্মত্যাগ করেছিলেন। সেই প্রত্যাশা বাস্তবায়ন করাই এখন সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।

জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের চেতনা নিয়ে বিতর্কেরও সমালোচনা করেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, শহীদ ও আহত ব্যক্তিদের আত্মত্যাগকে খাটো করার চেষ্টা চলছে। তবে বৈষম্য, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে মানুষ এখনো ঐক্যবদ্ধ রয়েছে বলে তাঁর দাবি।

শহীদদের আকাঙ্ক্ষার প্রশ্নে ঐক্যের আহ্বান

এনসিপির সদস্যসচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেন, জুলাই আন্দোলনের শহীদ ও আহত ব্যক্তিদের আত্মত্যাগের লক্ষ্য ছিল বৈষম্যহীন, জবাবদিহিমূলক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। তিনি বলেন, আন্দোলনে অংশ নেওয়া মানুষের প্রত্যাশা ছিল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অবসান। কিন্তু সেই প্রত্যাশা বাস্তবায়নে এখনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।

রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য থাকতে পারে, তবে জুলাই আন্দোলনের চেতনা ও শহীদদের আকাঙ্ক্ষার প্রশ্নে সবাইকে এক থাকতে হবে বলে মন্তব্য করেন আখতার হোসেন। তিনি বলেন, গণভোট ও জুলাই সনদের মাধ্যমে যে সংস্কারের প্রত্যাশা সামনে এসেছে, রাষ্ট্র পরিচালনায় তার প্রতিফলন থাকা প্রয়োজন। পাশাপাশি অতীতের মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নিপীড়নের ঘটনায় দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান তিনি।

আহতদের তালিকায় রাজনৈতিক বিবেচনার অভিযোগ

এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম অভিযোগ করেন, বিভিন্ন জেলায় জুলাই আন্দোলনের আহত ব্যক্তিদের তালিকায় রাজনৈতিক বিবেচনায় নতুন করে নাম অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা হচ্ছে। এতে প্রকৃত আহত ব্যক্তিদের স্বীকৃতি প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। একই সঙ্গে শহীদ পরিবার ও আহত ব্যক্তিদের কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে থেকে নিজেদের অধিকার ও ন্যায়বিচারের দাবি অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান তিনি।

শহীদ জাবের ইব্রাহিমের মা ও সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য রোকেয়া বেগম বলেন, অতীতের বিভিন্ন গুম, হত্যা ও সহিংসতার ঘটনার মতো জুলাই আন্দোলনে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচারেও এখনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। বিচারহীনতার সংস্কৃতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতেও সহিংসতার পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। এ সময় রাষ্ট্রসংস্কার–সংশ্লিষ্ট কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন এবং জুলাই সনদ কার্যকরের দাবি জানান তিনি।

জাতীয় নারীশক্তির সদস্যসচিব ও সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য মাহমুদা আলম মিতু বলেন, জুলাই আন্দোলনে শহীদ ও আহত ব্যক্তিদের স্বপ্ন ছিল একটি জনকল্যাণমুখী ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গড়ে তোলা। সেই লক্ষ্য অর্জনে রাষ্ট্রসংস্কারের উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, এসব দাবি কোনো ব্যক্তি বা দলের নয়; বরং আন্দোলনে আত্মত্যাগকারী মানুষের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন নারায়ণগঞ্জের শহীদ মো. আদিলের বাবা আবুল কালাম। এ ছাড়া বক্তব্য দেন এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, জাতীয় নারীশক্তির মুখ্য সংগঠক ও সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য নুসরাত তাবাসসুমসহ জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে শহীদ ও আহত পরিবারের সদস্যরা।

/এমআর/