শিরোনাম

সরকারের ১০০ দিনে ৬০৫ খুন, ধর্ষণ ২০৯: টিআইবি

নিজস্ব প্রতিবেদক
সরকারের ১০০ দিনে ৬০৫ খুন, ধর্ষণ ২০৯: টিআইবি
সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামানসহ অন্যরা

সরকারের প্রথম ১০০ দিনে দেশে খুন, ডাকাতি, ছিনতাই, অপহরণসহ বিভিন্ন অপরাধ উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। এ সময়ে ৬০৫টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া ধর্ষণ ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ২০৯ জন নারী ও শিশু। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক গবেষণা প্রতিবেদনে এই পর্যবেক্ষণ উঠে এসেছে।

রবিবার (৭ জুন) রাজধানীর ধানমন্ডিতে মাইডাস সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরবর্তী সরকারের ১০০ দিন: সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতিবিরোধী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক এই প্রতিবেদন প্রকাশ করে টিআইবি। প্রতিবেদন প্রকাশ করেন প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান।

পর্যবেক্ষণে বলা হয়, বিএনপি সরকার গঠনের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, মব সংস্কৃতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা ঘোষণা, চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিলেও বিভিন্ন হাটবাজার, পরিবহন খাত, বাসস্ট্যান্ড, ট্রাকস্ট্যান্ড ইত্যাদি ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ও চাঁদাবাজি, মাদকব্যবসা, চুরি-ছিনতাইয়ের মতো ঘটনা লক্ষণীয় মাত্রায় বিদ্যমান। এসব ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ রয়েছে। এমনকী চাঁদাবাজিকে একজন মন্ত্রীর বৈধতা দেওয়ার প্রচেষ্টা ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছে।

টিআইবির প্রতিবেদন বলছে, সরকার গঠনের ১০০ দিনের মধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন ও তথ্য কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কমিশন গঠনের জন্য দৃশ্যমান উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, মানবাধিকার সংরক্ষণ ও অবাধ তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিতকরণ কার্যক্রম একটি দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

প্রতিবেদনের সঙ্গে সংযুক্ত ‘অপরাধ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্র’ শীর্ষক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মার্চ ও এপ্রিল মাসে মোট ৬০৫টি খুন, ২৯৪টি ছিনতাই, ৯০টি ডাকাতি এবং ১৯৬টি অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে ১২৯টি এবং চুরির ঘটনা ঘটেছে ২ হাজার ২১৪টি। এছাড়া নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ছিল ৩ হাজার ৪৯৬টি। ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৭৮ থেকে ১০২ জন, সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার ৩০ থেকে ৩৬ জন এবং ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৪৯ থেকে ৭১টি শিশু।

পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বিএনপি সরকার তার নির্বাচনী ইশতেহারের অঙ্গীকার অনুযায়ী বিভিন্ন মন্ত্রণালয়সহ খাতভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন শুরু করেছে। তবে মন্ত্রণালয় ও খাতভিত্তিক কার্যক্রমে সুশাসনের ঘাটতি আছে। অনিয়ম-দুর্নীতিবিরোধী কঠোর ও সুনির্দিষ্ট অবস্থান ও দিকনির্দেশনার ঘাটতিও রয়েছে। অব্যবস্থাপনা ও দলীয় প্রভাব অব্যাহত আছে। এ ছাড়া ঝুঁকি বিশ্লেষণভিত্তিক কর্মকৌশলের অভাব রয়েছে। এসব কার্যত বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের অঙ্গীকার পূরণে বাধা হিসেবে কাজ করার ঝুঁকি তৈরি করছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বাংলাদেশের বিভিন্ন ধর্মীয় শক্তির উত্থান ও দেশব্যাপী বহুমত-বহুধর্মী-সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের ওপর সহিংস ও ষড়যন্ত্রমূলক কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতা নির্বাচিত সরকারের আমলেও অব্যাহত রয়েছে। এর সবশেষ দৃষ্টান্ত– ঢাকার ঐতিহ্যবাহী শাহ আলীর মাজারে এবং কুষ্টিয়ায় একজন পীরের ওপর হামলা হয়েছে। তা মুক্তচিন্তা, সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও বৈচিত্র্যের সহাবস্থান এবং সহিষ্ণু আচরণের ধারক-বাহক, তথা দেশবাসীর জন্য অশনিসংকেত।

বিএনপি সরকার গঠনের পর মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই ১৯টি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে টিআইবি। তবে তাদের অব্যাহতি দেওয়ার কোনো কারণ উল্লেখ করা হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উপাচার্য নিয়োগের ক্ষেত্রে সার্চ কমিটি থাকলেও যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে দলীয় বিবেচনায় উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সরকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে। বিশেষ করে সিটি করপোরেশন ও ৪২টি জেলা পরিষদে দলীয় লোকজনদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিয়ে সরকার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে।

পর্যবেক্ষণে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৭টি আইনে পরিণত করার উদ্যোগ সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। জবাবদিহিমূলক সরকার পরিচালনের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ আইনগুলো রহিত করা বা অধিকতর যাচাই-বাছাইয়ের জন্য স্থগিত করার মাধ্যমে কার্যত ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের মোটাদাগে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মানবাধিকার রক্ষা, দুর্নীতি দমন এবং গুম প্রতিরোধসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে পেছনে হাঁটার ইঙ্গিত দেয়।

টিআইবির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সরকারের ১০০ দিন একদিকে আশাজাগানিয়া ও সম্ভাবনাময়। অন্যদিকে সুশাসন, দুর্নীতি প্রতিরোধ, বিশেষ করে জবাবদিহিমূলক সরকার প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা পূরণে সুনির্দিষ্ট পথরেখা বা উদ্যোগের ঘাটতির দিকটি উদ্বেগজনক।

সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন টিআইবির উপদেষ্টা-নির্বাহী ব্যবস্থাপনা অধ্যাপক সুমাইয়া খায়ের, গবেষণা ও পলিসি বিভাগের পরিচালক মুহাম্মদ বদিউজ্জামান, গবেষণা সহযোগী মো. সহিদুল ইসলাম প্রমুখ।

/এফসি/