শিরোনাম

ত্রয়োদশ সংসদে কোটিপতি এমপি ৭৯ শতাংশ: টিআইবি

নিজস্ব প্রতিবেদক
ত্রয়োদশ সংসদে কোটিপতি এমপি ৭৯ শতাংশ: টিআইবি
ছবি: সংগৃহীত

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে ৭৯.৪৬ শতাংশ সদস্য (এমপি) কোটিপতি বলে জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। গত ১২ ফেব্রুয়ারি এই সংসদ নির্বাচনের ২৯৯টি আসনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়।

টিআইবি বলছে, অস্থাবর ও স্থাবর সম্পদের বর্তমান মূল্য অনুযায়ী নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মধ্যে ২৩৬ জন কোটিপতি এবং ১৩ জন শত কোটিপতি। তবে বিজয়ী প্রার্থীদের ঋণের পরিমাণ ১১ হাজার ৩৫৬ কোটি টাকা, যা বিগত চার নির্বাচনের চেয়ে অনেকাংশে বেশি।

সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবির কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রক্রিয়া ও হলফকনামা ভিত্তিক পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। সংসদ নির্বাচনের সার্বিক পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।

টিআইবির পর্যবেক্ষণে বলা হয়, মাঠপর্যায়ের গবেষণার জন্য দৈবচয়ন পদ্ধতিতে নমুনাভিত্তিকভাবে নির্বাচিত ৭০টি আসনের মধ্যে ২১.৪ শতাংশ আসনে এক বা একাধিক জালভোট প্রদানের ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে। নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতা হয়েছে ১২৫টি।

সার্বিক পর্যবেক্ষণে টিআইবি বলেছে, শুরুতে তুলনামূলক সুস্থ প্রতিযোগিতার লক্ষণ দেখা গেলেও, ক্রমান্বয়ে রাজনৈতিক দল এবং প্রার্থীরা নির্বাচনি কার্যক্রমের পুরোনো রাজনৈতিক চর্চা বজায় রেখেছেন। ফলে নির্বাচনে দল ও জোটের মধ্যে আন্তঃদলীয় কোন্দল, ক্ষমতার জন্য অসুস্থ প্রতিযোগিতা এবং সহিংসতা ক্রমেই বেড়েছে যা নির্বাচন-পরবর্তী সময়েও চলছে।

আওয়ামী লীগকে বাইরে রেখে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এক সাংবাদিক। জবাবে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, তৃণমূল পর্যায়ে অনেক জায়গায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে ধানের শীষ বা দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিতে বলেছিলেন। তারা ভোট দিয়েছেন। আওয়ামী লীগের শতভাগ নেতাকর্মী ভোট দেননি এটা বলার সুযোগ নেই। আমাদের দৃষ্টিতে নির্বাচন গ্রহণযোগ্য মাত্রায় সুষ্ঠু, প্রতিযোগিতামূলক, অংশগ্রহণমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়েছে।

আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচন ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক হল কি না’ এ নিয়ে আরো প্রশ্ন উঠবে বলে মন্তব্য করেন ইফতেখারুজ্জামান।

পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়, ত্রয়োদশ সংসদের অর্ধেক সংসদ সদস্যেরই দায় বা ঋণ রয়েছে। তাদের মোট দায় বা ঋণের পরিমাণ ১১ হাজার ৩৫৬ কোটি টাকা। যা বিগত চার সংসদের তুলনায় সর্বোচ্চ। দলগতভাবে বিএনপিতে এই হার ৬২ শতাংশ এবং জামায়াতে ইসলামীতে ১৬ শতাংশ।

টিআইবি বলছে, এবারের সংসদেও ব্যবসায়ী পেশার প্রার্থীরাই সবচেয়ে বেশি, প্রায় ৬০ শতাংশ। যদিও দ্বাদশ সংসদের তুলনায় ত্রয়োদশ সংসদে ব্যবসায়ীদের সংখ্যা ৫ শতাংশ কমেছে। নবম সংসদের তুলনায় তা ৩ শতাংশ বেড়েছে।

পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, প্রচারণা ব্যয়ের সীমা অনলাইন ও অফলাইন একক ও যৌথভাবে ব্যাপক লঙ্ঘিত হয়েছে। শীর্ষ দুই দল বিএনপি ও জামায়াত প্রার্থীদের ক্ষেত্রে এই লঙ্ঘনের মাত্রা সর্বাধিক। অফলাইন বা প্রত্যক্ষ প্রচারণা ব্যয় লঙ্ঘন হয়েছে। নির্ধারিত সীমার তুলনায় প্রায় ১৯ শতাংশ থেকে প্রায় ৩২৮ শতাংশ। শীর্ষে বিএনপি (৩২৭.৫%), স্বতন্ত্র (৩১৫.২%),জামায়াত (১৫৯.১%), জাতীয় পার্টি (১২৮.৬%), এনসিপি (১৯.০%)। নির্বাচন কমিশন তা কোনোভাবেই ঠেকাতে পারেনি।

পর্যবেক্ষণে বলা হয়, সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব মাত্র ২.৩৬ শতাংশ, যা ২০০৮ সালের নবম সংসদের অর্ধেক এবং সবচেয়ে কম।

আরও বলা হয়, এবারের সংসদ অপেক্ষাকৃত তরুণ, প্রথমবারের মতো সংসেদ যাচ্ছেন ২০৯ জন বা ৭০ শতাংশ, সম্ভাব্য সংসদ নেতা ও বিরোধীদলীয় নেতার দুইজনই প্রথমবারের মতো সংসদে যাচ্ছন। সংসদের ৮৪.৮৩ শতাংশই স্নাতক স্নাতকোত্তর ও উর্ধ্ব ডিগ্রিধারী। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি স্নাতকোত্তর ৪৪.৮৩ শতাংশ। বিগত চারটি সংসদের তুলনায় এবারই সবচেয়ে বেশি শিক্ষক সংসদে নির্বাচিত হয়েছেন। তবে পেশায় রাজনীতিবিদদের সংখ্যা এবার সবচেয়ে কম।

টিআইবির পর্যবেক্ষণ বলছে, এবারের নির্বাচন আয়োজনে সম্পৃক্ত সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে, বিশেষ করে, প্রশাসনিক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের একাংশের মধ্যে সুস্থ ও প্রভাবমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিতে ব্যাপক অনিয়ম ও নিষ্ক্রিয়তা লক্ষণীয় ছিল। রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের অনেকের ক্ষেত্রে সমান প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র নিশ্চিতের মূল্যবোধের নির্বাচনি আচরণবিধি প্রতিপালনে রাজনৈতিক দল এবং প্রার্থীদের নির্বাচন কমিশনকে অসহযোগিতার মনোভাবও পরিপন্থী আচরণ ক্রমাগত দৃশ্যমান হয়েছে।

এতে আরও বলা হয়, নির্বাচনি আচরণবিধি মান্য করার অঙ্গীকার করলেও প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো তা রক্ষা করেনি। প্রার্থীরা তাদের নির্ধারিত খরচের সীমা অতিক্রমের চর্চা অব্যাহত রেখেছে। ৯৯ শতাংশ প্রার্থী আচরণবিধির ৫৮টি বিষয়ের মধ্যে কোনো না কোনোটি লঙ্ঘন করেছেন। কিন্তু সীমাবদ্ধতার কারণে নির্বাচন কমিশন তেমন কোনো পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে।

টিআইবি বলছে, শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজনে নির্বাচন আচরণবিধি লঙ্ঘন, অনিয়ম ও অসুস্থ প্রতিযোগিতা প্রতিরোধে কমিশনের উপর আরোপিত ক্ষমতার কার্যকর প্রয়োগ কমিশন ও অন্যান্য অংশীজনের প্রয়াস ও সক্রিয়তা দৃশ্যমান ছিল। তবে রাজনৈতিক সংঘাত ঠেকানো অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভব হয়নি। আগের মতো রাজনৈতিক দল এবং প্রার্থীরা নির্বাচনে অর্থ, ধর্ম ও পেশী, পুরুষতান্ত্রিক ও গরিষ্ঠতান্ত্রিক শক্তির ব্যবহার শুধু অব্যাহতই রাখেননি, বরং বিশেষ করে অর্থ ও ধর্মের ব্যবহার ব্যাপকভাবে বেড়েছে, যা অনাকাঙ্ক্ষিত।

/এফসি/