১৫ আগস্ট ছিল সামরিক কর্মকর্তাদের প্রতিশোধ, ৭ নভেম্বর জনগণের সমর্থনে বিপ্লব: জামায়াত আমির

সিটিজেন জার্নাল ডেস্ক
সিটিজেন জার্নাল ডেস্ক
১৫ আগস্ট ছিল সামরিক কর্মকর্তাদের প্রতিশোধ, ৭ নভেম্বর জনগণের সমর্থনে বিপ্লব: জামায়াত আমির
জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে শুক্রবার রাজধানীর আল-ফালাহ মিলনায়তনে জামায়াতের আলোচনা সভায় বক্তব্য দেন দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান

১৫ আগস্টের ঘটনা ছিল সামরিক কর্মকর্তাদের প্রতিশোধের বহিঃপ্রকাশ। অন্যদিকে ৭ নভেম্বরের বিপ্লব সংঘটিত করেছিলেন সিপাহিরা, আর তাতে সমর্থন জানিয়েছিল সাধারণ মানুষ। এমন মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।

শুক্রবার (৬ নভেম্বর) সকাল সাড়ে ১০টায় রাজধানীর আল-ফালাহ মিলনায়তনে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগরী উত্তর আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সামরিক কর্মকর্তাদের উপহাস, অবজ্ঞা ও অপমান করার প্রতিশোধ থেকেই মূলত ১৫ আগস্টের ঘটনা ঘটেছিল। এর সঙ্গে সাধারণ মানুষের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না।

৭ নভেম্বরের ঘটনাকে জনগণের সমর্থনপুষ্ট সিপাহি বিপ্লব হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে পাল্টা অভ্যুত্থানের পরিপ্রেক্ষিতে সিপাহিরা ৭ নভেম্বর বিপ্লব ঘটান। এতে জনগণ সংহতি প্রকাশ করে। তাঁর ভাষায়, ‘বিপ্লবটা করেছে সিপাহীরা, সংহতি করেছে জনগণ। প্রকাশ্যে এই বিপ্লবকে সর্বাত্মক সমর্থন দিয়েছিল এ দেশের মানুষ।’

আলোচনায় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সমালোচনা করে জামায়াত আমির বলেন, ১৯৭২ সালে ক্ষমতায় আসার পর সরকার দেশের প্রায় সব ইসলামী সংগঠন নিষিদ্ধ করে। অথচ এসব সংগঠন ১৯৭০ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। নির্বাচনের আগে কোরআন-সুন্নাহর ওপর আঘাত না করার আশ্বাস দেওয়া হলেও ক্ষমতায় যাওয়ার পর সরকার ভিন্ন অবস্থান নেয়।

তিনি বলেন, জনগণের বিপুল সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসার পরপরই সরকার জনগণের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলে। সেনাবাহিনী, পুলিশ ও আনসারসহ বিভিন্ন বাহিনী থাকা সত্ত্বেও নিজেদের কর্মকাণ্ডের পরিণতি নিয়ে শঙ্কা থেকে রক্ষীবাহিনী গঠন করা হয়। এ বাহিনীকে ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল এবং তাদের জবাবদিহির কার্যকর ব্যবস্থা ছিল না।

রক্ষীবাহিনীর বিরুদ্ধে ৩৪ হাজার মানুষ হত্যার অভিযোগ তুলে শফিকুর রহমান বলেন, নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে অন্তত ১০ হাজার মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন।

তিনি আরও বলেন, মুক্তিযোদ্ধা সিরাজ শিকদারকে বিনা বিচারে হত্যার পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী সংসদে যে বক্তব্য দিয়েছিলেন, তা বিচারব্যবস্থা ও আইনের শাসনের প্রতি অবজ্ঞার বহিঃপ্রকাশ। সে সময় দেশে হত্যা, নির্যাতন, লুটপাট ও মানুষের সম্মানহানির বিচার ছিল না। বিরোধী মত দমনের পাশাপাশি ক্ষমতাসীনদের ঘনিষ্ঠদের অনিয়ম ও অপকর্মে সাধারণ মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল।

একজন কর্মরত সেনা কর্মকর্তার স্ত্রীকে অপহরণের ঘটনায় বিচার চাইতে গিয়ে ওই কর্মকর্তাকে চাকরি হারাতে হয়েছিল বলেও দাবি করেন জামায়াত আমির। এ ছাড়া ক্ষমতাসীনদের ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে ব্যাংক লুট ও বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগের কথা তুলে ধরেন তিনি। হোটেল শেরাটনের একটি স্যুটকে কেন্দ্র করে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের ভয়ে অভিভাবকেরা মেয়েদের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছিলেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

বিদেশ থেকে আসা ত্রাণসামগ্রী বিতরণেও অনিয়মের অভিযোগ করেন শফিকুর রহমান। তার দাবি, মানুষের জন্য পাঠানো ত্রাণের একটি অংশ বাইরে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছিল। এ বিষয়ে প্রশ্নের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী সাত কোটি মানুষের জন্য আট কোটি কম্বল আসার হিসাব তুলে ধরে নিজের কম্বল না পাওয়ার কথা বলেছিলেন।

তিনি বলেন, দুর্নীতি, লুটপাট, মানুষের অধিকার হরণ ও বিনা বিচারে হত্যার মধ্য দিয়ে তৎকালীন সরকার একদলীয় বাকশাল ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি একদলীয় শাসনব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে দেশে গণতন্ত্রের কবর রচনা করা হয়। বহুদলীয় নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসে বহুদলীয় গণতন্ত্র বিলুপ্ত করা হয়েছিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

৭ নভেম্বরের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে জামায়াত আমির বলেন, সেনাবাহিনীকে অবজ্ঞা ও অপমান করার কারণে সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। ১৫ আগস্টের পর থেকে ৩ নভেম্বর পর্যন্ত দেশে ধারাবাহিক ক্ষমতার পালাবদল ও অস্থিরতা চলছিল। ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের পাল্টা অভ্যুত্থানের পর ৩ থেকে ৬ নভেম্বর পর্যন্ত জিয়াউর রহমান বন্দি ছিলেন। ৭ নভেম্বর ভোরে সিপাহিরা সংগঠিত হয়ে তাকে মুক্ত করেন।

তিনি বলেন, সিপাহিরা ট্যাংক নিয়ে রাস্তায় নামলে মসজিদ থেকে নামাজ শেষে বের হওয়া মানুষ তাকবির ধ্বনি দিয়ে তাদের স্বাগত জানান। পরে এ সমর্থন সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। ঢাকার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহরেও একই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সিপাহিদের বিপ্লবের সঙ্গে জনগণের সংহতির কারণেই দিনটি জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসাবে বক্তব্য দেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য মিয়া গোলাম পরওয়ার। এতে সভাপতিত্ব করেন দলটির ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন।

/এমআর/