তীব্র গ্যাস সংকটে নাকাল জনজীবন

তীব্র গ্যাস সংকটে নাকাল জনজীবন
মরিয়ম সেঁজুতি

ভোর থেকেই রান্নাঘরের গ্যাসের চুলার দিকে এক দৃষ্টিতে চেয়ে আছেন পারভীন আক্তার। সকালের নাস্তার সময় পার হয়ে যাচ্ছে। অথচ জ্বলছে না গ্যাসের চুলা। শেষে নিরুপায় হয়ে দোকান থেকে কেনা পাউরুটি আর চা খেয়ে কাজে বের হতে হলো তার পরিবারের সদস্যদের। কিন্তু দুপুরের বা রাতের খাবারের ব্যবস্থা কীভাবে হবে, তা ভেবে কপালে চিন্তার ভাঁজ এই গৃহবধূর।
গ্যাসের তীব্র সংকটের কারণে পারভীর আক্তারের মতো রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বড় বড় শহরের লাখ লাখ পরিবার ভোগান্তি পোহাচ্ছে। এই চিত্র শুধু বৃহস্পতিবারের নয়। চার দিন ধরে গ্যাস না থাকায় সকাল থেকে গভীর রাত অবধি রাজধানীর বেশকিছু এলাকায় বাসাবাড়িতে রান্না বন্ধ। এই পরিস্থিতিতে অনেককে হোটেল-রেস্তোরাঁ থেকে খাবার এনে খেতে হচ্ছে। সবমিলিয়ে এক চরম অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে দিন কাটছে মানুষের।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাসাবাড়িতে গ্যাস সংকট নতুন কোনো সমস্যা না। তবে সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। রাজধানীর অধিকাংশ এলাকাতেই সকাল হতে না হতেই গ্যাসের চাপ একেবারেই কমে যায়। আবার কোথাও কোথাও সারাদিন সামান্য আগুন জ্বললেও তা দিয়ে রান্না হচ্ছে না। ফলে গভীর রাতে বা ভোরবেলায় যখন গ্যাসের চাপ কিছুটা বাড়ে, তখন ঘুম নষ্ট করে গৃহিণীদের রান্না করতে হচ্ছে। অসময়ে রান্নাবান্না করার এই অভ্যাসে স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে, পাশাপাশি ব্যাহত হচ্ছে দৈনন্দিন কাজ।
বাংলাদেশ তেল, গ্যাস, খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) সূত্র বলছে, দিনে গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট। তবে ৩০০ কোটি ঘনফুট পেলে মোটামুটি চাহিদা মেটানো যায়। কিন্তু গত বছর থেকে সরবরাহ করা হচ্ছে গড়ে ২৭০ কোটি ঘনফুট। অগ্নিদুর্ঘটনায় কক্সবাজারের মহেশখালীতে এলএনজির একটি টার্মিনাল বন্ধ হওয়ায় গ্যাস সরবরাহ কমে ২২০ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছে। তবে খুব শিগগিরই গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, জ্বালানি খাতের অনিশ্চয়তা দীর্ঘস্থায়ী হলে অর্থনীতির ওপর তার প্রভাব আরও গভীর হবে। তিনি আরও বলেন, জ্বালানি এমন একটি উপাদান যার সঙ্গে জীবনযাপন ও অর্থনীতির প্রতিটি খাত যুক্ত। কারণ জ্বালানির সরবরাহ ব্যাহত হলে উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সবকিছুই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
গ্যাসের চুলা জ্বলে না, বিকল্পেই ভরসা
বাসাবাড়িতে লাইনের গ্যাস যেন এখন সোনার হরিণ। সকাল হলেই অধিকাংশ এলাকায় চুলার তেজ কমে একদম নিভে যায়। দুপুর বা বিকেলের দিকে কিছুটা দেখা মিললেও তা দিয়ে এক পাতিল পানি ফোটাতেও লেগে যায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। ফলে চরম বিপাকে পড়েছেন গৃহিণীরা। ছোট বাচ্চা কিংবা প্রবীণদের সময়মতো খাবার তৈরি করে দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বাধ্য হয়ে অনেকেই ঝুঁকছেন মাটির চুলা, ইলেকট্রিক ইনডাকশন বা এলপিজি সিলিন্ডারের দিকে। তবে হঠাৎ বাজারে সিলিন্ডারের চাহিদা ও দাম দুটোই বেড়ে যাওয়ায় মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোর ওপর বাড়তি খরচের চাপ তৈরি হয়েছে।
খিলগাও সি ব্লক এলাকার গৃহিনী ফারজানা আক্তার সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, গত তিন দিন ধরে তীব্র গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। রাত ১১ টার পরে একটু একটু করে গ্যাসি আসে। ভোর ৬ টা পর্যন্ত থাকে। এরপর গ্যাস চলে যায়। সারাদিনে আর গ্যাসের দেখা পাওয়া যায় না।
নারায়নগঞ্জ বন্দর এলাকার বাসিন্দা গৌরাঙ্গ লাল মালী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, গত ১৫ দিন ধরে গ্যাসের সংকট। রাতে আসে, সকালে চলে যায়। অগত্যা হোটেলেই সকাল, দুপুর আর রাতের খাবার খেতে হচ্ছে। তিনি বলেন, হোটেলেও গ্যাসের সমস্যা। ফলে গ্যাসের জন্য অনেকটাই খারাপ অবস্থায় আছি।
আবার অনেকে রান্নার জন্য ব্যবহার করছেন ইলেকট্রিক চুলা বা ইন্ডাকশন কুকার। তবে বিদ্যুতের বিল বৃদ্ধি পাওয়ায় মাস শেষে এটিও সাধারণ ও মধ্যবিত্ত পরিবারের বাজেট এলোমেলো করে দিচ্ছে। আর যারা বাধ্য হয়ে হোটেল বা রেস্তোরাঁ থেকে প্রতিদিনের কেনা খাবার খাচ্ছেন, তাদের শারীরিক ও আর্থিক দুই দিক দিয়েই বেশ ধকল সহ্য করতে হচ্ছে।
কেন তৈরি হলো এই ভয়াবহ সংকট
জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে এবং জ্বালানির চাহিদা ও সরবরাহের তথ্য বিশ্লেষণ করে এই খাতের সংকটের পেছনে পেছনে একাধিক বড় কারণ পাওয়া গেছে। সেগুলো হচ্ছে;
১. দেশীয় গ্যাসের মজুত হ্রাস
দেশের প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রধান উৎসগুলো দিন দিন ফুরিয়ে আসছে। নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার বা পুরোনো গ্যাসকূপ খননের গতি চাহিদার তুলনায় বেশ ধীর।
২. আমদানি নির্ভরতা ও বৈশ্বিক বাজার
দেশীয় ঘাটতি মেটাতে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির ওপর বহুগুণে নির্ভরতা বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাসের দামের উঠানামা এবং বৈদেশিক মুদ্রার সংকটের কারণে অনেক সময় সময়মতো এলএনজি আমদানি করা সম্ভব হয় না।
৩. শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতকে অগ্রাধিকার
জাতীয় গ্রিডে যখন গ্যাসের জোগান কমে যায়, তখন সরকারের প্রাথমিক অগ্রাধিকার থাকে বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও শিল্পকারখানায় সরবরাহ ঠিক রাখা। ফলে সরবরাহ ব্যবস্থার একেবারে শেষ ধাপে থাকা আবাসিক খাত সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়ে।
৪. সিস্টেম লস ও অবৈধ সংযোগ
বিতরণ লাইনের কারিগরি ত্রুটি, পুরোনো পাইপলাইনের লিকেজ এবং বিভিন্ন স্থানে থাকা অবৈধ সংযোগের কারণে বিপুল পরিমাণ গ্যাস অপচয় হয়। এই কারণে বাসাবাড়ির বৈধ গ্রাহকেরা চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস পাচ্ছে না।
সাধারণ মানুষের ক্ষোভ
প্রতি মাসেই গ্রাহকরা নিয়মিত বিল পরিশোধ করছেন, কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস পাচ্ছেন না। এতে সাধারণ মানুষের মনে সৃষ্টি হচ্ছে গভীর ক্ষোভ ও হতাশা। তাদের প্রশ্ন—নিয়মিত বিল দিয়েও কেন পুরো মাস ধরে রান্নার কষ্ট সহ্য করতে হবে।
সমস্যা সমাধানে করণীয়
এ সংকট দূর করতে একগুচ্ছ দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। প্রথমত দেশে গ্যাস অনুসন্ধান প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত ও জোরদার করতে হবে। দ্বিতীয়ত পাইপলাইনের অবৈধ সংযোগ দ্রুত বিচ্ছিন্ন করে সিস্টেম লস কমাতে হবে। একই সঙ্গে এলএনজি আমদানির প্রক্রিয়া সহজ করা এবং সৌরশক্তি কিংবা অন্যান্য বিকল্প শক্তির ব্যবহার বাড়ানো জরুরি।
রান্নাঘর প্রতিটি পরিবারের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। আর সেই রান্নাঘরের আগুন যদি দিনের পর দিন বন্ধ থাকে, তবে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা থমকে দাঁড়ায়। সাধারণ নাগরিকদের জীবনের স্বাভাবিক গতি ফিরিয়ে আনতে এবং এই নিত্যদিনের ভোগান্তি থেকে মুক্তি দিতে প্রশাসনিক পর্যায় থেকে দ্রুত ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নেওয়াই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

ভোর থেকেই রান্নাঘরের গ্যাসের চুলার দিকে এক দৃষ্টিতে চেয়ে আছেন পারভীন আক্তার। সকালের নাস্তার সময় পার হয়ে যাচ্ছে। অথচ জ্বলছে না গ্যাসের চুলা। শেষে নিরুপায় হয়ে দোকান থেকে কেনা পাউরুটি আর চা খেয়ে কাজে বের হতে হলো তার পরিবারের সদস্যদের। কিন্তু দুপুরের বা রাতের খাবারের ব্যবস্থা কীভাবে হবে, তা ভেবে কপালে চিন্তার ভাঁজ এই গৃহবধূর।
গ্যাসের তীব্র সংকটের কারণে পারভীর আক্তারের মতো রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বড় বড় শহরের লাখ লাখ পরিবার ভোগান্তি পোহাচ্ছে। এই চিত্র শুধু বৃহস্পতিবারের নয়। চার দিন ধরে গ্যাস না থাকায় সকাল থেকে গভীর রাত অবধি রাজধানীর বেশকিছু এলাকায় বাসাবাড়িতে রান্না বন্ধ। এই পরিস্থিতিতে অনেককে হোটেল-রেস্তোরাঁ থেকে খাবার এনে খেতে হচ্ছে। সবমিলিয়ে এক চরম অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে দিন কাটছে মানুষের।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাসাবাড়িতে গ্যাস সংকট নতুন কোনো সমস্যা না। তবে সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। রাজধানীর অধিকাংশ এলাকাতেই সকাল হতে না হতেই গ্যাসের চাপ একেবারেই কমে যায়। আবার কোথাও কোথাও সারাদিন সামান্য আগুন জ্বললেও তা দিয়ে রান্না হচ্ছে না। ফলে গভীর রাতে বা ভোরবেলায় যখন গ্যাসের চাপ কিছুটা বাড়ে, তখন ঘুম নষ্ট করে গৃহিণীদের রান্না করতে হচ্ছে। অসময়ে রান্নাবান্না করার এই অভ্যাসে স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে, পাশাপাশি ব্যাহত হচ্ছে দৈনন্দিন কাজ।
বাংলাদেশ তেল, গ্যাস, খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) সূত্র বলছে, দিনে গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট। তবে ৩০০ কোটি ঘনফুট পেলে মোটামুটি চাহিদা মেটানো যায়। কিন্তু গত বছর থেকে সরবরাহ করা হচ্ছে গড়ে ২৭০ কোটি ঘনফুট। অগ্নিদুর্ঘটনায় কক্সবাজারের মহেশখালীতে এলএনজির একটি টার্মিনাল বন্ধ হওয়ায় গ্যাস সরবরাহ কমে ২২০ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছে। তবে খুব শিগগিরই গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, জ্বালানি খাতের অনিশ্চয়তা দীর্ঘস্থায়ী হলে অর্থনীতির ওপর তার প্রভাব আরও গভীর হবে। তিনি আরও বলেন, জ্বালানি এমন একটি উপাদান যার সঙ্গে জীবনযাপন ও অর্থনীতির প্রতিটি খাত যুক্ত। কারণ জ্বালানির সরবরাহ ব্যাহত হলে উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সবকিছুই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
গ্যাসের চুলা জ্বলে না, বিকল্পেই ভরসা
বাসাবাড়িতে লাইনের গ্যাস যেন এখন সোনার হরিণ। সকাল হলেই অধিকাংশ এলাকায় চুলার তেজ কমে একদম নিভে যায়। দুপুর বা বিকেলের দিকে কিছুটা দেখা মিললেও তা দিয়ে এক পাতিল পানি ফোটাতেও লেগে যায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। ফলে চরম বিপাকে পড়েছেন গৃহিণীরা। ছোট বাচ্চা কিংবা প্রবীণদের সময়মতো খাবার তৈরি করে দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বাধ্য হয়ে অনেকেই ঝুঁকছেন মাটির চুলা, ইলেকট্রিক ইনডাকশন বা এলপিজি সিলিন্ডারের দিকে। তবে হঠাৎ বাজারে সিলিন্ডারের চাহিদা ও দাম দুটোই বেড়ে যাওয়ায় মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোর ওপর বাড়তি খরচের চাপ তৈরি হয়েছে।
খিলগাও সি ব্লক এলাকার গৃহিনী ফারজানা আক্তার সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, গত তিন দিন ধরে তীব্র গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। রাত ১১ টার পরে একটু একটু করে গ্যাসি আসে। ভোর ৬ টা পর্যন্ত থাকে। এরপর গ্যাস চলে যায়। সারাদিনে আর গ্যাসের দেখা পাওয়া যায় না।
নারায়নগঞ্জ বন্দর এলাকার বাসিন্দা গৌরাঙ্গ লাল মালী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, গত ১৫ দিন ধরে গ্যাসের সংকট। রাতে আসে, সকালে চলে যায়। অগত্যা হোটেলেই সকাল, দুপুর আর রাতের খাবার খেতে হচ্ছে। তিনি বলেন, হোটেলেও গ্যাসের সমস্যা। ফলে গ্যাসের জন্য অনেকটাই খারাপ অবস্থায় আছি।
আবার অনেকে রান্নার জন্য ব্যবহার করছেন ইলেকট্রিক চুলা বা ইন্ডাকশন কুকার। তবে বিদ্যুতের বিল বৃদ্ধি পাওয়ায় মাস শেষে এটিও সাধারণ ও মধ্যবিত্ত পরিবারের বাজেট এলোমেলো করে দিচ্ছে। আর যারা বাধ্য হয়ে হোটেল বা রেস্তোরাঁ থেকে প্রতিদিনের কেনা খাবার খাচ্ছেন, তাদের শারীরিক ও আর্থিক দুই দিক দিয়েই বেশ ধকল সহ্য করতে হচ্ছে।
কেন তৈরি হলো এই ভয়াবহ সংকট
জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে এবং জ্বালানির চাহিদা ও সরবরাহের তথ্য বিশ্লেষণ করে এই খাতের সংকটের পেছনে পেছনে একাধিক বড় কারণ পাওয়া গেছে। সেগুলো হচ্ছে;
১. দেশীয় গ্যাসের মজুত হ্রাস
দেশের প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রধান উৎসগুলো দিন দিন ফুরিয়ে আসছে। নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার বা পুরোনো গ্যাসকূপ খননের গতি চাহিদার তুলনায় বেশ ধীর।
২. আমদানি নির্ভরতা ও বৈশ্বিক বাজার
দেশীয় ঘাটতি মেটাতে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির ওপর বহুগুণে নির্ভরতা বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাসের দামের উঠানামা এবং বৈদেশিক মুদ্রার সংকটের কারণে অনেক সময় সময়মতো এলএনজি আমদানি করা সম্ভব হয় না।
৩. শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতকে অগ্রাধিকার
জাতীয় গ্রিডে যখন গ্যাসের জোগান কমে যায়, তখন সরকারের প্রাথমিক অগ্রাধিকার থাকে বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও শিল্পকারখানায় সরবরাহ ঠিক রাখা। ফলে সরবরাহ ব্যবস্থার একেবারে শেষ ধাপে থাকা আবাসিক খাত সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়ে।
৪. সিস্টেম লস ও অবৈধ সংযোগ
বিতরণ লাইনের কারিগরি ত্রুটি, পুরোনো পাইপলাইনের লিকেজ এবং বিভিন্ন স্থানে থাকা অবৈধ সংযোগের কারণে বিপুল পরিমাণ গ্যাস অপচয় হয়। এই কারণে বাসাবাড়ির বৈধ গ্রাহকেরা চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস পাচ্ছে না।
সাধারণ মানুষের ক্ষোভ
প্রতি মাসেই গ্রাহকরা নিয়মিত বিল পরিশোধ করছেন, কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস পাচ্ছেন না। এতে সাধারণ মানুষের মনে সৃষ্টি হচ্ছে গভীর ক্ষোভ ও হতাশা। তাদের প্রশ্ন—নিয়মিত বিল দিয়েও কেন পুরো মাস ধরে রান্নার কষ্ট সহ্য করতে হবে।
সমস্যা সমাধানে করণীয়
এ সংকট দূর করতে একগুচ্ছ দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। প্রথমত দেশে গ্যাস অনুসন্ধান প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত ও জোরদার করতে হবে। দ্বিতীয়ত পাইপলাইনের অবৈধ সংযোগ দ্রুত বিচ্ছিন্ন করে সিস্টেম লস কমাতে হবে। একই সঙ্গে এলএনজি আমদানির প্রক্রিয়া সহজ করা এবং সৌরশক্তি কিংবা অন্যান্য বিকল্প শক্তির ব্যবহার বাড়ানো জরুরি।
রান্নাঘর প্রতিটি পরিবারের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। আর সেই রান্নাঘরের আগুন যদি দিনের পর দিন বন্ধ থাকে, তবে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা থমকে দাঁড়ায়। সাধারণ নাগরিকদের জীবনের স্বাভাবিক গতি ফিরিয়ে আনতে এবং এই নিত্যদিনের ভোগান্তি থেকে মুক্তি দিতে প্রশাসনিক পর্যায় থেকে দ্রুত ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নেওয়াই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

তীব্র গ্যাস সংকটে নাকাল জনজীবন
মরিয়ম সেঁজুতি

ভোর থেকেই রান্নাঘরের গ্যাসের চুলার দিকে এক দৃষ্টিতে চেয়ে আছেন পারভীন আক্তার। সকালের নাস্তার সময় পার হয়ে যাচ্ছে। অথচ জ্বলছে না গ্যাসের চুলা। শেষে নিরুপায় হয়ে দোকান থেকে কেনা পাউরুটি আর চা খেয়ে কাজে বের হতে হলো তার পরিবারের সদস্যদের। কিন্তু দুপুরের বা রাতের খাবারের ব্যবস্থা কীভাবে হবে, তা ভেবে কপালে চিন্তার ভাঁজ এই গৃহবধূর।
গ্যাসের তীব্র সংকটের কারণে পারভীর আক্তারের মতো রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বড় বড় শহরের লাখ লাখ পরিবার ভোগান্তি পোহাচ্ছে। এই চিত্র শুধু বৃহস্পতিবারের নয়। চার দিন ধরে গ্যাস না থাকায় সকাল থেকে গভীর রাত অবধি রাজধানীর বেশকিছু এলাকায় বাসাবাড়িতে রান্না বন্ধ। এই পরিস্থিতিতে অনেককে হোটেল-রেস্তোরাঁ থেকে খাবার এনে খেতে হচ্ছে। সবমিলিয়ে এক চরম অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে দিন কাটছে মানুষের।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাসাবাড়িতে গ্যাস সংকট নতুন কোনো সমস্যা না। তবে সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। রাজধানীর অধিকাংশ এলাকাতেই সকাল হতে না হতেই গ্যাসের চাপ একেবারেই কমে যায়। আবার কোথাও কোথাও সারাদিন সামান্য আগুন জ্বললেও তা দিয়ে রান্না হচ্ছে না। ফলে গভীর রাতে বা ভোরবেলায় যখন গ্যাসের চাপ কিছুটা বাড়ে, তখন ঘুম নষ্ট করে গৃহিণীদের রান্না করতে হচ্ছে। অসময়ে রান্নাবান্না করার এই অভ্যাসে স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে, পাশাপাশি ব্যাহত হচ্ছে দৈনন্দিন কাজ।
বাংলাদেশ তেল, গ্যাস, খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) সূত্র বলছে, দিনে গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট। তবে ৩০০ কোটি ঘনফুট পেলে মোটামুটি চাহিদা মেটানো যায়। কিন্তু গত বছর থেকে সরবরাহ করা হচ্ছে গড়ে ২৭০ কোটি ঘনফুট। অগ্নিদুর্ঘটনায় কক্সবাজারের মহেশখালীতে এলএনজির একটি টার্মিনাল বন্ধ হওয়ায় গ্যাস সরবরাহ কমে ২২০ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছে। তবে খুব শিগগিরই গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, জ্বালানি খাতের অনিশ্চয়তা দীর্ঘস্থায়ী হলে অর্থনীতির ওপর তার প্রভাব আরও গভীর হবে। তিনি আরও বলেন, জ্বালানি এমন একটি উপাদান যার সঙ্গে জীবনযাপন ও অর্থনীতির প্রতিটি খাত যুক্ত। কারণ জ্বালানির সরবরাহ ব্যাহত হলে উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সবকিছুই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
গ্যাসের চুলা জ্বলে না, বিকল্পেই ভরসা
বাসাবাড়িতে লাইনের গ্যাস যেন এখন সোনার হরিণ। সকাল হলেই অধিকাংশ এলাকায় চুলার তেজ কমে একদম নিভে যায়। দুপুর বা বিকেলের দিকে কিছুটা দেখা মিললেও তা দিয়ে এক পাতিল পানি ফোটাতেও লেগে যায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। ফলে চরম বিপাকে পড়েছেন গৃহিণীরা। ছোট বাচ্চা কিংবা প্রবীণদের সময়মতো খাবার তৈরি করে দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বাধ্য হয়ে অনেকেই ঝুঁকছেন মাটির চুলা, ইলেকট্রিক ইনডাকশন বা এলপিজি সিলিন্ডারের দিকে। তবে হঠাৎ বাজারে সিলিন্ডারের চাহিদা ও দাম দুটোই বেড়ে যাওয়ায় মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোর ওপর বাড়তি খরচের চাপ তৈরি হয়েছে।
খিলগাও সি ব্লক এলাকার গৃহিনী ফারজানা আক্তার সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, গত তিন দিন ধরে তীব্র গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। রাত ১১ টার পরে একটু একটু করে গ্যাসি আসে। ভোর ৬ টা পর্যন্ত থাকে। এরপর গ্যাস চলে যায়। সারাদিনে আর গ্যাসের দেখা পাওয়া যায় না।
নারায়নগঞ্জ বন্দর এলাকার বাসিন্দা গৌরাঙ্গ লাল মালী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, গত ১৫ দিন ধরে গ্যাসের সংকট। রাতে আসে, সকালে চলে যায়। অগত্যা হোটেলেই সকাল, দুপুর আর রাতের খাবার খেতে হচ্ছে। তিনি বলেন, হোটেলেও গ্যাসের সমস্যা। ফলে গ্যাসের জন্য অনেকটাই খারাপ অবস্থায় আছি।
আবার অনেকে রান্নার জন্য ব্যবহার করছেন ইলেকট্রিক চুলা বা ইন্ডাকশন কুকার। তবে বিদ্যুতের বিল বৃদ্ধি পাওয়ায় মাস শেষে এটিও সাধারণ ও মধ্যবিত্ত পরিবারের বাজেট এলোমেলো করে দিচ্ছে। আর যারা বাধ্য হয়ে হোটেল বা রেস্তোরাঁ থেকে প্রতিদিনের কেনা খাবার খাচ্ছেন, তাদের শারীরিক ও আর্থিক দুই দিক দিয়েই বেশ ধকল সহ্য করতে হচ্ছে।
কেন তৈরি হলো এই ভয়াবহ সংকট
জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে এবং জ্বালানির চাহিদা ও সরবরাহের তথ্য বিশ্লেষণ করে এই খাতের সংকটের পেছনে পেছনে একাধিক বড় কারণ পাওয়া গেছে। সেগুলো হচ্ছে;
১. দেশীয় গ্যাসের মজুত হ্রাস
দেশের প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রধান উৎসগুলো দিন দিন ফুরিয়ে আসছে। নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার বা পুরোনো গ্যাসকূপ খননের গতি চাহিদার তুলনায় বেশ ধীর।
২. আমদানি নির্ভরতা ও বৈশ্বিক বাজার
দেশীয় ঘাটতি মেটাতে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির ওপর বহুগুণে নির্ভরতা বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাসের দামের উঠানামা এবং বৈদেশিক মুদ্রার সংকটের কারণে অনেক সময় সময়মতো এলএনজি আমদানি করা সম্ভব হয় না।
৩. শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতকে অগ্রাধিকার
জাতীয় গ্রিডে যখন গ্যাসের জোগান কমে যায়, তখন সরকারের প্রাথমিক অগ্রাধিকার থাকে বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও শিল্পকারখানায় সরবরাহ ঠিক রাখা। ফলে সরবরাহ ব্যবস্থার একেবারে শেষ ধাপে থাকা আবাসিক খাত সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়ে।
৪. সিস্টেম লস ও অবৈধ সংযোগ
বিতরণ লাইনের কারিগরি ত্রুটি, পুরোনো পাইপলাইনের লিকেজ এবং বিভিন্ন স্থানে থাকা অবৈধ সংযোগের কারণে বিপুল পরিমাণ গ্যাস অপচয় হয়। এই কারণে বাসাবাড়ির বৈধ গ্রাহকেরা চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস পাচ্ছে না।
সাধারণ মানুষের ক্ষোভ
প্রতি মাসেই গ্রাহকরা নিয়মিত বিল পরিশোধ করছেন, কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস পাচ্ছেন না। এতে সাধারণ মানুষের মনে সৃষ্টি হচ্ছে গভীর ক্ষোভ ও হতাশা। তাদের প্রশ্ন—নিয়মিত বিল দিয়েও কেন পুরো মাস ধরে রান্নার কষ্ট সহ্য করতে হবে।
সমস্যা সমাধানে করণীয়
এ সংকট দূর করতে একগুচ্ছ দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। প্রথমত দেশে গ্যাস অনুসন্ধান প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত ও জোরদার করতে হবে। দ্বিতীয়ত পাইপলাইনের অবৈধ সংযোগ দ্রুত বিচ্ছিন্ন করে সিস্টেম লস কমাতে হবে। একই সঙ্গে এলএনজি আমদানির প্রক্রিয়া সহজ করা এবং সৌরশক্তি কিংবা অন্যান্য বিকল্প শক্তির ব্যবহার বাড়ানো জরুরি।
রান্নাঘর প্রতিটি পরিবারের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। আর সেই রান্নাঘরের আগুন যদি দিনের পর দিন বন্ধ থাকে, তবে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা থমকে দাঁড়ায়। সাধারণ নাগরিকদের জীবনের স্বাভাবিক গতি ফিরিয়ে আনতে এবং এই নিত্যদিনের ভোগান্তি থেকে মুক্তি দিতে প্রশাসনিক পর্যায় থেকে দ্রুত ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নেওয়াই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।









