ছাত্রদের দাবি ছিল ড. ইউনূসকেই প্রধান উপদেষ্টা করতে হবে: রাষ্ট্রপতি

ছাত্রদের দাবি ছিল ড. ইউনূসকেই প্রধান উপদেষ্টা করতে হবে: রাষ্ট্রপতি

চব্বিশের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগের দেড় দশকের শাসনের অবসান ঘটে। দেশ ছাড়তে বাধ্য হন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনদিন পর ৮ আগস্ট নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত হয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বলেছেন, ৫ আগস্টের পর ছাত্রদের পক্ষ থেকে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকেই প্রধান উপদেষ্টা করার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ছিল।
গত শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারি) রাতে দৈনিক কালের কণ্ঠকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেন রাষ্ট্রপ্রধান। মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) পত্রিকাটি সেই সাক্ষাৎকারের দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব প্রকাশ করেছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল পাঁচ বছরের জন্য রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন ৭৫ বছর বয়সী সাহাবুদ্দিন। একসময় তিনি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কমিশনার ছিলেন ।
রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে মো. সাহাবুদ্দিন বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক। এর বাইরে পদটি মূলত আনুষ্ঠানিক। দেশের কার্যনির্বাহী ক্ষমতা থাকে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার হাতে। দায়িত্ব নেওয়ার ১৬ মাসের মাথায় অভাবনীয় এক পরিস্থিতির মধ্যে পড়েন তিনি।
রাষ্ট্রপতির কাছে প্রশ্ন ছিল, জরুরি অবস্থা জারি করে দেশে সামরিক শাসন শুরু হতে যাচ্ছে বলে ওই সময় গুঞ্জন ছিল। এই ধরনের কোনো আলাপ কি উঠেছিল, প্রকাশ্যে বা গোপনে?
জবাবে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন বলেন, “এমন কোনো আলাপ ওঠেনি; বরং আমি এখানে দৃঢ়ভাবে বলতে পারি যে আমাদের সেনাবাহিনী এখানে যে ভূমিকা রেখেছিল, তা অবশ্যই স্মরণীয়। স্মরণীয় এই কারণে যে সঠিক সময়ে সঠিক ভূমিকা রেখেছে তারা।
“তারা ইচ্ছা করলে মার্শাল ল দিতে পারত। চাইলে ইমার্জেন্সি, মানে জরুরি অবস্থা দিতে পারত, যেটা দেওয়ার জন্য চাপ ছিল আমার ওপর। কারণ রাষ্ট্রপতিই শুধু দিতে পারে ইমার্জেন্সি। তাই আমাকে বিভিন্ন পর্যায় থেকে, বিভিন্নভাবে জরুরি অবস্থা জারি করতে প্রভাবিত করার চেষ্টা হয়েছিল। এখানে একটা কথা না বললেই নয় যে ওই সময় একটা প্রতিবিপ্লব ঘটানোর উদ্যোগও ছিল।
কোন পর্যায় থেকে প্রতিবিপ্লবের উদ্যোগ হচ্ছিল? আর কারা জরুরি অবস্থা জারির জন্য প্রভাবিত করতে চেয়েছে? এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “এটা আপনারা বোঝেন। সাধারণত এ ধরনের পরিস্থিতিতে অনেক সুযোগসন্ধানী পক্ষ থাকে। দেশি ও বিদেশি বিভিন্ন এজেন্সি তৎপর থাকে। তাদের তরফ থেকেই নানা প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা হয়েছে। বিশেষ করে একটি জটিলতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে অসাংবিধানিক কিছু করে দেওয়ার চেষ্টা চালিয়েছে।
“আমার কানে বারবার বলা হচ্ছিল, আমি যেন ইমার্জেন্সি দিই। তবে সেনাবাহিনী প্রধান, নৌবাহিনী প্রধান ও বিমানবাহিনী প্রধান এটার সম্পূর্ণ বিরোধী ছিলেন। সামরিক আইন জারি করার ব্যাপারে বিরোধী, জাতীয় সরকার গঠন করার ব্যাপারে বিরোধী এবং ইমার্জেন্সি দেওয়ার ব্যাপারেও তারা বিরোধী ছিলেন। তারা বলছিলেন, এভাবেই কন্টিনিউ করে নিয়ে নির্বাচন পর্যন্ত যাওয়া যায় কি না। এ কারণে আমি সেসব শক্ত হাতে দমন করতে পেরেছি।
“সশস্ত্র বাহিনীর উদ্দেশ্যই ছিল একটা নির্বাচন আয়োজনের ব্যবস্থা করা। যে জন্য সেনাপ্রধান বলেছিলেন যে ১৮ মাসের মধ্যে আমরা নির্বাচন দেখতে চাই। আমি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলতে পারি, সেনাপ্রধানের মধ্যে ক্ষমতার মোহ ছিল না; এটা একদম শতভাগ সত্য। তিনি বারবার বলেছেন, ‘আমাদের সেনাবাহিনীর অতীত ইতিহাস ঘাঁটলে অনেক ভালো এবং অনেক মন্দ পাওয়া যায়। ওয়ান-ইলেভেনের সময়ও অনেকে সেটাকে গ্রহণ করেনি।
“সেনাবাহিনী ওয়ান-ইলেভেনের সময় ইমার্জেন্সি দিয়ে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় ছিল। এই কারণে জনগণের মধ্যে একটা বিতৃষ্ণা আসতে পারে। সে জন্য উনারা কোনোমতেই এই পথে পা বাড়াননি। তবে আমি ছিলাম সেই সময় টার্গেট– ইমার্জেন্সি দেওয়ার জন্য। চরমভাবে প্রভাব বিস্তার করা হয়েছে আমার ওপর। তবে আল্লাহর রহমত এবং আমার দৃঢ় মনোবলের কারণে ওই পরিস্থিতি থেকে দেশ রক্ষা পেয়েছে।”
সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে ৩৬ দিন আগে শিক্ষার্থীদের যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল তা সরকার পতনের আন্দোলনে রূপান্তরিত হওয়ার পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা ছাড়তে হয়।
রাষ্ট্রপতির কাছে প্রশ্ন ছিল, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দিন বঙ্গভবনের পরিবেশ কেমন ছিল?
জবাবে রাষ্ট্রপতি বলেন, “স্বাভাবিকভাবে ওই আন্দোলনটা জনবিস্ফোরণে রূপ নেয়। যখন বিক্ষোভকারীরা গণভবন অভিমুখে, তখন আমাকে জানানো হল, যে কোনো মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গভবনে আসবেন। ১২টার সময় আমাকে জানানো হল, উনি প্রস্তুতি নিচ্ছেন বঙ্গভবনে আসার। এর আগে আমরা আঁচই করতে পারিনি যে আসলে ঘটনা কী ঘটতে যাচ্ছে। তবে উনি যখন এখানে আসবেন বলছেন এবং হেলিকপ্টারও রেডি, তখন আমরা ঘটনার ভয়াবহতা সম্পর্কে ধারণা করতে পারি। এখানে সিকিউরিটি যারা ছিল, সবাই পজিশন নিয়ে নিল।
“দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে জানানো হল, না, উনি আসছেন না। আসছেন না যখন জেনেছি, তখন আমরাও সতর্ক ছিলাম। কিছুক্ষণ পরেই শুনলাম, উনি দেশ ছেড়েছেন। একসময় জানতে পারলাম, উনি অলরেডি দেশের বাইরে চলে গেছেন। সব মিলিয়ে ৩০ থেকে ৪০ মিনিটের মধ্যে সামগ্রিক ঘটনাপ্রবাহের খুব দ্রুত পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছিলাম।
সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক সাহাবুদ্দিনের কাছে জানতে চাওয়া হয়, সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে তখন কোনো যোগাযোগ হচ্ছিল?
জবাবে তিনি বলেন, “সেদিন বিকাল ৩টার দিকে প্রথমে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান আমাকে টেলিফোনে সব ঘটনা অবহিত করেন। সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ থেকেও আমাকে জানানো হয়। পরে জানানো হলো, ওয়াকার সাহেব সাংবাদিকদের সামনে সম্পূর্ণ পরিস্থিতি নিয়ে একটা ব্রিফিং দেবেন।
‘‘উনি ব্রিফিং দিলেন, আমরা টেলিভিশনে দেখলাম। উনি বললেন, প্রধানমন্ত্রী দেশত্যাগ করেছেন। তো দেশবাসী আশ্বস্ত হলো যে উনি অলরেডি দেশান্তরী হয়েছেন। তারপর আমাকে সেনাপ্রধান ফোন করে জানালেন যে তারা আসছেন। সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী প্রধান– তিনজনই বঙ্গভবনে এলেন। এসে আমার সঙ্গে উদ্ভূত সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনায় বসলেন।
“তখন আমাদের প্রায় কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থা। কী করা যায়, কীভাবে কী হবে– এসব নিয়ে আমরা আলোচনা করলাম প্রায় ২ থেকে ৩ ঘণ্টা। সিদ্ধান্ত হলো, সব রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দকে ডাকা হবে। এই কাজে সেনাবাহিনীর টিম নিযুক্ত ছিল। তারপর উনারা চলে গেলেন।
“সেনা সদরে দেশের রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দকে একত্র করা হলো। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের মধ্যেও কেউ কেউ ছিল। তখন যাদের পাওয়া গেছে, তাদেরকে নিয়েই আবার তারা বঙ্গভবনে আসেন। আমরা আবার বৈঠকে বসি।
রাষ্ট্রপতি বলতে থাকেন, “বঙ্গভবনের এই বৈঠকে আমরা দেশের শান্তি ও স্থিতিশীলতার বিষয়টি সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছি। কীভাবে, কোন ধরনের সিদ্ধান্ত নিলে দেশের মানুষকে স্বস্তি ফিরিয়ে দেওয়া যায়, সে বিষয়ে দীর্ঘ আলোচনার আয়োজন হয়।
“আমার সভাপতিত্বে সভা হলো। সেনাপ্রধান সঞ্চালনা করলেন। সেখানে তিনি পুরো পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দিলেন। সেই বৈঠকে সম্মিলিতভাবে কয়েকটি প্রস্তাব আসে। বিশেষ করে, মূল তিনটি প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। এগুলো হলো– তত্ত্বাবধায়ক সরকার, সর্বদলীয় বা জাতীয় সরকার এবং অন্তর্বর্তী সরকার।
“যে নামেই ডাকা হোক না কেন, লক্ষ্য-উদ্দেশ্য থাকবে অভিন্ন। তত্ত্বাবধায়ক সরকার বললে হয়ত ওয়ান-ইলেভেনের মতো শোনায়। আবার সর্বদলীয় বা জাতীয় সরকার বললে দীর্ঘমেয়াদি সরকারও হয়ে যেতে পারে। তো, নানা বিবেচনায় আমাদের বিজ্ঞ রাজনীতিবিদরা সিদ্ধান্ত নেন যে অন্তর্বর্তী সরকারই গঠন করা উচিত।
“এই সিদ্ধান্ত হলো আর আমার ওপর দায়িত্ব পড়লো জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়ে জাতিকে আশ্বস্ত করার। আর তারা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে সব ঠিক করবেন সরকারের গঠন প্রণালীটা। এই সিদ্ধান্ত হওয়ার পর প্রফেসর আসিফ নজরুল সাংবাদিকদের কাছে পরিস্থিতির অগ্রগতি তুলে ধরেন।
“আমাকে ভাষণ দিতে হলো রাত ১১টার সময়। আর অন্তর্বর্তী সরকার গঠন প্রক্রিয়া তাদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হলো। সেনাবাহিনী এবং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ আলাপ করে এটা করবেন। সেনাবাহিনী থাকবে, সহায়তা করবে সব কিছুতে।”
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের তিন দিন পর ৮ আগস্ট নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। সেই সরকারের দেড় বছরের শাসনের পর গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন হয়, যাতে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় বিএনপি। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি দলটি সরকার গঠনের মধ্য দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের অবসান ঘটেছে।
রাষ্ট্রপতির কাছে জানতে চাওয়া হয়, অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের বিষয়টি সংবিধানে ছিল না। ফলে ওই সময় একটি সাংবিধানিক সংকটের মুখে পড়েছিল দেশ। সে পরিস্থিতি তিনি কীভাবে সামাল দিয়েছিলেন?
জবাবে সাহাবুদ্দিন বলেন, “যখন অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হলো, তখন কথা উঠল– এটা তো আমাদের সংবিধানে নেই। আমাদের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭ এবং ৭-ক অনুযায়ী, সংবিধানের কাঠামোতে কোনো পরিবর্তন, পরিবর্ধন, পরিমার্জন করাটা শাস্তিমূলক অপরাধ এবং এই অপরাধের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। এটা হবে বিদ্রোহ বা রাষ্ট্রদ্রোহের শামিল। এটা তো আমি জানি।
“কিন্তু আমরা যে কাজটা করতে যাচ্ছি, সরকার গঠন করতে যাচ্ছি, এটা তো সংবিধানে নেই। দেশের এই সংকটময় অবস্থায় আমি নিজে ৮ তারিখে, ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট তৎকালীন প্রধান বিচারপতির সঙ্গে কথা বলি। তার সঙ্গে পরামর্শ করি– এই অবস্থায় কী করা যায়।
“আমরা আলোচনা করলাম– এই সংবিধানের আলোকেই কীভাবে সরকার গঠন করা যায়। সংবিধানের আর্টিকেল ১০৬-এর বিধানমতে আপিল বিভাগের কাছে আমি তাদের মতামত চাইলাম। বললাম, এ অবস্থায় আপনারা আমাকে পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করেন।
“এটা আমাদের আইনে আছে। একটা আইনের সাপোর্ট থাকলে আমি তো ৭ ও ৭-ক অনুচ্ছেদ সংক্রান্ত জটিলতা থেকে বাঁচি। তখন উনারা আপিল বিভাগের আদালত বসালেন।”
রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে প্রশ্ন ছিল, বিচারপতিরা কি এসেছিলেন?
জবাবে তিনি বলেন, “না, ফোনে কথা হয়েছে। সেই সময় সুপ্রিম কোর্ট ঘেরাও আন্দোলন চলছিল। আমার তৎকালীন আইনসচিব আমার চিঠি কোর্টে নিয়ে যায়। উনারা তখন দুজন ছিলেন এজলাসে, আর বাকি কয়েকজন ছিলেন বাড়িতে। তাদের উনারা ভার্চুয়ালি সংযুক্ত করেন।
“এর আগে ৬ আগস্ট আমি রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাবলে যথোপযুক্ত মনে করে অ্যাডভোকেট আসাদুজ্জামানকে অ্যাটর্নি জেনারেল নিয়োগ দিই। যেহেতু তখন দেশে সরকার নাই, আইনে বলা আছে, রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দান করবেন। সে কারণে আমি কারো মুখাপেক্ষী হইনি।
“তো, ৮ আগস্টের ওই শুনানিতে আমার পক্ষ থেকে, মানে রাষ্ট্রপতির পক্ষ থেকে শুনানিতে অংশগ্রহণ করেন অ্যাটর্নি জেনারেল। পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে সেদিন শুনানি হয়। তারপর তারা আমাকে মতামত দিয়ে দেন যে, এই ধরনের পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করে দিতে পারেন। এক বা একাধিক উপদেষ্টা নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা যেতে পারে। আর সেটি রাষ্ট্রপতি গঠন করে দেবেন মর্মে সিদ্ধান্ত দিলেন তারা।
“তাদের ওই মতামত আমার জন্য রক্ষাকবচ হয়ে উঠল। আমার সামনে আর কোনো বাধা থাকল না। এই মতামতের ওপর ভিত্তি করেই আমি রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে পরামর্শ করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করি। সেখানে আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর সম্পূর্ণ রকম সমর্থন ছিল।”
রাষ্ট্রপতির কাছে জানতে চাওয়া হয়, প্রধান উপদেষ্টা কাকে করা হবে, সেই আলোচনায় কার কার নাম ছিল?
জবাবে রাষ্ট্রপতি বলেন, “ছাত্রদের পক্ষ থেকে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকেই প্রধান উপদেষ্টা করার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ছিল। তখন তিনি ছিলেন ফ্রান্সে। এতে সরকার গঠনে দেরি হচ্ছিল। আমাদের তৎকালীন ছাত্রনেতারা উনার সঙ্গে যোগাযোগ, ফ্রিকোয়েন্টলি যোগাযোগ করতে পারছিল না। তার কারণ উনি ওখানে হাসপাতালে একটা অপারেশন করাচ্ছিলেন। উনাকে তাই সব সময় মোবাইল ফোনে পাওয়া যাচ্ছিল না। এটা ছাত্রনেতারা আমাকে জানিয়েছিল।
“তারপর কথা উঠল যে, যেহেতু উনার আসতে দেরি হচ্ছে, তাহলে অন্য কাউকে সরকারপ্রধান করা যায় কি না। এ ধরনের কথা উঠলে ছাত্রনেতারা আপত্তি তোলে। তারা জানিয়ে দেয় যে, ড. ইউনূসকেই প্রধান উপদেষ্টা করতে হবে।
“তখন আমরা ঠিক করলাম, ছাত্রনেতাদের কথাই আমরা সম্মান করব। ওরা যাকে চায়, তাকেই আমরা প্রধান উপদেষ্টা করব। রাজনৈতিক নেতারাও ছাত্রনেতাদের সমর্থন করছিলেন।”
সরকার গঠনে দেরি হওয়ার কারণে প্রধান উপদেষ্টা পদে বিকল্প কোনো নাম কি আলোচনায় এসেছিল? এমন প্রশ্নের জবাবে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন বলেন, “সে রকম অনেক কথাই হচ্ছিল। যেহেতু ড. ইউনূসের সঙ্গে যোগাযোগটা খুব স্বাভাবিকভাবে করা সম্ভব হচ্ছিল না, তাই প্রধান উপদেষ্টা পদে কয়েকজনের নাম আসছিল। এর মধ্যে একজন ছিলেন সালেহউদ্দিন আহমেদ; পরবর্তী সময়ে তাকে অর্থ উপদেষ্টা করা হয়েছিল। তবে ছাত্রনেতারা ড. ইউনূসের ব্যাপারে অটল থাকে এবং তারা ধৈর্য ধরার পক্ষে ছিল।
“পরে ড. ইউনূসের দেশে ফেরা নিশ্চিত হলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। তিনি ঢাকায় অবতরণ করার পর বিমানবন্দরের লাউঞ্জে বসেই সশস্ত্র বাহিনী প্রধানরা তার সঙ্গে জরুরি বৈঠকে বসেন। সেখানেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টাদের নামের তালিকা চূড়ান্ত হয়ে যায়। আমরা আগে থেকে একটি খসড়া তালিকা করে রেখেছিলাম; সেখান থেকে ড. ইউনূস কিছু বাদ দিয়ে নিজের পছন্দের কয়েকটি নাম যুক্ত করেন। তারপর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে শপথ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।”
রাষ্ট্রপতির কাছে জানতে চাওয়া হয়– আপনাদের তালিকা থেকে বাদ পড়েছিলেন কারা?
জবাবে রাষ্ট্রপ্রধান বলেন, “এটা বিচিত্র। বাদ দেওয়া হয়েছে, আবার উনি নিজে কিছু নাম লিখে দিয়েছেন আর কি! ওই যে উনারা, এনজিও থেকে যারা যারা এসেছিলেন; উনি (মুহাম্মদ ইউনূস) তাদের নাম লিখে দিয়েছেন। মুক্তিযোদ্ধাবিষয়ক, স্বাস্থ্যবিষয়ক, ধর্মবিষয়ক– এগুলো উনি পরিবর্তন করে করে দিয়েছেন।”
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নাজুক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও মব সন্ত্রাস বহুল আলোচিত বিষয় ছিল।
রাষ্ট্রপতিকে কাছে প্রশ্ন করা হয়, সারা দেশে একসময় মব সন্ত্রাসে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা হয়েছে। ওই পরিস্থিতিকে তিনি কীভাবে দেখেছিলেন?
জবাবে সাহাবুদ্দিন বলেন, “এটা তো অবশ্যই কষ্টের জায়গা। ওই সময়টা এত অশান্ত ছিল যে, সেগুলো সে সময় দমন করার চেষ্টা করলে হিতে বিপরীত হতে পারত। শান্ত পরিবেশ বজায় রাখার জন্য অনেক কিছু সহ্য করতে হয়েছে।”
প্রশ্ন: বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে যে মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অন্তর্বর্তী সরকারের উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ ছিল না। এ ক্ষেত্রে সরকারের কোনো ইন্ধন দেখতে পান কি না?
রাষ্ট্রপতি: ইন্ধন ছিল কি না জানি না। তবে তারা নীরব ছিল দেখেছি।
প্রশ্ন: এ বিষয়ে কারো সঙ্গে কথা বলেছিলেন?
রাষ্ট্রপতি: আমি দেখলাম যে কিছু করে লাভ হবে না। মানে, আমি যেটা চাচ্ছি যে এটা যেন না হয়; কিন্তু সেটা আমি করতে পারতাম না। অসহায় ছিলাম। আমি কিছু বলতে চাইনি, কেননা বলতে গিয়ে যদি বুমেরাং হয়ে যায়!
এক প্রশ্নের জবাবে সাহাবুদ্দিন বলেন, “গত দেড় বছরে প্রধান উপদেষ্টা ১৪ বার বিদেশে গেছেন, অথচ আমি চিকিৎসার জন্য যেতে পারিনি। মূলত আমি যেন মনস্তাত্ত্বিকভাবে ভেঙে পড়ি, এটাই ছিল তাদের মূল উদ্দেশ্য। আমি ভেঙে পড়ে যাতে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করি; এতে তারা অসাংবিধানিকভাবে পছন্দের কাউকে বসাতে পারবে।
“আর এটা করতে পারলেই নির্বাচন বিলম্ব করানো বা নিজেদের ক্ষমতা বেশিদিন ধরে রাখা যেত। নিজেদের মনমতো রাষ্ট্রপতি হলে যা ইচ্ছা তা-ই করা যায়– এই ভাবনা থেকেই আমার ওপর মানসিক পীড়ন চালিয়েছেন তারা।”
এক প্রশ্নের জবাবে রাষ্ট্রপতি বলেন, “নির্বাচন ভালো হয়েছে। মানুষের আকাঙ্ক্ষা ছিল একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হোক। জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল। মানুষ যেন এক ধরনের মুক্তি চাইছিল।”
প্রশ্ন: তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার আসার পর আপনার অনুভূতি কী?
রাষ্ট্রপতি: (হেসে) এখন আমি সম্পূর্ণ চাপমুক্ত ও ভারমুক্ত। দেড় বছর শ্বাসরুদ্ধকর সময় পার করেছি। আমি এখন সম্পূর্ণ রিল্যাক্স। দেড় বছর ধরে আমার মাথায় একটাই চিন্তা ছিল, কীভাবে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করব, কীভাবে বঙ্গভবনকে নিরাপদ রাখব। সেই চাপ এখন পুরোপুরি চলে গেছে।
সম্প্রতি বিভিন্ন মহলে, গণমাধ্যমে আলোচনা হচ্ছে– রাষ্ট্রপতি পরিবর্তন হতে পারে; নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে কারো কারো নামও আসছে। এমনকি বিদেশি এক গণমাধ্যমে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন বলেছিলেন, নির্বাচনের পর আর এখানে থাকতে চান না। বিষয়টি স্পষ্ট করতে অনুরোধ করা হয় তাকে।
জবাবে সাহাবুদ্দিন বলেন, “এই বক্তব্যটি অন্যভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। আমি যেভাবে বলেছি, সেটি সেই প্রেক্ষাপটেই বোঝা দরকার। গত ১৮ মাসে ওই সরকার আমাকে যে রকম মানসিকভাবে চাপ দিয়েছে, নানা ঘটনায় আমাকে অপমানিত করা হয়েছে, সে কারণে আমার মনে এক ধরনের ক্ষোভ জন্মেছিল। তখনই আমি বলেছিলাম, এভাবে রাষ্ট্রপতি থাকা যায় না, চলে যেতে ইচ্ছা করে। এই কথাটাই আমি রয়টার্সকে বলেছিলাম।
“কিন্তু পরে এটাকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হলো, যেন আমার মেয়াদ নেই। প্রশ্ন করা হলো, নতুন নির্বাচন হলে, নতুন সরকার এলে আপনার অবস্থান কী হবে? তখন আমি বলেছি, আমি সাংবিধানিকভাবে পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত; আমার মেয়াদ ২০২৮ সাল পর্যন্ত। মানে আমার মেয়াদ আরো দুই বছর আছে।
“তবে আমি এটাও বলেছি, যদি একটি নির্বাচিত সরকার আসে এবং তাদের অভিপ্রায় থাকে যে আমি না থাকাই ভালো, তাহলে আমি স্বেচ্ছায় সরে যেতে প্রস্তুত। আই লাভ টু গো। মানে, তারা সে রকম ইচ্ছা পোষণ করলে আমি নিজে থেকেই চলে যেতে চাইব।”
রাষ্ট্রপতির কাছে প্রশ্ন ছিলো, এখনো কি সেই অবস্থানটাই আছে? বিএনপি যদি মনে করে, তারা নিজেদের মতো রাষ্ট্রপতি চায়, সে ক্ষেত্রে কী করবেন? কিংবা সংসদের মাধ্যমে অভিশংসন হলে?
জবাবে রাষ্ট্রপতি বলেন, “ওগুলো কেন হতে দেব? আমি একজন সচেতন মানুষ। যদি তারা মনে করে আমি থাকি, তাহলে আমি থাকব। আর যদি বলে যে– সরে যাওয়া ভালো; তাহলে আমি নিজেই সম্মানজনকভাবে সরে যাব।”
রাষ্ট্রপতি পদ থেকে অবসরের পর কোন কাজে মনোনিবেশ করতে চান– এমন প্রশ্নে সাহাবুদ্দিন বলেন, আমি তো আইন অঙ্গনের মানুষ। জীবনের দীর্ঘ ৪০টি বছর কাটিয়ে দিয়েছি কোর্ট-কাচারিতে। অবসরের পর একজন আইনি পরামর্শক হিসেবে বাকি জীবন কাটিয়ে দেব; যদি শরীর-স্বাস্থ্য ভালো থাকে।

চব্বিশের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগের দেড় দশকের শাসনের অবসান ঘটে। দেশ ছাড়তে বাধ্য হন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনদিন পর ৮ আগস্ট নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত হয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বলেছেন, ৫ আগস্টের পর ছাত্রদের পক্ষ থেকে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকেই প্রধান উপদেষ্টা করার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ছিল।
গত শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারি) রাতে দৈনিক কালের কণ্ঠকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেন রাষ্ট্রপ্রধান। মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) পত্রিকাটি সেই সাক্ষাৎকারের দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব প্রকাশ করেছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল পাঁচ বছরের জন্য রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন ৭৫ বছর বয়সী সাহাবুদ্দিন। একসময় তিনি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কমিশনার ছিলেন ।
রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে মো. সাহাবুদ্দিন বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক। এর বাইরে পদটি মূলত আনুষ্ঠানিক। দেশের কার্যনির্বাহী ক্ষমতা থাকে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার হাতে। দায়িত্ব নেওয়ার ১৬ মাসের মাথায় অভাবনীয় এক পরিস্থিতির মধ্যে পড়েন তিনি।
রাষ্ট্রপতির কাছে প্রশ্ন ছিল, জরুরি অবস্থা জারি করে দেশে সামরিক শাসন শুরু হতে যাচ্ছে বলে ওই সময় গুঞ্জন ছিল। এই ধরনের কোনো আলাপ কি উঠেছিল, প্রকাশ্যে বা গোপনে?
জবাবে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন বলেন, “এমন কোনো আলাপ ওঠেনি; বরং আমি এখানে দৃঢ়ভাবে বলতে পারি যে আমাদের সেনাবাহিনী এখানে যে ভূমিকা রেখেছিল, তা অবশ্যই স্মরণীয়। স্মরণীয় এই কারণে যে সঠিক সময়ে সঠিক ভূমিকা রেখেছে তারা।
“তারা ইচ্ছা করলে মার্শাল ল দিতে পারত। চাইলে ইমার্জেন্সি, মানে জরুরি অবস্থা দিতে পারত, যেটা দেওয়ার জন্য চাপ ছিল আমার ওপর। কারণ রাষ্ট্রপতিই শুধু দিতে পারে ইমার্জেন্সি। তাই আমাকে বিভিন্ন পর্যায় থেকে, বিভিন্নভাবে জরুরি অবস্থা জারি করতে প্রভাবিত করার চেষ্টা হয়েছিল। এখানে একটা কথা না বললেই নয় যে ওই সময় একটা প্রতিবিপ্লব ঘটানোর উদ্যোগও ছিল।
কোন পর্যায় থেকে প্রতিবিপ্লবের উদ্যোগ হচ্ছিল? আর কারা জরুরি অবস্থা জারির জন্য প্রভাবিত করতে চেয়েছে? এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “এটা আপনারা বোঝেন। সাধারণত এ ধরনের পরিস্থিতিতে অনেক সুযোগসন্ধানী পক্ষ থাকে। দেশি ও বিদেশি বিভিন্ন এজেন্সি তৎপর থাকে। তাদের তরফ থেকেই নানা প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা হয়েছে। বিশেষ করে একটি জটিলতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে অসাংবিধানিক কিছু করে দেওয়ার চেষ্টা চালিয়েছে।
“আমার কানে বারবার বলা হচ্ছিল, আমি যেন ইমার্জেন্সি দিই। তবে সেনাবাহিনী প্রধান, নৌবাহিনী প্রধান ও বিমানবাহিনী প্রধান এটার সম্পূর্ণ বিরোধী ছিলেন। সামরিক আইন জারি করার ব্যাপারে বিরোধী, জাতীয় সরকার গঠন করার ব্যাপারে বিরোধী এবং ইমার্জেন্সি দেওয়ার ব্যাপারেও তারা বিরোধী ছিলেন। তারা বলছিলেন, এভাবেই কন্টিনিউ করে নিয়ে নির্বাচন পর্যন্ত যাওয়া যায় কি না। এ কারণে আমি সেসব শক্ত হাতে দমন করতে পেরেছি।
“সশস্ত্র বাহিনীর উদ্দেশ্যই ছিল একটা নির্বাচন আয়োজনের ব্যবস্থা করা। যে জন্য সেনাপ্রধান বলেছিলেন যে ১৮ মাসের মধ্যে আমরা নির্বাচন দেখতে চাই। আমি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলতে পারি, সেনাপ্রধানের মধ্যে ক্ষমতার মোহ ছিল না; এটা একদম শতভাগ সত্য। তিনি বারবার বলেছেন, ‘আমাদের সেনাবাহিনীর অতীত ইতিহাস ঘাঁটলে অনেক ভালো এবং অনেক মন্দ পাওয়া যায়। ওয়ান-ইলেভেনের সময়ও অনেকে সেটাকে গ্রহণ করেনি।
“সেনাবাহিনী ওয়ান-ইলেভেনের সময় ইমার্জেন্সি দিয়ে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় ছিল। এই কারণে জনগণের মধ্যে একটা বিতৃষ্ণা আসতে পারে। সে জন্য উনারা কোনোমতেই এই পথে পা বাড়াননি। তবে আমি ছিলাম সেই সময় টার্গেট– ইমার্জেন্সি দেওয়ার জন্য। চরমভাবে প্রভাব বিস্তার করা হয়েছে আমার ওপর। তবে আল্লাহর রহমত এবং আমার দৃঢ় মনোবলের কারণে ওই পরিস্থিতি থেকে দেশ রক্ষা পেয়েছে।”
সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে ৩৬ দিন আগে শিক্ষার্থীদের যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল তা সরকার পতনের আন্দোলনে রূপান্তরিত হওয়ার পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা ছাড়তে হয়।
রাষ্ট্রপতির কাছে প্রশ্ন ছিল, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দিন বঙ্গভবনের পরিবেশ কেমন ছিল?
জবাবে রাষ্ট্রপতি বলেন, “স্বাভাবিকভাবে ওই আন্দোলনটা জনবিস্ফোরণে রূপ নেয়। যখন বিক্ষোভকারীরা গণভবন অভিমুখে, তখন আমাকে জানানো হল, যে কোনো মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গভবনে আসবেন। ১২টার সময় আমাকে জানানো হল, উনি প্রস্তুতি নিচ্ছেন বঙ্গভবনে আসার। এর আগে আমরা আঁচই করতে পারিনি যে আসলে ঘটনা কী ঘটতে যাচ্ছে। তবে উনি যখন এখানে আসবেন বলছেন এবং হেলিকপ্টারও রেডি, তখন আমরা ঘটনার ভয়াবহতা সম্পর্কে ধারণা করতে পারি। এখানে সিকিউরিটি যারা ছিল, সবাই পজিশন নিয়ে নিল।
“দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে জানানো হল, না, উনি আসছেন না। আসছেন না যখন জেনেছি, তখন আমরাও সতর্ক ছিলাম। কিছুক্ষণ পরেই শুনলাম, উনি দেশ ছেড়েছেন। একসময় জানতে পারলাম, উনি অলরেডি দেশের বাইরে চলে গেছেন। সব মিলিয়ে ৩০ থেকে ৪০ মিনিটের মধ্যে সামগ্রিক ঘটনাপ্রবাহের খুব দ্রুত পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছিলাম।
সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক সাহাবুদ্দিনের কাছে জানতে চাওয়া হয়, সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে তখন কোনো যোগাযোগ হচ্ছিল?
জবাবে তিনি বলেন, “সেদিন বিকাল ৩টার দিকে প্রথমে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান আমাকে টেলিফোনে সব ঘটনা অবহিত করেন। সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ থেকেও আমাকে জানানো হয়। পরে জানানো হলো, ওয়াকার সাহেব সাংবাদিকদের সামনে সম্পূর্ণ পরিস্থিতি নিয়ে একটা ব্রিফিং দেবেন।
‘‘উনি ব্রিফিং দিলেন, আমরা টেলিভিশনে দেখলাম। উনি বললেন, প্রধানমন্ত্রী দেশত্যাগ করেছেন। তো দেশবাসী আশ্বস্ত হলো যে উনি অলরেডি দেশান্তরী হয়েছেন। তারপর আমাকে সেনাপ্রধান ফোন করে জানালেন যে তারা আসছেন। সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী প্রধান– তিনজনই বঙ্গভবনে এলেন। এসে আমার সঙ্গে উদ্ভূত সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনায় বসলেন।
“তখন আমাদের প্রায় কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থা। কী করা যায়, কীভাবে কী হবে– এসব নিয়ে আমরা আলোচনা করলাম প্রায় ২ থেকে ৩ ঘণ্টা। সিদ্ধান্ত হলো, সব রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দকে ডাকা হবে। এই কাজে সেনাবাহিনীর টিম নিযুক্ত ছিল। তারপর উনারা চলে গেলেন।
“সেনা সদরে দেশের রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দকে একত্র করা হলো। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের মধ্যেও কেউ কেউ ছিল। তখন যাদের পাওয়া গেছে, তাদেরকে নিয়েই আবার তারা বঙ্গভবনে আসেন। আমরা আবার বৈঠকে বসি।
রাষ্ট্রপতি বলতে থাকেন, “বঙ্গভবনের এই বৈঠকে আমরা দেশের শান্তি ও স্থিতিশীলতার বিষয়টি সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছি। কীভাবে, কোন ধরনের সিদ্ধান্ত নিলে দেশের মানুষকে স্বস্তি ফিরিয়ে দেওয়া যায়, সে বিষয়ে দীর্ঘ আলোচনার আয়োজন হয়।
“আমার সভাপতিত্বে সভা হলো। সেনাপ্রধান সঞ্চালনা করলেন। সেখানে তিনি পুরো পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দিলেন। সেই বৈঠকে সম্মিলিতভাবে কয়েকটি প্রস্তাব আসে। বিশেষ করে, মূল তিনটি প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। এগুলো হলো– তত্ত্বাবধায়ক সরকার, সর্বদলীয় বা জাতীয় সরকার এবং অন্তর্বর্তী সরকার।
“যে নামেই ডাকা হোক না কেন, লক্ষ্য-উদ্দেশ্য থাকবে অভিন্ন। তত্ত্বাবধায়ক সরকার বললে হয়ত ওয়ান-ইলেভেনের মতো শোনায়। আবার সর্বদলীয় বা জাতীয় সরকার বললে দীর্ঘমেয়াদি সরকারও হয়ে যেতে পারে। তো, নানা বিবেচনায় আমাদের বিজ্ঞ রাজনীতিবিদরা সিদ্ধান্ত নেন যে অন্তর্বর্তী সরকারই গঠন করা উচিত।
“এই সিদ্ধান্ত হলো আর আমার ওপর দায়িত্ব পড়লো জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়ে জাতিকে আশ্বস্ত করার। আর তারা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে সব ঠিক করবেন সরকারের গঠন প্রণালীটা। এই সিদ্ধান্ত হওয়ার পর প্রফেসর আসিফ নজরুল সাংবাদিকদের কাছে পরিস্থিতির অগ্রগতি তুলে ধরেন।
“আমাকে ভাষণ দিতে হলো রাত ১১টার সময়। আর অন্তর্বর্তী সরকার গঠন প্রক্রিয়া তাদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হলো। সেনাবাহিনী এবং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ আলাপ করে এটা করবেন। সেনাবাহিনী থাকবে, সহায়তা করবে সব কিছুতে।”
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের তিন দিন পর ৮ আগস্ট নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। সেই সরকারের দেড় বছরের শাসনের পর গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন হয়, যাতে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় বিএনপি। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি দলটি সরকার গঠনের মধ্য দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের অবসান ঘটেছে।
রাষ্ট্রপতির কাছে জানতে চাওয়া হয়, অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের বিষয়টি সংবিধানে ছিল না। ফলে ওই সময় একটি সাংবিধানিক সংকটের মুখে পড়েছিল দেশ। সে পরিস্থিতি তিনি কীভাবে সামাল দিয়েছিলেন?
জবাবে সাহাবুদ্দিন বলেন, “যখন অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হলো, তখন কথা উঠল– এটা তো আমাদের সংবিধানে নেই। আমাদের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭ এবং ৭-ক অনুযায়ী, সংবিধানের কাঠামোতে কোনো পরিবর্তন, পরিবর্ধন, পরিমার্জন করাটা শাস্তিমূলক অপরাধ এবং এই অপরাধের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। এটা হবে বিদ্রোহ বা রাষ্ট্রদ্রোহের শামিল। এটা তো আমি জানি।
“কিন্তু আমরা যে কাজটা করতে যাচ্ছি, সরকার গঠন করতে যাচ্ছি, এটা তো সংবিধানে নেই। দেশের এই সংকটময় অবস্থায় আমি নিজে ৮ তারিখে, ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট তৎকালীন প্রধান বিচারপতির সঙ্গে কথা বলি। তার সঙ্গে পরামর্শ করি– এই অবস্থায় কী করা যায়।
“আমরা আলোচনা করলাম– এই সংবিধানের আলোকেই কীভাবে সরকার গঠন করা যায়। সংবিধানের আর্টিকেল ১০৬-এর বিধানমতে আপিল বিভাগের কাছে আমি তাদের মতামত চাইলাম। বললাম, এ অবস্থায় আপনারা আমাকে পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করেন।
“এটা আমাদের আইনে আছে। একটা আইনের সাপোর্ট থাকলে আমি তো ৭ ও ৭-ক অনুচ্ছেদ সংক্রান্ত জটিলতা থেকে বাঁচি। তখন উনারা আপিল বিভাগের আদালত বসালেন।”
রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে প্রশ্ন ছিল, বিচারপতিরা কি এসেছিলেন?
জবাবে তিনি বলেন, “না, ফোনে কথা হয়েছে। সেই সময় সুপ্রিম কোর্ট ঘেরাও আন্দোলন চলছিল। আমার তৎকালীন আইনসচিব আমার চিঠি কোর্টে নিয়ে যায়। উনারা তখন দুজন ছিলেন এজলাসে, আর বাকি কয়েকজন ছিলেন বাড়িতে। তাদের উনারা ভার্চুয়ালি সংযুক্ত করেন।
“এর আগে ৬ আগস্ট আমি রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাবলে যথোপযুক্ত মনে করে অ্যাডভোকেট আসাদুজ্জামানকে অ্যাটর্নি জেনারেল নিয়োগ দিই। যেহেতু তখন দেশে সরকার নাই, আইনে বলা আছে, রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দান করবেন। সে কারণে আমি কারো মুখাপেক্ষী হইনি।
“তো, ৮ আগস্টের ওই শুনানিতে আমার পক্ষ থেকে, মানে রাষ্ট্রপতির পক্ষ থেকে শুনানিতে অংশগ্রহণ করেন অ্যাটর্নি জেনারেল। পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে সেদিন শুনানি হয়। তারপর তারা আমাকে মতামত দিয়ে দেন যে, এই ধরনের পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করে দিতে পারেন। এক বা একাধিক উপদেষ্টা নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা যেতে পারে। আর সেটি রাষ্ট্রপতি গঠন করে দেবেন মর্মে সিদ্ধান্ত দিলেন তারা।
“তাদের ওই মতামত আমার জন্য রক্ষাকবচ হয়ে উঠল। আমার সামনে আর কোনো বাধা থাকল না। এই মতামতের ওপর ভিত্তি করেই আমি রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে পরামর্শ করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করি। সেখানে আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর সম্পূর্ণ রকম সমর্থন ছিল।”
রাষ্ট্রপতির কাছে জানতে চাওয়া হয়, প্রধান উপদেষ্টা কাকে করা হবে, সেই আলোচনায় কার কার নাম ছিল?
জবাবে রাষ্ট্রপতি বলেন, “ছাত্রদের পক্ষ থেকে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকেই প্রধান উপদেষ্টা করার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ছিল। তখন তিনি ছিলেন ফ্রান্সে। এতে সরকার গঠনে দেরি হচ্ছিল। আমাদের তৎকালীন ছাত্রনেতারা উনার সঙ্গে যোগাযোগ, ফ্রিকোয়েন্টলি যোগাযোগ করতে পারছিল না। তার কারণ উনি ওখানে হাসপাতালে একটা অপারেশন করাচ্ছিলেন। উনাকে তাই সব সময় মোবাইল ফোনে পাওয়া যাচ্ছিল না। এটা ছাত্রনেতারা আমাকে জানিয়েছিল।
“তারপর কথা উঠল যে, যেহেতু উনার আসতে দেরি হচ্ছে, তাহলে অন্য কাউকে সরকারপ্রধান করা যায় কি না। এ ধরনের কথা উঠলে ছাত্রনেতারা আপত্তি তোলে। তারা জানিয়ে দেয় যে, ড. ইউনূসকেই প্রধান উপদেষ্টা করতে হবে।
“তখন আমরা ঠিক করলাম, ছাত্রনেতাদের কথাই আমরা সম্মান করব। ওরা যাকে চায়, তাকেই আমরা প্রধান উপদেষ্টা করব। রাজনৈতিক নেতারাও ছাত্রনেতাদের সমর্থন করছিলেন।”
সরকার গঠনে দেরি হওয়ার কারণে প্রধান উপদেষ্টা পদে বিকল্প কোনো নাম কি আলোচনায় এসেছিল? এমন প্রশ্নের জবাবে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন বলেন, “সে রকম অনেক কথাই হচ্ছিল। যেহেতু ড. ইউনূসের সঙ্গে যোগাযোগটা খুব স্বাভাবিকভাবে করা সম্ভব হচ্ছিল না, তাই প্রধান উপদেষ্টা পদে কয়েকজনের নাম আসছিল। এর মধ্যে একজন ছিলেন সালেহউদ্দিন আহমেদ; পরবর্তী সময়ে তাকে অর্থ উপদেষ্টা করা হয়েছিল। তবে ছাত্রনেতারা ড. ইউনূসের ব্যাপারে অটল থাকে এবং তারা ধৈর্য ধরার পক্ষে ছিল।
“পরে ড. ইউনূসের দেশে ফেরা নিশ্চিত হলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। তিনি ঢাকায় অবতরণ করার পর বিমানবন্দরের লাউঞ্জে বসেই সশস্ত্র বাহিনী প্রধানরা তার সঙ্গে জরুরি বৈঠকে বসেন। সেখানেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টাদের নামের তালিকা চূড়ান্ত হয়ে যায়। আমরা আগে থেকে একটি খসড়া তালিকা করে রেখেছিলাম; সেখান থেকে ড. ইউনূস কিছু বাদ দিয়ে নিজের পছন্দের কয়েকটি নাম যুক্ত করেন। তারপর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে শপথ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।”
রাষ্ট্রপতির কাছে জানতে চাওয়া হয়– আপনাদের তালিকা থেকে বাদ পড়েছিলেন কারা?
জবাবে রাষ্ট্রপ্রধান বলেন, “এটা বিচিত্র। বাদ দেওয়া হয়েছে, আবার উনি নিজে কিছু নাম লিখে দিয়েছেন আর কি! ওই যে উনারা, এনজিও থেকে যারা যারা এসেছিলেন; উনি (মুহাম্মদ ইউনূস) তাদের নাম লিখে দিয়েছেন। মুক্তিযোদ্ধাবিষয়ক, স্বাস্থ্যবিষয়ক, ধর্মবিষয়ক– এগুলো উনি পরিবর্তন করে করে দিয়েছেন।”
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নাজুক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও মব সন্ত্রাস বহুল আলোচিত বিষয় ছিল।
রাষ্ট্রপতিকে কাছে প্রশ্ন করা হয়, সারা দেশে একসময় মব সন্ত্রাসে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা হয়েছে। ওই পরিস্থিতিকে তিনি কীভাবে দেখেছিলেন?
জবাবে সাহাবুদ্দিন বলেন, “এটা তো অবশ্যই কষ্টের জায়গা। ওই সময়টা এত অশান্ত ছিল যে, সেগুলো সে সময় দমন করার চেষ্টা করলে হিতে বিপরীত হতে পারত। শান্ত পরিবেশ বজায় রাখার জন্য অনেক কিছু সহ্য করতে হয়েছে।”
প্রশ্ন: বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে যে মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অন্তর্বর্তী সরকারের উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ ছিল না। এ ক্ষেত্রে সরকারের কোনো ইন্ধন দেখতে পান কি না?
রাষ্ট্রপতি: ইন্ধন ছিল কি না জানি না। তবে তারা নীরব ছিল দেখেছি।
প্রশ্ন: এ বিষয়ে কারো সঙ্গে কথা বলেছিলেন?
রাষ্ট্রপতি: আমি দেখলাম যে কিছু করে লাভ হবে না। মানে, আমি যেটা চাচ্ছি যে এটা যেন না হয়; কিন্তু সেটা আমি করতে পারতাম না। অসহায় ছিলাম। আমি কিছু বলতে চাইনি, কেননা বলতে গিয়ে যদি বুমেরাং হয়ে যায়!
এক প্রশ্নের জবাবে সাহাবুদ্দিন বলেন, “গত দেড় বছরে প্রধান উপদেষ্টা ১৪ বার বিদেশে গেছেন, অথচ আমি চিকিৎসার জন্য যেতে পারিনি। মূলত আমি যেন মনস্তাত্ত্বিকভাবে ভেঙে পড়ি, এটাই ছিল তাদের মূল উদ্দেশ্য। আমি ভেঙে পড়ে যাতে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করি; এতে তারা অসাংবিধানিকভাবে পছন্দের কাউকে বসাতে পারবে।
“আর এটা করতে পারলেই নির্বাচন বিলম্ব করানো বা নিজেদের ক্ষমতা বেশিদিন ধরে রাখা যেত। নিজেদের মনমতো রাষ্ট্রপতি হলে যা ইচ্ছা তা-ই করা যায়– এই ভাবনা থেকেই আমার ওপর মানসিক পীড়ন চালিয়েছেন তারা।”
এক প্রশ্নের জবাবে রাষ্ট্রপতি বলেন, “নির্বাচন ভালো হয়েছে। মানুষের আকাঙ্ক্ষা ছিল একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হোক। জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল। মানুষ যেন এক ধরনের মুক্তি চাইছিল।”
প্রশ্ন: তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার আসার পর আপনার অনুভূতি কী?
রাষ্ট্রপতি: (হেসে) এখন আমি সম্পূর্ণ চাপমুক্ত ও ভারমুক্ত। দেড় বছর শ্বাসরুদ্ধকর সময় পার করেছি। আমি এখন সম্পূর্ণ রিল্যাক্স। দেড় বছর ধরে আমার মাথায় একটাই চিন্তা ছিল, কীভাবে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করব, কীভাবে বঙ্গভবনকে নিরাপদ রাখব। সেই চাপ এখন পুরোপুরি চলে গেছে।
সম্প্রতি বিভিন্ন মহলে, গণমাধ্যমে আলোচনা হচ্ছে– রাষ্ট্রপতি পরিবর্তন হতে পারে; নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে কারো কারো নামও আসছে। এমনকি বিদেশি এক গণমাধ্যমে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন বলেছিলেন, নির্বাচনের পর আর এখানে থাকতে চান না। বিষয়টি স্পষ্ট করতে অনুরোধ করা হয় তাকে।
জবাবে সাহাবুদ্দিন বলেন, “এই বক্তব্যটি অন্যভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। আমি যেভাবে বলেছি, সেটি সেই প্রেক্ষাপটেই বোঝা দরকার। গত ১৮ মাসে ওই সরকার আমাকে যে রকম মানসিকভাবে চাপ দিয়েছে, নানা ঘটনায় আমাকে অপমানিত করা হয়েছে, সে কারণে আমার মনে এক ধরনের ক্ষোভ জন্মেছিল। তখনই আমি বলেছিলাম, এভাবে রাষ্ট্রপতি থাকা যায় না, চলে যেতে ইচ্ছা করে। এই কথাটাই আমি রয়টার্সকে বলেছিলাম।
“কিন্তু পরে এটাকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হলো, যেন আমার মেয়াদ নেই। প্রশ্ন করা হলো, নতুন নির্বাচন হলে, নতুন সরকার এলে আপনার অবস্থান কী হবে? তখন আমি বলেছি, আমি সাংবিধানিকভাবে পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত; আমার মেয়াদ ২০২৮ সাল পর্যন্ত। মানে আমার মেয়াদ আরো দুই বছর আছে।
“তবে আমি এটাও বলেছি, যদি একটি নির্বাচিত সরকার আসে এবং তাদের অভিপ্রায় থাকে যে আমি না থাকাই ভালো, তাহলে আমি স্বেচ্ছায় সরে যেতে প্রস্তুত। আই লাভ টু গো। মানে, তারা সে রকম ইচ্ছা পোষণ করলে আমি নিজে থেকেই চলে যেতে চাইব।”
রাষ্ট্রপতির কাছে প্রশ্ন ছিলো, এখনো কি সেই অবস্থানটাই আছে? বিএনপি যদি মনে করে, তারা নিজেদের মতো রাষ্ট্রপতি চায়, সে ক্ষেত্রে কী করবেন? কিংবা সংসদের মাধ্যমে অভিশংসন হলে?
জবাবে রাষ্ট্রপতি বলেন, “ওগুলো কেন হতে দেব? আমি একজন সচেতন মানুষ। যদি তারা মনে করে আমি থাকি, তাহলে আমি থাকব। আর যদি বলে যে– সরে যাওয়া ভালো; তাহলে আমি নিজেই সম্মানজনকভাবে সরে যাব।”
রাষ্ট্রপতি পদ থেকে অবসরের পর কোন কাজে মনোনিবেশ করতে চান– এমন প্রশ্নে সাহাবুদ্দিন বলেন, আমি তো আইন অঙ্গনের মানুষ। জীবনের দীর্ঘ ৪০টি বছর কাটিয়ে দিয়েছি কোর্ট-কাচারিতে। অবসরের পর একজন আইনি পরামর্শক হিসেবে বাকি জীবন কাটিয়ে দেব; যদি শরীর-স্বাস্থ্য ভালো থাকে।

ছাত্রদের দাবি ছিল ড. ইউনূসকেই প্রধান উপদেষ্টা করতে হবে: রাষ্ট্রপতি

চব্বিশের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগের দেড় দশকের শাসনের অবসান ঘটে। দেশ ছাড়তে বাধ্য হন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনদিন পর ৮ আগস্ট নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত হয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বলেছেন, ৫ আগস্টের পর ছাত্রদের পক্ষ থেকে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকেই প্রধান উপদেষ্টা করার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ছিল।
গত শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারি) রাতে দৈনিক কালের কণ্ঠকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেন রাষ্ট্রপ্রধান। মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) পত্রিকাটি সেই সাক্ষাৎকারের দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব প্রকাশ করেছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল পাঁচ বছরের জন্য রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন ৭৫ বছর বয়সী সাহাবুদ্দিন। একসময় তিনি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কমিশনার ছিলেন ।
রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে মো. সাহাবুদ্দিন বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক। এর বাইরে পদটি মূলত আনুষ্ঠানিক। দেশের কার্যনির্বাহী ক্ষমতা থাকে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার হাতে। দায়িত্ব নেওয়ার ১৬ মাসের মাথায় অভাবনীয় এক পরিস্থিতির মধ্যে পড়েন তিনি।
রাষ্ট্রপতির কাছে প্রশ্ন ছিল, জরুরি অবস্থা জারি করে দেশে সামরিক শাসন শুরু হতে যাচ্ছে বলে ওই সময় গুঞ্জন ছিল। এই ধরনের কোনো আলাপ কি উঠেছিল, প্রকাশ্যে বা গোপনে?
জবাবে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন বলেন, “এমন কোনো আলাপ ওঠেনি; বরং আমি এখানে দৃঢ়ভাবে বলতে পারি যে আমাদের সেনাবাহিনী এখানে যে ভূমিকা রেখেছিল, তা অবশ্যই স্মরণীয়। স্মরণীয় এই কারণে যে সঠিক সময়ে সঠিক ভূমিকা রেখেছে তারা।
“তারা ইচ্ছা করলে মার্শাল ল দিতে পারত। চাইলে ইমার্জেন্সি, মানে জরুরি অবস্থা দিতে পারত, যেটা দেওয়ার জন্য চাপ ছিল আমার ওপর। কারণ রাষ্ট্রপতিই শুধু দিতে পারে ইমার্জেন্সি। তাই আমাকে বিভিন্ন পর্যায় থেকে, বিভিন্নভাবে জরুরি অবস্থা জারি করতে প্রভাবিত করার চেষ্টা হয়েছিল। এখানে একটা কথা না বললেই নয় যে ওই সময় একটা প্রতিবিপ্লব ঘটানোর উদ্যোগও ছিল।
কোন পর্যায় থেকে প্রতিবিপ্লবের উদ্যোগ হচ্ছিল? আর কারা জরুরি অবস্থা জারির জন্য প্রভাবিত করতে চেয়েছে? এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “এটা আপনারা বোঝেন। সাধারণত এ ধরনের পরিস্থিতিতে অনেক সুযোগসন্ধানী পক্ষ থাকে। দেশি ও বিদেশি বিভিন্ন এজেন্সি তৎপর থাকে। তাদের তরফ থেকেই নানা প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা হয়েছে। বিশেষ করে একটি জটিলতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে অসাংবিধানিক কিছু করে দেওয়ার চেষ্টা চালিয়েছে।
“আমার কানে বারবার বলা হচ্ছিল, আমি যেন ইমার্জেন্সি দিই। তবে সেনাবাহিনী প্রধান, নৌবাহিনী প্রধান ও বিমানবাহিনী প্রধান এটার সম্পূর্ণ বিরোধী ছিলেন। সামরিক আইন জারি করার ব্যাপারে বিরোধী, জাতীয় সরকার গঠন করার ব্যাপারে বিরোধী এবং ইমার্জেন্সি দেওয়ার ব্যাপারেও তারা বিরোধী ছিলেন। তারা বলছিলেন, এভাবেই কন্টিনিউ করে নিয়ে নির্বাচন পর্যন্ত যাওয়া যায় কি না। এ কারণে আমি সেসব শক্ত হাতে দমন করতে পেরেছি।
“সশস্ত্র বাহিনীর উদ্দেশ্যই ছিল একটা নির্বাচন আয়োজনের ব্যবস্থা করা। যে জন্য সেনাপ্রধান বলেছিলেন যে ১৮ মাসের মধ্যে আমরা নির্বাচন দেখতে চাই। আমি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলতে পারি, সেনাপ্রধানের মধ্যে ক্ষমতার মোহ ছিল না; এটা একদম শতভাগ সত্য। তিনি বারবার বলেছেন, ‘আমাদের সেনাবাহিনীর অতীত ইতিহাস ঘাঁটলে অনেক ভালো এবং অনেক মন্দ পাওয়া যায়। ওয়ান-ইলেভেনের সময়ও অনেকে সেটাকে গ্রহণ করেনি।
“সেনাবাহিনী ওয়ান-ইলেভেনের সময় ইমার্জেন্সি দিয়ে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় ছিল। এই কারণে জনগণের মধ্যে একটা বিতৃষ্ণা আসতে পারে। সে জন্য উনারা কোনোমতেই এই পথে পা বাড়াননি। তবে আমি ছিলাম সেই সময় টার্গেট– ইমার্জেন্সি দেওয়ার জন্য। চরমভাবে প্রভাব বিস্তার করা হয়েছে আমার ওপর। তবে আল্লাহর রহমত এবং আমার দৃঢ় মনোবলের কারণে ওই পরিস্থিতি থেকে দেশ রক্ষা পেয়েছে।”
সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে ৩৬ দিন আগে শিক্ষার্থীদের যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল তা সরকার পতনের আন্দোলনে রূপান্তরিত হওয়ার পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা ছাড়তে হয়।
রাষ্ট্রপতির কাছে প্রশ্ন ছিল, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দিন বঙ্গভবনের পরিবেশ কেমন ছিল?
জবাবে রাষ্ট্রপতি বলেন, “স্বাভাবিকভাবে ওই আন্দোলনটা জনবিস্ফোরণে রূপ নেয়। যখন বিক্ষোভকারীরা গণভবন অভিমুখে, তখন আমাকে জানানো হল, যে কোনো মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গভবনে আসবেন। ১২টার সময় আমাকে জানানো হল, উনি প্রস্তুতি নিচ্ছেন বঙ্গভবনে আসার। এর আগে আমরা আঁচই করতে পারিনি যে আসলে ঘটনা কী ঘটতে যাচ্ছে। তবে উনি যখন এখানে আসবেন বলছেন এবং হেলিকপ্টারও রেডি, তখন আমরা ঘটনার ভয়াবহতা সম্পর্কে ধারণা করতে পারি। এখানে সিকিউরিটি যারা ছিল, সবাই পজিশন নিয়ে নিল।
“দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে জানানো হল, না, উনি আসছেন না। আসছেন না যখন জেনেছি, তখন আমরাও সতর্ক ছিলাম। কিছুক্ষণ পরেই শুনলাম, উনি দেশ ছেড়েছেন। একসময় জানতে পারলাম, উনি অলরেডি দেশের বাইরে চলে গেছেন। সব মিলিয়ে ৩০ থেকে ৪০ মিনিটের মধ্যে সামগ্রিক ঘটনাপ্রবাহের খুব দ্রুত পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছিলাম।
সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক সাহাবুদ্দিনের কাছে জানতে চাওয়া হয়, সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে তখন কোনো যোগাযোগ হচ্ছিল?
জবাবে তিনি বলেন, “সেদিন বিকাল ৩টার দিকে প্রথমে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান আমাকে টেলিফোনে সব ঘটনা অবহিত করেন। সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ থেকেও আমাকে জানানো হয়। পরে জানানো হলো, ওয়াকার সাহেব সাংবাদিকদের সামনে সম্পূর্ণ পরিস্থিতি নিয়ে একটা ব্রিফিং দেবেন।
‘‘উনি ব্রিফিং দিলেন, আমরা টেলিভিশনে দেখলাম। উনি বললেন, প্রধানমন্ত্রী দেশত্যাগ করেছেন। তো দেশবাসী আশ্বস্ত হলো যে উনি অলরেডি দেশান্তরী হয়েছেন। তারপর আমাকে সেনাপ্রধান ফোন করে জানালেন যে তারা আসছেন। সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী প্রধান– তিনজনই বঙ্গভবনে এলেন। এসে আমার সঙ্গে উদ্ভূত সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনায় বসলেন।
“তখন আমাদের প্রায় কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থা। কী করা যায়, কীভাবে কী হবে– এসব নিয়ে আমরা আলোচনা করলাম প্রায় ২ থেকে ৩ ঘণ্টা। সিদ্ধান্ত হলো, সব রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দকে ডাকা হবে। এই কাজে সেনাবাহিনীর টিম নিযুক্ত ছিল। তারপর উনারা চলে গেলেন।
“সেনা সদরে দেশের রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দকে একত্র করা হলো। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের মধ্যেও কেউ কেউ ছিল। তখন যাদের পাওয়া গেছে, তাদেরকে নিয়েই আবার তারা বঙ্গভবনে আসেন। আমরা আবার বৈঠকে বসি।
রাষ্ট্রপতি বলতে থাকেন, “বঙ্গভবনের এই বৈঠকে আমরা দেশের শান্তি ও স্থিতিশীলতার বিষয়টি সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছি। কীভাবে, কোন ধরনের সিদ্ধান্ত নিলে দেশের মানুষকে স্বস্তি ফিরিয়ে দেওয়া যায়, সে বিষয়ে দীর্ঘ আলোচনার আয়োজন হয়।
“আমার সভাপতিত্বে সভা হলো। সেনাপ্রধান সঞ্চালনা করলেন। সেখানে তিনি পুরো পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দিলেন। সেই বৈঠকে সম্মিলিতভাবে কয়েকটি প্রস্তাব আসে। বিশেষ করে, মূল তিনটি প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। এগুলো হলো– তত্ত্বাবধায়ক সরকার, সর্বদলীয় বা জাতীয় সরকার এবং অন্তর্বর্তী সরকার।
“যে নামেই ডাকা হোক না কেন, লক্ষ্য-উদ্দেশ্য থাকবে অভিন্ন। তত্ত্বাবধায়ক সরকার বললে হয়ত ওয়ান-ইলেভেনের মতো শোনায়। আবার সর্বদলীয় বা জাতীয় সরকার বললে দীর্ঘমেয়াদি সরকারও হয়ে যেতে পারে। তো, নানা বিবেচনায় আমাদের বিজ্ঞ রাজনীতিবিদরা সিদ্ধান্ত নেন যে অন্তর্বর্তী সরকারই গঠন করা উচিত।
“এই সিদ্ধান্ত হলো আর আমার ওপর দায়িত্ব পড়লো জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়ে জাতিকে আশ্বস্ত করার। আর তারা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে সব ঠিক করবেন সরকারের গঠন প্রণালীটা। এই সিদ্ধান্ত হওয়ার পর প্রফেসর আসিফ নজরুল সাংবাদিকদের কাছে পরিস্থিতির অগ্রগতি তুলে ধরেন।
“আমাকে ভাষণ দিতে হলো রাত ১১টার সময়। আর অন্তর্বর্তী সরকার গঠন প্রক্রিয়া তাদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হলো। সেনাবাহিনী এবং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ আলাপ করে এটা করবেন। সেনাবাহিনী থাকবে, সহায়তা করবে সব কিছুতে।”
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের তিন দিন পর ৮ আগস্ট নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। সেই সরকারের দেড় বছরের শাসনের পর গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন হয়, যাতে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় বিএনপি। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি দলটি সরকার গঠনের মধ্য দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের অবসান ঘটেছে।
রাষ্ট্রপতির কাছে জানতে চাওয়া হয়, অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের বিষয়টি সংবিধানে ছিল না। ফলে ওই সময় একটি সাংবিধানিক সংকটের মুখে পড়েছিল দেশ। সে পরিস্থিতি তিনি কীভাবে সামাল দিয়েছিলেন?
জবাবে সাহাবুদ্দিন বলেন, “যখন অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হলো, তখন কথা উঠল– এটা তো আমাদের সংবিধানে নেই। আমাদের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭ এবং ৭-ক অনুযায়ী, সংবিধানের কাঠামোতে কোনো পরিবর্তন, পরিবর্ধন, পরিমার্জন করাটা শাস্তিমূলক অপরাধ এবং এই অপরাধের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। এটা হবে বিদ্রোহ বা রাষ্ট্রদ্রোহের শামিল। এটা তো আমি জানি।
“কিন্তু আমরা যে কাজটা করতে যাচ্ছি, সরকার গঠন করতে যাচ্ছি, এটা তো সংবিধানে নেই। দেশের এই সংকটময় অবস্থায় আমি নিজে ৮ তারিখে, ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট তৎকালীন প্রধান বিচারপতির সঙ্গে কথা বলি। তার সঙ্গে পরামর্শ করি– এই অবস্থায় কী করা যায়।
“আমরা আলোচনা করলাম– এই সংবিধানের আলোকেই কীভাবে সরকার গঠন করা যায়। সংবিধানের আর্টিকেল ১০৬-এর বিধানমতে আপিল বিভাগের কাছে আমি তাদের মতামত চাইলাম। বললাম, এ অবস্থায় আপনারা আমাকে পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করেন।
“এটা আমাদের আইনে আছে। একটা আইনের সাপোর্ট থাকলে আমি তো ৭ ও ৭-ক অনুচ্ছেদ সংক্রান্ত জটিলতা থেকে বাঁচি। তখন উনারা আপিল বিভাগের আদালত বসালেন।”
রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে প্রশ্ন ছিল, বিচারপতিরা কি এসেছিলেন?
জবাবে তিনি বলেন, “না, ফোনে কথা হয়েছে। সেই সময় সুপ্রিম কোর্ট ঘেরাও আন্দোলন চলছিল। আমার তৎকালীন আইনসচিব আমার চিঠি কোর্টে নিয়ে যায়। উনারা তখন দুজন ছিলেন এজলাসে, আর বাকি কয়েকজন ছিলেন বাড়িতে। তাদের উনারা ভার্চুয়ালি সংযুক্ত করেন।
“এর আগে ৬ আগস্ট আমি রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাবলে যথোপযুক্ত মনে করে অ্যাডভোকেট আসাদুজ্জামানকে অ্যাটর্নি জেনারেল নিয়োগ দিই। যেহেতু তখন দেশে সরকার নাই, আইনে বলা আছে, রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দান করবেন। সে কারণে আমি কারো মুখাপেক্ষী হইনি।
“তো, ৮ আগস্টের ওই শুনানিতে আমার পক্ষ থেকে, মানে রাষ্ট্রপতির পক্ষ থেকে শুনানিতে অংশগ্রহণ করেন অ্যাটর্নি জেনারেল। পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে সেদিন শুনানি হয়। তারপর তারা আমাকে মতামত দিয়ে দেন যে, এই ধরনের পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করে দিতে পারেন। এক বা একাধিক উপদেষ্টা নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা যেতে পারে। আর সেটি রাষ্ট্রপতি গঠন করে দেবেন মর্মে সিদ্ধান্ত দিলেন তারা।
“তাদের ওই মতামত আমার জন্য রক্ষাকবচ হয়ে উঠল। আমার সামনে আর কোনো বাধা থাকল না। এই মতামতের ওপর ভিত্তি করেই আমি রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে পরামর্শ করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করি। সেখানে আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর সম্পূর্ণ রকম সমর্থন ছিল।”
রাষ্ট্রপতির কাছে জানতে চাওয়া হয়, প্রধান উপদেষ্টা কাকে করা হবে, সেই আলোচনায় কার কার নাম ছিল?
জবাবে রাষ্ট্রপতি বলেন, “ছাত্রদের পক্ষ থেকে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকেই প্রধান উপদেষ্টা করার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ছিল। তখন তিনি ছিলেন ফ্রান্সে। এতে সরকার গঠনে দেরি হচ্ছিল। আমাদের তৎকালীন ছাত্রনেতারা উনার সঙ্গে যোগাযোগ, ফ্রিকোয়েন্টলি যোগাযোগ করতে পারছিল না। তার কারণ উনি ওখানে হাসপাতালে একটা অপারেশন করাচ্ছিলেন। উনাকে তাই সব সময় মোবাইল ফোনে পাওয়া যাচ্ছিল না। এটা ছাত্রনেতারা আমাকে জানিয়েছিল।
“তারপর কথা উঠল যে, যেহেতু উনার আসতে দেরি হচ্ছে, তাহলে অন্য কাউকে সরকারপ্রধান করা যায় কি না। এ ধরনের কথা উঠলে ছাত্রনেতারা আপত্তি তোলে। তারা জানিয়ে দেয় যে, ড. ইউনূসকেই প্রধান উপদেষ্টা করতে হবে।
“তখন আমরা ঠিক করলাম, ছাত্রনেতাদের কথাই আমরা সম্মান করব। ওরা যাকে চায়, তাকেই আমরা প্রধান উপদেষ্টা করব। রাজনৈতিক নেতারাও ছাত্রনেতাদের সমর্থন করছিলেন।”
সরকার গঠনে দেরি হওয়ার কারণে প্রধান উপদেষ্টা পদে বিকল্প কোনো নাম কি আলোচনায় এসেছিল? এমন প্রশ্নের জবাবে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন বলেন, “সে রকম অনেক কথাই হচ্ছিল। যেহেতু ড. ইউনূসের সঙ্গে যোগাযোগটা খুব স্বাভাবিকভাবে করা সম্ভব হচ্ছিল না, তাই প্রধান উপদেষ্টা পদে কয়েকজনের নাম আসছিল। এর মধ্যে একজন ছিলেন সালেহউদ্দিন আহমেদ; পরবর্তী সময়ে তাকে অর্থ উপদেষ্টা করা হয়েছিল। তবে ছাত্রনেতারা ড. ইউনূসের ব্যাপারে অটল থাকে এবং তারা ধৈর্য ধরার পক্ষে ছিল।
“পরে ড. ইউনূসের দেশে ফেরা নিশ্চিত হলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। তিনি ঢাকায় অবতরণ করার পর বিমানবন্দরের লাউঞ্জে বসেই সশস্ত্র বাহিনী প্রধানরা তার সঙ্গে জরুরি বৈঠকে বসেন। সেখানেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টাদের নামের তালিকা চূড়ান্ত হয়ে যায়। আমরা আগে থেকে একটি খসড়া তালিকা করে রেখেছিলাম; সেখান থেকে ড. ইউনূস কিছু বাদ দিয়ে নিজের পছন্দের কয়েকটি নাম যুক্ত করেন। তারপর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে শপথ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।”
রাষ্ট্রপতির কাছে জানতে চাওয়া হয়– আপনাদের তালিকা থেকে বাদ পড়েছিলেন কারা?
জবাবে রাষ্ট্রপ্রধান বলেন, “এটা বিচিত্র। বাদ দেওয়া হয়েছে, আবার উনি নিজে কিছু নাম লিখে দিয়েছেন আর কি! ওই যে উনারা, এনজিও থেকে যারা যারা এসেছিলেন; উনি (মুহাম্মদ ইউনূস) তাদের নাম লিখে দিয়েছেন। মুক্তিযোদ্ধাবিষয়ক, স্বাস্থ্যবিষয়ক, ধর্মবিষয়ক– এগুলো উনি পরিবর্তন করে করে দিয়েছেন।”
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নাজুক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও মব সন্ত্রাস বহুল আলোচিত বিষয় ছিল।
রাষ্ট্রপতিকে কাছে প্রশ্ন করা হয়, সারা দেশে একসময় মব সন্ত্রাসে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা হয়েছে। ওই পরিস্থিতিকে তিনি কীভাবে দেখেছিলেন?
জবাবে সাহাবুদ্দিন বলেন, “এটা তো অবশ্যই কষ্টের জায়গা। ওই সময়টা এত অশান্ত ছিল যে, সেগুলো সে সময় দমন করার চেষ্টা করলে হিতে বিপরীত হতে পারত। শান্ত পরিবেশ বজায় রাখার জন্য অনেক কিছু সহ্য করতে হয়েছে।”
প্রশ্ন: বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে যে মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অন্তর্বর্তী সরকারের উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ ছিল না। এ ক্ষেত্রে সরকারের কোনো ইন্ধন দেখতে পান কি না?
রাষ্ট্রপতি: ইন্ধন ছিল কি না জানি না। তবে তারা নীরব ছিল দেখেছি।
প্রশ্ন: এ বিষয়ে কারো সঙ্গে কথা বলেছিলেন?
রাষ্ট্রপতি: আমি দেখলাম যে কিছু করে লাভ হবে না। মানে, আমি যেটা চাচ্ছি যে এটা যেন না হয়; কিন্তু সেটা আমি করতে পারতাম না। অসহায় ছিলাম। আমি কিছু বলতে চাইনি, কেননা বলতে গিয়ে যদি বুমেরাং হয়ে যায়!
এক প্রশ্নের জবাবে সাহাবুদ্দিন বলেন, “গত দেড় বছরে প্রধান উপদেষ্টা ১৪ বার বিদেশে গেছেন, অথচ আমি চিকিৎসার জন্য যেতে পারিনি। মূলত আমি যেন মনস্তাত্ত্বিকভাবে ভেঙে পড়ি, এটাই ছিল তাদের মূল উদ্দেশ্য। আমি ভেঙে পড়ে যাতে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করি; এতে তারা অসাংবিধানিকভাবে পছন্দের কাউকে বসাতে পারবে।
“আর এটা করতে পারলেই নির্বাচন বিলম্ব করানো বা নিজেদের ক্ষমতা বেশিদিন ধরে রাখা যেত। নিজেদের মনমতো রাষ্ট্রপতি হলে যা ইচ্ছা তা-ই করা যায়– এই ভাবনা থেকেই আমার ওপর মানসিক পীড়ন চালিয়েছেন তারা।”
এক প্রশ্নের জবাবে রাষ্ট্রপতি বলেন, “নির্বাচন ভালো হয়েছে। মানুষের আকাঙ্ক্ষা ছিল একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হোক। জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল। মানুষ যেন এক ধরনের মুক্তি চাইছিল।”
প্রশ্ন: তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার আসার পর আপনার অনুভূতি কী?
রাষ্ট্রপতি: (হেসে) এখন আমি সম্পূর্ণ চাপমুক্ত ও ভারমুক্ত। দেড় বছর শ্বাসরুদ্ধকর সময় পার করেছি। আমি এখন সম্পূর্ণ রিল্যাক্স। দেড় বছর ধরে আমার মাথায় একটাই চিন্তা ছিল, কীভাবে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করব, কীভাবে বঙ্গভবনকে নিরাপদ রাখব। সেই চাপ এখন পুরোপুরি চলে গেছে।
সম্প্রতি বিভিন্ন মহলে, গণমাধ্যমে আলোচনা হচ্ছে– রাষ্ট্রপতি পরিবর্তন হতে পারে; নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে কারো কারো নামও আসছে। এমনকি বিদেশি এক গণমাধ্যমে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন বলেছিলেন, নির্বাচনের পর আর এখানে থাকতে চান না। বিষয়টি স্পষ্ট করতে অনুরোধ করা হয় তাকে।
জবাবে সাহাবুদ্দিন বলেন, “এই বক্তব্যটি অন্যভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। আমি যেভাবে বলেছি, সেটি সেই প্রেক্ষাপটেই বোঝা দরকার। গত ১৮ মাসে ওই সরকার আমাকে যে রকম মানসিকভাবে চাপ দিয়েছে, নানা ঘটনায় আমাকে অপমানিত করা হয়েছে, সে কারণে আমার মনে এক ধরনের ক্ষোভ জন্মেছিল। তখনই আমি বলেছিলাম, এভাবে রাষ্ট্রপতি থাকা যায় না, চলে যেতে ইচ্ছা করে। এই কথাটাই আমি রয়টার্সকে বলেছিলাম।
“কিন্তু পরে এটাকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হলো, যেন আমার মেয়াদ নেই। প্রশ্ন করা হলো, নতুন নির্বাচন হলে, নতুন সরকার এলে আপনার অবস্থান কী হবে? তখন আমি বলেছি, আমি সাংবিধানিকভাবে পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত; আমার মেয়াদ ২০২৮ সাল পর্যন্ত। মানে আমার মেয়াদ আরো দুই বছর আছে।
“তবে আমি এটাও বলেছি, যদি একটি নির্বাচিত সরকার আসে এবং তাদের অভিপ্রায় থাকে যে আমি না থাকাই ভালো, তাহলে আমি স্বেচ্ছায় সরে যেতে প্রস্তুত। আই লাভ টু গো। মানে, তারা সে রকম ইচ্ছা পোষণ করলে আমি নিজে থেকেই চলে যেতে চাইব।”
রাষ্ট্রপতির কাছে প্রশ্ন ছিলো, এখনো কি সেই অবস্থানটাই আছে? বিএনপি যদি মনে করে, তারা নিজেদের মতো রাষ্ট্রপতি চায়, সে ক্ষেত্রে কী করবেন? কিংবা সংসদের মাধ্যমে অভিশংসন হলে?
জবাবে রাষ্ট্রপতি বলেন, “ওগুলো কেন হতে দেব? আমি একজন সচেতন মানুষ। যদি তারা মনে করে আমি থাকি, তাহলে আমি থাকব। আর যদি বলে যে– সরে যাওয়া ভালো; তাহলে আমি নিজেই সম্মানজনকভাবে সরে যাব।”
রাষ্ট্রপতি পদ থেকে অবসরের পর কোন কাজে মনোনিবেশ করতে চান– এমন প্রশ্নে সাহাবুদ্দিন বলেন, আমি তো আইন অঙ্গনের মানুষ। জীবনের দীর্ঘ ৪০টি বছর কাটিয়ে দিয়েছি কোর্ট-কাচারিতে। অবসরের পর একজন আইনি পরামর্শক হিসেবে বাকি জীবন কাটিয়ে দেব; যদি শরীর-স্বাস্থ্য ভালো থাকে।




