শিরোনাম

সার নিয়ে দুশ্চিন্তায় কৃষক, প্রতি বস্তায় বাড়তি ৬০০ টাকা

সিজেডএন ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
সার নিয়ে দুশ্চিন্তায় কৃষক, প্রতি বস্তায় বাড়তি ৬০০ টাকা
দোকানে খুচরা বিক্রির জন্য রাখা বিভিন্ন ধরনের সার

চলতি আমন মৌসুমে সার সংগ্রহ নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন দেশের বিভিন্ন জেলার কৃষকরা। সারের পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকলেও দাম অনেক বেশি নেওয়া হচ্ছে। সরকার নির্ধারিত দামে সার না পেয়ে তাদের এক দোকান থেকে অন্য দোকানে ছুটতে হচ্ছে।

আমন মৌসুমে ইউরিয়া, এমওপি, টিএসপি ও ডিএপি সারের ব্যাপক প্রয়োজন থাকলেও চাহিদার তুলনায় মাত্র ৫০ থেকে ৬০ ভাগ বরাদ্দ পাওয়া যাচ্ছে। আমনের পরপরই শুরু হবে রবি ও বোরো মৌসুম। ফলে আগামী মার্চ পর্যন্ত দেশের কৃষির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সার সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

জয়পুরহাট, মেহেরপুর, নাটোর ও কিশোরগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলার কৃষকরা চাহিদামতো সার না পাওয়ার অভিযোগ করছেন। কোনো কোনো এলাকায় সরকারি বরাদ্দ বাড়লেও সেই সার কৃষকের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। কোথাও নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি টাকা দিলেই সার মিলছে।

জয়পুরহাট

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে জয়পুরহাটে ৭০ হাজার ৯৫ হেক্টর জমিতে আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এরইমধ্যে ৯৭ ভাগ জমিতে রোপণ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। তবে ধানক্ষেতের পরিচর্যায় নেমে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন কৃষকরা। ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি হাঁকাচ্ছেন।সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বস্তাপ্রতি ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা বেশি নিচ্ছেন অসাধু ব্যবসায়ীরা।

চাষিরা জানান, ৫০ কেজির এক বস্তা ইউরিয়া সারের সরকার নির্ধারিত দাম ১৩৫০ টাকা। অথচ খুচরা ডিলারদের কাছ থেকে কৃষকদের কিনতে হচ্ছে ১৯০০ থেকে ১৯৫০ টাকা পর্যন্ত। একইভাবে ১৩৫০ টাকার টিএসপি সার বিক্রি হচ্ছে ১৯০০ থেকে ২০০০ টাকায়। ১০৫০ টাকার ডিএপি সার ১৫০০ থেকে ১৬০০ টাকা এবং ১০৫০ টাকার এমওপি সার বিক্রি হচ্ছে ১৪০০ টাকায়।

জেলা সার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি রওনকুল ইসলাম চৌধুরী জানান, চাহিদার তুলনায় সার কম পাওয়া যাচ্ছে। তবে প্রত্যন্ত এলাকায় কোনো সমস্যা থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি দাবি করেন, বিসিআইসির কোনো ডিলার সারের দাম বেশি নিচ্ছেন না।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক একেএম সাদিকুল ইসলাম বলেন, জেলাজুড়ে ডিলার পয়েন্টে কর্মকর্তাদের ফোন নম্বর দেওয়া আছে। সারের দাম বেশি নেওয়ার প্রমাণসহ অভিযোগ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মেহেরপুর

চলতি মৌসুমে মেহেরপুর জেলায় ২৬ হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় সার বরাদ্দ কম মেলায় তৈরি হয়েছে কৃত্রিম সংকট। চাহিদার তুলনায় মাত্র ৫০ থেকে ৬০ ভাগ বরাদ্দ পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে টিএসপি সারের সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। সরকারি ডিলারের কাছে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়েও ৫-১০ কেজির বেশি টিএসপি মিলছে না।

মেহেরপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ সনজীব মৃধা জানান, মেহেরপুরে একই জমিতে বছরে তিন-চারবার ফসল চাষ করা হয়। এতে অতিরিক্ত সারের দরকার হয়। তাই ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

বিএডিসির তথ্যানুযায়ী, দেশে নন-ইউরিয়া সার ডিএপি, টিএসপি ও এমওপির মজুদ এরইমধ্যে নিরাপদ সীমার নিচে নেমে গেছে। এর মধ্যে ডিএপির ঘাটতি সবচেয়ে বেশি।

নাটোর

কৃষকদের অভিযোগ, বস্তাপ্রতি ২০০ থেকে ৪০০ টাকা বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে। তাদের দেয়া হিসাব অনুযায়ী, টিএসপি ১৮০০, ইউরিয়া ১৫০০, ডিএপি ১৭৫০ এবং এমওপি ১১৫০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। খুচরা বিক্রেতাদের দাবি, ডিলাররা বেশি দাম রাখায় তারাও বাড়তি দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। তবে ডিলারদের দাবি, তারা সরকার নির্ধারিত দামেই সার দিচ্ছেন। স্থানীয় কৃষি বিভাগ বলছে, জেলায় পর্যাপ্ত সার মজুদ রয়েছে।

কিশোরগঞ্জ

করিমগঞ্জ, কটিয়াদী, পাকুন্দিয়া ও হোসেনপুরে কৃষকরা কয়েকদিন ঘুরেও সার পাচ্ছেন না। ২৭ টাকা কেজি দরের ইউরিয়া ৩৫ টাকা, টিএসপি ৩০-৩৫ টাকা এবং এমওপি ২২ টাকা কেজি দরে বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেছে। ডিলারদের দাবি, বিসিআইসি ও বিএডিসি থেকে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম। বিশেষ করে ডিএপি ও টিএসপির সংকট প্রকট। এদিকে কৃষি বিভাগের ভাষ্য, জেলায় সারের কোনো ঘাটতি নেই।

৩ ডিলারের লাইসেন্স সমর্পণ

কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলায় ব্যবসায়ে লোকসানের কারণ দেখিয়ে বিসিআইসির ৩ জন ডিলার উপজেলা কৃষি অফিসে লাইসেন্স জমা দিয়েছেন। তারা জানান, নতুন নীতিমালায় জামানত ২ লাখ থেকে বাড়িয়ে ৩ লাখ টাকা করা হয়েছে। এদিকে ইউনিয়নে ডিলারের সংখ্যা বাড়লেও মোট বরাদ্দের পরিমাণ একই থাকছে। এভাবে লোকসান দিয়ে ব্যবসা চালানো সম্ভব নয়।

কিশোরগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. সাদিকুর রহমান জানান, শূন্য হওয়া ৩টি ডিলার পদের জন্য বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে।

বিএডিসির তথ্যানুযায়ী, দেশে নন-ইউরিয়া সার ডিএপি, টিএসপি ও এমওপির মজুদ এরইমধ্যে নিরাপদ সীমার নিচে নেমে গেছে। এর মধ্যে ডিএপির ঘাটতি সবচেয়ে বেশি।

আমনের সারের চাহিদা সামাল দিতে গত ২৬ জুলাই কৃষি মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়ে জরুরি পদক্ষেপ নেয়ার তাগিদ দেয় বিএডিসি। সংস্থাটি জানায়, অক্টোবর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে চুক্তির আওতাধীন চালানের পাশাপাশি আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত প্রতি মাসে অতিরিক্ত দুই লট করে ডিএপি আমদানি করা জরুরি।

বেসরকারি আমদানিকারকরা জানান, সার আমদানির জন্য সরকার এখনো প্রয়োজনীয় ক্রয়সংক্রান্ত পরিপত্র জারি করেনি। পরিপত্র জারির পর এলসি খোলা এবং জাহাজে সার এসে পৌঁছাতে অন্তত ২ থেকে ৩ মাস লাগে। এখন সিদ্ধান্ত নিলেও নতুন সার পৌঁছাতে অক্টোবর বা নভেম্বর হয়ে যাবে। ফলে শীতকালীন ফসলের মৌসুমেও সারের অনিশ্চয়তা দেখা দিতে পারে।

/এফসি/