গ্যাস সংকটে গভীর হচ্ছে জ্বালানি ঝুঁকি: সিপিডি

গ্যাস সংকটে গভীর হচ্ছে জ্বালানি ঝুঁকি: সিপিডি
নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এখন আর শুধু সাময়িক সরবরাহ সংকটের বিষয় নয়, বরং এটি ক্রমেই একটি কাঠামোগত সংকটে পরিণত হচ্ছে বলে জানিয়েছে বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।
বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) রাজধানীর মহাখালীতে ব্র্যাক সেন্টার ইন মিলনায়তনে ‘বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট মোকাবিলা: তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার ও টেকসই জ্বালানি ভবিষ্যতের পথ’ শীর্ষক আলোচনায় সিপিডির উপস্থাপনায় এ তথ্য জানানো হয়। উপস্থাপনাটি তৈরি করেছেন সিপিডির সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট ফওকোরউদ্দিন আল কবির।
সিপিডির উপস্থাপনায় বলা হয়, দেশে গ্যাসের মজুত দ্রুত কমছে, নতুন বাণিজ্যিকভাবে সম্ভাবনাময় গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার হচ্ছে না এবং একই সঙ্গে বাড়ছে আমদানি করা এলএনজি, কয়লা ও পেট্রোলিয়ামজাত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি বা ভূরাজনৈতিক সংকট দেখা দিলেই বাংলাদেশের বিদ্যুৎ, শিল্প ও পরিবহন খাত বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়ছে।
প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত নিয়ে দেশে সবচেয়ে বড় দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি হয়েছে জানিয়ে উপস্থাপনায় বলা হয়েছে, ছয় দশকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, ২০৩১ সালের মধ্যে দেশে গ্যাসের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার প্রায় ৩০ ট্রিলিয়ন ঘনফুটে পৌঁছাতে পারে। নতুন আবিষ্কার বা কার্যকর হস্তক্ষেপ না হলে একই সময়ের মধ্যে অবশিষ্ট গ্যাস মজুত প্রায় নিঃশেষের দিকে চলে যেতে পারে।
অর্থাৎ, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প, সার, আবাসিক ও পরিবহন– সব খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই জ্বালানি উৎসকে ঘিরে এখনই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা না করলে আগামী দশকের শুরুতেই আরও বড় সংকট দেখা দিতে পারে।
এলএনজি নির্ভরতায় বাড়ছে বৈদেশিক মুদ্রার চাপ
দেশীয় উৎপাদন কমে যাওয়ায় ঘাটতি পূরণে বাংলাদেশ ক্রমেই আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের মোট গ্যাস ব্যবহারের ২৮.৮২ শতাংশ এসেছে আমদানি করা এলএনজি থেকে। কিন্তু আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির সাম্প্রতিক পরিবর্তন এই নির্ভরতার ঝুঁকি স্পষ্ট করে দিয়েছে।
সিপিডি জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও হরমুজ প্রণালি ঘিরে সরবরাহ বিঘ্নের পর কাতার বাংলাদেশে নির্ধারিত এলএনজি সরবরাহ অর্ধেকে কমিয়ে দেয়। সংঘাতের আগে ১৯টি কার্গো পাওয়ার পর পরবর্তী সময়ে কোনো কার্গো পাওয়া যায়নি। পরিস্থিতি সামাল দিতে পেট্রোবাংলাকে স্পট মার্কেট থেকে ৩৫টি এলএনজি কার্গো সংগ্রহ করতে হয়েছে।
এর ফলে এলএনজির দামও বেড়েছে। ২০২৬ সালের শুরুর দিকে প্রতি এমএমবিটিইউ প্রায় ১০ ডলার থাকলেও স্পট মার্কেটে তা বেড়ে ১৫.৮৮ থেকে ১৬.৯৮ ডলারে উঠেছে। এতে এলএনজি ভর্তুকির ব্যয়ও ব্যাপকভাবে বেড়েছে। সিপিডির হিসাবে, পেট্রোবাংলার এলএনজি ভর্তুকি বিল বেড়ে ১৬ হাজার ৬০০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বরাদ্দ ৬ হাজার কোটি টাকার প্রায় তিন গুণ।
জীবাশ্ম জ্বালানির ফাঁদে বাংলাদেশ
বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের নির্ভরতা এখনো মূলত জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর। বিপিডিবির ২০২৬ সালের তথ্য উদ্ধৃত করে সিপিডি জানিয়েছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার ৪২.১৫ শতাংশ প্রাকৃতিক গ্যাস, ২৩.৪১ শতাংশ কয়লা এবং ১৯.০৬ শতাংশ ফার্নেস অয়েলভিত্তিক। বিপরীতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও জলবিদ্যুতের সম্মিলিত অংশ খুবই সীমিত।
সিপিডি বলছে, বাংলাদেশ জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে বেরিয়ে আসার পরিবর্তে ক্রমেই আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। ২০১৮ সালে এলএনজি আমদানি শুরু হওয়ার পর থেকে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমার পাশাপাশি এলএনজি আমদানি বাড়ছে।
সংকট মোকাবিলায় তিন ধাপ
বর্তমান পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার ইতোমধ্যে জ্বালানি ক্রয়ের সীমা, দোকানপাট আগেভাগে বন্ধ, আলোকসজ্জা নিষিদ্ধ, অফিস ও ব্যাংকের সময় কমানো এবং শিক্ষা কার্যক্রমে অনলাইন-অফলাইন সমন্বয়সহ বিভিন্ন চাহিদা ব্যবস্থাপনা পদক্ষেপ নিয়েছে। পাশাপাশি জরুরি জ্বালানি আমদানি, এলএনজি সংগ্রহ, আমদানির উৎস বহুমুখীকরণ, ৯০ দিনের জ্বালানি মজুত তৈরির পরিকল্পনা এবং মজুতদারির বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হচ্ছে।
সিপিডি মনে করছে, এসব তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সংকটের সমাধান হবে না। স্বল্পমেয়াদে এলএনজি সংগ্রহে মূল্যঝুঁকি কমানো, জ্বালানি ব্যবহারে দক্ষতা বাড়ানো এবং সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করতে হবে। মধ্যমেয়াদে এলএনজি টার্মিনাল ও স্টোরেজ সক্ষমতা, গ্যাস সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানকে ‘জাতীয় জরুরি অগ্রাধিকার’ দেওয়ার কথা বলেছে সিপিডি। একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ আন্তর্জাতিক সরবরাহ সংকট মোকাবিলায় কৌশলগত জ্বালানি মজুত গড়ে তোলা এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
সিপিডির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট একই সঙ্গে তাৎক্ষণিক ও কাঠামোগত। আজকের জরুরি পদক্ষেপ সরবরাহ পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল করতে পারে; কিন্তু টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য দেশীয় অনুসন্ধান, নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণ, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো ছাড়া বিকল্প নেই।
অনুষ্ঠানে অনলাইনে যুক্ত ছিলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। এ সময় তিনি বলেন, এফএসআরইউ (ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল) মেরামত সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত আপাতত লোডশেডিং ব্যবস্থাপনা এবং অপেক্ষা করা ছাড়া এখন আর কোনো উপায় নেই।

দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এখন আর শুধু সাময়িক সরবরাহ সংকটের বিষয় নয়, বরং এটি ক্রমেই একটি কাঠামোগত সংকটে পরিণত হচ্ছে বলে জানিয়েছে বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।
বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) রাজধানীর মহাখালীতে ব্র্যাক সেন্টার ইন মিলনায়তনে ‘বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট মোকাবিলা: তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার ও টেকসই জ্বালানি ভবিষ্যতের পথ’ শীর্ষক আলোচনায় সিপিডির উপস্থাপনায় এ তথ্য জানানো হয়। উপস্থাপনাটি তৈরি করেছেন সিপিডির সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট ফওকোরউদ্দিন আল কবির।
সিপিডির উপস্থাপনায় বলা হয়, দেশে গ্যাসের মজুত দ্রুত কমছে, নতুন বাণিজ্যিকভাবে সম্ভাবনাময় গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার হচ্ছে না এবং একই সঙ্গে বাড়ছে আমদানি করা এলএনজি, কয়লা ও পেট্রোলিয়ামজাত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি বা ভূরাজনৈতিক সংকট দেখা দিলেই বাংলাদেশের বিদ্যুৎ, শিল্প ও পরিবহন খাত বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়ছে।
প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত নিয়ে দেশে সবচেয়ে বড় দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি হয়েছে জানিয়ে উপস্থাপনায় বলা হয়েছে, ছয় দশকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, ২০৩১ সালের মধ্যে দেশে গ্যাসের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার প্রায় ৩০ ট্রিলিয়ন ঘনফুটে পৌঁছাতে পারে। নতুন আবিষ্কার বা কার্যকর হস্তক্ষেপ না হলে একই সময়ের মধ্যে অবশিষ্ট গ্যাস মজুত প্রায় নিঃশেষের দিকে চলে যেতে পারে।
অর্থাৎ, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প, সার, আবাসিক ও পরিবহন– সব খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই জ্বালানি উৎসকে ঘিরে এখনই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা না করলে আগামী দশকের শুরুতেই আরও বড় সংকট দেখা দিতে পারে।
এলএনজি নির্ভরতায় বাড়ছে বৈদেশিক মুদ্রার চাপ
দেশীয় উৎপাদন কমে যাওয়ায় ঘাটতি পূরণে বাংলাদেশ ক্রমেই আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের মোট গ্যাস ব্যবহারের ২৮.৮২ শতাংশ এসেছে আমদানি করা এলএনজি থেকে। কিন্তু আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির সাম্প্রতিক পরিবর্তন এই নির্ভরতার ঝুঁকি স্পষ্ট করে দিয়েছে।
সিপিডি জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও হরমুজ প্রণালি ঘিরে সরবরাহ বিঘ্নের পর কাতার বাংলাদেশে নির্ধারিত এলএনজি সরবরাহ অর্ধেকে কমিয়ে দেয়। সংঘাতের আগে ১৯টি কার্গো পাওয়ার পর পরবর্তী সময়ে কোনো কার্গো পাওয়া যায়নি। পরিস্থিতি সামাল দিতে পেট্রোবাংলাকে স্পট মার্কেট থেকে ৩৫টি এলএনজি কার্গো সংগ্রহ করতে হয়েছে।
এর ফলে এলএনজির দামও বেড়েছে। ২০২৬ সালের শুরুর দিকে প্রতি এমএমবিটিইউ প্রায় ১০ ডলার থাকলেও স্পট মার্কেটে তা বেড়ে ১৫.৮৮ থেকে ১৬.৯৮ ডলারে উঠেছে। এতে এলএনজি ভর্তুকির ব্যয়ও ব্যাপকভাবে বেড়েছে। সিপিডির হিসাবে, পেট্রোবাংলার এলএনজি ভর্তুকি বিল বেড়ে ১৬ হাজার ৬০০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বরাদ্দ ৬ হাজার কোটি টাকার প্রায় তিন গুণ।
জীবাশ্ম জ্বালানির ফাঁদে বাংলাদেশ
বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের নির্ভরতা এখনো মূলত জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর। বিপিডিবির ২০২৬ সালের তথ্য উদ্ধৃত করে সিপিডি জানিয়েছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার ৪২.১৫ শতাংশ প্রাকৃতিক গ্যাস, ২৩.৪১ শতাংশ কয়লা এবং ১৯.০৬ শতাংশ ফার্নেস অয়েলভিত্তিক। বিপরীতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও জলবিদ্যুতের সম্মিলিত অংশ খুবই সীমিত।
সিপিডি বলছে, বাংলাদেশ জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে বেরিয়ে আসার পরিবর্তে ক্রমেই আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। ২০১৮ সালে এলএনজি আমদানি শুরু হওয়ার পর থেকে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমার পাশাপাশি এলএনজি আমদানি বাড়ছে।
সংকট মোকাবিলায় তিন ধাপ
বর্তমান পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার ইতোমধ্যে জ্বালানি ক্রয়ের সীমা, দোকানপাট আগেভাগে বন্ধ, আলোকসজ্জা নিষিদ্ধ, অফিস ও ব্যাংকের সময় কমানো এবং শিক্ষা কার্যক্রমে অনলাইন-অফলাইন সমন্বয়সহ বিভিন্ন চাহিদা ব্যবস্থাপনা পদক্ষেপ নিয়েছে। পাশাপাশি জরুরি জ্বালানি আমদানি, এলএনজি সংগ্রহ, আমদানির উৎস বহুমুখীকরণ, ৯০ দিনের জ্বালানি মজুত তৈরির পরিকল্পনা এবং মজুতদারির বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হচ্ছে।
সিপিডি মনে করছে, এসব তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সংকটের সমাধান হবে না। স্বল্পমেয়াদে এলএনজি সংগ্রহে মূল্যঝুঁকি কমানো, জ্বালানি ব্যবহারে দক্ষতা বাড়ানো এবং সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করতে হবে। মধ্যমেয়াদে এলএনজি টার্মিনাল ও স্টোরেজ সক্ষমতা, গ্যাস সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানকে ‘জাতীয় জরুরি অগ্রাধিকার’ দেওয়ার কথা বলেছে সিপিডি। একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ আন্তর্জাতিক সরবরাহ সংকট মোকাবিলায় কৌশলগত জ্বালানি মজুত গড়ে তোলা এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
সিপিডির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট একই সঙ্গে তাৎক্ষণিক ও কাঠামোগত। আজকের জরুরি পদক্ষেপ সরবরাহ পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল করতে পারে; কিন্তু টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য দেশীয় অনুসন্ধান, নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণ, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো ছাড়া বিকল্প নেই।
অনুষ্ঠানে অনলাইনে যুক্ত ছিলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। এ সময় তিনি বলেন, এফএসআরইউ (ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল) মেরামত সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত আপাতত লোডশেডিং ব্যবস্থাপনা এবং অপেক্ষা করা ছাড়া এখন আর কোনো উপায় নেই।

গ্যাস সংকটে গভীর হচ্ছে জ্বালানি ঝুঁকি: সিপিডি
নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এখন আর শুধু সাময়িক সরবরাহ সংকটের বিষয় নয়, বরং এটি ক্রমেই একটি কাঠামোগত সংকটে পরিণত হচ্ছে বলে জানিয়েছে বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।
বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) রাজধানীর মহাখালীতে ব্র্যাক সেন্টার ইন মিলনায়তনে ‘বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট মোকাবিলা: তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার ও টেকসই জ্বালানি ভবিষ্যতের পথ’ শীর্ষক আলোচনায় সিপিডির উপস্থাপনায় এ তথ্য জানানো হয়। উপস্থাপনাটি তৈরি করেছেন সিপিডির সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট ফওকোরউদ্দিন আল কবির।
সিপিডির উপস্থাপনায় বলা হয়, দেশে গ্যাসের মজুত দ্রুত কমছে, নতুন বাণিজ্যিকভাবে সম্ভাবনাময় গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার হচ্ছে না এবং একই সঙ্গে বাড়ছে আমদানি করা এলএনজি, কয়লা ও পেট্রোলিয়ামজাত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি বা ভূরাজনৈতিক সংকট দেখা দিলেই বাংলাদেশের বিদ্যুৎ, শিল্প ও পরিবহন খাত বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়ছে।
প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত নিয়ে দেশে সবচেয়ে বড় দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি হয়েছে জানিয়ে উপস্থাপনায় বলা হয়েছে, ছয় দশকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, ২০৩১ সালের মধ্যে দেশে গ্যাসের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার প্রায় ৩০ ট্রিলিয়ন ঘনফুটে পৌঁছাতে পারে। নতুন আবিষ্কার বা কার্যকর হস্তক্ষেপ না হলে একই সময়ের মধ্যে অবশিষ্ট গ্যাস মজুত প্রায় নিঃশেষের দিকে চলে যেতে পারে।
অর্থাৎ, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প, সার, আবাসিক ও পরিবহন– সব খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই জ্বালানি উৎসকে ঘিরে এখনই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা না করলে আগামী দশকের শুরুতেই আরও বড় সংকট দেখা দিতে পারে।
এলএনজি নির্ভরতায় বাড়ছে বৈদেশিক মুদ্রার চাপ
দেশীয় উৎপাদন কমে যাওয়ায় ঘাটতি পূরণে বাংলাদেশ ক্রমেই আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের মোট গ্যাস ব্যবহারের ২৮.৮২ শতাংশ এসেছে আমদানি করা এলএনজি থেকে। কিন্তু আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির সাম্প্রতিক পরিবর্তন এই নির্ভরতার ঝুঁকি স্পষ্ট করে দিয়েছে।
সিপিডি জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও হরমুজ প্রণালি ঘিরে সরবরাহ বিঘ্নের পর কাতার বাংলাদেশে নির্ধারিত এলএনজি সরবরাহ অর্ধেকে কমিয়ে দেয়। সংঘাতের আগে ১৯টি কার্গো পাওয়ার পর পরবর্তী সময়ে কোনো কার্গো পাওয়া যায়নি। পরিস্থিতি সামাল দিতে পেট্রোবাংলাকে স্পট মার্কেট থেকে ৩৫টি এলএনজি কার্গো সংগ্রহ করতে হয়েছে।
এর ফলে এলএনজির দামও বেড়েছে। ২০২৬ সালের শুরুর দিকে প্রতি এমএমবিটিইউ প্রায় ১০ ডলার থাকলেও স্পট মার্কেটে তা বেড়ে ১৫.৮৮ থেকে ১৬.৯৮ ডলারে উঠেছে। এতে এলএনজি ভর্তুকির ব্যয়ও ব্যাপকভাবে বেড়েছে। সিপিডির হিসাবে, পেট্রোবাংলার এলএনজি ভর্তুকি বিল বেড়ে ১৬ হাজার ৬০০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বরাদ্দ ৬ হাজার কোটি টাকার প্রায় তিন গুণ।
জীবাশ্ম জ্বালানির ফাঁদে বাংলাদেশ
বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের নির্ভরতা এখনো মূলত জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর। বিপিডিবির ২০২৬ সালের তথ্য উদ্ধৃত করে সিপিডি জানিয়েছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার ৪২.১৫ শতাংশ প্রাকৃতিক গ্যাস, ২৩.৪১ শতাংশ কয়লা এবং ১৯.০৬ শতাংশ ফার্নেস অয়েলভিত্তিক। বিপরীতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও জলবিদ্যুতের সম্মিলিত অংশ খুবই সীমিত।
সিপিডি বলছে, বাংলাদেশ জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে বেরিয়ে আসার পরিবর্তে ক্রমেই আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। ২০১৮ সালে এলএনজি আমদানি শুরু হওয়ার পর থেকে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমার পাশাপাশি এলএনজি আমদানি বাড়ছে।
সংকট মোকাবিলায় তিন ধাপ
বর্তমান পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার ইতোমধ্যে জ্বালানি ক্রয়ের সীমা, দোকানপাট আগেভাগে বন্ধ, আলোকসজ্জা নিষিদ্ধ, অফিস ও ব্যাংকের সময় কমানো এবং শিক্ষা কার্যক্রমে অনলাইন-অফলাইন সমন্বয়সহ বিভিন্ন চাহিদা ব্যবস্থাপনা পদক্ষেপ নিয়েছে। পাশাপাশি জরুরি জ্বালানি আমদানি, এলএনজি সংগ্রহ, আমদানির উৎস বহুমুখীকরণ, ৯০ দিনের জ্বালানি মজুত তৈরির পরিকল্পনা এবং মজুতদারির বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হচ্ছে।
সিপিডি মনে করছে, এসব তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সংকটের সমাধান হবে না। স্বল্পমেয়াদে এলএনজি সংগ্রহে মূল্যঝুঁকি কমানো, জ্বালানি ব্যবহারে দক্ষতা বাড়ানো এবং সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করতে হবে। মধ্যমেয়াদে এলএনজি টার্মিনাল ও স্টোরেজ সক্ষমতা, গ্যাস সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানকে ‘জাতীয় জরুরি অগ্রাধিকার’ দেওয়ার কথা বলেছে সিপিডি। একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ আন্তর্জাতিক সরবরাহ সংকট মোকাবিলায় কৌশলগত জ্বালানি মজুত গড়ে তোলা এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
সিপিডির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট একই সঙ্গে তাৎক্ষণিক ও কাঠামোগত। আজকের জরুরি পদক্ষেপ সরবরাহ পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল করতে পারে; কিন্তু টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য দেশীয় অনুসন্ধান, নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণ, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো ছাড়া বিকল্প নেই।
অনুষ্ঠানে অনলাইনে যুক্ত ছিলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। এ সময় তিনি বলেন, এফএসআরইউ (ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল) মেরামত সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত আপাতত লোডশেডিং ব্যবস্থাপনা এবং অপেক্ষা করা ছাড়া এখন আর কোনো উপায় নেই।

লোডশেডিং সমাধানে অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই: বিদ্যুৎমন্ত্রী







