শিরোনাম

ভোটের আগে নারী ভোটারদের দাবি পূরণের আশ্বাস, পরে উপেক্ষা

ভোটের আগে নারী ভোটারদের দাবি পূরণের আশ্বাস, পরে উপেক্ষা
গ্রাফিকস: সিটিজেন জার্নাল

দেশে মোট ভোটারের মধ্যে প্রায় অর্ধেকই নারী। তাই বরাবরের মতো এয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণে নারী ভোটাররা বড় ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করবে। এ কারণে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নারী ভোটারদের আকৃষ্ট করতে প্রচার চালিয়েছেন, দিয়েছেন ইশতেহার।

দলগুলোর ইশতেহার ও নির্বাচনী প্রচারণার সময় নারী ভোটারদের দাবিগুলো পূরণের কথা বলা হয়। কিন্তু নির্বাচন শেষ হওয়ার পর আর কেউ তাদের দাবিগুলো পূরণ করে না। এতে অনেক নারী ভোটার ভোট দিতে উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন।

শহর ও গ্রামের কয়েকজন নারী ভোটারদের সঙ্গে কথা হলে তারা তাদের কয়েকটি মূল দাবির কথা তুলে ধরেন। এগুলোর মধ্যে আছে দেশে রাজনীতির পুরোনো ধারার পরিবর্তন, কর্মস্থলসহ সব জায়গায় নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, যথাযথ স্বাস্থ্যসেবা, যুগোপযোগী শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের জবাবদিহিতা, মজুরি বৈষম্য দূর ও সবক্ষেত্রে সমান অধিকার নিশ্চিত করা।

নারী উদ্যোক্তা ও শিক্ষার্থীরা জানান, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য বিনাসুদে ঋণের ব্যবস্থা ও বাল্যবিবাহ বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিবে- এমন প্রার্থী চান তারা।

রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে নারীরা পিছিয়ে

নারী অধিকার নিয়ে কাজ করেন-এমন কয়েকজন নারী নেত্রী বলেন, রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে নারীরা এখনো অনেক পেছনে। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী দলে প্রতি কমিটিতে নারীর অংশগ্রহণ ৩৩ শতাংশের এখনো পূরণে তেমন কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি। ১৯৭১ সাল থেকে সংরক্ষিত আসনে নারীর সংখ্যা বেড়েছে। তবে তুলনামূলকভাবে সেই সংখ্যা অনেক কম।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকার আসে সরকার যায়, কিন্তু নারীদের ভাগ্যের খুব একটা পরিবর্তন হয় না। আশা করি, আসন্ন নির্বাচনে যে দলই দেশ পরিচালনার দায়িত্বে আসবে তারা আন্তরিকতার সঙ্গে নারীদের ভাগ্যের উন্নয়নে কাজ করবে।

নারী প্রার্থীর সংখ্যা কম

নির্বাচন কমিশন (ইসি) সূত্রে জানা গেছে, দেশের ৩০০টি আসনের মধ্যে ৭৮টি আসনে পুরুষের তুলনায় নারী ভোটার বেশি রয়েছেন। বিশেষভাবে দেশের উত্তর ও দক্ষিণ এলাকার আসনগুলোয় নারী ভোটার বেশি। তাই নির্বাচনে নারীদের ভোট ফলাফল বদলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। অথচ বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনে নারী প্রার্থীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম।

ইসির ওয়েবসাইটে দেখা গেছে, এবার মোট প্রার্থীর সংখ্যা ১ হাজার ৯৮১ জন। এর মধ্যে নারী প্রার্থী মাত্র ৭৬ জন। অর্থাৎ মোট প্রার্থীর মাত্র ৩ দশমিক ৮৪ শতাংশ নারী।

নারী নেত্রীরা বলছেন, নারী প্রার্থীর সংখ্যা কম থাকার বিষয়টি গনতন্ত্রের জন্য মঙ্গলজনক নয়। বিষয়টি নারী ভোটারদের জন্যও ভালো নয়। কারণ জাতীয় সংসদে নারী সদস্য বেশি না থাকলে তাদের দাবি ও অধিকার আদায়ের পক্ষে কথা বলার সুযোগ কমে যায়।

ভোটারদের কথা

জাতীয় নির্বাচনে ভোট দেয়ার অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা হয় একটি বেসরকারি ব্যাংকে কর্মকর্তা নাজিয়া কণার সঙ্গে। তিনি সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ২০০৯ সালে প্রথম ভোট দিয়েছেন। এরপরে আর ভোট দেওয়া হয়নি। কণা আরও বলেন, ‘সেইসময়ে আমার গ্রামের বাড়িতে ভোট দিয়েছি। সুন্দর এবং সুষ্ঠু একটি পরিবেশ ছিল। কোনো ধরনের সমস্যার মধ্যে পড়তে হয়নি । আমাকে কেউ এ বিষয়ে প্রভাবিত করেনি, বরং আমি নিজেই পছন্দমতো প্রার্থীকে ভোট দিয়েছি।’’

ঢাকার খিলগাঁও এলাকার গৃহিনী আসমা জামান বলেন, ‘১৯৯৬ সালে কলেজে পড়ার সময় প্রথম ভোট দিয়েছি। এরপর বিয়ে হয়ে গেলে আর ভোট দেওয়া হয়নি। আমি এখন দুই ছেলের মা। বিয়ের প্রথম দিকে ভোট দিতে পারিনি পরিবারের সমস্যার কারণে। এরপরে যতবার ভোট দিতে গিয়েছি, বলেছে- ‘ভোট দেয়া হয়ে গেছে’। তবে এবার ভোট দিতে পারবো বলে আশা করছি।’

বরিশালের উজিরপুর উপজেলার মূলপাইন গ্রামের মিনা বেগম। তাঁর স্বামী মারা গেছেন। এক মেয়ে ও বেকার ছেলেকে নিয়ে কোনোমতে বেঁচে আছেন। সন্তানদের নিয়ে থাকেন অন্যের বাড়িতে। তার দাবি, ‘সরকার যদি একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দেয় তাহলে আমরা একটু শান্তিতে থাকতে পারবো।’

নানা প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে নারীদের উদ্যোক্তা হওয়ার পথ সহজ করতে রাজনৈতিক দলগুলো কার্যকর উদ্যোগ নেবে বলে আশা করছেন নারী ভোটাররা। নারী উদ্যোক্তা সাজিদা ইসলাম বলেন, নারী পুরুষের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ থাকবে না। সবাই মিলে এক সঙ্গে কাজ করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবো। তিনি আরও বলেন, ‘কোনো সহানুভূতি চাই না। আমরা চাই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হবে এবং আমাদের যে অধিকারগুলো আছে, সেগুলো বাস্তবায়ন হবে।’

তবে তৃণমূলের খেটে খাওয়া নারীদের কাছে ভোট কেবলই এলাকার উন্নয়নে প্রার্থীদের দেয়া নানা প্রতিশ্রুতি। নির্বাচনের পরে সেগুলো বাস্তবায়ন না হওয়ার অভিযোগ তাদের। তাই তাদের কাছে ভোটের চেয়ে খেয়ে-পরে বেঁচে থাকাটাই মুখ্য।

তবে তৃণমূলের খেটে খাওয়া নারীদের কাছে ভোট কেবলই এলাকার উন্নয়নে প্রার্থীদের দেয়া নানা প্রতিশ্রুতি। নির্বাচনের পরে সেগুলো বাস্তবায়ন না হওয়ার অভিযোগ তাদের। তাই তাদের কাছে ভোটের চেয়ে খেয়ে-পরে বেঁচে থাকাটাই মুখ্য। তবে আক্ষেপের মাঝেও কেউ কেউ গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে রাজনৈতিক হানাহানি বন্ধ, ঘরে-বাইরে নিরপদে চলতে পারা আর কর্মক্ষেত্রে নানা বৈষম্য নিরসনের দাবি তুলেছেন।

মৌলভাবাজার জেলার শ্রীমঙ্গলের মিশনরোডে সাথী চৌধুরী (ছদ্ম নাম) বলেন, এমন একটা সরকার আসুক, যে সরকার নারী নির্যাতন বন্ধ করবে। নারীর ক্ষমতায়নের জন্য তারা আরও বেশি কাজ করবে।

আমি বয়স্ক মানুষ। আমার কিছু করার শক্তি সামর্থ্য নাই। ধনেপাতা আর কাঁচা মরিচ কিনে বিক্রি করি। আমি এমন প্রার্থীকে ভোট দেবো, যে আমার জন্য সরকারি ভাতার ব্যবস্থা করবে
রাশিদা বেগম চাঁদপুরের মোমপট্টি এলাকার বাসিন্দা

বয়সের ভারে নুয়ে পড়া চাঁদপুরের মোমপট্টি এলাকার রাশিদা বেগম। স্থানীয় বৌবাজারে সবজি বিক্রি করেন। আশায় আছেন, আগামীর সরকার হয়তো পাশে দাঁড়াবে। রাশিদা বেগম বলেন, ‘আমি বয়স্ক মানুষ। আমার কিছু করার শক্তি সামর্থ্য নাই। ধনেপাতা আর কাঁচা মরিচ কিনে বিক্রি করি। আমি এমন প্রার্থীকে ভোট দেবো, যে আমার জন্য সরকারি ভাতার ব্যবস্থা করবে।’

নারী অধিকারের বিষয়ে যা বলছে দলগুলো

নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণায় নারীদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে রাজনৈতিকদলগুলোর নেতা ও প্রার্থীরা। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) জানিয়েছে, নির্বাচনে জয়ী হলে নারীর যথাযথ ক্ষমতায়ন নিশ্চিতে তারা কাজ করবে। নারীদের জীবনমান উন্নয়নে যে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে, তার বাজেট কোথা থেকে আসবে, তা নিয়েও চিন্তা করেছে বিএনপি।

জামায়াতের ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘আমরা এমন একটি দেশ চাই, যেখানে আমাদের মা-বোনরা ঘরে সুরক্ষিত থাকবেন, কর্মস্থলে সুরক্ষা পাবেন, রাস্তাঘাটেও সুরক্ষিত থাকবেন। তাদের দিকে কোনো খারাপ লোক চোখ তুলে তাকানোর ফুরসত পাবে না। তারা ইজ্জতের সঙ্গে, মর্যাদার সঙ্গে দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখবেন।’

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম সিটিজেন জার্নালকে বলেন, পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব, নারী নির্যাতনের বৃদ্ধি এবং দুর্বল আইনি কাঠামো নারীদের ভোট দিতে যাওয়ার অন্যতম প্রধান প্রতিবন্ধকতা। তার অভিযোগ, সরকারের এজেন্ডায় নারীর অবস্থান স্পষ্ট নয় এবং যৌন নির্যাতনের বিচার না হওয়ায় নারীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।

নারী প্রার্থীর বক্তব্য

নারীদের অধিকার ও বিভিন্ন দাবির বিষয়ে কথা হয় বরিশাল-৫ আসনের একমাত্র নারী প্রার্থী মনীষা চক্রবর্তীর সঙ্গে। তিনি বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) ও গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা নারীবান্ধব কর্মসংস্থান ও নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সুদমুক্ত ঋণ দেওয়ার দাবি জানিয়েছি। কর্মজীবী নারীদের জন্য ডে-কেয়ার সেন্টার ও শৌচাগারের ব্যবস্থা করারও কথা বলেছি। এ ছাড়া আমর নারী নির্যাতন বন্ধ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করারও দাবি জানিয়েছি।’

সব মিলিয়ে নারী ভোটাররা আশা করছেন, আসন্ন নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এমন একটি সরকার আসবে, যারা কেবল প্রতিশ্রুতি নয়—বাস্তব উদ্যোগের মাধ্যমে নারীদের অধিকার ও ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করবে।

/বিবি/