মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার, দায়সারা ঘোষণায় কাটছে না ধোঁয়াশা

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার, দায়সারা ঘোষণায় কাটছে না ধোঁয়াশা
জুবায়ের আহমেদ

দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খুলে দেওয়া হচ্ছে। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে দেশটিতে বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরুর ঘোষণা দিয়েছে সরকার। উপরন্তু সরকারের পক্ষ থেকে এবার বিনা খরচে ১০ হাজার কর্মীকে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অতীতে দেশটিতে সরকার নির্ধারিত টাকায় কর্মী পাঠানো, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতাসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে বেশ কয়েকবার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে অসাধু রিক্রুটিং এজেন্সি এবং দালাল চক্রের অপতৎপরতায় সেসব উদ্যোগ বারবার হোঁচট খেয়েছে।
মূলত কর্মী নিয়োগের নিয়ম, অভিবাসন ব্যয় নির্ধারণ ও রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর দায়িত্ব বণ্টন নিয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা না থাকায় পুরো প্রক্রিয়ার বাস্তবায়ন নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এবার নতুন ব্যবস্থাপনায় সরকারি প্রতিষ্ঠান বোয়েসেলসহ ৩১২টি রিক্রুটিং এজেন্সি, ২৫টি প্রসেসিং এজেন্সি যুক্ত করার কথা জানানো হয়েছে। গত ১৫ অক্টোবর প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে নতুন করে কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরুর ঘোষণা দেওয়া হয়। তবে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর মালিকদের অভিযোগ, এজেন্সিগুলো কীভাবে তালিকাভুক্ত হলো, কর্মীরা কত টাকা খরচে মালয়েশিয়া যেতে পারবেন এবং বিনা খরচে যাওয়ার সুযোগ কারা পাবেন-এসব বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি। এমনকি তালিকাভুক্ত রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোও বলছে, কীভাবে কাজ শুরু করতে হবে- সে বিষয়ে তারা আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা পায়নি।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে অতীতে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে সিন্ডিকেট ও অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, তার পুনরাবৃত্তি হতে পারে। এতে কর্মীরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ এই শ্রমবাজার আবারও বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
২০২২ সালে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে কর্মী নিয়োগ সংক্রান্ত যে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়, সেই অনুযায়ী কর্মী প্রেরণকারী বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সি (জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান) বাছাই করার দায়িত্ব এককভাবে মালয়েশিয়া সরকারের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে। এ সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত রয়েছে। এ কারণেই মালয়েশিয়া সরকারের আরোপিত শর্ত পরিবর্তন করাটা বাংলাদেশের পক্ষে সহজ নয় বলে মনে করেন অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, বাজার খোলার ঘোষণার পাশাপাশি কর্মী পাঠানোর সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি ঠিক কেমন হবে, তা কার্যকর অভিবাসন কূটনীতির মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারকে আগেই আরও স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট করার দরকার ছিল।
ঘোষণা আছে, নির্দেশনা নেই
রিক্রুটিং এজেন্সিদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজের (বায়রা) সদস্যসহ সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, শুধু সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে শ্রমবাজার চালুর ঘোষণা দিলেই স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয় না। কর্মী নিয়োগের ধাপ, এজেন্সিগুলোর দায়িত্ব এবং অভিবাসন ব্যয় নির্ধারণের নিয়ম স্পষ্ট করা জরুরি।
বায়রার সদস্যদের ভাষ্য, আগে যেখানে ১০০টি প্রসেসিং এজেন্সি ছিল, এবার সেখানে ২৫টি প্রতিষ্ঠানকে রাখা হয়েছে। অন্যদিকে, আট শতাধিক রিক্রুটিং এজেন্সির পরিবর্তে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে ৩১২টিকে। এসব প্রতিষ্ঠান বাছাইয়ের মানদণ্ড ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
এ ছাড়া রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে কর্মী পাঠানোর কার্যক্রম সম্পন্ন করতে প্রসেসিং এজেন্সি বা সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেডের (বোয়েসেল) কাছ থেকে অনাপত্তিপত্র (এনওসি) নিতে হবে। ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, এতে একটি এজেন্সির কার্যক্রম অন্য প্রতিষ্ঠানের অনুমোদনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। ফলে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় মধ্যস্থতাকারীদের প্রভাব বাড়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বায়রার সদস্যদের মতে, মালয়েশিয়ার সরকার অনুমোদিক অভিবাসী কর্মী নিয়োগ ও ব্যবস্থাপনার অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ফরেন ওয়ার্কার্স সেন্ট্রালাইজড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের (এফডব্লিউসিএমএস) মাধ্যমে নিয়োগপ্রক্রিয়া পরিচালিত হলেও বিভিন্ন ধাপে স্বচ্ছতা নিশ্চিতের ব্যবস্থা স্পষ্ট নয়। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তৈরি করা এজেন্সির তালিকা নিয়েও বিতর্ক ছিল। বর্তমান সরকার সেই তালিকায় পরিবর্তন না আনায় পুরোনো সমস্যাগুলোর সমাধান হয়নি বলে মনে করছেন তারা।
এবিষয়ে জানতে চাইলে বায়রার সাবেক মহাসচিব বীর মুক্তিযোদ্ধা আলী হায়দার চৌধুরী সিটিজেন জার্নাল টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘মালয়েশিয়ায় শ্রম বাজার চালু হওয়ায় আমরা খুশি। কিন্তু কোন প্রক্রিয়ায় লোক পাঠানো হবে, কবে থেকে কর্মী পাঠানো শুরু হবে-সেসব বিষয়ে আমরা এখনো স্পষ্ট না। সরকারের পক্ষ থেকেও আমাদের এসব বিষয়ে কিছু বলা হচ্ছে না। ফলে অনেক এজেন্সিই এখনো দ্বিধাদ্বন্দ্বে রয়েছে। এগুলো স্পষ্ট না করলে মালয়েশিয়ায় শ্রম বাজার নিয়ে একটা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে।’
স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে
অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন ব্যবস্থায় কর্মী নিয়োগের একাধিক ধাপ নির্ধারণ করা হলেও প্রতিটি ধাপে অনিয়ম প্রতিরোধ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার কার্যকর পদ্ধতি প্রকাশ করা হয়নি।
এবিষয়ে কথা হয় অভিবাসন বিষয়ক বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীরের সঙ্গে। তিনি সিটিজেন জার্নাল টোয়েন্টি ফোরকে বলেন, ‘মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার চালুর ঘোষণা কিছুটা অপরিপক্ব মনে হয়েছে। কারণ, এখানে দুই পক্ষ রয়েছে-বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া। মালয়েশিয়া তাদের অনুমোদিত এজেন্সির নাম প্রকাশ করলেও বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রক্রিয়াটি কীভাবে বাস্তবায়ন করবে, সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট ধারণা দিতে পারেনি। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে যে বক্তব্য বা প্রেস বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হচ্ছে, সেগুলোর সঙ্গে মালয়েশিয়ার অবস্থানের কতটা সামঞ্জস্য রয়েছে, সেটিও পরিষ্কার নয়।’
আসিফ মুনীর আরও বলেন, ডিসেম্বর মাসে দুই দেশের বর্তমান সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা। এই সময়ের মধ্যে সেটি পর্যালোচনা করে জানুয়ারিতে নতুন সমঝোতা স্মারক করা যেতে পারে। সেখানে কর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া, এজেন্সির অংশগ্রহণ এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার বিষয়গুলো স্পষ্ট করা প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে শ্রমবাজার পুরোপুরি চালু হতে ডিসেম্বর বা জানুয়ারি পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
সরকারের বক্তব্য
স্বচ্ছতা নিয়ে ব্যবসায়ী ও বিশেষজ্ঞদের প্রশ্নের বিষয়ে এখনই কথা বলতে চাননি প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। গত ২২ অক্টোবর মন্ত্রণালয়ে একটি অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমাদের যা জানানোর ছিল, তা আমরা প্রেস রিলিজের মাধ্যমে জানিয়েছি। পরবর্তীতে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করলে আপনাদের জানানো হবে।’
মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর সরকারের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো মালয়েশিয়ায় নিয়োগদাতা খুঁজে চাকরির চাহিদাপত্র সংগ্রহ এবং কর্মী নির্বাচন করতে পারবে। এরপর কলিং ভিসা, ই-ভিসাসহ প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় বোয়েসেল ও ২৫টি প্রসেসিং এজেন্সি সহায়তা করবে। পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সি বাংলাদেশের নিয়ম অনুযায়ী জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) ছাড়পত্র নেবে। তবে এসব ধাপে দায়িত্ব ও জবাবদিহির বিস্তারিত কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।
তবে বাংলাদেশ থেকে কতসংখ্যক কর্মী মালয়েশিয়ায় পাঠানো হতে পারে এবং দেশটিতে বিনা মূল্যে ১০ হাজার কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া সম্পর্কে একটি ধারণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান।
এ বিষয়ে ডা. জাহেদ উর রহমান গত ১ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরের (পিআইডি) সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে বলেন, আগামী ছয় মাসের মধ্যে মালয়েশিয়া বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২ লাখ জনশক্তি নেওয়ার বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ অনুরোধে ১০ হাজার কর্মী সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে যাওয়ার সুযোগ পাবেন।
বিনা মূল্যে কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়ার বিষয়ে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, মালয়েশিয়ায় সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে প্রথম বহরটি সরকারি প্রতিষ্ঠান বোয়েসেলের মাধ্যমে বিশেষ চার্টার্ড ফ্লাইটে পাঠানো হবে। এর মাধ্যমে অভিবাসন ব্যয় পুরোপুরি শূন্যে নামিয়ে আনার এক নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি হবে।
আগের দুই দফায় বন্ধ হয়েছিল শ্রমবাজার
২০০৯ সাল থেকে বন্ধ থাকা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার ২০১৬ সালের শেষ দিকে জি-টু-জি প্লাস প্রক্রিয়ায় চালু হয়। সে সময় মাত্র ১০টি রিক্রুটিং এজেন্সি কর্মী পাঠানোর সুযোগ পায়। তবে সে সময় সরকার নির্ধারিত ৩৩ হাজার ৩৭৫ টাকার পরিবর্তে কর্মীদের কাছ থেকে সাড়ে ৩ লাখ থেকে ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায়ের অভিযোগ ওঠে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশি কর্মী নেওয়া বন্ধ করে মালয়েশিয়া।
২০২১ সালের ১৮ ডিসেম্বর দুই দেশের মধ্যে নতুন সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়। ওই সময় প্রথমে ২৫টি এজেন্সিকে কর্মী পাঠানোর অনুমতি দেওয়া হয়। পরে সিন্ডিকেট করার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বোয়েসেলসহ আরও ৭৫টি এজেন্সিকে এই সুযোগ দেওয়া হয়। কিন্তু কর্মীদের কাছ থেকে তখনও সরকার নির্ধারিত ৭৮ হাজার ৯৯০ টাকার পরিবর্তে সাড়ে ৫ লাখ থেকে ৬ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এরপর ২০২৪ সালের ৩১ মে আবারও বন্ধ হয়ে যায় মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার।

দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খুলে দেওয়া হচ্ছে। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে দেশটিতে বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরুর ঘোষণা দিয়েছে সরকার। উপরন্তু সরকারের পক্ষ থেকে এবার বিনা খরচে ১০ হাজার কর্মীকে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অতীতে দেশটিতে সরকার নির্ধারিত টাকায় কর্মী পাঠানো, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতাসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে বেশ কয়েকবার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে অসাধু রিক্রুটিং এজেন্সি এবং দালাল চক্রের অপতৎপরতায় সেসব উদ্যোগ বারবার হোঁচট খেয়েছে।
মূলত কর্মী নিয়োগের নিয়ম, অভিবাসন ব্যয় নির্ধারণ ও রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর দায়িত্ব বণ্টন নিয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা না থাকায় পুরো প্রক্রিয়ার বাস্তবায়ন নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এবার নতুন ব্যবস্থাপনায় সরকারি প্রতিষ্ঠান বোয়েসেলসহ ৩১২টি রিক্রুটিং এজেন্সি, ২৫টি প্রসেসিং এজেন্সি যুক্ত করার কথা জানানো হয়েছে। গত ১৫ অক্টোবর প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে নতুন করে কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরুর ঘোষণা দেওয়া হয়। তবে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর মালিকদের অভিযোগ, এজেন্সিগুলো কীভাবে তালিকাভুক্ত হলো, কর্মীরা কত টাকা খরচে মালয়েশিয়া যেতে পারবেন এবং বিনা খরচে যাওয়ার সুযোগ কারা পাবেন-এসব বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি। এমনকি তালিকাভুক্ত রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোও বলছে, কীভাবে কাজ শুরু করতে হবে- সে বিষয়ে তারা আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা পায়নি।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে অতীতে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে সিন্ডিকেট ও অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, তার পুনরাবৃত্তি হতে পারে। এতে কর্মীরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ এই শ্রমবাজার আবারও বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
২০২২ সালে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে কর্মী নিয়োগ সংক্রান্ত যে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়, সেই অনুযায়ী কর্মী প্রেরণকারী বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সি (জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান) বাছাই করার দায়িত্ব এককভাবে মালয়েশিয়া সরকারের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে। এ সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত রয়েছে। এ কারণেই মালয়েশিয়া সরকারের আরোপিত শর্ত পরিবর্তন করাটা বাংলাদেশের পক্ষে সহজ নয় বলে মনে করেন অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, বাজার খোলার ঘোষণার পাশাপাশি কর্মী পাঠানোর সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি ঠিক কেমন হবে, তা কার্যকর অভিবাসন কূটনীতির মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারকে আগেই আরও স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট করার দরকার ছিল।
ঘোষণা আছে, নির্দেশনা নেই
রিক্রুটিং এজেন্সিদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজের (বায়রা) সদস্যসহ সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, শুধু সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে শ্রমবাজার চালুর ঘোষণা দিলেই স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয় না। কর্মী নিয়োগের ধাপ, এজেন্সিগুলোর দায়িত্ব এবং অভিবাসন ব্যয় নির্ধারণের নিয়ম স্পষ্ট করা জরুরি।
বায়রার সদস্যদের ভাষ্য, আগে যেখানে ১০০টি প্রসেসিং এজেন্সি ছিল, এবার সেখানে ২৫টি প্রতিষ্ঠানকে রাখা হয়েছে। অন্যদিকে, আট শতাধিক রিক্রুটিং এজেন্সির পরিবর্তে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে ৩১২টিকে। এসব প্রতিষ্ঠান বাছাইয়ের মানদণ্ড ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
এ ছাড়া রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে কর্মী পাঠানোর কার্যক্রম সম্পন্ন করতে প্রসেসিং এজেন্সি বা সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেডের (বোয়েসেল) কাছ থেকে অনাপত্তিপত্র (এনওসি) নিতে হবে। ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, এতে একটি এজেন্সির কার্যক্রম অন্য প্রতিষ্ঠানের অনুমোদনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। ফলে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় মধ্যস্থতাকারীদের প্রভাব বাড়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বায়রার সদস্যদের মতে, মালয়েশিয়ার সরকার অনুমোদিক অভিবাসী কর্মী নিয়োগ ও ব্যবস্থাপনার অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ফরেন ওয়ার্কার্স সেন্ট্রালাইজড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের (এফডব্লিউসিএমএস) মাধ্যমে নিয়োগপ্রক্রিয়া পরিচালিত হলেও বিভিন্ন ধাপে স্বচ্ছতা নিশ্চিতের ব্যবস্থা স্পষ্ট নয়। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তৈরি করা এজেন্সির তালিকা নিয়েও বিতর্ক ছিল। বর্তমান সরকার সেই তালিকায় পরিবর্তন না আনায় পুরোনো সমস্যাগুলোর সমাধান হয়নি বলে মনে করছেন তারা।
এবিষয়ে জানতে চাইলে বায়রার সাবেক মহাসচিব বীর মুক্তিযোদ্ধা আলী হায়দার চৌধুরী সিটিজেন জার্নাল টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘মালয়েশিয়ায় শ্রম বাজার চালু হওয়ায় আমরা খুশি। কিন্তু কোন প্রক্রিয়ায় লোক পাঠানো হবে, কবে থেকে কর্মী পাঠানো শুরু হবে-সেসব বিষয়ে আমরা এখনো স্পষ্ট না। সরকারের পক্ষ থেকেও আমাদের এসব বিষয়ে কিছু বলা হচ্ছে না। ফলে অনেক এজেন্সিই এখনো দ্বিধাদ্বন্দ্বে রয়েছে। এগুলো স্পষ্ট না করলে মালয়েশিয়ায় শ্রম বাজার নিয়ে একটা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে।’
স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে
অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন ব্যবস্থায় কর্মী নিয়োগের একাধিক ধাপ নির্ধারণ করা হলেও প্রতিটি ধাপে অনিয়ম প্রতিরোধ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার কার্যকর পদ্ধতি প্রকাশ করা হয়নি।
এবিষয়ে কথা হয় অভিবাসন বিষয়ক বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীরের সঙ্গে। তিনি সিটিজেন জার্নাল টোয়েন্টি ফোরকে বলেন, ‘মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার চালুর ঘোষণা কিছুটা অপরিপক্ব মনে হয়েছে। কারণ, এখানে দুই পক্ষ রয়েছে-বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া। মালয়েশিয়া তাদের অনুমোদিত এজেন্সির নাম প্রকাশ করলেও বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রক্রিয়াটি কীভাবে বাস্তবায়ন করবে, সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট ধারণা দিতে পারেনি। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে যে বক্তব্য বা প্রেস বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হচ্ছে, সেগুলোর সঙ্গে মালয়েশিয়ার অবস্থানের কতটা সামঞ্জস্য রয়েছে, সেটিও পরিষ্কার নয়।’
আসিফ মুনীর আরও বলেন, ডিসেম্বর মাসে দুই দেশের বর্তমান সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা। এই সময়ের মধ্যে সেটি পর্যালোচনা করে জানুয়ারিতে নতুন সমঝোতা স্মারক করা যেতে পারে। সেখানে কর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া, এজেন্সির অংশগ্রহণ এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার বিষয়গুলো স্পষ্ট করা প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে শ্রমবাজার পুরোপুরি চালু হতে ডিসেম্বর বা জানুয়ারি পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
সরকারের বক্তব্য
স্বচ্ছতা নিয়ে ব্যবসায়ী ও বিশেষজ্ঞদের প্রশ্নের বিষয়ে এখনই কথা বলতে চাননি প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। গত ২২ অক্টোবর মন্ত্রণালয়ে একটি অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমাদের যা জানানোর ছিল, তা আমরা প্রেস রিলিজের মাধ্যমে জানিয়েছি। পরবর্তীতে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করলে আপনাদের জানানো হবে।’
মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর সরকারের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো মালয়েশিয়ায় নিয়োগদাতা খুঁজে চাকরির চাহিদাপত্র সংগ্রহ এবং কর্মী নির্বাচন করতে পারবে। এরপর কলিং ভিসা, ই-ভিসাসহ প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় বোয়েসেল ও ২৫টি প্রসেসিং এজেন্সি সহায়তা করবে। পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সি বাংলাদেশের নিয়ম অনুযায়ী জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) ছাড়পত্র নেবে। তবে এসব ধাপে দায়িত্ব ও জবাবদিহির বিস্তারিত কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।
তবে বাংলাদেশ থেকে কতসংখ্যক কর্মী মালয়েশিয়ায় পাঠানো হতে পারে এবং দেশটিতে বিনা মূল্যে ১০ হাজার কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া সম্পর্কে একটি ধারণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান।
এ বিষয়ে ডা. জাহেদ উর রহমান গত ১ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরের (পিআইডি) সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে বলেন, আগামী ছয় মাসের মধ্যে মালয়েশিয়া বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২ লাখ জনশক্তি নেওয়ার বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ অনুরোধে ১০ হাজার কর্মী সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে যাওয়ার সুযোগ পাবেন।
বিনা মূল্যে কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়ার বিষয়ে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, মালয়েশিয়ায় সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে প্রথম বহরটি সরকারি প্রতিষ্ঠান বোয়েসেলের মাধ্যমে বিশেষ চার্টার্ড ফ্লাইটে পাঠানো হবে। এর মাধ্যমে অভিবাসন ব্যয় পুরোপুরি শূন্যে নামিয়ে আনার এক নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি হবে।
আগের দুই দফায় বন্ধ হয়েছিল শ্রমবাজার
২০০৯ সাল থেকে বন্ধ থাকা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার ২০১৬ সালের শেষ দিকে জি-টু-জি প্লাস প্রক্রিয়ায় চালু হয়। সে সময় মাত্র ১০টি রিক্রুটিং এজেন্সি কর্মী পাঠানোর সুযোগ পায়। তবে সে সময় সরকার নির্ধারিত ৩৩ হাজার ৩৭৫ টাকার পরিবর্তে কর্মীদের কাছ থেকে সাড়ে ৩ লাখ থেকে ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায়ের অভিযোগ ওঠে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশি কর্মী নেওয়া বন্ধ করে মালয়েশিয়া।
২০২১ সালের ১৮ ডিসেম্বর দুই দেশের মধ্যে নতুন সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়। ওই সময় প্রথমে ২৫টি এজেন্সিকে কর্মী পাঠানোর অনুমতি দেওয়া হয়। পরে সিন্ডিকেট করার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বোয়েসেলসহ আরও ৭৫টি এজেন্সিকে এই সুযোগ দেওয়া হয়। কিন্তু কর্মীদের কাছ থেকে তখনও সরকার নির্ধারিত ৭৮ হাজার ৯৯০ টাকার পরিবর্তে সাড়ে ৫ লাখ থেকে ৬ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এরপর ২০২৪ সালের ৩১ মে আবারও বন্ধ হয়ে যায় মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার।

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার, দায়সারা ঘোষণায় কাটছে না ধোঁয়াশা
জুবায়ের আহমেদ

দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খুলে দেওয়া হচ্ছে। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে দেশটিতে বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরুর ঘোষণা দিয়েছে সরকার। উপরন্তু সরকারের পক্ষ থেকে এবার বিনা খরচে ১০ হাজার কর্মীকে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অতীতে দেশটিতে সরকার নির্ধারিত টাকায় কর্মী পাঠানো, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতাসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে বেশ কয়েকবার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে অসাধু রিক্রুটিং এজেন্সি এবং দালাল চক্রের অপতৎপরতায় সেসব উদ্যোগ বারবার হোঁচট খেয়েছে।
মূলত কর্মী নিয়োগের নিয়ম, অভিবাসন ব্যয় নির্ধারণ ও রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর দায়িত্ব বণ্টন নিয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা না থাকায় পুরো প্রক্রিয়ার বাস্তবায়ন নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এবার নতুন ব্যবস্থাপনায় সরকারি প্রতিষ্ঠান বোয়েসেলসহ ৩১২টি রিক্রুটিং এজেন্সি, ২৫টি প্রসেসিং এজেন্সি যুক্ত করার কথা জানানো হয়েছে। গত ১৫ অক্টোবর প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে নতুন করে কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরুর ঘোষণা দেওয়া হয়। তবে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর মালিকদের অভিযোগ, এজেন্সিগুলো কীভাবে তালিকাভুক্ত হলো, কর্মীরা কত টাকা খরচে মালয়েশিয়া যেতে পারবেন এবং বিনা খরচে যাওয়ার সুযোগ কারা পাবেন-এসব বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি। এমনকি তালিকাভুক্ত রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোও বলছে, কীভাবে কাজ শুরু করতে হবে- সে বিষয়ে তারা আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা পায়নি।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে অতীতে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে সিন্ডিকেট ও অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, তার পুনরাবৃত্তি হতে পারে। এতে কর্মীরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ এই শ্রমবাজার আবারও বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
২০২২ সালে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে কর্মী নিয়োগ সংক্রান্ত যে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়, সেই অনুযায়ী কর্মী প্রেরণকারী বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সি (জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান) বাছাই করার দায়িত্ব এককভাবে মালয়েশিয়া সরকারের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে। এ সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত রয়েছে। এ কারণেই মালয়েশিয়া সরকারের আরোপিত শর্ত পরিবর্তন করাটা বাংলাদেশের পক্ষে সহজ নয় বলে মনে করেন অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, বাজার খোলার ঘোষণার পাশাপাশি কর্মী পাঠানোর সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি ঠিক কেমন হবে, তা কার্যকর অভিবাসন কূটনীতির মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারকে আগেই আরও স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট করার দরকার ছিল।
ঘোষণা আছে, নির্দেশনা নেই
রিক্রুটিং এজেন্সিদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজের (বায়রা) সদস্যসহ সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, শুধু সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে শ্রমবাজার চালুর ঘোষণা দিলেই স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয় না। কর্মী নিয়োগের ধাপ, এজেন্সিগুলোর দায়িত্ব এবং অভিবাসন ব্যয় নির্ধারণের নিয়ম স্পষ্ট করা জরুরি।
বায়রার সদস্যদের ভাষ্য, আগে যেখানে ১০০টি প্রসেসিং এজেন্সি ছিল, এবার সেখানে ২৫টি প্রতিষ্ঠানকে রাখা হয়েছে। অন্যদিকে, আট শতাধিক রিক্রুটিং এজেন্সির পরিবর্তে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে ৩১২টিকে। এসব প্রতিষ্ঠান বাছাইয়ের মানদণ্ড ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
এ ছাড়া রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে কর্মী পাঠানোর কার্যক্রম সম্পন্ন করতে প্রসেসিং এজেন্সি বা সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেডের (বোয়েসেল) কাছ থেকে অনাপত্তিপত্র (এনওসি) নিতে হবে। ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, এতে একটি এজেন্সির কার্যক্রম অন্য প্রতিষ্ঠানের অনুমোদনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। ফলে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় মধ্যস্থতাকারীদের প্রভাব বাড়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বায়রার সদস্যদের মতে, মালয়েশিয়ার সরকার অনুমোদিক অভিবাসী কর্মী নিয়োগ ও ব্যবস্থাপনার অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ফরেন ওয়ার্কার্স সেন্ট্রালাইজড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের (এফডব্লিউসিএমএস) মাধ্যমে নিয়োগপ্রক্রিয়া পরিচালিত হলেও বিভিন্ন ধাপে স্বচ্ছতা নিশ্চিতের ব্যবস্থা স্পষ্ট নয়। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তৈরি করা এজেন্সির তালিকা নিয়েও বিতর্ক ছিল। বর্তমান সরকার সেই তালিকায় পরিবর্তন না আনায় পুরোনো সমস্যাগুলোর সমাধান হয়নি বলে মনে করছেন তারা।
এবিষয়ে জানতে চাইলে বায়রার সাবেক মহাসচিব বীর মুক্তিযোদ্ধা আলী হায়দার চৌধুরী সিটিজেন জার্নাল টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘মালয়েশিয়ায় শ্রম বাজার চালু হওয়ায় আমরা খুশি। কিন্তু কোন প্রক্রিয়ায় লোক পাঠানো হবে, কবে থেকে কর্মী পাঠানো শুরু হবে-সেসব বিষয়ে আমরা এখনো স্পষ্ট না। সরকারের পক্ষ থেকেও আমাদের এসব বিষয়ে কিছু বলা হচ্ছে না। ফলে অনেক এজেন্সিই এখনো দ্বিধাদ্বন্দ্বে রয়েছে। এগুলো স্পষ্ট না করলে মালয়েশিয়ায় শ্রম বাজার নিয়ে একটা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে।’
স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে
অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন ব্যবস্থায় কর্মী নিয়োগের একাধিক ধাপ নির্ধারণ করা হলেও প্রতিটি ধাপে অনিয়ম প্রতিরোধ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার কার্যকর পদ্ধতি প্রকাশ করা হয়নি।
এবিষয়ে কথা হয় অভিবাসন বিষয়ক বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীরের সঙ্গে। তিনি সিটিজেন জার্নাল টোয়েন্টি ফোরকে বলেন, ‘মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার চালুর ঘোষণা কিছুটা অপরিপক্ব মনে হয়েছে। কারণ, এখানে দুই পক্ষ রয়েছে-বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া। মালয়েশিয়া তাদের অনুমোদিত এজেন্সির নাম প্রকাশ করলেও বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রক্রিয়াটি কীভাবে বাস্তবায়ন করবে, সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট ধারণা দিতে পারেনি। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে যে বক্তব্য বা প্রেস বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হচ্ছে, সেগুলোর সঙ্গে মালয়েশিয়ার অবস্থানের কতটা সামঞ্জস্য রয়েছে, সেটিও পরিষ্কার নয়।’
আসিফ মুনীর আরও বলেন, ডিসেম্বর মাসে দুই দেশের বর্তমান সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা। এই সময়ের মধ্যে সেটি পর্যালোচনা করে জানুয়ারিতে নতুন সমঝোতা স্মারক করা যেতে পারে। সেখানে কর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া, এজেন্সির অংশগ্রহণ এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার বিষয়গুলো স্পষ্ট করা প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে শ্রমবাজার পুরোপুরি চালু হতে ডিসেম্বর বা জানুয়ারি পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
সরকারের বক্তব্য
স্বচ্ছতা নিয়ে ব্যবসায়ী ও বিশেষজ্ঞদের প্রশ্নের বিষয়ে এখনই কথা বলতে চাননি প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। গত ২২ অক্টোবর মন্ত্রণালয়ে একটি অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমাদের যা জানানোর ছিল, তা আমরা প্রেস রিলিজের মাধ্যমে জানিয়েছি। পরবর্তীতে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করলে আপনাদের জানানো হবে।’
মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর সরকারের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো মালয়েশিয়ায় নিয়োগদাতা খুঁজে চাকরির চাহিদাপত্র সংগ্রহ এবং কর্মী নির্বাচন করতে পারবে। এরপর কলিং ভিসা, ই-ভিসাসহ প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় বোয়েসেল ও ২৫টি প্রসেসিং এজেন্সি সহায়তা করবে। পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সি বাংলাদেশের নিয়ম অনুযায়ী জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) ছাড়পত্র নেবে। তবে এসব ধাপে দায়িত্ব ও জবাবদিহির বিস্তারিত কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।
তবে বাংলাদেশ থেকে কতসংখ্যক কর্মী মালয়েশিয়ায় পাঠানো হতে পারে এবং দেশটিতে বিনা মূল্যে ১০ হাজার কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া সম্পর্কে একটি ধারণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান।
এ বিষয়ে ডা. জাহেদ উর রহমান গত ১ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরের (পিআইডি) সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে বলেন, আগামী ছয় মাসের মধ্যে মালয়েশিয়া বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২ লাখ জনশক্তি নেওয়ার বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ অনুরোধে ১০ হাজার কর্মী সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে যাওয়ার সুযোগ পাবেন।
বিনা মূল্যে কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়ার বিষয়ে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, মালয়েশিয়ায় সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে প্রথম বহরটি সরকারি প্রতিষ্ঠান বোয়েসেলের মাধ্যমে বিশেষ চার্টার্ড ফ্লাইটে পাঠানো হবে। এর মাধ্যমে অভিবাসন ব্যয় পুরোপুরি শূন্যে নামিয়ে আনার এক নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি হবে।
আগের দুই দফায় বন্ধ হয়েছিল শ্রমবাজার
২০০৯ সাল থেকে বন্ধ থাকা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার ২০১৬ সালের শেষ দিকে জি-টু-জি প্লাস প্রক্রিয়ায় চালু হয়। সে সময় মাত্র ১০টি রিক্রুটিং এজেন্সি কর্মী পাঠানোর সুযোগ পায়। তবে সে সময় সরকার নির্ধারিত ৩৩ হাজার ৩৭৫ টাকার পরিবর্তে কর্মীদের কাছ থেকে সাড়ে ৩ লাখ থেকে ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায়ের অভিযোগ ওঠে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশি কর্মী নেওয়া বন্ধ করে মালয়েশিয়া।
২০২১ সালের ১৮ ডিসেম্বর দুই দেশের মধ্যে নতুন সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়। ওই সময় প্রথমে ২৫টি এজেন্সিকে কর্মী পাঠানোর অনুমতি দেওয়া হয়। পরে সিন্ডিকেট করার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বোয়েসেলসহ আরও ৭৫টি এজেন্সিকে এই সুযোগ দেওয়া হয়। কিন্তু কর্মীদের কাছ থেকে তখনও সরকার নির্ধারিত ৭৮ হাজার ৯৯০ টাকার পরিবর্তে সাড়ে ৫ লাখ থেকে ৬ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এরপর ২০২৪ সালের ৩১ মে আবারও বন্ধ হয়ে যায় মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার।

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলার পথে যেসব বাধা
মালয়েশিয়ায় শ্রমবাজার: ৪৯ রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স বাতিলই থাকছে
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে সিন্ডিকেটমুক্ত করার দাবিতে বায়রার স্মারকলিপি







