এক্সপ্লেইনার

ইরানে নতুন হামলার পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্রের, ট্রাম্প কি অনুমতি দেবেন

ইরানে নতুন হামলার পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্রের, ট্রাম্প কি অনুমতি দেবেন
মেরিল্যান্ডের বাল্টিমোর কাউন্টির স্প্যারোস পয়েন্ট শিপইয়ার্ডে একটি অনুষ্ঠানে মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে করমর্দন করছেন।

ইরানে নতুন করে সামরিক হামলার পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির সামরিক বাহিনী মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনীর দায়িত্বে থাকা সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) নেতৃত্বে সম্ভাব্য হামলার বিভিন্ন পরিকল্পনা তৈরি করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অনুমতি দিলে এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হতে পারে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছে পেন্টাগন। সম্ভাব্য হামলার লক্ষ্যবস্তু হিসেবে ইরানের জ্বালানি স্থাপনা, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও পারমাণবিক কেন্দ্রের কথা আলোচনায় এসেছে।

তবে সামরিক পরিকল্পনা তৈরি হওয়া মানেই হামলার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হওয়া নয়। ট্রাম্প এখনো এ বিষয়ে স্পষ্ট ঘোষণা দেননি। বরং তাঁর বক্তব্যে একদিকে সামরিক পদক্ষেপের ইঙ্গিত রয়েছে, অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে নতুন চুক্তির সম্ভাবনাও তুলে ধরা হয়েছে।

বার্তা সংস্থা আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

হামলার প্রস্তুতি কত দূর এগিয়েছে

মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য হিলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেন্টকম নতুন হামলার জন্য একাধিক পরিকল্পনা তৈরি করে রেখেছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের বিবেচনার জন্যও কয়েকটি বিকল্প প্রস্তুত করা হয়েছে।

এর আগে চলতি মাসের শুরুতে মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানায়, ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান আবার শুরু করার সম্ভাবনা বিবেচনায় রেখে সেন্টকমকে প্রস্তুতি নিতে বলেছে পেন্টাগন।

এদিকে দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে হামলার যৌথ পরিকল্পনা তৈরি করেছে।

এসব পরিকল্পনার বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। ট্রাম্প কোন পরিকল্পনায় সম্মতি দেবেন, কিংবা আদৌ হামলার নির্দেশ দেবেন কি না, তা স্পষ্ট নয়।

তবে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর প্রস্তুতি চলছে। নভেম্বরের শেষ নাগাদ ওই অঞ্চলে তৃতীয় বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস থিওডোর রুজভেল্ট, প্রায় ১০ হাজার অতিরিক্ত সেনা এবং ১৩তম মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট মোতায়েনের পরিকল্পনার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

চ্যাথাম হাউসের সহযোগী গবেষক জুলি নরম্যানের মতে, এসব প্রস্তুতির দুটি উদ্দেশ্য থাকতে পারে। প্রথমত, ইরানকে সামরিক শক্তির বার্তা দেওয়া। দ্বিতীয়ত, মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর প্রয়োজন হলে বড় ধরনের অভিযান চালানোর সুযোগ তৈরি রাখা।

ট্রাম্প কি শিগগিরই হামলার নির্দেশ দেবেন

ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্যে হামলার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। শুক্রবার এক সমাবেশে তিনি ইরানের বিরুদ্ধে আরেকটি ছোট সামরিক অভিযান চালানোর সম্ভাবনার কথা বলেন। এ সময় তিনি গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া সামরিক অভিযানের নাম ‘এপিক ফিউরি’ উল্লেখ করেন।

পরদিন শনিবারও সম্ভাব্য হামলার নির্দিষ্ট সময় জানাতে রাজি হননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তবে দ্রুত হামলা হতে পারে, এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে ইরানের সঙ্গে একটি বড় চুক্তিতে পৌঁছানোর সম্ভাবনার কথাও বলেছেন।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থার একটি স্মারকলিপিতে ইরানের পক্ষ থেকে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন অঞ্চলে মার্কিন কর্মীদের লক্ষ্যবস্তু করার চেষ্টা বাড়ানোর অভিযোগ তোলা হয়েছে। ওই স্মারকলিপিতে বলা হয়েছে, এ ধরনের কয়েকটি ষড়যন্ত্র উন্নত পর্যায়ে পৌঁছেছে।

এ সতর্কতার পর কয়েকটি আঞ্চলিক মার্কিন দূতাবাসে কর্মী কমানোর নির্দেশ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর। তবে প্রকাশ্যে আসা স্মারকলিপিতে নির্দিষ্ট কোনো সম্ভাব্য হামলার লক্ষ্যবস্তু বা সময়ের উল্লেখ নেই।

বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক প্রস্তুতি, নিরাপত্তা সতর্কতা এবং ট্রাম্পের বক্তব্য মিলিয়ে পরিস্থিতি অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। তবে এসব পদক্ষেপের কোনটি সরাসরি হামলার সিদ্ধান্তের ইঙ্গিত, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

ইরানের অবস্থান কী

যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে হামলা চালালে পাল্টা জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। একই সঙ্গে দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছানোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন।

শনিবার এক বক্তব্যে পেজেশকিয়ান যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আলোচনা ব্যাহত করার অভিযোগ তোলেন। তবে তিনি বলেন, একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর চেষ্টা অব্যাহত রাখা উচিত।

ইরানের সামরিক বাহিনীও নিজেদের অবস্থান কঠোর করার ইঙ্গিত দিয়েছে। দেশটির ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের মুখপাত্র হোসেন মোহেবি জানিয়েছেন, ইরানের প্রতিরক্ষানীতিতে পরিবর্তন আনা হচ্ছে। আগে কোনো দেশ আক্রমণ করলে জবাব দেওয়ার নীতি অনুসরণ করা হলেও এখন পাল্টা আক্রমণের প্রস্তুতির কথাও বলা হচ্ছে।

এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ব্যবহৃত সামরিক ঘাঁটি যেসব দেশে রয়েছে, সেসব দেশও সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হতে পারে বলে সতর্ক করেছে ইরান।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে ইরানি নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল নতুন করে হামলা শুরু করলে পারস্য উপসাগরে সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে যাওয়া যোগাযোগের তারগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার পরিকল্পনা করেছে তেহরান।

এদিকে, ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, দেশটির সেনাবাহিনী দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরনগর বান্দার আব্বাসের আকাশে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি একটি ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করেছে।

ইরানের এসব বক্তব্য ও পদক্ষেপ থেকে বোঝা যাচ্ছে, নতুন করে হামলা হলে সংঘাত শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ না-ও থাকতে পারে। জ্বালানি স্থাপনা, সমুদ্রপথ ও যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক মিত্রদের নিরাপত্তাও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

হরমুজ প্রণালিতে কেন বাড়ছে উদ্বেগ

বিশ্বের জ্বালানি বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি ঘিরেও উদ্বেগ বাড়ছে। ইরানের কাছাকাছি এই সমুদ্রপথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ তেল পরিবহন করা হয়। ফলে এখানে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড় প্রভাব পড়তে পারে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর অক্টোবর মাসে হরমুজ প্রণালির কাছে জাহাজে হামলার ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটেছে। এ পর্যন্ত ১২০টির বেশি হামলার খবর পাওয়া গেছে। এ মাসে কয়েকটি তেলবাহী ট্যাংকারে আগুন লাগা বা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে জাহাজ চলাচল আরও বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা-পাল্টা হামলা হলে পুরো অঞ্চলের অর্থনীতি ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে উঠতে পারে।

নতুন হামলায় কি লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে যুক্তরাষ্ট্র

ইরানে নতুন করে হামলার পরিকল্পনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে বড় প্রশ্ন হলো, সামরিক অভিযান চালিয়ে শেষ পর্যন্ত কী অর্জন করা সম্ভব হবে।

কাতারের দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের অধ্যাপক মোহাম্মদ এলমাসরির মতে, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ কূটনৈতিক সমাধানের চেয়ে নতুন করে সংঘাত শুরুর আশঙ্কাই বাড়াচ্ছে। তাঁর ধারণা, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল শিগগিরই ইরানে আরেক দফা হামলার প্রস্তুতি নিতে পারে।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও ইরানের সরকার পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়ে কথা বলেছেন। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপের পেছনে কী লক্ষ্য কাজ করছে, তা নিয়েও আলোচনা চলছে।

তবে বিশ্লেষকদের একটি বড় প্রশ্ন, আগের সামরিক অভিযানগুলো যে ফল আনতে পারেনি, নতুন হামলা চালিয়ে তা কীভাবে অর্জন করা সম্ভব হবে।

জুলি নরম্যানের মতে, ট্রাম্পের সামরিক উপদেষ্টাদের সামনে মূল প্রশ্ন হলো, উত্তেজনার নতুন পর্যায় থেকে এমন কী অর্জন করা যাবে, যা আগের পদক্ষেপগুলোতে সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে সামরিক চাপ বাড়ালে ইরান আলোচনার টেবিলে আসবে কি না, তার কোনো স্পষ্ট উত্তর নেই।

সব মিলিয়ে, ইরানে নতুন হামলার সম্ভাবনা তৈরি হলেও ট্রাম্পের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো অনিশ্চিত। সামরিক প্রস্তুতির পাশাপাশি কূটনৈতিক আলোচনার পথও খোলা রয়েছে। তবে দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি হুঁশিয়ারি এবং মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক তৎপরতা বাড়তে থাকায় নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

/এমআর/