সার্টিফিকেটের পাহাড়, চাকরি নেই—সমস্যাটা কোথায়?

চাকরি ডেস্ক
চাকরি ডেস্ক
 সার্টিফিকেটের পাহাড়, চাকরি নেই—সমস্যাটা কোথায়?
ক্যারিয়ার। ছবি: এআই (সিজেডএন২৪ সম্পাদিত)

একাধিক ডিগ্রি, বিভিন্ন কোর্সের সার্টিফিকেট, প্রশিক্ষণের সনদ—চাকরিপ্রার্থীদের অনেকের সিভিতে এসবের কমতি নেই। তারপরও কাঙ্ক্ষিত চাকরি মিলছে না। আবেদন করছেন একের পর এক প্রতিষ্ঠানে, দিচ্ছেন লিখিত পরীক্ষা ও সাক্ষাৎকার; কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিয়োগের তালিকায় নাম থাকছে না। ফলে অনেকের মধ্যেই প্রশ্ন উঠছে—এত সার্টিফিকেট থাকার পরও চাকরি না পাওয়ার কারণ কী?

বিশেষজ্ঞদের মতে, চাকরির বাজারে এখন শুধু শিক্ষাগত যোগ্যতা বা সার্টিফিকেট দেখেই নিয়োগ দেওয়া হয় না। একটি পদের জন্য প্রার্থীর বাস্তব দক্ষতা, কাজ শেখার সক্ষমতা, যোগাযোগের ধরন, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা এবং সংশ্লিষ্ট কাজে অভিজ্ঞতা—এসব বিষয়ও গুরুত্ব পায়। ফলে সার্টিফিকেট যতই থাকুক, প্রয়োজনীয় দক্ষতার ঘাটতি থাকলে চাকরি পাওয়া কঠিন হতে পারে।

শুধু ডিগ্রি নয়, দরকার ব্যবহারিক দক্ষতা

বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি একজন প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রমাণ দেয়। বিভিন্ন প্রশিক্ষণের সার্টিফিকেটও দেখায় যে তিনি নির্দিষ্ট বিষয়ে কোনো কোর্স করেছেন। কিন্তু নিয়োগদাতা সাধারণত জানতে চান—প্রার্থী সেই জ্ঞান বাস্তবে কাজে লাগাতে পারেন কি না।

ধরা যাক, কেউ ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের একাধিক কোর্স করেছেন। তাঁর সিভিতে কয়েকটি সার্টিফিকেটও রয়েছে। কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠানের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পরিচালনা, কনটেন্ট পরিকল্পনা, বিজ্ঞাপন ব্যবস্থাপনা বা ডেটা বিশ্লেষণের বাস্তব কাজ করতে না পারলে শুধু সার্টিফিকেট তাঁকে এগিয়ে দেবে না।

একইভাবে কম্পিউটার, গ্রাফিক ডিজাইন, প্রোগ্রামিং, হিসাবরক্ষণ বা ভাষা শেখার ক্ষেত্রেও সার্টিফিকেটের পাশাপাশি ব্যবহারিক দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ।

সিভিতে সার্টিফিকেট বেশি, কাজের প্রমাণ কম

অনেক চাকরিপ্রার্থী সিভিতে যত বেশি সম্ভব কোর্স ও সার্টিফিকেট যুক্ত করেন। এতে সিভি বড় হয়, কিন্তু নিয়োগদাতার কাছে প্রার্থীর সক্ষমতা সব সময় স্পষ্ট হয় না।

কোনো কোর্স করার পাশাপাশি সেই দক্ষতা দিয়ে কী কাজ করেছেন, কী প্রকল্প তৈরি করেছেন বা কী ধরনের ফলাফল পেয়েছেন—সেটি তুলে ধরা বেশি কার্যকর হতে পারে।

যেমন, ‘ডিজিটাল মার্কেটিং কোর্স সম্পন্ন’ লেখার পাশাপাশি কোনো ওয়েবসাইটের ট্রাফিক বাড়ানো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কনটেন্ট পরিচালনা বা বিজ্ঞাপন প্রচারণার ফলাফল থাকলে সেটি প্রার্থীর দক্ষতার বাস্তব প্রমাণ হিসেবে কাজ করতে পারে।

যোগাযোগ দক্ষতার ঘাটতিও বাধা

চাকরির ক্ষেত্রে শুধু কারিগরি দক্ষতা যথেষ্ট নয়। একজন কর্মীকে সহকর্মী, গ্রাহক, ব্যবস্থাপক বা প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন বিভাগের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করতে হয়।

সাক্ষাৎকারে নিজের কথা স্পষ্টভাবে বলতে না পারা, প্রশ্ন বুঝতে না পারা, নিজের দক্ষতা সম্পর্কে সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করতে না পারা কিংবা পেশাগত যোগাযোগের ক্ষেত্রে দুর্বলতা—চাকরি পাওয়ার পথে বাধা হতে পারে।

বাংলা ও ইংরেজিতে প্রয়োজন অনুযায়ী লিখিত ও মৌখিক যোগাযোগের দক্ষতাও অনেক পদের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা কতটা?

কর্মক্ষেত্রে প্রতিদিনই বিভিন্ন ধরনের সমস্যা তৈরি হয়। তাই প্রতিষ্ঠানগুলো এমন কর্মী চায়, যিনি শুধু নির্দেশের অপেক্ষায় না থেকে সমস্যার কারণ খুঁজে বের করতে এবং সম্ভাব্য সমাধান দিতে পারেন।

একজন প্রার্থী অনেক বিষয়ে সার্টিফিকেট অর্জন করলেও যদি বাস্তব পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নিতে বা সমস্যা বিশ্লেষণ করতে না পারেন, তাহলে তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা একা যথেষ্ট নাও হতে পারে।

এ কারণে চাকরিপ্রার্থীদের পড়াশোনা ও কোর্সের পাশাপাশি বাস্তবভিত্তিক কাজ, প্রকল্প এবং সমস্যা সমাধানের অনুশীলন করা প্রয়োজন।

অভিজ্ঞতা না থাকলে কী করবেন?

ফ্রেশারদের বড় একটি সমস্যা হলো—চাকরির জন্য অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়, কিন্তু চাকরি না পেলে অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগও তৈরি হয় না। এই অবস্থায় ইন্টার্নশিপ, স্বেচ্ছাসেবী কাজ, ফ্রিল্যান্সিং, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকল্প, ব্যক্তিগত প্রজেক্ট বা ছোট প্রতিষ্ঠানে কাজের অভিজ্ঞতা কাজে লাগতে পারে।

কোনো নির্দিষ্ট পেশায় যেতে চাইলে সেই ক্ষেত্রের বাস্তব কাজ নিজে করে দেখাও গুরুত্বপূর্ণ। এতে একদিকে দক্ষতা বাড়ে, অন্যদিকে সাক্ষাৎকারে নিজের সক্ষমতার উদাহরণ দেওয়া সহজ হয়।

সব চাকরিতে একই সিভি কেন?

আরেকটি সাধারণ সমস্যা হলো একই সিভি দিয়ে সব ধরনের চাকরিতে আবেদন করা। একজন চাকরিপ্রার্থী হয়তো মার্কেটিং, মানবসম্পদ, প্রশাসন ও কনটেন্ট রাইটিং—সব ধরনের পদে একই সিভি পাঠাচ্ছেন।

এতে নির্দিষ্ট পদের সঙ্গে তাঁর যোগ্যতার সম্পর্কটি স্পষ্ট হয় না। যে পদের জন্য আবেদন করা হচ্ছে, সেই পদের প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা সামনে রেখে সিভি সাজানো বেশি কার্যকর।

সার্টিফিকেটের সংখ্যা নয়, দক্ষতার গভীরতা

বর্তমান চাকরির বাজারে সার্টিফিকেট অর্জন করা খারাপ কিছু নয়। বরং প্রয়োজনীয় বিষয়ে মানসম্মত প্রশিক্ষণ একজন প্রার্থীকে দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করতে পারে। সমস্যা হয় তখনই, যখন সার্টিফিকেট সংগ্রহই মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় এবং শেখা বিষয়টি বাস্তবে প্রয়োগের সুযোগ তৈরি করা হয় না।

তাই চাকরিপ্রার্থীদের উচিত শুধু ‘কতগুলো সার্টিফিকেট আছে’—এই হিসাব না করে ‘কী কাজ করতে পারি’—সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা।

/এবি/