শিরোনাম
এক্সপ্লেইনার

নেতানিয়াহুর ‘ট্রাম্প কার্ড’ কি কার্যকারিতা হারাচ্ছে

সিজেডএন  ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
নেতানিয়াহুর ‘ট্রাম্প কার্ড’ কি কার্যকারিতা হারাচ্ছে
বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ও ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: আল জাজিরা

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিকে হাতের তালুর মতো চেনা এবং মার্কিন প্রেসিডেন্টদের নিজের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করায় ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর জুড়ি মেলা ভার। দীর্ঘদিন ধরে তিনি ওয়াশিংটনের সঙ্গে ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতাকেই দেশের রাজনীতিতে নিজের অপরিহার্যতার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছেন।

তবে ইরানের বিরুদ্ধে যৌথ যুদ্ধ থমকে যাওয়া, যুক্তরাষ্ট্রের তীব্র অভ্যন্তরীণ সমালোচনা এবং আঞ্চলিক সমীকরণের পরিবর্তনের মুখে সেই পুরোনো ‘তুরুপের তাস’ এখন যেন কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলছে। এমনই এক চরম রাজনৈতিক সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে সম্পর্কে নতুন করে উষ্ণতা ফেরাতে এবং নিজের অবস্থান শক্ত করতে ওয়াশিংটনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন নেতানিয়াহু।

এক সময় মনে করা হতো, আমেরিকার সাবেক ও বর্তমান মার্কিন নেতাদের মধ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্পই নেতানিয়াহু ও ইসরায়েলের প্রতি সবচেয়ে বেশি নমনীয়। ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ শুরু করতেও ট্রাম্প দ্বিধা করেননি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই চিত্রে অনেকটাই পরিবর্তন এসেছে। অক্টোবরের শেষেই ইসরায়েলে সাধারণ নির্বাচন। অন্যদিকে দেশে দুর্নীতির মামলাসহ সব মিলিয়ে ঘরে-বাইরে মারাত্মক চাপে রয়েছেন নেতানিয়াহু। আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি প্রয়াত রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের শেষকৃত্যে যোগ দিতে এবং ইরান সংঘাত বা এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান চুক্তি নিয়ে আলোচনার কথা বলে যুক্তরাষ্ট্র সফরে এলেও, বিশ্লেষকদের মতে তার আসল উদ্দেশ্য ভিন্ন।

নিউইয়র্কে নিযুক্ত ইসরায়েলের সাবেক রাষ্ট্রদূত অ্যালন পিঙ্কাসের মতে, নেতানিয়াহু মূলত নিজ দেশের মিত্র ও সমালোচকদের দেখাতে চান যে ট্রাম্পের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব এখনো অটুট রয়েছে। একই সঙ্গে, নিজের দুর্নীতির মামলা থেকে বাঁচতে ট্রাম্পের অনুকম্পা বা রাজনৈতিক সহায়তা পাওয়ার আশা করাও তার অন্যতম গোপন লক্ষ্য।

তবে এবার ওয়াশিংটনের পরিস্থিতি নেতানিয়াহুর জন্য মোটেও সুবিধাজনক নয়। যুক্তরাষ্ট্রে তার জনপ্রিয়তা এখন তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। এতদিন ধরে মার্কিন কংগ্রেসে যে সমর্থন তিনি পেতেন, তা এখন অনেকটাই ম্লান। রিপাবলিকানদের ডানপন্থী অংশের জনপ্রিয় মুখ, পডকাস্টার টাকার কার্লসন ও সাবেক মার্কিন প্রতিনিধি মার্জোরি টেলর গ্রিন প্রকাশ্যেই নেতানিয়াহুর নীতি নিয়ে কঠোর সমালোচনা শুরু করেছেন। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইসরায়েলি সরকারের মধ্যকার কিছু চরমপন্থী গোষ্ঠী ইরান যুদ্ধ বন্ধের মধ্যস্থতা ভেস্তে দেওয়ার চেষ্টা করছে। এর ওপর আবার ইসরায়েলের চরমপন্থী বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা এবং সেখানে এক মার্কিন সিনেটরকে বেআইনিভাবে আটকের ঘটনা ওয়াশিংটনে চরম অসন্তোষের জন্ম দিয়েছে।

আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতি ও সামরিক পদক্ষেপ নিয়েও ট্রাম্পের সাথে নেতানিয়াহুর দূরত্ব স্পষ্ট হচ্ছে। তুরস্কের কাছে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রি এবং সৌদি আরবের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি নিয়ে ইসরায়েল তীব্র আপত্তি জানিয়েছিল। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প তা নাকচ করে দিয়েছেন। এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প জানান, যুক্তরাষ্ট্র কাকে কীধরণের অস্ত্র বিক্রি করবে, তা অন্য কেউ ঠিক করে দেওয়ার অধিকার রাখে না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রকে একটি কৌশলগত বিপর্যয়ের যুদ্ধে টেনে আনার জন্য ওয়াশিংটনের অনেকেই এখন নেতানিয়াহুকে দায়ী করছেন। লন্ডনের কিংস কলেজের যুদ্ধবিদ্যা বিভাগের গবেষক আরন ব্রেগম্যানের মতে, নেতানিয়াহু এখন ওয়াশিংটনে এক ‘বিষাক্ত ব্যক্তিত্বে’ পরিণত হয়েছেন এবং নিজের রাজনৈতিক স্বার্থে ট্রাম্পকে চালনা করার দিন এখন শেষ।

ক্যামেরার সামনে দুই নেতা ফাটল ঢাকার চেষ্টা করতে পারে। তবে ইসরায়েলের আসন্ন নির্বাচনে এ সফরের প্রভাব কতটা ইতিবাচক হবে, তা নিয়ে গভীর সংশয় রয়েছে। নেতানিয়াহুর সাবেক সহযোগী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মিচেল বারাকের মতে, নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে এখন মার্কিন রাজনীতির সর্বস্তরেই সমালোচনা বাড়ছে। এমনটাও হতে পারে, ট্রাম্প জনসমক্ষে নেতানিয়াহুকে একজন ‘যুদ্ধকালীন নেতা’ হিসেবে সম্মান জানিয়ে ইসরায়েলিদের নতুন নেতৃত্বের দিকে এগিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেবেন। ফলে ওয়াশিংটনের পুরোনো বন্ধুত্বের হাত ধরে নির্বাচনে পার পাওয়ার যে স্বপ্ন নেতানিয়াহু দেখছেন, তা বাস্তবে কতখানি কাজ দেবে, তা সময়ই বলে দেবে।

সূত্র: আল জাজিরা

/এমএকে/