যেভাবে বিশ্বকে অস্থিতিশীল করছে ইসরায়েল

সিজেডএন ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
যেভাবে বিশ্বকে অস্থিতিশীল করছে ইসরায়েল
কোলাজ: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

ফরাসি চিত্রশিল্পীর আঁকা তরুণ নেপোলিয়নের একটি বিখ্যাত ছবিতে দেখা যায়, ক্যাডেট হিসেবে সামরিক স্কুলে পড়ার সময় মানচিত্রের ওপর তার বিশাল ছায়া পড়েছিল। বর্তমান বিশ্বের মানচিত্রে ইসরায়েলের অবস্থানও যেন অনেকটা সেরকম। জনসংখ্যার দিক থেকে বেশ ছোট হলেও বিশ্ব রাজনীতি, যুদ্ধনীতি আর আন্তর্জাতিক আইনের ওপর দেশটি এক বিশাল ও ভীতিকর প্রভাব ফেলছে। প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু যখন ইসরায়েলকে একটি ‘সুপার স্পার্টা’ রাষ্ট্রে পরিণত করার পরিকল্পনা করছেন, তখন অতিরিক্ত সামরিক শক্তি প্রদর্শন আর গোয়েন্দা কূটচাল দীর্ঘদিনের মিত্রদেরও দূরে ঠেলে দিচ্ছে।

ট্যাঙ্কসহ দুইজন ইসরায়েলি সেনা। ছবি: ইয়েমেন নিউজ এজেন্সি
ট্যাঙ্কসহ দুইজন ইসরায়েলি সেনা। ছবি: ইয়েমেন নিউজ এজেন্সি

প্রযুক্তির জালে গড়া সামরিক অর্থনীতি

ইসরায়েলের বৈশ্বিক ক্ষমতার মূল চাবিকাঠি হলো এর শক্তিশালী সামরিক শিল্প। জিডিপির প্রায় ৮ শতাংশেরও বেশি অর্থ সামরিক খাতে ব্যয় করে দেশটি। অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ বা এলবিট সিস্টেমসের মতো বৃহৎ প্রতিষ্ঠানগুলো বিশ্বের অন্যতম বড় অস্ত্র রপ্তানিকারক হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সাইবার প্রযুক্তির ছোঁয়ায় সামরিক ইকোসিস্টেম আরও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে। মাইক্রোসফট, গুগল, অ্যামাজনের মতো বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি জায়ান্টদের ক্লাউড সেবা এবং পেগাসাসের মতো স্পাইওয়্যার ইসরায়েলি গোয়েন্দা বাহিনীকে একচেটিয়া সুবিধা দিচ্ছে। এর পেছনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কয়েক দশক ধরে চলা শত শত বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা এবং শক্তিশালী লবিং নেটওয়ার্কের হাত রয়েছে।

মধ্য গাজা উপত্যকার মাগাজি শরণার্থী শিবিরে একটি বাড়িতে ইসরায়েলি হামলার ঘটনাস্থলের কাছে দাঁড়িয়ে আছে এক শিশু
মধ্য গাজা উপত্যকার মাগাজি শরণার্থী শিবিরে একটি বাড়িতে ইসরায়েলি হামলার ঘটনাস্থলের কাছে দাঁড়িয়ে আছে এক শিশু

ধ্বংসযজ্ঞ ও মানবিক বিপর্যয়

ইসরায়েলের অতিরিক্ত সামরিক শক্তির চরম মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ ফিলিস্তিনিদের। গাজায় সামরিক অভিযানে লাখ লাখ মানুষ হতাহত এবং ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা এ ধ্বংসলীলাকে ‘গণহত্যা’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে গাজা উপত্যকায় মৃতের সংখ্যা কমপক্ষে ৭৩,৯১০ জন ফিলিস্তিনিতে পৌঁছেছে এবং আইডিএফের হাতে গাজায় কমপক্ষে ১,৭৪,৯১৪ জন ফিলিস্তিনি আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।

গাজার বেশিরভাগ আবাসিক ভবন, হাসপাতাল ও পানি সরবরাহ ব্যবস্থা মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। ত্রাণ নিতে যাওয়া সাধারণ মানুষের ওপর হামলা এবং অবরুদ্ধ শিবিরে বন্দিদের ওপর অকথ্য নির্যাতনের অভিযোগ তুলছে মানবাধিকার সংস্থাগুলো। শুধু গাজাই নয়, পশ্চিম তীরেও বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছে।

আঞ্চলিক সংঘাতের বিস্তার

ইসরায়েলের আগ্রাসী নীতি ফিলিস্তিনের গণ্ডি ছাড়িয়ে পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে এক অস্থিতিশীলতার আগুনে পোড়াচ্ছে। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ১৯৫৬ সালের সুয়েজ সংকট থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময়ে প্রতিবেশীদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালিয়েছে দেশটি। ১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধে মিশর, সিরিয়া ও জর্ডানের বিরুদ্ধে ইসরায়েল বিমান হামলা চালিয়েছিল।

এছাড়া ১৯৭৮ এবং ১৯৮২ সালে লেবাননেও বড় ধরনের আগ্রাসন চালিয়েছিল, যার মধ্যে দ্বিতীয়টির লক্ষ্য ছিল লেবানন থেকে প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশনকে (পিএলও) বিতাড়িত করা। এছাড়া ইসরায়েল গাজায় ২০০৮-০৯, ২০১৪ এবং ২০২১ সালসহ বিভিন্ন সময়ে বারবার বড় আকারের সামরিক অভিযান চালিয়েছে দেশটি।

বর্তমানে গাজার যুদ্ধের আঁচ আবারও লেবানন, সিরিয়া, ইয়েমেন এবং ইরানের সঙ্গেও সরাসরি সংঘাতে রূপ নিয়েছে। লেবাননের দক্ষিণাঞ্চল থেকে শুরু করে বৈরুতে নিয়মিত বিমান হামলা ও কামানের গোলার আঘাতে লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, যা গোটা অঞ্চলকে এক দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতার মুখে ঠেলে দিয়েছে।

দক্ষিণ গাজার খান ইউনুসে ইসরায়েলি হামলায় নিহত ফিলিস্তিনি সাংবাদিক মোহাম্মদ আবু হাত্তাবের জানাজা। ছবি: আল জাজিরা
দক্ষিণ গাজার খান ইউনুসে ইসরায়েলি হামলায় নিহত ফিলিস্তিনি সাংবাদিক মোহাম্মদ আবু হাত্তাবের জানাজা। ছবি: আল জাজিরা

গণমাধ্যম ও ভিন্নমতের টুঁটি চেপে ধরা

তথ্য প্রকাশের পথ বন্ধ করতে সাংবাদিকদের ওপর নজিরবিহীন হামলা চালাচ্ছে ইসরায়েলি বাহিনী। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বজুড়ে যত সাংবাদিক নিহত হয়েছেন, তার একটি বড় অংশের মৃত্যুর পেছনে রয়েছে ইসরায়েলি হামলা।

হামলায় নিহতদের মধ্যে ছিলেন আল জাজিরা মুবাশের এবং ড্রপ সাইট নিউজের হোসাম শাবাত, যিনি ইন্দোনেশিয়ান হাসপাতালের কাছে তার গাড়িতে হামলায় নিহত হন; আনাস আল-শরিফ, যিনি তার বিরুদ্ধে কয়েকমাস ধরে চলা ভিত্তিহীন সামরিক অভিযোগের পর একটি প্রেস টেন্টে হামলায় পাঁচ সহকর্মীসহ নিহত হন; এবং নাসের হাসপাতালে 'ডাবল-ট্যাপ' হামলায় নিহত পাঁচ সাংবাদিকের মধ্যে মরিয়ম আবু দাগ্গা ও হুসাম আল-মাসরি।

ড্রোন হামলা চালিয়ে একের পর এক গণমাধ্যমকর্মী ও তাদের পরিবারকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। এমনকি যুদ্ধের খবর যাতে বাইরে না আসে, সেজন্য আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের গাজায় প্রবেশে কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি রাখা হয়েছে।

গোপন নাশকতা ও আন্তর্জাতিক আদালতে হস্তক্ষেপ

ইসরায়েলের এ আধিপত্য কেবল যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নেই, এর গোপন কার্যক্রম ছড়িয়ে আছে বিশ্বজুড়ে। বিদেশি রাজনীতিবিদদের প্রভাবিত করতে ভুয়া অ্যাকাউন্ট ব্যবহার থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) প্রসিকিউটরদের ওপর ভয়ভীতি প্রদর্শনের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ রয়েছে। হেগের প্রসিকিউটরদের ট্র্যাক করতে এবং আইনি প্রক্রিয়াকে পাশ কাটাতে শিন বেত, মোসাদ, আমান এবং ইউনিট ৮২০০ আইসিসি প্রসিকিউটর ফাতু বেনসুদা ও করিম খান এবং আল-হাকের মতো ফিলিস্তিনি মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে নজরদারি, হ্যাকিং ও ভীতি প্রদর্শন চালিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ও ডোনাল্ড ট্রাম্প
বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ও ডোনাল্ড ট্রাম্প

সাংস্কৃতিক বয়কট ও বৈশ্বিক বিচ্ছিন্নতা

বিশ্বজুড়ে এখন ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঝড় বইছে। আন্তর্জাতিক মঞ্চে ফিলিস্তিনের পক্ষে কথা বলায় অনেক হলিউড তারকা ও শিল্পীকে কাজ থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে বা কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। তবে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ দিন দিন বাড়ছে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জনমত এখন ইসরায়েলের বিরুদ্ধে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের একটি সমীক্ষায়, যা ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে ৩৬টি দেশে পরিচালিত হয়েছিল, দেখা গেছে যে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে গড়ে ৬৭ শতাংশ ইসরায়েল সম্পর্কে বিরূপ মনোভাব পোষণ করেন।

অসমর্থনের হার সর্বোচ্চ ছিল তুরস্কে (৯৭%) এবং এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল জুড়ে-পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও জাপানে এই হার ছিল ৮৩% থেকে ৯৫%- এর পরেই ছিল ইউরোপ, যেখানে সুইডেন, স্পেন, নেদারল্যান্ডস, ইতালি, জার্মানি ও যুক্তরাজ্যে এই হার ছিল ৬৯% থেকে ৭৮%, এবং আমেরিকা, যেখানে কানাডা, চিলি ও যুক্তরাষ্ট্রে এই হার ছিল ৬০% থেকে ৬৫%।

স্পেন, নরওয়ে কিংবা কানাডার মতো দেশগুলো অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ বা বিনিয়োগ প্রত্যাহারের মতো কঠোর পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে। নেতানিয়াহুর ‘সুপার স্পার্টা’ গড়ার স্বপ্ন আজ ইসরায়েলকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চরম এক নিঃসঙ্গতার মুখে এনে দাঁড় করিয়েছে।

/এমএকে/