
সিটিজেন ডেস্ক


ইরানের সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রভাবে ইসরায়েলে অন্তত ২,৭০০ জন মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন। দেশটির সমাজকল্যাণ ও সামাজিক নিরাপত্তা মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে স্থানীয় গণমাধ্যম এ তথ্য জানিয়েছে।
সরকারি সহায়তার আওতায় থাকা এসব মানুষের মধ্যে প্রায় ১,০০০ জন দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর আরাদ ও দিমোনার বাসিন্দা। এই দুটি শহরই রাতভর তীব্র হামলার মুখে পড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে।
এদিকে, জরুরি পরিষেবা সংস্থাগুলো জানিয়েছে, হামলার কারণে আরাদ ও দিমোনা মিলিয়ে অন্তত ১৮০ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে। আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর বলে জানা গেছে।
সাম্প্রতিক এই হামলা ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলে ব্যাপক আতঙ্ক ও মানবিক সংকট তৈরি করেছে। অনেক পরিবার রাতারাতি ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে, ফলে পরিস্থিতি দিন দিন আরও জটিল হয়ে উঠছে।

ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর আরাদে হামলাস্থল পরিদর্শনকালে দেওয়া এক বক্তব্যে দেশটির প্রধানমন্ত্রী ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে আন্তর্জাতিক সমর্থন জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বিশ্ব নেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের এই লড়াইয়ে আরও দেশকে সম্পৃক্ত হওয়া প্রয়োজন।
নেতানিয়াহু দাবি করেন, ইতোমধ্যেই কিছু দেশ এই অবস্থানের দিকে এগোচ্ছে এবং তিনি বৃহত্তর আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তার মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সমন্বিত বৈশ্বিক পদক্ষেপই এই সংঘাতের মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
ভাষণে তিনি ইরানের বিরুদ্ধে বেসামরিক জনগণকে লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগ তোলেন। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, ইরানের এমন দূরপাল্লার সামরিক সক্ষমতা রয়েছে, যা দিয়ে ইউরোপের গভীর অঞ্চল পর্যন্ত আঘাত হানা সম্ভব।
তার এই বক্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার মধ্যে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে বলে বিশ্লেষকদের মত।

শনিবার রাতে ইসরায়েলের পারমাণবিক স্থাপনার কাছাকাছি অবস্থিত দুটি শহরে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত ১৬০ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ। আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
হামলার শিকার হওয়া শহর দুটি হলো আরাদ ও দিমোনা। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর আরাদে ৮৪ জন এবং দিমোনায় আরও ৭৮ জন চিকিৎসা নিচ্ছেন।
এদিকে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) জানিয়েছে, দিমোনা শহর থেকে প্রায় ১৩ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত একটি পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্রে এই হামলার কোনো প্রভাব পড়েছে কি না—সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এর আগে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন দাবি করেছিল, নাতাঞ্জে অবস্থিত তাদের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার জবাব হিসেবেই এই হামলা চালানো হয়েছে।
সাম্প্রতিক এই হামলা মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে এবং পারমাণবিক স্থাপনাকে ঘিরে নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

তেহরানের সামরিক শক্তি কমে এসেছে—যুক্তরাষ্ট্রের এমন মূল্যায়নের প্রেক্ষিতে জবাব দিয়েছেন ইরানের উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী রেজা তালাই-নিক। তিনি বলেছেন, চলমান পরিস্থিতি প্রমাণ করছে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী এখনো কার্যকর এবং প্রস্তুত।
ইরানি গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক বক্তব্যে তালাই-নিক বলেন, অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে ইরানের ধারাবাহিক হামলা দেখিয়ে দিচ্ছে যে দেশটি এখনো তার ‘কৌশলগত মজুদ’ এবং নিজস্ব অস্ত্র উৎপাদন সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছে।
তিনি দাবি করেন, গত দুই দশক ধরে অস্ত্র প্রযুক্তিতে—বিশেষ করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উন্নয়নে—যে বিনিয়োগ করা হয়েছে, তার ফলেই ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) এখন আরও নির্ভুলভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম।
তালাই-নিক আরও বলেন, যুদ্ধের শুরুর তুলনায় বর্তমানে আইআরজিসি পরিচালিত ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র হামলাগুলোর নির্ভুলতা বেড়েছে। উপকূলীয় এলাকা, সমুদ্রপথে চলাচলরত জাহাজ এবং দেশের অভ্যন্তর থেকে পরিচালিত এসব হামলা আগের তুলনায় বেশি কার্যকরভাবে লক্ষ্যভেদ করছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
হরমুজ প্রণালীর প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ইরানের সশস্ত্র বাহিনী কার্যত এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথের নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ করে। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হওয়ায় এর কৌশলগত গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপকূলের কাছে একটি বাল্ক ক্যারিয়ার জাহাজে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে ইউনাইটেড কিংডম মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও)।
সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, অজ্ঞাত কোনো বস্তু জাহাজটিতে আঘাত হানার পরই এই বিস্ফোরণ ঘটে। তবে এতে জাহাজের সকল নাবিক নিরাপদে আছেন এবং তাৎক্ষণিকভাবে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে ইউকেএমটিও জানায়, ঘটনাটি শারজাহ উপকূল থেকে প্রায় ১৫ নটিক্যাল মাইল উত্তরে ঘটেছে। বিস্ফোরণের পেছনে ঠিক কী কারণ কাজ করেছে বা কোন বস্তুটি আঘাত হেনেছিল, তা এখনো নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করা যায়নি।
ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি তদন্ত করে দেখছে। একই সঙ্গে ওই এলাকার সমুদ্রপথে চলাচলরত অন্যান্য জাহাজকে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর আরাদে শনিবার রাতে চালানো এক হামলায় অন্তত দুটি আবাসিক অ্যাপার্টমেন্ট ভবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হামলার ফলে ভবনগুলোর বাইরের দেয়ালের বড় অংশ ভেঙে পড়েছে এবং আশপাশের এলাকাজুড়ে ধ্বংসস্তূপ ছড়িয়ে পড়েছে।
নেগেভ মরুভূমি অঞ্চলে অবস্থিত এই শহরটি মূলত রক্ষণশীল ইহুদি অধ্যুষিত এলাকা হিসেবে পরিচিত। হামলার পরপরই ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলোর আশেপাশে ভিড় জমায় স্থানীয় বাসিন্দারা, অনেকেই আতঙ্কিত ও উদ্বিগ্ন অবস্থায় পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলের ভেতরে এ ধরনের ক্ষয়ক্ষতি ঘটাতে পারা ইরানের সামরিক সক্ষমতার ইঙ্গিত বহন করে এবং চলমান সংঘাতে মানবিক ক্ষতির ঝুঁকি যে কতটা বাড়ছে, সেটিও স্পষ্ট করে।
এদিকে, হামলায় ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্রগুলো কীভাবে ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করতে সক্ষম হয়েছে, তা খতিয়ে দেখতে জরুরি তদন্ত শুরু করেছে কর্তৃপক্ষ। যদিও ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অত্যাধুনিক, তবুও এটি সম্পূর্ণ নির্ভুল নয়—এ বিষয়টি নতুন কিছু নয় দেশটির জন্য।
গত বছরের ১২ দিনের সংঘাতেও একই ধরনের সীমাবদ্ধতার মুখে পড়তে হয়েছিল ইসরায়েলকে। সাম্প্রতিক এই হামলা সেই বাস্তবতাকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।