এক্সপ্লেইনার

বাব আল-মান্দেব ঘিরে কি বদলে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা সমীকরণ

সিজেডএন ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
বাব আল-মান্দেব ঘিরে কি বদলে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা সমীকরণ
বাব আল-মান্দেব প্রণালি

ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের দ্রুত অগ্রযাত্রা এবং কৌশলগত বাব আল-মান্দেব প্রণালিকে ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে মার্কিন মধ্যপ্রাচ্য নীতি নিয়ে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুথিদের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে না গিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন। এরপরই বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, ওয়াশিংটন গুরুত্বপূর্ণ এ নৌপথের নিরাপত্তায় আগের মতো সামরিক প্রতিশ্রুতি দিতে চাইছে না।

যুক্তরাষ্ট্র কি বাব আল-মান্দেবের নিরাপত্তা থেকে সরে দাঁড়াচ্ছে এবং এর মাধ্যমে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে দীর্ঘদিনের ‘নিরাপত্তার বিনিময়ে তেল’ সমীকরণে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে? সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে বাব আল-মান্দেব ঘিরে হুথিদের অবস্থান যে আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী হয়েছে, তা আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনেও স্পষ্ট।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প

ট্রাম্পের মন্তব্য ও হুতিদের শক্ত অবস্থান

১২ সেপ্টেম্বর আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনে ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, হুথিরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতে যেতে চায় না এবং তারা মার্কিন জাহাজ চলাচলে বাধা দিচ্ছে না। পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত ভালোভাবে সমাধান হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। এ বক্তব্য সামনে আসার পর ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলে হুথিদের সামরিক অগ্রযাত্রা দারুণ গতি পায়। কৌশলগত বন্দরনগরী মোখা দখলের পর তারা ধুবাব ও মায়ুন বা পেরিম দ্বীপের দিকেও নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়েছে। মায়ুন দ্বীপটি বাব আল-মান্দেবের প্রবেশমুখে অবস্থিত হওয়ায় প্রণালিটিকে কার্যত দুটি নৌপথে ভাগ করেছে। ফলে এ অঞ্চলে হুতিদের উপস্থিতি আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে, হুতিদের এ অগ্রযাত্রা বাব আল-মান্দেবের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ ও আন্তর্জাতিক নৌযানে হুমকির সক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এটি সৌদি আরবের জন্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

নতুন সংঘাতে অনীহা ওয়াশিংটনের

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরান যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালি ঘিরে বড় ধরনের সামরিক চাপের মুখে রয়েছে। এ বাস্তবতায় ইয়েমেনে হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি আরেকটি সামরিক ফ্রন্ট খুলতে চাইছে না ওয়াশিংটন। বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী তথ্যানুযায়ী, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল এখন ব্যাপক হারে কমে গেছে। বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) মাত্র তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজ প্রণালিটি অতিক্রম করে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক মনোযোগ ও শক্তি বর্তমানে হরমুজকেন্দ্রিক হয়ে পড়ায়, একই সময়ে বাব আল-মান্দেবে বড় ধরনের অভিযান চালালে মার্কিন বাহিনীর ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে। এ হিসাব-নিকাশ থেকেই ওয়াশিংটন সংযত থাকার নীতি নিয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। ছবি: রয়টার্স
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। ছবি: রয়টার্স

দ্বিমুখী সংকটে সৌদি আরব

বাব আল-মান্দেব সংকটের সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি এসে পড়ছে সৌদি আরবের ওপর। একদিকে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে হুথিদের আগ্রাসী পদক্ষেপে লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব দিয়ে সৌদি তেল ও পণ্য পরিবহন নতুন ঝুঁকির মুখে পড়েছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে সৌদি আরবের অপরিশোধিত তেল সরবরাহ দৈনিক প্রায় ৬০ লাখ ব্যারেলে নেমে এসেছে। গত তিন দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে এটিই সর্বনিম্ন। হুথিদের হামলা ও ইরাকভিত্তিক মিলিশিয়াদের ড্রোন হামলার কারণে তেল অবকাঠামো এবং সমুদ্রপথ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সৌদি সরবরাহ বড় ধাক্কা খেয়েছে। একই সঙ্গে হুথিদের এ দ্রুত অগ্রগতি সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি বাহিনীর দুর্বলতাও পরিষ্কার করে দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র-সৌদি সম্পর্কের সমীকরণে বদল

১৯৭০-এর দশক থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর সম্পর্কের ভিত্তি ছিল একধরনের অনলিখিত সমঝোতা। যুক্তরাষ্ট্র উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা ও জ্বালানি পথ সুরক্ষার দায়িত্ব নেবে, আর বিনিময়ে উপসাগরীয় দেশগুলো বৈশ্বিক বাজারে তেলের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করবে। বিশ্লেষক আল-আকিলির মতে, সাম্প্রতিক পরিস্থিতি এ পুরোনো সমীকরণে পরিবর্তনের স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে। অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্র এখন আর পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য সামগ্রিক কোনো ‘ছাতা’ দিতে আগ্রহী নয়, বরং সরাসরি মার্কিন স্বার্থের ক্ষেত্রগুলোকে তারা বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

অবশ্য এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতির সম্পূর্ণ ইতি হিসেবে দেখা ভুল হবে। মার্কিন বাহিনী মধ্যপ্রাচ্যে এখনো সক্রিয় আছে এবং সৌদি আরবের সঙ্গে তাদের সামরিক সমন্বয়ও বন্ধ হয়নি। ১৪ সেপ্টেম্বর সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারের বৈঠক হয়েছে। সরাসরি মার্কিন সামরিক হামলা অনুমোদন না করলেও ওয়াশিংটন গোয়েন্দা তথ্য ও লক্ষ্য শনাক্তকরণে সৌদিকে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে। অর্থাৎ পরিস্থিতিটি কেবল ‘সৌদিকে ছেড়ে দেওয়া’ নয়, বরং সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপে না গিয়ে সীমিত সহায়তা ও সমন্বয়ের নীতিতে এগোচ্ছে ওয়াশিংটন।

তুরস্কের রাষ্ট্রপতি রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোগান, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ (বাঁ থেকে)
তুরস্কের রাষ্ট্রপতি রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোগান, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ (বাঁ থেকে)

নিজেদের নিরাপত্তায় সৌদির উদ্যোগ

মার্কিন সহায়তার এ অনিশ্চয়তার মুখে সৌদি আরব চুপ করে বসে নেই। তারা নিজস্ব ও বহুপক্ষীয় নিরাপত্তা সক্ষমতা বাড়ানোর বড় পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে। জুলাইয়ে রিয়াদে সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বহুজাতিক সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোট গঠনের লক্ষ্যে একটি বৈঠক হয়, যেখানে ৪৩টি দেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। রিয়াদের লক্ষ্য হলো একক কোনো দেশের ওপর নির্ভর না করে আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথের নিরাপত্তা যৌথভাবে নিশ্চিত করা। এর পাশাপাশি তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার করেছে সৌদি আরব। সম্প্রতি মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, যা তাদের বৃহত্তর নিরাপত্তা পুনর্বিন্যাসেরই অংশ।

বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও নতুন মধ্যপ্রাচ্য

বাব আল-মান্দেব এবং হরমুজ প্রণালি- দুটো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ একসঙ্গে অস্থিতিশীল হয়ে পড়লে ‘নিরাপত্তার বিনিময়ে তেল’ কাঠামো ভেঙে পড়া অস্বাভাবিক নয়। আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থা (আইইএ) জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংঘাত ও সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার কারণে ২০২৬ সালে বৈশ্বিক তেল সরবরাহ দৈনিক প্রায় ৫৭ লাখ ব্যারেল বা প্রায় ৬ শতাংশ কমে যেতে পারে।

এ বাস্তবতায় সৌদি আরব পরিষ্কার বার্তা দিচ্ছে, আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথ রক্ষার দায়িত্ব কেবল একক কোনো দেশের নয়, এটি একটি যৌথ দায়িত্ব। শুধু মার্কিন সামরিক সহায়তার ওপর ভরসা না রেখে রিয়াদ এখন আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অংশীদারদের নিয়ে বহুপক্ষীয় কাঠামো গড়ার দিকে ঝুঁকছে। মার্কিন সামরিক উপস্থিতির পাশাপাশি সৌদি আরব, তুরস্ক, মিসর ও পাকিস্তানের মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলো নিজেদের সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। আবার চীনও কূটনৈতিকভাবে তেহরানের ওপর প্রভাব খাটিয়ে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার চেষ্টা করছে। সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এখন আর একমুখী নয়, বরং বহুমুখী ও শর্তসাপেক্ষ এক নতুন বাস্তবতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

সূত্র: আল জাজিরা

/এমএকে/