এক্সপ্লেইনার

নেতানিয়াহুর বিদায়ে কি ফিলিস্তিনিদের ভাগ্য বদলাবে

সিটিজেন জার্নাল ডেস্ক
সিটিজেন জার্নাল ডেস্ক
নেতানিয়াহুর বিদায়ে কি ফিলিস্তিনিদের ভাগ্য বদলাবে
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু

ইসরায়েলের নির্বাচনে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু যদি সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পায় তবে তা ফিলিস্তিনিদের জন্য কেবলই এক নামমাত্র বা পাইরিক জয় হতে পারে। গত তিন বছর ধরে গাজায় নির্বিচারে বেসামরিক মানুষ হত্যা, সমগ্র জনগোষ্ঠীকে অনাহারে রাখা এবং গোটা উপত্যকাকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করার সিদ্ধান্তগুলোকে নেতানিয়াহুই নানা অজুহাতে ন্যায্যতা দিয়ে এসেছেন। প্রায় দুই দশক ধরে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের সবচেয়ে পরিচিত মুখ। বিশ্ব নেতাদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে তিনি ঐতিহাসিক ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে অবৈধ বসতি সম্প্রসারণের পক্ষে সমর্থন আদায় করেছেন।

রাজনৈতিক জীবনের একাধিক বড় কেলেঙ্কারি- ঘুষ, প্রতারণা ও চরম বিশ্বাসভঙ্গের ফৌজদারি মামলা থেকে তিনি বারবার বেঁচে ফিরেছেন। এমনকি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) থেকে তার বিরুদ্ধে জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানাকেও পশ্চিমা মিত্রদের সহায়তায় বুড়ো আঙুল দেখিয়েছেন। তবুও, সম্প্রতি তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করা তেল আবিবের বুকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তৈরি পারমাণবিক বোমার ছবি ইঙ্গিত দেয়, নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে জনগণের মধ্যে তৈরি ইরান-বিরোধী ভয়কে তিনি চরমভাবে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছেন।

বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ও গাদি আইজেন কোট
বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ও গাদি আইজেন কোট

নেতৃত্বের পরিবর্তন ও বাস্তবতা

নেতানিয়াহুর স্থানে সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোটের আসার সম্ভাবনা নিয়ে জোর আলোচনা চলছে। আইজেনকোটও ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের তীব্র বিরোধী। ২০০৬ সালের লেবানন যুদ্ধে তথাকথিত দাহিয়া মতবাদ প্রয়োগের মাধ্যমে বেসামরিক অবকাঠামো ও সাধারণ মানুষের ওপর মাত্রাতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগের জন্য পরিচিত। এ থেকে স্পষ্ট, নেতানিয়াহু পরবর্তী ইসরায়েলেও নীতিগত বড় কোনো ইতিবাচক পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই।

আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক এবং ফিলিস্তিনপন্থী কর্মীদের অনেকেই ইসরায়েলের রাজনীতির পালাবদল নিয়ে আশাবাদী। তবে ইতিহাস বলে, ইসরায়েলের ক্ষমতায় কে বসছেন তা দিয়ে ফিলিস্তিনিদের ভাগ্যের তেমন কোনো তারতম্য ঘটেনি। ইসরায়েলি রাজনীতিতে বাজপাখি বা ঘুঘু- যে শব্দই ব্যবহার করা হোক না কেন, মূল নীতির কোনো বদল হয় না।

ইতিহাসের ঘাটলে দেখা যায়, নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়া ইৎজাক রাবিন অসলো চুক্তিতে সই করলেও ফিলিস্তিনিদের আন্দোলন দমনে ‘হাড় ভেঙে দাও’ নীতি গ্রহণ করেছিলেন। তার আমলেও ফিলিস্তিনিদের ঘরবাড়ি উচ্ছেদ ও বসতি স্থাপন থামেনি। তার তথাকথিত শান্তিনীতির উদ্দেশ্য ছিল দখলদারিত্বের ভার কিছুটা অনুগত ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের ওপর চাপিয়ে মূল সমস্যাকে আড়াল করা।

গাজায় ধ্বংসস্তূপের মধ্যে বসে আছে এক ফিলিস্তিনি নারী
গাজায় ধ্বংসস্তূপের মধ্যে বসে আছে এক ফিলিস্তিনি নারী

একই নীতির ভিন্ন রূপ

ইৎজাক রাবিন পরবর্তী নেতাদের ইতিহাসও একই সূত্রে গাঁথা। শান্তিকামী হিসেবে তুলে ধরা শিমন পেরেজের মেয়াদে ১৯৯৬ সালে দক্ষিণ লেবাননের কানায় ভয়াবহ গণহত্যা হয়েছিল। এ বিষয়ে তিনি বলেছিলেন যে তিনি শান্তিতে আছেন। অন্যদিকে গাজায় বর্তমান ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কথা বলা এহুদ ওলমার্টের আমলেই লেবানন যুদ্ধ (২০০৬), টার্গেটেড কিলিং এবং অবৈধ বসতি স্থাপন ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়েছিল।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাক, নাফতালি বেনেট এবং ইয়ার লাপিদের মতো নেতারাও ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের ধারণাকে সম্পূর্ণ নাকচ করে দিয়েছেন। বারাকের বিরুদ্ধে ২০০৯ সালে যুক্তরাজ্যে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ পর্যন্ত উঠেছিল। মাদ্রিদ, অসলো, ওয়াই রিভার থেকে শুরু করে ক্যাম্প ডেভিড- সবকটি ঐতিহাসিক তথাকথিত শান্তি আলোচনার একই পরিণতি দেখা গেছে। আর সেটি হলো ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের ক্রমাগত সংকোচন এবং ইসরায়েলি ঔপনিবেশিক নীতির বাস্তবায়ন।

ইসরায়েলি হামলায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে গাজা
ইসরায়েলি হামলায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে গাজা

মূল সমস্যা কোথায়

ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার সমর্থকদের জন্য ইসরায়েলি সরকারে নেতৃত্বের এ পরিবর্তন মূলত একটি মায়াজাল। কেবল ব্যক্তির পরিবর্তনে বর্ণবাদী ও সামরিকীকরণ কাঠামোর অবসান সম্ভব নয়।

নেতানিয়াহুর পতন হোক বা না হোক, বর্ণ বৈষম্য ও দখলদারিত্বের মূল রাজনৈতিক ভিত্তি অক্ষত থাকলে ফিলিস্তিনিদের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটা অসম্ভব। ফলে ইসরায়েলের রাজনৈতিক পরিবর্তনের দিকে তাকিয়ে মিথ্যা আশা বাঁধার চেয়ে ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার ও মুক্তির মূল আন্দোলনকে শক্তিশালী করাই এ সংকট থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ।

/এমএকে/