যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন কেন গুরুত্বপূর্ণ

সিটিজেন জার্নাল ডেস্ক
সিটিজেন জার্নাল ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন কেন গুরুত্বপূর্ণ
যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস ভবন

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে আজ এক গুরুত্বপূর্ণ দিন। মধ্যবর্তী নির্বাচনের ভোটে নির্ধারিত হবে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাকি দুই বছরের শাসন কতটা নির্বিঘ্নে যাবে। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে মরিয়া রিপাবলিকান পার্টি। অন্যদিকে, দুই কক্ষের অন্তত একটির দখল নিতে জোর লড়াইয়ে নেমেছে বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা। ফলে এবারের নির্বাচন কেবল আসন ভাগাভাগির লড়াই নয়, বরং ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা, নেতৃত্ব ও নীতিনির্ধারণী সক্ষমতারও বড় পরীক্ষা।

নির্বাচন ঘিরে কয়েক সপ্তাহ ধরেই চলছে আগাম ভোট। ২০২২ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের মতো ভোটার উপস্থিতি হলে এবার ভোট দিতে পারেন ১০ কোটির বেশি মানুষ। দুই দলের প্রচারেও দেখা গেছে নজিরবিহীন অর্থের ঝলক। ১২ অক্টোবর পর্যন্ত নির্বাচনী কেবল বিজ্ঞাপনেই ব্যয় হয়েছে ৩৮০ কোটি ডলার। এর মধ্যে রিপাবলিকানদের পক্ষে একাই প্রায় ৩৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার খরচ করেছেন ধনকুবের ইলন মাস্ক। বিপুল অর্থের প্রচার আর রাজনৈতিক উত্তাপ মিলিয়ে এবারের ভোট পেয়েছে বিশেষ গুরুত্ব।

যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি চার বছর পরপর প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হলেও এর দুই বছর পর অনুষ্ঠিত হয় মধ্যবর্তী নির্বাচন বা মিডটার্ম। এতে প্রেসিডেন্ট পদে ভোট হয় না। বরং কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদ ও উচ্চকক্ষ সিনেটের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, সেটিই নির্ধারিত হয়। একই সঙ্গে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের গভর্নর ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিও নির্বাচিত হন।

এবার প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনের সব কটিতেই ভোট হচ্ছে। অন্যদিকে, সিনেটের ১০০ আসনের মধ্যে নির্বাচন হচ্ছে ৩৫টিতে। পাশাপাশি ৩৬টি অঙ্গরাজ্যে গভর্নর নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

বর্তমানে কংগ্রেসের উভয় কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠ রিপাবলিকানরা। প্রতিনিধি পরিষদে দলটির আসন ২১৮টি, ডেমোক্র্যাটদের ২১৪টি। একটি আসনে রয়েছেন স্বতন্ত্র সদস্য এবং দুটি আসন শূন্য। ফলে নিম্নকক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিতে ডেমোক্র্যাটদের অন্তত চারটি আসন বাড়াতে হবে।

সিনেটের সমীকরণ আরও কঠিন। ১০০ সদস্যের এই কক্ষে রিপাবলিকানদের আসন ৫৩টি। ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে রয়েছেন ৪৫ জন এবং তাদের সমর্থক দুই স্বতন্ত্র সদস্য। অর্থাৎ ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে ভোট দেওয়া সদস্যের সংখ্যা ৪৭। সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিতে তাদের অন্তত চারটি আসন বাড়িয়ে ৫১-তে পৌঁছাতে হবে।

সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সবচেয়ে বেশি নজর জর্জিয়া, মেইন, নর্থ ক্যারোলাইনা, মিশিগান, নিউ হ্যাম্পশায়ার, ওহাইও, আলাস্কা ও আইওয়ার দিকে। এসব অঙ্গরাজ্যের কয়েকটি আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস রয়েছে। টেক্সাস ও কানসাসের আসন নিয়েও ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে আশাবাদ তৈরি হয়েছে।

এবারের নির্বাচনে ভোটারদের অন্যতম প্রধান উদ্বেগ নিত্যদিনের খরচ। পেট্রল, বাড়িভাড়া, বাড়ি কেনা ও চিকিৎসার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় চাপে রয়েছেন সাধারণ মার্কিন পরিবারগুলো। এসব ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসনের ভূমিকা নির্বাচনী ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। এর পাশাপাশি অভিবাসননীতি, গর্ভপাতের অধিকার, গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ এবং ইরান যুদ্ধের মতো বিষয়ও আলোচনায় রয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডেটা সেন্টারের বিস্তার নিয়েও তৈরি হয়েছে নতুন উদ্বেগ।

পিউ রিসার্চ সেন্টারের এক জরিপে দেখা গেছে, ৪৪ শতাংশ ভোটার তাদের এলাকার ডেমোক্র্যাট প্রার্থীকে সমর্থন করতে চান। রিপাবলিকানদের পক্ষে রয়েছেন ৩৬ শতাংশ। এখনো সিদ্ধান্ত নেননি ১৫ শতাংশ ভোটার। বিশেষ করে নারী ভোটারদের মধ্যে ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন তুলনামূলক বেশি।

নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পেলে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে। প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে তদন্ত, সরকারি কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং নথিপত্র তলব করতে পারবেন তারা। এমনকি প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রক্রিয়াও শুরু করতে পারবেন।

সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারালে আরও জটিলতায় পড়তে পারে ট্রাম্প প্রশাসন। মন্ত্রিসভার সদস্য, রাষ্ট্রদূত ও কেন্দ্রীয় আদালতের বিচারক নিয়োগে সিনেটের অনুমোদন প্রয়োজন। ফলে ডেমোক্র্যাটরা এসব নিয়োগ আটকে দেওয়ার সুযোগ পাবেন। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রেও সিনেটের সম্মতি অপরিহার্য।

তবে কংগ্রেসের দুই কক্ষ ডেমোক্র্যাটদের দখলে গেলেও ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট পদ তাৎক্ষণিকভাবে ঝুঁকিতে পড়বে না। তাকে অভিশংসনের অভিযোগে পদ থেকে সরাতে সিনেটের দুই-তৃতীয়াংশ, অর্থাৎ অন্তত ৬৭ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন। আবার প্রেসিডেন্ট হিসেবে কোনো বিলে ভেটো দেওয়ার ক্ষমতাও থাকবে তার।

ডেমোক্র্যাটরা নিম্নকক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেলে স্পিকার পদে আসতে পারেন হাকিম জেফরিস। অন্যদিকে, রিপাবলিকানরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে পারলে বর্তমান স্পিকার মাইক জনসনের পদে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

নির্বাচন ঘিরে আরেকটি বড় উদ্বেগ ভোটের গ্রহণযোগ্যতা। ২০২০ সালের নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তুললেও ট্রাম্পের দাবির পক্ষে প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এবারও নির্বাচন প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপের আশঙ্কা নিয়ে সতর্ক রয়েছেন বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের নির্বাচন কর্মকর্তা ও ডেমোক্র্যাট নেতারা।

সব মিলিয়ে আজকের ভোটের ফল শুধু কংগ্রেসের আসনসংখ্যা নির্ধারণ করবে না, বরং ট্রাম্পের ক্ষমতার বাকি দুই বছরের রাজনৈতিক গতিপথও ঠিক করে দিতে পারে। রিপাবলিকানরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে পারলে নিজের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আরও শক্তিশালী অবস্থানে থাকবেন ট্রাম্প। আর ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ছিনিয়ে নিতে পারলে হোয়াইট হাউসের জন্য অপেক্ষা করছে কঠিন রাজনৈতিক লড়াই।

/এসবি/