কাজের নিশ্চয়তা নেই, তবু ভোর হলেই বসে ‘মানুষ বেচাকেনার হাট’

মৃত্যুঞ্জয় রায়, সাতক্ষীরা
মৃত্যুঞ্জয় রায়, সাতক্ষীরা
কাজের নিশ্চয়তা নেই, তবু ভোর হলেই বসে ‘মানুষ বেচাকেনার হাট’
কাজের আশায় পাকাপোল মোড়ে অপেক্ষায় থাকা কয়েকজন শ্রমজীবী মানুষ। ছবি: সিটিজেন জার্নাল

ভোরের আলো ফুটতেই সাতক্ষীরা শহরের পাকাপোল মোড়ে জড়ো হতে থাকেন শ্রমজীবী মানুষ। কারও হাতে কোদাল, কারও কাঁধে ঝুড়ি, আবার কেউ এসেছেন দিনভর কাজের আশায়। সকাল গড়ানোর সঙ্গে শুরু হয় দরকষাকষি, ‘মানুষ বেচাকেনা’। মজুরি নিয়ে বনিবনা হলেই কেউ তাদের কাজে নিয়ে যান। এভাবেই প্রতিদিন নিজের শ্রম বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন এসব মানুষ।

কেউ দিনমজুর, কেউ নির্মাণশ্রমিক, কেউ কৃষিশ্রমিক, আবার কেউ মাটি কাটা কিংবা ভারী মালামাল বহনের কাজ করেন। তাদের কাছে প্রতিটি সকাল নতুন করে কাজ পাওয়ার অপেক্ষা। সকালে কাজ না পেলে অনেকেরই কপালে জোটে না দিনের খাবার। তাই কাজের সন্ধানে বৃষ্টি-রোদ উপেক্ষা করে প্রতিদিন ভোরেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েন তারা।

তেমনই একজন ইমান আলী। ভোর হতেই কাজের সন্ধানে বাড়ি থেকে বের হন তিনি। হাতে কোদাল, ঝুড়ি আর ডালা নিয়ে চলে আসেন সাতক্ষীরা শহরের পাকাপোল মোড়ে। কাজের আশায় বসে থাকেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা।

ইমান আলী বলেন, কাজ পাওয়া নিয়েও রয়েছে অনিশ্চয়তা। প্রতিদিন সবার কাজ মেলে না। কখনো অর্ধেক দিন অপেক্ষা করেও কাজ না পেয়ে খালি হাতে বাড়ি ফিরতে হয়। আবার কাজ পেলেও যে মজুরি পাওয়া যায়, তা দিয়ে সংসারের খরচ ঠিকমতো চলে না। তবুও সংসারের খরচ, সন্তানের পড়াশোনা আর খাবারের জোগান দিতে বাধ্য হয়েই প্রতিদিন শ্রম বিক্রি করতে হয়।

তিনি আরও বলেন, আমরা দিন আনি, দিন খাই। প্রতিদিন কাজ পাব কি না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। বৃষ্টি হোক কিংবা রোদ, সকাল হলেই এখানে আসতে হয়। কাজ না পেলে সেদিন পরিবারের সবাইকে কষ্ট করতে হয়। আমাদের জন্য কোনো নির্দিষ্ট মজুরি বা কাজের নিশ্চয়তা নেই।

ইমান আলীর পাশে কাজ পাওয়ার আশায় বসে আছেন গফুর মিয়া। থাকেন সাতক্ষীরা শহরের বদ্দীপুর কলোনিতে। প্রতিদিন কাজের সন্ধানে ভিড় জমান পাকাপোল মোড়ে।

গফুর বলেন, প্রতিদিন ভোর হলেই বাড়ি থেকে বের হই। ঝুড়ি, ডালা আর কোদাল নিয়ে পাকাপোল মোড়ে এসে বসি। কখন কে কাজ নিতে আসবে, সেই অপেক্ষায় থাকি। কোনো দিন কাজ পাই, আবার কোনো দিন সারাদিন বসে থেকেও খালি হাতে বাড়ি ফিরতে হয়।

তিনি আরও বলেন, কাজ করলেও যে টাকা পাই, কিন্তু সেই টাকা দিয়ে সংসার চলে না। এই বয়সেও পেটের দায়ে কাজ করতে হচ্ছে। সংসারে চাল-ডাল কিনতে হয়, ছেলেমেয়েদের খরচ আছে। তাই বাধ্য হয়েই কম টাকায় কাজ করতে রাজি হই। আমাদের শ্রমের দাম কেউ বুঝতে চায় না।

শুধু পুরুষ শ্রমিক নন, জীবিকার প্রয়োজনে শ্রম বিক্রি করছেন নারীরাও। তাদের একজন সালমা বেগম। শহরের পলাশপোল এলাকায় থাকেন তিনি। কয়েকটি বাসায় গৃহকর্মীর কাজ করেন। সালমা বলেন, আমি তিনটি বাসায় কাজ করি। প্রতিদিন সকালে উঠে একের পর এক বাসায় গিয়ে ঘর পরিষ্কার করি, তাদের জামাকাপড় ধুয়ে দিই। প্রতিটি কাজের জন্য মাস শেষে ৫০০ টাকা করে পাই। দুই ধরনের কাজ করলে একেক বাসা থেকে মাসে এক হাজার টাকা আয় হয়। এভাবেই আমার সংসার চলে।

পাকাপোল মোড়ে শ্রমিক নিতে আসা আব্দুর রহমান বলেন, আমি আগে সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ মোড় এলাকায় থাকতাম। কিন্তু খুলনায় চাকরি হওয়ায় আমাকে বাসা ছেড়ে চলে যেতে হচ্ছে। ফলে বাসার আসবাবপত্র বের করে গাড়িতে তোলার জন্য একজন শ্রমিকের প্রয়োজন। একবেলার কাজের জন্য ৫০০ টাকা দেওয়ার কথা বলে দরকষাকষি করে একজনকে কাজে নিয়ে যাচ্ছি।

সাতক্ষীরা জেলা নাগরিক কমিটির মাধব চন্দ্র দত্ত বলেন, জীবিকার তাগিদে এসব শ্রমজীবী মানুষ প্রতিদিন ভোরে এসে এখানে অপেক্ষা করেন। কিন্তু তাদের কাজের নিশ্চয়তা, ন্যায্য মজুরি ও সামাজিক নিরাপত্তা নেই। এসব শ্রমজীবী মানুষের জীবনমান উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

/এফআর/