শান্তিতে নোবেলজয়ী নাভি পিল্লাই কে

সিজেডএন ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
শান্তিতে নোবেলজয়ী নাভি পিল্লাই কে
নাভি পিল্লাই

দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী শাসন থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক বিচারাঙ্গন- ন্যায্যতা ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ লড়াইয়ের স্বীকৃতি পেলেন নাভি পিল্লাই। শান্তি ও আন্তর্জাতিক আইন প্রতিষ্ঠায় অসামান্য অবদানের জন্য ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকার এ ভারতীয় তামিল বংশোদ্ভূত আইনজ্ঞ। নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি তার নৈতিক অবস্থান এবং সর্বজনীন আইনি নীতির প্রতি অবিচল আস্থাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়ন করেছে।

শৈশবের সংগ্রাম ও আইনি লড়াই

১৯৪১ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ আফ্রিকার তৎকালীন নাটাল প্রদেশের ডারবারের ক্লেয়ারউড এলাকায় জন্ম নাভানেথেম ‘নাভি’ পিল্লাইয়ের। বাসচালক বাবার আট সন্তানের পরিবারে বেড়ে ওঠার দিনগুলোতে পদে পদে বর্ণবৈষম্যের শিকার হয়েছেন তিনি। কৃষ্ণাঙ্গ হওয়ায় শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে তখন ছিল নানা বাধা। তবে এ প্রতিকূলতা তাকে থামাতে পারে নি। নাটাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬৩ সালে স্নাতক এবং ১৯৬৫ সালে আইন ডিগ্রি অর্জনের পর ১৯৬৭ সালে নাটালে আইনচর্চা শুরু করেন তিনি। এটি ছিল ওই অঞ্চলের কোনো নারীর জন্য প্রথম ঘটনা। বর্ণবাদী সরকারের হাতে আটক রাজনৈতিক কর্মীদের আইনি সহায়তা দিতে গিয়েই তার দীর্ঘ ক্যারিয়ারের ভিত্তি তৈরি হয়। পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৮২ সালে স্নাতকোত্তর এবং ১৯৮৮ সালে উচ্চতর আইন গবেষণা সম্পন্ন করেন তিনি।

রুয়ান্ডা ট্রাইব্যুনাল ও আন্তর্জাতিক আইনের নতুন নজির

নাভি পিল্লাইয়ের কর্মজীবন কেবল দক্ষিণ আফ্রিকার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। বিশ্বজুড়ে গুরুত্বপূর্ণ সব বিচারিক প্রতিষ্ঠানে তা ছড়িয়ে পড়েছে। ১৯৯৫ সালে রুয়ান্ডার জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারক হিসেবে যোগ দেন তিনি। ১৯৯৯ সালে ট্রাইব্যুনালের প্রেসিডেন্ট হন। রুয়ান্ডায় গণহত্যার সময় জঁ-পল আকায়েসুর বিচারিক প্রক্রিয়ায় তার ভূমিকা আন্তর্জাতিক আইনের ইতিহাসে এক বিশাল মাইলফলক হয়ে আছে। তিনিই প্রথম ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতাকে গণহত্যার অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেন। পরবর্তীতে ২০০৩ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের আপিল বিভাগের বিচারক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

জাতিসংঘের শীর্ষ পদ ও মানবাধিকার রক্ষা

২০০৮ সালে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন নাভি পিল্লাই। ২০১৪ সাল পর্যন্ত অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সামলান সে দায়িত্ব। এ ছাড়াও তিনি অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডবিষয়ক জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (ICJ) মিয়ানমারের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া গণহত্যার মামলার বিচারক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। শুধু আন্তর্জাতিক আদালত নয়, নারীর অধিকার রক্ষায়ও তার ভূমিকা অনবদ্য। বিশ্বজুড়ে লিঙ্গসমতা ও নারীর অধিকার নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘ইকুয়ালিটি নাউ’-এর সহপ্রতিষ্ঠাতাদের একজন তিনি।

দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদ-পরবর্তী সংবিধানে সমতার অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও তার বড় অবদান রয়েছে। বর্ণ, লিঙ্গ বা পরিচয়ের বৈষম্যের ঊর্ধ্বে গিয়ে মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করাই ছিল তার জীবনের মূল ব্রত। ডারবানের এক সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসে আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছানোর এ জীবনযাত্রা মানবাধিকারের ইতিহাসে স্থায়ী ছাপ রেখে গেছে, যার অনন্য স্বীকৃতি ২০২৬ সালের এ নোবেল শান্তি পুরস্কার।

সূত্র: এনডিটিভি

/এমএকে/