শিরোনাম

হামে শেষ ঈদের আনন্দ

হামে শেষ ঈদের আনন্দ
মহাখালীতে ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কোভিড-১৯ হাসপাতালে হামে আক্রান্ত মেয়েকে নিয়ে এসেছে এক বাবা। ছবি: সিটিজেন জার্নাল

নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত ছয় মাস বয়সী সন্তানকে নিয়ে মিটফোর্ড হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের সামনে লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন কেরানীগঞ্জের আগানগরের হোসেন আলী। আজ সোমবার দুপুর একটার দিকে কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘দেড় ঘণ্টা ধরে অপেক্ষা করছি। এখনও ডাক্তার দেখাতে পারিনি। ডাক্তার দেখাতে আরও কত সময় লাগবে জানি না।’

একই ওয়ার্ডে আরও ১৫–২০ জন শিশুকে নিয়ে চিকিৎসকের কক্ষের সামনে অপেক্ষা করতে দেখা যায় অভিভাবকদের। এসব শিশুর অধিকাংশই জ্বরে আক্রান্ত। কর্তব্যরত চিকিৎসক জানান, এখানে রোগীর চাপ বেশি। তবে হামে আক্রান্তদের জন্য আলাদা ওয়ার্ড নেই।

ঢাকা মেডিকেলের কেবিন ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, ১৪ জন শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি আছে। এদের মধ্যে মুন্সীগঞ্জ থেকে ১১ মাস বয়সী রাইয়ানকে নিয়ে এসেছে তার মা রিয়া আক্তার। তিনি জানান, পাঁচ দিন আগে হাম শনাক্ত হয় রাইয়ানের। স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসার পরও অবস্থার অবনতি হওয়ায় তিন দিন আগে রাইয়ানকে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে আসেন তিনি।

বেলা আড়াইটার দিকে মহাখালীর ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কোভিড-১৯ হাসপাতালে কথা হয় শ্যামপুরের শাহ আলমের সঙ্গে। তাঁর দেড় বছর বয়সী মেয়ে মুনতাহাকে নিয়ে তিনি গত রবিবার মিটেফার্ড হাসপাতালে যান। সেখানে হামের কথা শুনেই শুধু ওষুধ লিখে ছেড়ে দেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে তিনি মেয়েকে নিয়ে রাত ১২টার দিকে মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে যান। গভীর রাত হওয়ায় সেখানেও তার মেয়েকে রাখা হয়নি। পরে তিনি ডিএনসিসি হাসপাতালে আসেন। এবার ঈদ হাসপাতালেই কাটাতে হবে তাদের। কারণ একমাত্র মেয়ের অবস্থা সংকটাপন্ন । এমন পরিস্থিতিতে ঈদের আনন্দ নেই তাদের মনে।

  • ঢাকা মেডিকেল ও মিটফোর্ড হাসপাতালে ডেটিকেটেড ওয়ার্ড প্রয়োজন
  • বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত আইসিইউ নেই
  • পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের দূরদর্শীতার অভাব রয়েছে
  • চিকিৎসা করাতে গিয়ে অনেকে নিঃস্ব হয়ে গেছেন

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতালে হামে আক্রান্ত রোগীদের জন্য ডেডিকেটেড কোনো ওয়ার্ড নেই। তাই প্রতিদিন এই দুই হাসপাতালে আসা অসংখ্য রোগীকে অন্যত্র পাঠানো হচ্ছে। এতে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছোটাছুটি করায় রোগীর অবস্থা সংকটাপন্ন হচ্ছে। এছাড়া দেশের জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালগুলোতেও হামে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা সেবা অপ্রতুল। এসব হাসপাতালে না আছে পর্যাপ্ত ওষুধ, না আছে আইসিইউ। ফলে হামে মৃত্যু থামানো সম্ভব হচ্ছে না। দেশের ৬৩ টি জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে এই প্রাণঘাতী রোগ। এই রোগে অনেক মা-বাবা আদরের সন্তান হারিয়েছেন। আবার অনেকে সন্তানের চিকিৎসা করাতে গিয়ে বাড়ি-জমি বিক্রি করে নিঃস্ব হয়ে গেছেন।

  • ডিএনসিসি, মুগদা ও সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ডেডিকেটেড ওয়ার্ড রয়েছে
  • সারাদেশে আক্রান্ত হয়েছে ৭২ হাজার ৮৫৯ জন
  • দেশের ৬৩টি জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে প্রাণঘাতী হাম
  • পরিস্থিতি মোকাবিলায় জাতীয় পরামর্শক কমিটি গঠন প্রয়োজন

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের তথ্য বলছে, গত ১৫ মার্চ থেকে আজ সোমবার পর্যন্ত হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে ৫৪৫ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্ত হয়েছে ৭২ হাজার ৮৫৯ জন রোগী। গত ২৪ ঘন্টায় সন্দেহজনক ও নিশ্চিত হামে ১৭ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। নতুন আক্রান্ত হয়েছে এক হাজার ২২৪ জন।

হামে আক্রান্ত রোগীদের অভিভাবক, চিকিৎসক ও বিভিন্ন হাসপাতালের প্রশাসন বিভাগের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশের জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে হামে আক্রান্তদের চিকিৎসা খুবই সীমিত। হামের সঙ্গে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ায় রোগীদের অবস্থা খারাপ হচ্ছে। নিজ জেলায় চিকিৎসার ব্যবস্থা না থাকায় ঢাকায় নিয়ে আসতে আসতে রোগীর অবস্থা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। তাদের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে( আইসিইউ) সেবা দেওয়া জরুরি হয়ে পড়লেও তা পাওয়া যাচ্ছে না। এতে যথাসময়ে সঠিক চিকিৎসা না পেয়ে অনেক শিশুর মৃত্যু হচ্ছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সারা দেশে থেকে যেহেতু অনেক রোগী প্রথমেই ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতালে আসে, সেহেতু এই দুই হাসপাতালে হামের রোগীদের চিকিৎসার জন্য ডেডিকেটেড ওয়ার্ড স্থাপন করা দরকার ছিল। কারণ এই দুটি প্রতিষ্ঠানে দক্ষ জনবল রয়েছে।

এ বিষয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান সিটিজেন জার্নালকে বলেন, তাদের হাসপাতালে হামে আক্রান্ত রোগীদের জন্য ডেডিকেটেড ওয়ার্ড নেই। তবে কিছু কেবিন রাখা হয়েছে। সেখানে ৩২ জন শিশু চিকিৎসা নিতে পারে। তবে সংকটাপন্ন রোগীদের জন্য আইসিইউ সেবা দেওয়া হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, তাদের হাসপাতাল থেকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ডেডিকেটেড হাসপাতালে ১০ জন দক্ষ চিকিৎসক ও ১০ জন নার্স দেওয়া হয়েছে।

Untitled design (2)
স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের সামনে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে অভিভাবকেরা। ছবি: সিটিজেন জার্নাল

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক বে-নজীর আহমেদ বলেন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতালে দক্ষ জনবল রয়েছে। সেখানে ডেডিকেটেড ওয়ার্ড রাখা দরকার ছিল। বর্তমানে যেসব ডেডিকেটেড হাসপাতালে চিকিৎসা ব্যবস্থা রাখা হয়েছে সেগুলোর বিষয়ে সরকারের প্রচার–প্রচারণায় ঘাটতি আছে। এ বিষয়ে গণমাধ্যম নিজ উদ্যোগে প্রচার চালাচ্ছে। এ ছাড়া সংকট মোকাবিলায় কোভিড–১৯-এর মতো জাতীয় পরামর্শক কমিটি গঠন করা উচিত ছিল। কারণ এই পর্যন্ত পাঁচ শতাধিক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের দূরদর্শীতার অভাব রয়েছে বলে তিনি মনে করছেন।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতালে ডেডিকেটেড ওয়ার্ড প্রস্তুত না থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ঢাকা মেডিকেল ও মিটফোর্ডে অন্যান্য রোগীর চাপ অনেক বেশি। সেখানে জায়গারও সংকট রয়েছে। এ কারণে ওই দুই হাসপাতালে ডেডিকেটেড ওয়ার্ড তৈরি করা হয়নি। তবে ডিএনসিসি, মুগদা ও শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেডিকেটেড ওয়ার্ড রয়েছে। সেখানে হামের যথাযথ ও পর্যাপ্ত চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে।

/বিবি/