শিরোনাম

গ্রেট লেকসের দানব: যে মাছ বাঁচে ৩০০ বছর

সিজেডএন ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
গ্রেট লেকসের দানব: যে মাছ বাঁচে ৩০০ বছর
লেক স্টারজন ফিস

উত্তর আমেরিকার গ্রেট লেকগুলোর গভীর জলে প্রায় ৬ ফুট লম্বা ও ৪৫ কেজি ওজনের এক অদ্ভুত প্রাণী ভেসে বেড়ায়। এদের নাম লেক স্টারজন ফিস। এ মাছগুলো কেবল আকারের দিক থেকেই বিশাল নয়, বয়সের বিচারেও এরা পৃথিবীর বুকে এক অবিশ্বাস্য বিস্ময়। গ্রেট লেকগুলোতে সাঁতরে বেড়ানো মাছগুলো প্রায় ২০০ থেকে ৩০০ বছর পর্যন্ত বাঁচতে পারে।

‘জার্নাল অফ ফিশ বায়োলজি’-তে প্রকাশিত এক গবেষণা লেক স্টারজনকে উত্তর আমেরিকার সবচেয়ে বয়স্ক স্বাদু পানির মাছের তালিকায় শীর্ষে জায়গা করে দিয়েছে। মিশিগান ডিপার্টমেন্ট অফ ন্যাচারাল রিসোর্সেস এবং মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটির (এমএসইউ) বিজ্ঞানীদের যৌথ উদ্যোগে গবেষণাটি পরিচালিত হয়। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এরা মেরু অঞ্চলের বিখ্যাত গ্রিনল্যান্ড শার্কের মতোই দীর্ঘদিন বাঁচে।

গ্রেট লেকসের দানব যে মাছ বাঁচে ৩০০ বছর

আজকের দিনে গ্রেট লেকসে ঘুরে বেড়ানো কোনো বয়স্ক লেক স্টারজনের জন্ম হয়তো হয়েছিল ১৭৫০-এর দশকে! অর্থাৎ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্মেরও আগে, যখন ফরাসি ও ভারতীয় যুদ্ধ (১৭৫৬-১৭৬৩) চলছিল, তখনও এই মাছটি জলের নিচে খেলা করত। মানুষের ইতিহাসের কত না ঘটনার নীরব সাক্ষী সে।১৭৭৩ সালের ‘বোস্টন টি পার্টি’, লুইস ও ক্লার্কের অভিযান (১৮০৪-১৮০৬), মিলওয়াকি থেকে প্রথম রেলগাড়ি চালু হওয়া (১৮৫১), ১৮৭১ সালের শিকাগোর মহা অগ্নিকাণ্ড, কিংবা ১৯৭৫ সালে এডমন্ড ফিট্‌জেরাল্ড জাহাজের সলিল সমাধি। ইতিহাস বদলেছে, নতুন রাজ্য ও শহরের জন্ম হয়েছে, আর এই মাছগুলো নীরবে পার করে দিয়েছে শতাব্দীর পর শতাব্দী।

বিজ্ঞানীরা এতদিন পাখার কাঁটায় থাকা বৃদ্ধির বলয় গুনে স্টারজনের বয়স অনুমান করতেন। তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বলয়গুলো অস্পষ্ট হয়ে যেত, ফলে মাছগুলোর আসল বয়স জানা কঠিন ছিল। এমএসইউ-এর সহকারী অধ্যাপক স্কট কোলবোর্ন এবং তার দল বছরের পর বছর ধরে সংগ্রহ করা ট্যাগযুক্ত স্টারজনের বৃদ্ধির রেকর্ড বিশ্লেষণ করেন। গ্রিনল্যান্ড হাঙরের আয়ু পরিমাপের বিশেষ গাণিতিক মডেল প্রয়োগ করে তারা বুঝতে পারেন, মাছগুলো প্রবীণ বয়সে অত্যন্ত ধীরগতিতে বাড়ে।

গ্রেট লেকসের দানব যে মাছ বাঁচে ৩০০ বছর (1)

তবে বিজ্ঞানের নতুন এ আবিষ্কার স্থানীয় আদিবাসী সম্প্রদায়ের কাছে মোটেও নতুন ছিল না। গবেষণা চলাকালীন উপজাতি সম্প্রদায়ের এক সদস্যের সঙ্গে কথা বলে কোলবোর্ন। ওই আদাবাসী সদস্য জানান, তাদের পূর্বপুরুষরা যুগ যুগ ধরে বিশ্বাস করে আসছেন এ মাছগুলো ৪০০ বছর পর্যন্ত বাঁচতে পারে। কোলবোর্ন বলেন, সেটি ছিল সত্যিই গায়ে কাঁটা দেওয়ার মতো এক মুহূর্ত। আমরা আধুনিক বিশ্লেষণাত্মক পদ্ধতি ব্যবহার করে যে সত্যে পৌঁছালাম, আদিবাসী সম্প্রদায় তা জানত বহু আগে থেকেই।

এ আবিষ্কার কেবল জানার আনন্দ দেয় না, পরিবেশ সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লেক স্টারজন প্রজননক্ষম হতে দীর্ঘ সময় নেয় এবং অনিয়মিতভাবে ডিম পাড়ে। তাই এদের সংখ্যা একবার কমে গেলে তা পুরানো অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে কয়েক দশক পার হয়ে যায়। এরা কতদিন বাঁচে সে সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকলে পরিবেশবিদরা এদের প্রজাতি পুনরুদ্ধার ও বাসস্থান সুরক্ষায় আরও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারবেন। লাখ লাখ বছর ধরে পৃথিবীতে টিকে থাকা এ প্রাণীদের অভিযোজন ক্ষমতা অসাধারণ। মানুষ যদি শুধু এদের বেঁচে থাকার নিরাপদ পরিবেশটুকু নিশ্চিত করে, তবে জলতলের এ প্রাগৈতিহাসিক দানবগুলো ঠিকই নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রাখার পথ খুঁজে নেবে।

সূত্র: পপুলার সায়েন্স

/এমএকে/