শিরোনাম

জমি বরাদ্দের আড়ালে বিদায়ী রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের ক্ষমতার ‘খেলা’

জমি বরাদ্দের আড়ালে বিদায়ী রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের ক্ষমতার ‘খেলা’
প্রভাব খাটিয়ে রাজধানীর আফতাবনগর এলাকার ব্যক্তি মালিকানাধীন সম্পত্তি অর্পিত হিসেবে দেখিয়ে বরাদ্দ নিশ্চিত করেন সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। কোলাজ সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

ব্যক্তি মালিকানাধীন সম্পত্তি অর্পিত হিসেবে দেখিয়ে নিজ জেলার সংগঠনের নামে বরাদ্দ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর বিরুদ্ধে। পাবনা জেলা সমিতির সহযোগী প্রতিষ্ঠান পাবনা ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের নামে এই জমি বরাদ্দ নেওয়া হয়। সদ্য বিদায়ী রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন পাবনা ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাষ্ট্রপতির চেয়ারে থাকাকালীন মো. সাহাবুদ্দিন প্রভাব বিস্তার করে দখলে নিয়ে ওই জমিতে সাইনবোর্ড বসিয়েছিলেন। কিন্তু ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর সে জমিতে বেসরকারি আবাসন প্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন হাউজিং লিমিটেড নিজেদের দখলে নেয়। আবাসন প্রতিষ্ঠানটির ভূমি শাখার কর্মকর্তার দাবি, সাহাবুদ্দিন নিজে প্রভাব খাটিয়ে জমিটি দখলে নিয়েছিলেন।

ঢাকা জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ঢাকার বাড্ডা এলাকার বাড্ডা মৌজার আফতাবনগরে ইস্টার্ন হাউজিংয়ের সি ব্লকের এস এ ১৪৮৯ নম্বর দাগের ১১ দশমিক ৫৪ শতাংশ জমি অর্পিত সম্পত্তি দেখানো হয়। এরপর তা ২০২৪ সালের ৪ এপ্রিল বরাদ্দ নেন সাবেক এই রাষ্ট্রপতি। যার ভিপি কেস নম্বর ১৫৪/৬৮। তবে নথিতে দেখা যায়, জমির মালিকানা ধারাবাহিকতায় প্রহলাল চন্দ্র গং লেখা রয়েছে।

জমিটি বরাদ্দ দেওয়ার বিষয়ে ঢাকার তৎকালীন জেলা প্রশাসক (ডিসি) আনিসুর রহমান আজ শনিবার (১ আগস্ট) সিজেডএন টোয়ন্টিফোরকে বলেন, ‘পাবনা ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে অর্পিত সম্পত্তি এক বছরের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। কারণ ওই সংগঠনে সরকারের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা ছিলেন। আমি সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে চেয়েছি এই সম্পত্তি সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকুক।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকার বর্তমান ডিসি ফরিদা খানম বলেন, ‘তথ্য প্রমাণ ছাড়া জেলা প্রশাসক কার্যালয় থেকে লিজ দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। জেলা প্রশাসনে সব জমির রেকর্ডপত্র রয়েছে। সেখান থেকে যেহেতু অর্পিত সম্পত্তি দেখানো হয়েছে, সেহেতু সেটি অর্পিত সম্পত্তিই হওয়ার কথা। তবে অনেক সময় এসব সম্পত্তি লিজ নিয়ে তৃতীয় কোনো পক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়। যা আইনসিদ্ধ নয়।’

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন প্রভাব খাটিয়ে এই অর্পিত সম্পত্তি পাবনা ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের নামে বরাদ্দ করান। পরে সেখানে আধা-পাকা ভবন নির্মাণের অনুমতি পাইয়ে দিতে প্রত্যক্ষভাবে সহায়তা করেন। সেখানে পাবনা ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক মো. সেলিম রেজার নামে এই সম্পত্তি অর্পিত দেখিয়ে লিজ নেওয়া হয়।

লিজের শর্তে বলা হয়, লিজ নেওয়া অংশের আকার, আকৃতি বা শ্রেণী কোনোভাবেই পরিবর্তন করা যাবে না। লিজদাতার পূর্বানুমতি ছাড়া স্থায়ীভাবে নতুন ভবন নির্মাণ বা কোনো ধরনের পরিবর্তন করা নিষিদ্ধ। শর্ত ভঙ্গ করলে কর্তৃপক্ষ কোনো কারণ দর্শানো ব্যতিরেকে যে কোনো সময় লিজ ও অনুমতি বাতিল করার ক্ষমতা সংরক্ষণ করে বলেও বরাদ্দ পত্রে উল্লেখ্য করা হয়।

জেলা প্রশাসন সূত্রে আরও জানা গেছে, ২০২৪ সালের ১২ মে পাবনা ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক সেলিম রেজা লিজ নেওয়া সম্পত্তিতে একটি আধা-পাকা ভবন নির্মাণের জন্য একটি আবেদন দেন। ওই আবেদনের পর জেলা প্রশাসন থেকে ওই বছরের ২৮ মে অনুমতি দিয়ে একটি পত্র দেয়।

Untitled design (93)
রাজধানীর আফতাবনগর আবাসিক এলাকা। এই এলাকার ব্যক্তিমালিকানাধীন কিছু জমি প্রভাব খাটিয়ে দখলে নেওয়া হয়।

জানা গেছে, আফতাবনগরের সি ব্লকের ২ নম্বর রোডের এস এ দাগের ১৪৮৯ নম্বর জমি পাবনা ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের একটি সাইনবার্ড ছিল। জমিটির চারপাশে সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করা ছিল। বর্তমানে পাবনা সমিতি কিংবা পাবনা ডেভেলপমেন্টের কোনো অস্তিত্ব সেখানে নেই। গত ২৯ জুলাই সরেজমিনে দেখা গেছে, আফতাবনগরের সি ব্লকের ২ নম্বর রোডে কোথাও কোনো সাইনবোর্ড নেই।

তবে ইস্টার্ন হাউজিংয়ের সার্ভেয়ার কামরুজ্জামান দাবি করেন, সাবেক রাষ্ট্রপতি জোরপূর্বক তাদের খাজনা দেওয়া সম্পত্তি নিজ সংগঠনের নামে অর্পিত দেখিয়ে লিজ নেন। মূলত এই জমি কখনই অর্পিত সম্পত্তি ছিল না। কারণ ২০২৩ সাল পর্যন্ত তাদের হাউজিং জমির খাজনা পরিশোধ করেছে। রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রভাব খাটিয়ে জমিটি সংগঠনের নামে লিজ নেন।

লিজ নেওয়ার পর পুলিশের তিনজন ডিআইজি তাদের আফতাবনগর অফিসে এসেছিলেন। তারা জমি বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য তাদেরকে চাপ দিয়েছিলেন। পুলিশের সহায়তায় তারা (পাবনা ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন) নামে সেখানে সীমানা প্রাচীর নির্মাণ ও সাইনবোর্ড টানান। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগষ্টের পর ওই জমির মালিকেরা সেটি উদ্ধার করেন। পাবনা ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের সাইনবোর্ড গুড়িয়ে দিয়ে তারা সেখানে নিজ নিজ স্থাপনা নির্মাণ করেন বলেও ইস্টার্ন হাউজিংয়ের ওই কর্মকর্তা জানান ।

ইস্টার্ন হাউজিং লিমিটেডের প্রজেক্ট ইনচার্জ মেজর (অব.) আলতামাস করিম বলেন, এই জমি ইস্টার্ন হাউজিংয়ের সম্পত্তি। ওই জমি বর্তমান মালিকদের কাছে একাধিক প্লট আকারে ১০- ১৫ কোনো কোনো ক্ষেত্রে ২০ বছর আগে বিক্রি করা হয়। কিন্তু সাবেক রাষ্ট্রপতি ক্ষমতার অপব্যবহার করে ওই জমির ওপর একটি সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দিয়েছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ওই প্লটগুলো মালিকদের বুঝিয়ে দেওয়া হয়।

Untitled design (90)
পাবনা ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের লোগো

ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি কীভাবে অর্পিত সম্পত্তি দেখিয়ে সংগঠনের নামে বরাদ্দ নিলেন–এ প্রশ্নের জবাবে পাবনা ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক সেলিম রেজা মুঠোফোনে সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘আমি একটি মিটিংয়ে আছি। এ বিষয়ে পরে কথা বলবো।’ এরপরে আবার ফোন দিলে তিনি বলেন, জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে অর্পিত সম্পত্তি হিসেবে ওই জমি পাবনা ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনসহ আরও কয়েকটি সংগঠনের নামে এক বছরের জন্য লিজ দেওয়া হয়েছিল।পরবর্তীতে দেখা গেল ওই জমি নিয়ে আদালতে মামলা আছে। কাজেই সেটি স্থগিত রাখা হয়। লিজের মেয়াদ অনেক আগেই শেষ হয়ে গিয়েছে।

এ বিষয়ে পাবনা জেলা সমিতির অফিস সেক্রেটারি রুহুল আমিন সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘আমাদের ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের নামে ওই জমি লিজ নেওয়া হয়েছিল। এখন সেই জমি আমাদের দখলে নেই।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সাবেক রাষ্ট্রপতি শাহাবুদ্দিনের কথিত মামাতো ভাই আব্দুল ওহাব এই জমি লিজ দেওয়ার ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তিনি ইস্টার্ন হাউজিংয়ের পরিচালক ছিলেন। ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে লিজ দেওয়ার ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর তিনি চাকরিচ্যুত হন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ট্রান্সফারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘রাষ্ট্রপতির ক্ষমতায় থাকাকালীন নিজ জেলার সংগঠনের নামে সম্পত্তি লিজ নেওয়ার মাধ্যমে ক্ষমতার অপব্যবহার করা হয়েছে। এখানে দুর্নীতি হয়েছে। ইতোপূর্বে দুর্নীতি করায় সাবেক রাষ্ট্রপতির সাজাও হয়েছে- এরকম দৃষ্টান্ত দেশে রয়েছে।’

/বিবি/