রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে শিল্পী পরিচয়কে বেশি সম্মান করি: ন্যান্সি

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে শিল্পী পরিচয়কে বেশি সম্মান করি: ন্যান্সি
সংগীতশিল্পী নাজমুন মুনিরা ন্যান্সি

জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী নাজমুন মুনিরা ন্যান্সি বলেছেন, কোনও রাজনৈতিক দলই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। আবার অন্য দলের সমর্থক বলেই কাউকে ঘৃণা করার মানুষও আমি নই। আমি একজন শিল্পীর রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে তার শিল্পী পরিচয়কে অনেক বেশি সম্মান করি।

বুধবার (৪ নভেম্বর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে একথা বলেন তিনি।

পোস্টে ন্যান্সি লিখেন, আমি বিএনপির একজন একনিষ্ঠ সমর্থক। এই ভালোবাসার পেছনে আমার পারিবারিক ইতিহাস আছে। ছোটবেলা থেকেই আমাদের ঘরে ধানের শীষের কথা শুনে বড় হয়েছি। আমার মা, মরহুমা জোৎস্না হক নেত্রকোনা জেলা জাসাসের সহ সভাপতি ছিলেন। পরবর্তী সময়ে নিজের রাজনৈতিক বোধ ও উপলব্ধি থেকেও বিএনপির প্রতি আমার ভালোবাসা তৈরি হয়েছে।কিন্তু বিএনপির সমর্থক হওয়া মানেই আমি রাজনীতিবিদ, নির্বাচন করতে চাই কিংবা সংসদ সদস্য হওয়ার স্বপ্ন দেখি—এমনটা কেন ধরে নেওয়া হয়, বুঝি না। আমি কখনো সংসদ সদস্য হতে চাইনি, সংরক্ষিত আসনেও আমার কোনো আগ্রহ ছিল না। কাউকে কখনো এমন ইচ্ছার কথাও বলিনি।

তিনি লিখেন, বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই কেউ কেউ বলতে শুরু করলেন, বিএনপি ন্যান্সিকে মূল্যায়ন করলো না, সংরক্ষিত আসনে ডাকল না। আমাকে ভালোবেসে তারা কথাগুলো বলছেন, সেটা বুঝি। কিন্তু আমি যা কখনো হতে চাইনি সেটা আমাকে না দেওয়ার অভিযোগ দলের প্রতি কেন?

ন্যান্সি লিখেন, কোনো প্রতিষ্ঠানে বা কোনো পদে আমাকে যদি যোগ্য মনে করা হয়, আমি অবশ্যই সেখানে কাজ করতে চাইব। কিন্তু সেটা নিজের যোগ্যতায়, কোনো তদবিরে নয়। আমার জীবনের ১৪টি বছর রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে হারিয়ে গেছে। সেই সময় আর কেউ ফিরিয়ে দিতে পারবে? কিন্তু আমি তো থেমে থাকিনি! আজ বাংলাদেশের মানুষ আমাকে একজন শিল্পী হিসেবে চেনে, ভালোবাসে। এটাও কী আমার বড় প্রাপ্তি নয়?

তিনি লিখেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ‘নতুন কুঁড়ি’র বিচারক হিসেবে কাজ করেছি। ২০২৩ সালের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের জুরি বোর্ডের সদস্যও হয়েছি। এসব সুযোগের জন্য কাউকে ফোন করতে হয়নি, কারও কাছে অনুরোধ করতে হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আমাকে যোগ্য মনে করেছে বলেই ডেকেছে। এটাই আমার কাছে প্রকৃত সম্মান।আর বিএনপি সংস্কৃতিবান্ধব নয়, শিল্পীদের মূল্যায়ন করে না—এমন ঢালাও বক্তব্যের সঙ্গেও আমি একদমই একমত নই।

এই সংগীতশিল্পী লিখেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় নতুন কুঁড়ি, একুশে পদক, স্বাধীনতা পুরস্কারসহ সাংস্কৃতিক ও জাতীয় স্বীকৃতির বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিলো। বেগম খালেদা জিয়ার সময় জাতীয় নাট্যশালা, জাতীয় চারুকলা গ্যালারি ও জাতীয় সংগীত ও নৃত্যকলা কেন্দ্র উদ্বোধন করা হয়। নতুন কুঁড়ির প্রতিও তার আগ্রহ ছিল। এগুলো কি সংস্কৃতির প্রতি পৃষ্ঠপোষকতার উদাহরণ নয়? বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও এই ঐতিহ্যের উত্তরসূরি। ‘ সবার আগে বাংলাদেশ ’ নামক অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে একটি সুন্দর সাংস্কৃতিক যাত্রা তিনি শুরু করেছেন। মনে রাখতে হবে, বিএনপি সবে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে। একটি কঠিন পরিস্থিতিতে দেশ পরিচালনার পাশাপাশি সংস্কৃতি অঙ্গনকে এগিয়ে নেওয়ার জন্যও সময় ও সুযোগ দিতে হবে।

তিনি লিখেন, মাস চারেক আগে এসএসএফের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে আমার সাথে যোগাযোগ করা হয় এবং এই প্রথম কোনো রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানের জন্য আমার প্রাপ্য পুরো সম্মানী অনুষ্ঠানের কয়েকদিন আগেই আমার বাসায় পৌঁছে দেয়া হয়! আওয়ামীলীগ এর আমলে এমন ভাবাও ছিলো দুঃস্বপ্ন! প্রধানমন্ত্রী ও তার পরিবারের সামনে বালাম ভাই ও আমার গান করার সুযোগ হয়েছিল। অনুষ্ঠানে বালাম ভাই প্রধানমন্ত্রী কে স্টেজে আসার আহ্বান জানালে তিনি সাথে সাথেই মঞ্চে উপস্থিত হোন। আবার আমার গানের শেষেও একই ঘটনা। তিনি আমাদের সঙ্গে মঞ্চে এসে কথা বলেছেন, আমার গাওয়া গান নিয়েও নিজের স্মৃতির কথা বলেছেন। সংস্কৃতি অঙ্গনের কিছু সমস্যা ও পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও আমার কথা শুনেছেন। অভিজ্ঞতাটি আমার কাছে বিশেষ ছিল। অথচ সেই ছবিগুলো আমি ফেসবুকে প্রকাশ করিনি। কারণ জানতাম, প্রকাশ করলেই হয়তো বলা হবে, এখন তো ন্যান্সির সময়, এখন তো সে সব পেয়ে যাবে! আমার রাজনৈতিক ভালোবাসা বা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা সবাইকে দেখিয়ে প্রমাণ করার কোনো প্রয়োজন আমি অনুভব করিনি।

ন্যান্সি লিখেন, আমি বিএনপির সমালোচনাও করি। কোনো রাজনৈতিক দলই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। আবার অন্য দলের সমর্থক বলেই কাউকে ঘৃণা করার মানুষও আমি নই। বিশেষ করে একজন শিল্পীর রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে তার শিল্পী পরিচয়কে আমি অনেক বেশি সম্মান করি। আমি নিশ্চিত হয়ে বলছি, বিএনপি বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতির চর্চাকে অনেকদূর এগিয়ে নেবে। প্রতিষ্ঠিত শিল্পীদের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নতুন প্রতিভা খুঁজে বের করবে। নতুন মুখ তৈরি হবে, নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে। আমি বিশ্বাস করি, সামনে আমরা এমন অনেক প্রতিভাবান শিল্পীকে দেখতে পাব। সেদিন খুব দূরে নয়।

তিনি লিখেন, অতীতে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে শিল্পীদের বঞ্চিত করা অন্যায় ছিল। একইভাবে এখন নিজের সমর্থিত দল ক্ষমতায় আছে বলে বিশেষ সুবিধা প্রত্যাশা করাও অন্যায়। এই চর্চা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। বাংলাদেশের শিল্পীকে তার রাজনৈতিক পরিচয়ে নয়, তার শিল্প ও যোগ্যতায় মূল্যায়ন করা হোক - এই আমার প্রত্যাশা।

/এসবি/