এইচএসসিতে ধস, দায় কার?

এইচএসসিতে ধস, দায় কার?
গ্রাফিক্স: সিটিজেন জার্নাল টোয়েন্টিফোর

একসময় এইচএসসির ফল প্রকাশের দিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে দেখা যেতো আনন্দ-উচ্ছ্বাস। জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের ঘিরে সহপাঠীদের ছবি তোলা আর অভিভাবকদের চোখে-মুখে থাকতো গর্ব ও স্বস্তির ছাপ। তবে এবারের চিত্র একেবারেই ভিন্ন। পরীক্ষায় অংশ নেওয়া প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেননি। ফল প্রকাশের দিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও ছিল নীরব পরিবেশ। কেন এইচএসসির ফলে এমন বিপর্যয়, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে শিক্ষাঙ্গনে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজে ৭২৪ শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছেন। জিপিএ-৫ পেয়েছেন মাত্র তিনজন। স্বনামধন্য ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজেও এক বছরের ব্যবধানে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে অর্ধেকের বেশি, অকৃতকার্য ১৩৯জন। শুধু রাজধানীতেই নয়, সর্বোচ্চ অকৃতকার্য হওয়া বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের অধীন ১১টি কলেজ থেকে ৩৭ জন পরীক্ষায় অংশ নিলেও কেউই পাস করতে পারেনি। ফলাফলের অবনতি নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে কেন ধারাবাহিকভাবে পিছিয়ে পড়ছে এইচএসসি পরীক্ষার ফল।

শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জুলাইয়ের আন্দোলনের পর অনেক শিক্ষার্থীই আর নিয়মিত পড়াশোনায় ফিরতে পারেনি। দীর্ঘ বিরতি ও নানা অনিশ্চয়তায় তাদের শিক্ষাজীবনে তৈরি হয়েছে ছন্দপতন। এছাড়া শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় অমনোযোগের পেছনে রয়েছে ডিজিটাল ডিভাইসের অতিরিক্ত ব্যবহার। দীর্ঘ সময় মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যস্ত থাকায় নিয়মিত পড়াশোনা, বই পড়া এবং শ্রেণিকক্ষে মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষেত্রে অনেক শিক্ষার্থী পিছিয়ে পড়ছে।

এর পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগে শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের একাংশের মনোযোগ পাঠদান থেকে অন্যদিকে সরে গেলে তার প্রভাব পড়াশোনার সার্বিক ফলাফলে পড়া স্বাভাবিক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এছাড়া, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকসংকট, শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের দুর্বলতা, শিক্ষকদের পেশাগত অনিশ্চয়তা এবং শিক্ষায় বাজেটের ঘাটতিও দীর্ঘদিনের সমস্যা। গত বছর ফল বিপর্যয়ের পর এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হলেও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। ফলে আগের সংকট মোকাবিলায় নেওয়া উদ্যোগের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

এর পাশাপাশি প্রশ্নপত্রের ভুল, প্রশ্ন বিতরণে গরমিল এবং উত্তরপত্র মূল্যায়নের নির্ভুলতা নিয়েও আলোচনায় এসেছে। পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্রের দুটি প্রশ্নে ভুল স্বীকার করে পরীক্ষার্থীদের পূর্ণ নম্বর দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিলো। অন্যদিকে সর্বশেষ এসএসসির প্রায় ১৩ লাখ উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষণে প্রায় ৪৫ হাজার শিক্ষার্থীর গ্রেড পরিবর্তন এবং প্রায় পাঁচ হাজার শিক্ষার্থীর ফেল থেকে পাসের ঘটনায় মূল্যায়নব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

ফল প্রকাশের পর ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী সামিহা জামান বলেন, শেখ হাসিনার সময়ে দেখতাম আমাদের সিনিয়রদের রেজাল্ট ভালো হতো, এই সরকারের সময়ে কেন এমন হচ্ছে বুঝতে পারছি না। এসএসসিতেও দেখেছিলাম খাতা রিকলের পর অনেকের রেজাল্ট পরিবর্তন হয়েছে। এবার আমার অনেক ফ্রেন্ডের রেজাল্টও খারাপ হয়েছে। দেখা যাক খাতা পুনর্মূল্যায়নের পর কি আসে।

তহমিনা রহমান নামে এক অভিভাবক বলেন, আমার মেয়ে এবার এ গ্রেড পেয়েছে। ফলাফলে শুধু শিক্ষার্থীদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। কলেজে ঠিকমতো পড়ানো হচ্ছে কি না, শিক্ষকেরা কতটা আন্তরিক, সেটাও দেখতে হবে।

কেশবপুর সরকারি ডিগ্রি কলেজের সহযোগী অধ্যাপক আজিজুল ইসলাম বলেন, ছাত্র আন্দোলনের পর থেকেই ক্রমান্বয়ে রেজাল্ট খারাপ করছে শিক্ষার্থীরা। আমরা শিক্ষকরা নিজেদের সর্বোচ্চ দিয়েই পড়ানোর চেষ্টা করি। কিন্তু শিক্ষার্থীদেরও তো মনোযোগী হতে হবে।

সরকারী শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজের সাবেক অধ্যাপক মোহাম্মদ এবাদুল হক ভূঁইয়া বলেন, ফল বিপর্যয়ের প্রধান কারনই হলো শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করেনা। বেশিরভাগই ফোনে আসক্ত বা রাজনীতিতে বেশি সময় দিচ্ছে। আর যদি কলেজের হিসাব করি, সোহরাওয়ার্দীসহ এসব কলেজে ভালো শিক্ষার্থীরা ভর্তি হয়না। যারা ভর্তি হয় তারা পার্কে আড্ডা দেয় আর কিছু শিক্ষার্থী পার্ট টাইম চাকরি বা টিউশনি করে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুন বলেন, ইংরেজি এবং আইসিটিতে প্রায় ৪ লাখ শিক্ষার্থীর ফেল করার পেছনে পুরো জাতির ব্যর্থতা রয়েছে। এ বিপর্যয়ের পেছনে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের চরম সংকট এবং শিক্ষকদের অপ্রতুল বেতন-ভাতা অন্যতম প্রধান সমস্যা।

/এসবি/