শিরোনাম

এসএসসির ফলে বিপর্যয়, যা বলছেন শিক্ষাবিদরা

শেখ শাহরিয়ার হোসেন
শেখ শাহরিয়ার হোসেন
এসএসসির ফলে বিপর্যয়, যা বলছেন শিক্ষাবিদরা
মোবাইল ফোনে এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল দেখছেন শিক্ষার্থীরা। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলে বড় পতন হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে সার্বিক পাসের হার কমেছে ৬ দশমিক ২০ শতাংশ। ২০০৭ সালের পর, অর্থাৎ প্রায় দুই দশকের মধ্যে এবারই সবচেয়ে কম শিক্ষার্থী পাস করেছে। ওই বছর পাসের হার ছিল ৫৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ।

এবার জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কমেছে ২২ হাজার ৩৫৬ জন। বেড়েছে শতভাগ অকৃতকার্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও। ফলে এবারের ফল নিয়ে মাধ্যমিক শিক্ষার মান, শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা এবং শিক্ষা ব্যবস্থার বৈষম্য নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ১১টি শিক্ষা বোর্ডে এবার গড় পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ। গত বছর এ হার ছিল ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ। একইভাবে ২০২৫ সালে জিপিএ-৫ পেয়েছিল ১ লাখ ৩৯ হাজার ৩২ জন। এবার তা কমে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জনে।

সাধারণ ৯টি শিক্ষা বোর্ডেও ফলাফলের অবনতি হয়েছে। এবার এসব বোর্ডে গড় পাসের হার ৬৪ দশমিক ০৫ শতাংশ, গত বছর তা ছিল ৬৮ দশমিক ০৪ শতাংশ। বোর্ডভেদে ফলাফলে রয়েছে বড় ব্যবধান। ঢাকা বোর্ডে পাসের হার সর্বোচ্চ ৭১ দশমিক ৬৩ শতাংশ হলেও ময়মনসিংহে তা ৫৭ দশমিক ৩৯ শতাংশ। চট্টগ্রাম, সিলেট ও দিনাজপুর বোর্ডেও পাসের হার ৬০ শতাংশের নিচে।

ফলাফলের এই পতনের অন্যতম কারণ হিসেবে ইংরেজি ও গণিত বিষয়ে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতাকে চিহ্নিত করেছেন মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, ঢাকার চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান। সোমবার (১০ আগস্ট) সচিবালয়ে ফলাফল প্রকাশের সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, সব বোর্ডের ফলাফল পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ইংরেজি ও গণিত– এই দুটি বিষয়ে ফেল করার হার পাসের হার কমিয়ে দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই এ দুটি বিষয় ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

এদিকে মাদ্রাসা শিক্ষায় ফলাফলের অবনতি আরও স্পষ্ট। এবার শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। গত বছর ৮৬টি মাদ্রাসা থেকে কোনো শিক্ষার্থী পাস করেনি, এবার সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২২৬টিতে।

তবে শিক্ষার্থীদের মেধা বা পরিশ্রমের ঘাটতি দিয়েই এবারের ফলাফল ব্যাখ্যা করতে চান না শিক্ষাবিদরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আশরাফ সাদেক সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, শহর অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা তুলনামূলকভাবে পড়াশোনার ক্ষেত্রে বেশি সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকে। তাদের অভিভাবকরাও সন্তানদের পড়াশোনার বিষয়ে অধিক সচেতন ও তদারকিতে থাকেন। উন্নত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাড়তি শিক্ষা সহায়তা এবং পারিবারিক তদারকির কারণে শহরের শিক্ষার্থীরা বাড়তি সুবিধা পায়।

তার মতে, বোর্ডভেদে ফলাফলের পার্থক্যের পেছনে শিক্ষার পরিবেশ ও সুযোগের বৈষম্যও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি, অনার্স ও মাস্টার্স পর্যায়ে গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা নিজেদের মেধা ও যোগ্যতায় ভালো সাফল্য দেখায়। তাই এসএসসির ফলের পার্থক্যকে শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক সক্ষমতার চূড়ান্ত মাপকাঠি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

এদিকে মাদ্রাসা শিক্ষায় ফলাফলের অবনতি আরও স্পষ্ট। এবার শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। গত বছর ৮৬টি মাদ্রাসা থেকে কোনো শিক্ষার্থী পাস করেনি, এবার সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২২৬টিতে।

চলতি বছর মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে দাখিল পরীক্ষায় মোট ২ লাখ ৯৮ হাজার ৯৮২ জন শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছে। তাদের মধ্যে পাস করেছে ১ লাখ ৬৪ হাজার ৭৯৭ জন। সামগ্রিক পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৫৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ।

এ বছর দাখিল পরীক্ষায় মোট ৬ হাজার ৭১৬ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে। এর মধ্যে ছাত্র ৩ হাজার ৫৭২ জন এবং ছাত্রী ৩ হাজার ১৪৪ জন।

মাদ্রাসার ফল খারাপ হওয়ার পেছনে অভিভাবকদের ভূমিকার কথা বলেছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক কাজী ফারুক হোসেন। তিনি বলেন, অনেক অভিভাবক ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে সন্তানকে মাদ্রাসায় ভর্তি করান। কিন্তু ভর্তি করানোর পর সন্তানের পড়াশোনা, গাইডলাইন ও একাডেমিক অগ্রগতির বিষয়ে অনেক সময় নিয়মিত খোঁজখবর রাখেন না। ফলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় প্রয়োজনীয় নজরদারি ও সহায়তার ঘাটতি তৈরি হতে পারে, যা ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

শুধু মাদ্রাসা নয়, সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থাতেও শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে। এবার সাধারণ ৯টি শিক্ষা বোর্ডে ৫৭টি প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ৪৮টি। অর্থাৎ এক বছরে শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে ৯টি।

ফলাফলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ছাত্রীদের এগিয়ে থাকা। সাধারণ ৯টি শিক্ষা বোর্ডে উত্তীর্ণ মোট ছাত্রের চেয়ে ১ লাখ ৭ হাজার ৯৮২ জন বেশি ছাত্রী উত্তীর্ণ হয়েছে। জিপিএ-৫ পাওয়ার ক্ষেত্রেও ছাত্রদের চেয়ে ১১ হাজার ৪০১ জন বেশি ছাত্রী জিপিএ-৫ পেয়েছে।

সব মিলিয়ে এবারের এসএসসি ফলাফলে ইংরেজি ও গণিতে দুর্বলতা, অঞ্চলভেদে শিক্ষার সুযোগের পার্থক্য, অভিভাবকদের তদারকির ঘাটতি এবং দুর্বল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চিত্র একসঙ্গে সামনে এসেছে। বিশেষ করে শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং মাদ্রাসা বোর্ডের নিম্ন পাসের হার মাধ্যমিক শিক্ষার কাঠামোগত দুর্বলতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করেছে।

/এফসি/