অবসর ভাতা পেতে টেবিলে টেবিলে শিক্ষকরা

অবসর ভাতা পেতে টেবিলে টেবিলে শিক্ষকরা
শেখ শাহরিয়ার হোসেন

সকাল গড়াতেই রাজধানীর ইস্কাটনে ‘বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী অবসর সুবিধা বোর্ড’ কার্যালয়ে বাড়তে থাকে মানুষের ভিড়। কারও হাতে পুরোনো ফাইল, কারও হাতে আবেদনপত্র। কেউ কেউ বারবার মোবাইল ফোনে পরিবারের সদস্যদের আশ্বস্ত করছেন, ‘দেখি, আজ কোনো সুখবর পাই কি না।’
করিডোরজুড়ে অপেক্ষমাণ এই শিক্ষকেরা একসময় দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান করেছেন। অবসরের পর এখন তাদের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা, চাকরি জীবনের প্রাপ্য অবসর ও কল্যাণ সুবিধার অর্থ হাতে পাওয়া। কারো কারো ক্ষেত্রে সেই অপেক্ষা গিয়ে ঠেকেছে দুই, তিন, এমনকি সাড়ে চার বছরেও।
রংপুর থেকে আসা অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক তাহের হোসেন তেমনই একজন। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে তিনি এসেছেন নিজের আবেদনের অগ্রগতি জানতে। শিক্ষকতা পেশায় পার করেছেন জীবনের চল্লিশটি বছর। এখন এক কর্মকর্তার টেবিল থেকে আরেক কর্মকর্তার টেবিলে ঘুরছেন, কোথাও নথি যাচাই হচ্ছে, কোথাও নতুন তথ্য দিতে বলা হচ্ছে, আবার কোথাও বলা হচ্ছে এবারের লিস্টে নাম আসবে না। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস অপেক্ষার পরও নিশ্চিত কোনো উত্তর না পেয়ে তার কণ্ঠে ফুটে ওঠে হতাশা।
গত ১৬ জুলাই বোর্ডের কার্যালয়ে তার সঙ্গে কথা হয় সিজেডএন টোয়েন্টিফোরের। অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক তাহের হোসেন বলেন ‘চাকরি জীবনে নিয়মিত বেতন থেকে অবসর তহবিলের টাকা কাটা হয়েছে। এখন অবসরের আড়াই বছর পার হলেও নিজের প্রাপ্য টাকাই পাচ্ছি না। বারবার রংপুর থেকে ঢাকায় আসতে হয়, এক টেবিল থেকে আরেক টেবিলে ঘুরি, কিন্তু কেউ নির্দিষ্ট করে বলতে পারে না কবে টাকা পাবো।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘বয়স হয়েছে, চিকিৎসার খরচ বাড়ছে। এই টাকা এখন আমাদের জন্য বিলাসিতা নয়, বেঁচে থাকার অবলম্বন।’
করিডোরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ধীর পায়ে হাঁটছিলেন আহসান নামে এক যুবক। মুখে ক্লান্তি আর হতাশার ছাপ। হাতে শক্ত করে ধরা একটি পুরোনো ফাইল। বারবার বিভিন্ন টেবিলে গিয়ে খোঁজ নিচ্ছেন, আবার ফিরে আসছেন। পরিচয় দিয়ে কথা বলতেই জানালেন, নিজের জন্য নয়, মৃত বাবার অবসর সুবিধার প্রাপ্য টাকা তুলতেই মাসের পর মাস ধরে বোর্ডের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন।
আহসান বলেন, ‘আমার বাবা অবসরের পর আবেদন করেছিলেন। কিন্তু প্রাপ্য টাকা হাতে পাওয়ার আগেই মারা যান। আগে বাবা ঘুরতেন, এখন উত্তরাধিকারী হিসেবে আমি সেই টাকার জন্য ঘুরছি। প্রতিবারই নতুন কাগজ বা নতুন প্রক্রিয়ার কথা বলা হয়। বাবার সারাজীবনের পরিশ্রমের এই টাকাটা পেতেই এত ভোগান্তি হবে ভাবিনি।’
এসব বাস্তবতার মধ্যেই সরকার বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের আটকে থাকা অবসর সুবিধা ও কল্যাণ ট্রাস্টের বকেয়া অর্থ পরিশোধের কার্যক্রম শুরু করেছে। প্রথম ধাপে ২৫ হাজার শিক্ষকের তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন।
গত ১৪ জুলাই জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী জানান, ২০২২ সালের পর থেকে অবসর ভাতা ও কল্যাণ ট্রাস্টের অর্থ পরিশোধ কার্যত বন্ধ ছিল। ফলে বর্তমানে প্রায় ৬৫ হাজার শিক্ষক তাদের প্রাপ্য অর্থের অপেক্ষায় রয়েছেন। এ সংকট নিরসনে সরকার বিশেষ আর্থিক বরাদ্দ দিয়েছে এবং সেই বরাদ্দের ভিত্তিতেই প্রথম ধাপে ২৫ হাজার শিক্ষকের তথ্য যাচাই-বাছাই (স্ক্রুটিনি) সম্পন্ন করে পর্যায়ক্রমে অর্থ পরিশোধ শুরু করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘এবার অর্থ পরিশোধে কোনো ধরনের অনিয়ম বা তছরুপ হবে না। পর্যায়ক্রমে বাকি শিক্ষক-কর্মচারীদের পাওনাও পরিশোধ করা হবে।’
তবে সংকটের গভীরতা আরও বড়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী অবসর সুবিধা বোর্ডে বর্তমানে প্রায় ৬৫ হাজার আবেদন অনিষ্পন্ন রয়েছে। একজন শিক্ষক বা কর্মচারী গড়ে প্রায় ১৩ লাখ টাকা অবসর ভাতা পান। এসব আবেদন নিষ্পত্তির জন্য প্রয়োজন প্রায় ৮ হাজার ৭১০ কোটি টাকা, অথচ তহবিলে রয়েছে মাত্র প্রায় ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। সে হিসেবে, অবসর তহবিলে প্রায় ৭ হাজার ৪১০ কোটি টাকার ঘাটতি রয়েছে।

অন্যদিকে, শিক্ষক-কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্টে ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত প্রায় ৪৪ হাজার আবেদন জমা হলেও সেগুলো এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। এসব আবেদন মেটাতে প্রয়োজন প্রায় ৩ হাজার ১৫০ কোটি টাকার এককালীন বরাদ্দ।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, অবসর সুবিধা বোর্ডের তহবিল কেবল শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন থেকে কেটে রাখা অর্থের ওপর নির্ভরশীল নয়। প্রতিবছর অবসর সুবিধা ও কল্যাণ ট্রাস্টের অর্থ পরিশোধে সরকারের বিশেষ অনুদান বা বরাদ্দ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে কয়েক বছর ধরে প্রয়োজনের তুলনায় পর্যাপ্ত বরাদ্দ না পাওয়ায় অনিষ্পন্ন আবেদন বাড়তে থাকে। ফলে বর্তমানে বিপুলসংখ্যক শিক্ষক-কর্মচারীর প্রাপ্য অর্থ আটকে আছে এবং তহবিলে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
এদিকে, অবসরের পর নিজের প্রাপ্য অর্থ পেতে অনেককে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হচ্ছে। কেউ কেউ সেই অর্থ পাওয়ার আগেই মৃত্যুবরণ করছেন।
এসব সংকট নিরসনে সরকার অর্থ বরাদ্দের পাশাপাশি পুনরায় সফটওয়্যার চালু, জনবল বৃদ্ধি, অনলাইন কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং আইবাস প্লাস প্লাস (iBAS++)-এর মাধ্যমে সরাসরি শিক্ষক-কর্মচারীদের ব্যাংক হিসাবে অর্থ পাঠানোর উদ্যোগ নিচ্ছে বলে জানা গেছে।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী অবসর সুবিধা বোর্ডের উপ-পরিচালক ড. মোহাম্মদ আমীর হামজা মোল্লা সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘শিক্ষকদের আর ভোগান্তিতে পড়তে হবে না। ফাইল প্রস্তুতের কাজ চলছে। পর্যায়ক্রমে সবাই তাদের প্রাপ্য অর্থ পেয়ে যাবেন।’

সকাল গড়াতেই রাজধানীর ইস্কাটনে ‘বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী অবসর সুবিধা বোর্ড’ কার্যালয়ে বাড়তে থাকে মানুষের ভিড়। কারও হাতে পুরোনো ফাইল, কারও হাতে আবেদনপত্র। কেউ কেউ বারবার মোবাইল ফোনে পরিবারের সদস্যদের আশ্বস্ত করছেন, ‘দেখি, আজ কোনো সুখবর পাই কি না।’
করিডোরজুড়ে অপেক্ষমাণ এই শিক্ষকেরা একসময় দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান করেছেন। অবসরের পর এখন তাদের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা, চাকরি জীবনের প্রাপ্য অবসর ও কল্যাণ সুবিধার অর্থ হাতে পাওয়া। কারো কারো ক্ষেত্রে সেই অপেক্ষা গিয়ে ঠেকেছে দুই, তিন, এমনকি সাড়ে চার বছরেও।
রংপুর থেকে আসা অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক তাহের হোসেন তেমনই একজন। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে তিনি এসেছেন নিজের আবেদনের অগ্রগতি জানতে। শিক্ষকতা পেশায় পার করেছেন জীবনের চল্লিশটি বছর। এখন এক কর্মকর্তার টেবিল থেকে আরেক কর্মকর্তার টেবিলে ঘুরছেন, কোথাও নথি যাচাই হচ্ছে, কোথাও নতুন তথ্য দিতে বলা হচ্ছে, আবার কোথাও বলা হচ্ছে এবারের লিস্টে নাম আসবে না। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস অপেক্ষার পরও নিশ্চিত কোনো উত্তর না পেয়ে তার কণ্ঠে ফুটে ওঠে হতাশা।
গত ১৬ জুলাই বোর্ডের কার্যালয়ে তার সঙ্গে কথা হয় সিজেডএন টোয়েন্টিফোরের। অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক তাহের হোসেন বলেন ‘চাকরি জীবনে নিয়মিত বেতন থেকে অবসর তহবিলের টাকা কাটা হয়েছে। এখন অবসরের আড়াই বছর পার হলেও নিজের প্রাপ্য টাকাই পাচ্ছি না। বারবার রংপুর থেকে ঢাকায় আসতে হয়, এক টেবিল থেকে আরেক টেবিলে ঘুরি, কিন্তু কেউ নির্দিষ্ট করে বলতে পারে না কবে টাকা পাবো।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘বয়স হয়েছে, চিকিৎসার খরচ বাড়ছে। এই টাকা এখন আমাদের জন্য বিলাসিতা নয়, বেঁচে থাকার অবলম্বন।’
করিডোরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ধীর পায়ে হাঁটছিলেন আহসান নামে এক যুবক। মুখে ক্লান্তি আর হতাশার ছাপ। হাতে শক্ত করে ধরা একটি পুরোনো ফাইল। বারবার বিভিন্ন টেবিলে গিয়ে খোঁজ নিচ্ছেন, আবার ফিরে আসছেন। পরিচয় দিয়ে কথা বলতেই জানালেন, নিজের জন্য নয়, মৃত বাবার অবসর সুবিধার প্রাপ্য টাকা তুলতেই মাসের পর মাস ধরে বোর্ডের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন।
আহসান বলেন, ‘আমার বাবা অবসরের পর আবেদন করেছিলেন। কিন্তু প্রাপ্য টাকা হাতে পাওয়ার আগেই মারা যান। আগে বাবা ঘুরতেন, এখন উত্তরাধিকারী হিসেবে আমি সেই টাকার জন্য ঘুরছি। প্রতিবারই নতুন কাগজ বা নতুন প্রক্রিয়ার কথা বলা হয়। বাবার সারাজীবনের পরিশ্রমের এই টাকাটা পেতেই এত ভোগান্তি হবে ভাবিনি।’
এসব বাস্তবতার মধ্যেই সরকার বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের আটকে থাকা অবসর সুবিধা ও কল্যাণ ট্রাস্টের বকেয়া অর্থ পরিশোধের কার্যক্রম শুরু করেছে। প্রথম ধাপে ২৫ হাজার শিক্ষকের তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন।
গত ১৪ জুলাই জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী জানান, ২০২২ সালের পর থেকে অবসর ভাতা ও কল্যাণ ট্রাস্টের অর্থ পরিশোধ কার্যত বন্ধ ছিল। ফলে বর্তমানে প্রায় ৬৫ হাজার শিক্ষক তাদের প্রাপ্য অর্থের অপেক্ষায় রয়েছেন। এ সংকট নিরসনে সরকার বিশেষ আর্থিক বরাদ্দ দিয়েছে এবং সেই বরাদ্দের ভিত্তিতেই প্রথম ধাপে ২৫ হাজার শিক্ষকের তথ্য যাচাই-বাছাই (স্ক্রুটিনি) সম্পন্ন করে পর্যায়ক্রমে অর্থ পরিশোধ শুরু করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘এবার অর্থ পরিশোধে কোনো ধরনের অনিয়ম বা তছরুপ হবে না। পর্যায়ক্রমে বাকি শিক্ষক-কর্মচারীদের পাওনাও পরিশোধ করা হবে।’
তবে সংকটের গভীরতা আরও বড়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী অবসর সুবিধা বোর্ডে বর্তমানে প্রায় ৬৫ হাজার আবেদন অনিষ্পন্ন রয়েছে। একজন শিক্ষক বা কর্মচারী গড়ে প্রায় ১৩ লাখ টাকা অবসর ভাতা পান। এসব আবেদন নিষ্পত্তির জন্য প্রয়োজন প্রায় ৮ হাজার ৭১০ কোটি টাকা, অথচ তহবিলে রয়েছে মাত্র প্রায় ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। সে হিসেবে, অবসর তহবিলে প্রায় ৭ হাজার ৪১০ কোটি টাকার ঘাটতি রয়েছে।

অন্যদিকে, শিক্ষক-কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্টে ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত প্রায় ৪৪ হাজার আবেদন জমা হলেও সেগুলো এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। এসব আবেদন মেটাতে প্রয়োজন প্রায় ৩ হাজার ১৫০ কোটি টাকার এককালীন বরাদ্দ।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, অবসর সুবিধা বোর্ডের তহবিল কেবল শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন থেকে কেটে রাখা অর্থের ওপর নির্ভরশীল নয়। প্রতিবছর অবসর সুবিধা ও কল্যাণ ট্রাস্টের অর্থ পরিশোধে সরকারের বিশেষ অনুদান বা বরাদ্দ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে কয়েক বছর ধরে প্রয়োজনের তুলনায় পর্যাপ্ত বরাদ্দ না পাওয়ায় অনিষ্পন্ন আবেদন বাড়তে থাকে। ফলে বর্তমানে বিপুলসংখ্যক শিক্ষক-কর্মচারীর প্রাপ্য অর্থ আটকে আছে এবং তহবিলে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
এদিকে, অবসরের পর নিজের প্রাপ্য অর্থ পেতে অনেককে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হচ্ছে। কেউ কেউ সেই অর্থ পাওয়ার আগেই মৃত্যুবরণ করছেন।
এসব সংকট নিরসনে সরকার অর্থ বরাদ্দের পাশাপাশি পুনরায় সফটওয়্যার চালু, জনবল বৃদ্ধি, অনলাইন কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং আইবাস প্লাস প্লাস (iBAS++)-এর মাধ্যমে সরাসরি শিক্ষক-কর্মচারীদের ব্যাংক হিসাবে অর্থ পাঠানোর উদ্যোগ নিচ্ছে বলে জানা গেছে।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী অবসর সুবিধা বোর্ডের উপ-পরিচালক ড. মোহাম্মদ আমীর হামজা মোল্লা সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘শিক্ষকদের আর ভোগান্তিতে পড়তে হবে না। ফাইল প্রস্তুতের কাজ চলছে। পর্যায়ক্রমে সবাই তাদের প্রাপ্য অর্থ পেয়ে যাবেন।’

অবসর ভাতা পেতে টেবিলে টেবিলে শিক্ষকরা
শেখ শাহরিয়ার হোসেন

সকাল গড়াতেই রাজধানীর ইস্কাটনে ‘বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী অবসর সুবিধা বোর্ড’ কার্যালয়ে বাড়তে থাকে মানুষের ভিড়। কারও হাতে পুরোনো ফাইল, কারও হাতে আবেদনপত্র। কেউ কেউ বারবার মোবাইল ফোনে পরিবারের সদস্যদের আশ্বস্ত করছেন, ‘দেখি, আজ কোনো সুখবর পাই কি না।’
করিডোরজুড়ে অপেক্ষমাণ এই শিক্ষকেরা একসময় দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান করেছেন। অবসরের পর এখন তাদের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা, চাকরি জীবনের প্রাপ্য অবসর ও কল্যাণ সুবিধার অর্থ হাতে পাওয়া। কারো কারো ক্ষেত্রে সেই অপেক্ষা গিয়ে ঠেকেছে দুই, তিন, এমনকি সাড়ে চার বছরেও।
রংপুর থেকে আসা অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক তাহের হোসেন তেমনই একজন। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে তিনি এসেছেন নিজের আবেদনের অগ্রগতি জানতে। শিক্ষকতা পেশায় পার করেছেন জীবনের চল্লিশটি বছর। এখন এক কর্মকর্তার টেবিল থেকে আরেক কর্মকর্তার টেবিলে ঘুরছেন, কোথাও নথি যাচাই হচ্ছে, কোথাও নতুন তথ্য দিতে বলা হচ্ছে, আবার কোথাও বলা হচ্ছে এবারের লিস্টে নাম আসবে না। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস অপেক্ষার পরও নিশ্চিত কোনো উত্তর না পেয়ে তার কণ্ঠে ফুটে ওঠে হতাশা।
গত ১৬ জুলাই বোর্ডের কার্যালয়ে তার সঙ্গে কথা হয় সিজেডএন টোয়েন্টিফোরের। অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক তাহের হোসেন বলেন ‘চাকরি জীবনে নিয়মিত বেতন থেকে অবসর তহবিলের টাকা কাটা হয়েছে। এখন অবসরের আড়াই বছর পার হলেও নিজের প্রাপ্য টাকাই পাচ্ছি না। বারবার রংপুর থেকে ঢাকায় আসতে হয়, এক টেবিল থেকে আরেক টেবিলে ঘুরি, কিন্তু কেউ নির্দিষ্ট করে বলতে পারে না কবে টাকা পাবো।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘বয়স হয়েছে, চিকিৎসার খরচ বাড়ছে। এই টাকা এখন আমাদের জন্য বিলাসিতা নয়, বেঁচে থাকার অবলম্বন।’
করিডোরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ধীর পায়ে হাঁটছিলেন আহসান নামে এক যুবক। মুখে ক্লান্তি আর হতাশার ছাপ। হাতে শক্ত করে ধরা একটি পুরোনো ফাইল। বারবার বিভিন্ন টেবিলে গিয়ে খোঁজ নিচ্ছেন, আবার ফিরে আসছেন। পরিচয় দিয়ে কথা বলতেই জানালেন, নিজের জন্য নয়, মৃত বাবার অবসর সুবিধার প্রাপ্য টাকা তুলতেই মাসের পর মাস ধরে বোর্ডের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন।
আহসান বলেন, ‘আমার বাবা অবসরের পর আবেদন করেছিলেন। কিন্তু প্রাপ্য টাকা হাতে পাওয়ার আগেই মারা যান। আগে বাবা ঘুরতেন, এখন উত্তরাধিকারী হিসেবে আমি সেই টাকার জন্য ঘুরছি। প্রতিবারই নতুন কাগজ বা নতুন প্রক্রিয়ার কথা বলা হয়। বাবার সারাজীবনের পরিশ্রমের এই টাকাটা পেতেই এত ভোগান্তি হবে ভাবিনি।’
এসব বাস্তবতার মধ্যেই সরকার বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের আটকে থাকা অবসর সুবিধা ও কল্যাণ ট্রাস্টের বকেয়া অর্থ পরিশোধের কার্যক্রম শুরু করেছে। প্রথম ধাপে ২৫ হাজার শিক্ষকের তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন।
গত ১৪ জুলাই জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী জানান, ২০২২ সালের পর থেকে অবসর ভাতা ও কল্যাণ ট্রাস্টের অর্থ পরিশোধ কার্যত বন্ধ ছিল। ফলে বর্তমানে প্রায় ৬৫ হাজার শিক্ষক তাদের প্রাপ্য অর্থের অপেক্ষায় রয়েছেন। এ সংকট নিরসনে সরকার বিশেষ আর্থিক বরাদ্দ দিয়েছে এবং সেই বরাদ্দের ভিত্তিতেই প্রথম ধাপে ২৫ হাজার শিক্ষকের তথ্য যাচাই-বাছাই (স্ক্রুটিনি) সম্পন্ন করে পর্যায়ক্রমে অর্থ পরিশোধ শুরু করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘এবার অর্থ পরিশোধে কোনো ধরনের অনিয়ম বা তছরুপ হবে না। পর্যায়ক্রমে বাকি শিক্ষক-কর্মচারীদের পাওনাও পরিশোধ করা হবে।’
তবে সংকটের গভীরতা আরও বড়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী অবসর সুবিধা বোর্ডে বর্তমানে প্রায় ৬৫ হাজার আবেদন অনিষ্পন্ন রয়েছে। একজন শিক্ষক বা কর্মচারী গড়ে প্রায় ১৩ লাখ টাকা অবসর ভাতা পান। এসব আবেদন নিষ্পত্তির জন্য প্রয়োজন প্রায় ৮ হাজার ৭১০ কোটি টাকা, অথচ তহবিলে রয়েছে মাত্র প্রায় ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। সে হিসেবে, অবসর তহবিলে প্রায় ৭ হাজার ৪১০ কোটি টাকার ঘাটতি রয়েছে।

অন্যদিকে, শিক্ষক-কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্টে ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত প্রায় ৪৪ হাজার আবেদন জমা হলেও সেগুলো এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। এসব আবেদন মেটাতে প্রয়োজন প্রায় ৩ হাজার ১৫০ কোটি টাকার এককালীন বরাদ্দ।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, অবসর সুবিধা বোর্ডের তহবিল কেবল শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন থেকে কেটে রাখা অর্থের ওপর নির্ভরশীল নয়। প্রতিবছর অবসর সুবিধা ও কল্যাণ ট্রাস্টের অর্থ পরিশোধে সরকারের বিশেষ অনুদান বা বরাদ্দ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে কয়েক বছর ধরে প্রয়োজনের তুলনায় পর্যাপ্ত বরাদ্দ না পাওয়ায় অনিষ্পন্ন আবেদন বাড়তে থাকে। ফলে বর্তমানে বিপুলসংখ্যক শিক্ষক-কর্মচারীর প্রাপ্য অর্থ আটকে আছে এবং তহবিলে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
এদিকে, অবসরের পর নিজের প্রাপ্য অর্থ পেতে অনেককে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হচ্ছে। কেউ কেউ সেই অর্থ পাওয়ার আগেই মৃত্যুবরণ করছেন।
এসব সংকট নিরসনে সরকার অর্থ বরাদ্দের পাশাপাশি পুনরায় সফটওয়্যার চালু, জনবল বৃদ্ধি, অনলাইন কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং আইবাস প্লাস প্লাস (iBAS++)-এর মাধ্যমে সরাসরি শিক্ষক-কর্মচারীদের ব্যাংক হিসাবে অর্থ পাঠানোর উদ্যোগ নিচ্ছে বলে জানা গেছে।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী অবসর সুবিধা বোর্ডের উপ-পরিচালক ড. মোহাম্মদ আমীর হামজা মোল্লা সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘শিক্ষকদের আর ভোগান্তিতে পড়তে হবে না। ফাইল প্রস্তুতের কাজ চলছে। পর্যায়ক্রমে সবাই তাদের প্রাপ্য অর্থ পেয়ে যাবেন।’

শিক্ষকদের বাড়ি ভাড়া ভাতা দ্বিগুণ করলো সরকার







