ককটেল ফোটালেই ৫০০০ টাকা, ভারতীয় নম্বর থেকে যোগাযোগ: ডিবি

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
ককটেল ফোটালেই ৫০০০ টাকা, ভারতীয় নম্বর থেকে যোগাযোগ: ডিবি
ককটেল

সম্প্রতি রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ককটেল ও হাতবোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এই হামলাগুলোর পেছনে ‘একটি বিশেষ চক্র’ কাজ করছে বলে জানিয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় গত এক সপ্তাহে হাতবোমা বিস্ফোরণের ঘটনাগুলো তদন্ত করতে গিয়ে তারা পেয়েছে, একটি মলোটভ ককটেল বিস্ফোরণ ঘটাতে ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা দেওয়া হচ্ছে। কোথায় যেতে হবে, কী করতে হবে- এসব নির্দেশনা আসছে ভারতীয় নম্বর দিয়ে খোলা বিভিন্ন হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট থেকে।

মেসেজ বা ভয়েস কলে বলা হচ্ছে, ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ভিডিও পাঠালেই কেবল প্রতিশ্রুত অর্থ মিলবে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, রাজধানীতে ককটেল বিস্ফোরণ ও বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় সম্প্রতি গ্রেপ্তারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়অ গেছে। নির্দেশদাতাদের মধ্যে ভারতে অবস্থানরত কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতারাও রয়েছেন। মাঠপর্যায়ে ককটেল নিক্ষেপের জন্য মাদকাসক্ত ও ভাসমান মানুষদের ব্যবহার করা হচ্ছে। আবার দলীয় পদ-পদবির লোভেও তরুণদের এই অপরাধে যুক্ত করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড এবং রাজধানীর মোহাম্মদপুরস্থ জেনেভা ক্যাম্প এলাকায় ককটেল তৈরির গোপন কারখানার সন্ধান পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

গত ১৮ সেপ্টেম্বর রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানার সামনে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় রায়হান উদ্দিন নামে একজনকে গ্রেপ্তার করে ডিবি। তিনি কর্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ঢাকা দক্ষিণের বংশাল থানার ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের ৬ নম্বর ইউনিটের দপ্তর সম্পাদক। গত বছর মতিঝিল থানার একটি সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে তিনি ৫ মাস কারাগারেও ছিলেন।

পরে একই ঘটনায় গ্রেপ্তার রাসেল খান, আলা উদ্দিন ও আব্দুল্লাহ নামে তিনজন ছাত্রলীগের সক্রিয় সদস্য বলে জানিয়েছে ডিবি। তাদের কাছ থেকে ৪টি অবিস্ফোরিত ককটেল উদ্ধার করা হয়।

এছাড়া ১৮ সেপ্টেম্বরই যাত্রাবাড়ীর দক্ষিণ দনিয়া এলাকা থেকে একটি পুরোনো বাজারের ব্যাগ থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় ১০টি হাতবোমা উদ্ধার করা হয়। এর পরদিন ১৯ সেপ্টেম্বর কমলাপুর রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে হাতবোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় ছাত্রলীগের এক নেতাসহ ২ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। বিস্ফোরণের ঘটনার পর তদন্তে নেমে তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় রবিবার রাতে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।

গ্রেপ্তাররা হলেন- ছাত্রলীগের শাহজাহানপুর থানা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেন রায়হান। তিনি রেলওয়ের ইলেকট্রিশিয়ান হিসেবে কর্মরত। আর শাহজাহানপুর থানা যুবলীগের সক্রিয় কর্মী মোহাম্মদ সানমুন।

এরও আগে গত ১৫ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্টের প্রধান ফটকের সামনে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় ছাত্রলীগের মতিঝিল থানা শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সালমান ইসলাম সাকিব ওরফে আসিফকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এ সময় তার কাছ থেকে বিস্ফোরণের ঘটনায় ব্যবহৃত মোটরসাইকেল এবং ৪টি ককটেল উদ্ধার করা হয়।

গ্রেপ্তারদের জিজ্ঞাসাবাদে তদন্ত কর্মকর্তারা বলছেন, অর্থের পাশাপাশি তারা দলীয় বা সাংগঠনিক পদ পাওয়ার লোভেও এসব কাজে যুক্ত হচ্ছেন।

তাদের ভাষ্য, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় হাতবোমা সরবরাহ ও বিস্ফোরণের জন্য ভিন্ন ভিন্ন লোককে কাজে লাগানো হচ্ছে। ককটেল তৈরির জন্যও রয়েছে নির্দিষ্ট নেটওয়ার্ক।

ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়কে নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড ও মোহাম্মদপুরের জেনিভা ক্যাম্প এলাকায় হাতবোমা তৈরির তথ্য পেয়েছেন গোয়েন্দারা। ককটেল নিক্ষেপকারীদের সমন্বয় করার জন্য দেশে অবস্থানকারী আলাদা একটি গ্রুপ কাজ করছে বলেও জানিয়েছেন তারা।

গোয়েন্দারা বলছেন, বিস্ফোরণের ভিডিও পাঠালে তবেই টাকা মেলে। বেশি টাকা পেতে একই স্পটে চার-পাঁচটি ককটেলও ফাটানো হচ্ছে। বাসে আগুন দেওয়ার ক্ষেত্রে মাদকাসক্ত ও ভাসমান মানুষদের কাজে লাগাচ্ছে চক্রটি।

ডিবির জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃত রায়হান জানান, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাব্বির হোসেনের নির্দেশেই তারা যাত্রাবাড়ীতে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটান। পরিচিত দোকানদারের মোটরসাইকেল চেয়ে নিয়ে ব্যবহার করেছিলেন। বিস্ফোরণের পর ভিডিও ধারণ করে নির্ধারিত হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে পাঠালেই মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) অ্যাকাউন্টে টাকা পৌঁছে যেত।

ডিবি ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনার মোল্লা মো. শাহীন এবং ডিবি প্রধান শফিকুল ইসলাম জানান, অপরাধীরা যোগাযোগের ক্ষেত্রে নতুন নতুন কৌশল অবলম্বন করছে। তবে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির সতর্ক করে বলেছেন, কেবল ভারতীয় নম্বরে হোয়াটসঅ্যাপ খোলা থাকলেই সে ভারতে অবস্থান করছে এমনটি বলা যায় না। রোমিং সুবিধা বা ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিশ্বের যেকোনো স্থান থেকেই এই অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করা সম্ভব।

এদিকে নাশকতায় জড়িত সন্দেহে গত সোমবার রাত ৩টার দিকে ঢাকার উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টর থেকে রবিউল ইসলাম নামে এক ভারতীয়কে আটক করেছে ডিবি। তার বাড়ি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনার গৌড়িভোজ গ্রামে। রবিউল গত ১৪ সেপ্টেম্বর থেকে বাংলাদেশে অবস্থান করছেন। তার ড্রাইভিং লাইসেন্স ও এনআইডির জন্ম তারিখের সঙ্গে পাসপোর্টের গরমিল দেখা গেছে। ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে তাকে ৪ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। এজন্য অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা সম্ভব হচ্ছে। নাশকতার মূল নেটওয়ার্ক উপড়ে ফেলতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান তারা।

/জেএইচ/