অশান্ত সাজেক: ঝুঁকিতে হাজারো মানুষের জীবিকা

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
অশান্ত সাজেক: ঝুঁকিতে হাজারো মানুষের জীবিকা
সাজেক ভ্যালি

পর্যটকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি গন্তব্য হলো রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ভ্যালি। মেঘে ঢাকা পাহাড়ের সারি, সবুজ উপত্যকা আর পাহাড়ের বুক চিরে আঁকাবাঁকা পথ ও প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিদিন শত শত পর্যটক এখানে ভ্রমণ করেন। গত কয়েক বছরে এটি পর্যটকদের জন্য অন্যতম গন্তব্য হয়ে উঠেছে। এটাকে কেন্দ্র করে সেখানে গড়ে উঠেছে শতাধিক ছোট-বড় কটেজ ও রিসোর্ট। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামের সশস্ত্র গোষ্ঠী ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) ও বিভিন্ন গ্রুপের দফায় দফায় অবরোধ ও সহিংসতায় সাজেকের পর্যটন ব্যবসায় অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। সাম্প্রতিক সময়ে এসব সংগঠনের কয়েক দফা অবরোধ ও সহিংসতায় পর্যটকদের বুকিং বাতিল, অগ্রিম অর্থ ফেরতের প্রবণতায় ভরা মৌসুমে মন্দার আশঙ্কায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন এ খাতের উদ্যোক্তারা। সেইসঙ্গে হাজার হাজার মানুষের জীবিকায় প্রভাব পড়ছে।

বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) এক বিবৃতিতে জানায়, ইউপিডিএফ সশস্ত্র সদস্যরা স্থানীয় লোকজনকে মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করে সড়ক অবরোধ করেন। এসময় পর্যটক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করা হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আটকে পড়া পর্যটকদের নিরাপদে খাগড়াছড়িতে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও পুলিশ যৌথভাবে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করে।

পর্যটকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম চলাকালে সকাল আনুমানিক ১০টায় গঙ্গারাম বাজার এলাকায় অবরোধকারীরা সড়কে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে পর্যটকবাহী যানবাহনের চলাচল বন্ধ করে দেয়। এ সময় সেনাবাহিনী ও পুলিশের টহল দল পর্যটকদের নিরাপদে যাতায়াত নিশ্চিত করতে অবরোধকারীদের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নেয়। আলোচনা চলাকালে, সকাল আনুমানিক ১০টা ৪৫ মিনিটে ইউপিডিএফের প্ররোচনায় অবরোধকারীরা আকস্মিকভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও পর্যটকদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী লাঠিচার্জের মাধ্যমে অবরোধকারীদের ছত্রভঙ্গ করে এবং পুনরায় পর্যটকবাহী যানবাহনের চলাচলের ব্যবস্থা গ্রহণ করে।

এতে আরও বলা হয়, পরবর্তীতে সকাল আনুমানিক ১১টায় ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও পর্যটকদের লক্ষ্য করে আনুমানিক ৩০-৪০ রাউন্ড গুলিবর্ষণ করে বলে প্রাথমিকভাবে জানা যায়। এ সময় সেনাবাহিনীর টহল দল আত্মরক্ষা ও পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পাল্টা গুলিবর্ষণ করলে সশস্ত্র ব্যক্তিরা ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও পুলিশের সমন্বিত প্রচেষ্টায় অবরুদ্ধ পর্যটকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়।

আইএসপিআরের বিবৃতিতে বলা হয়, পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর চলমান অভিযানের পরিপ্রেক্ষিতে অনেকটা কোণঠাসা হয়ে ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যদের একটি অংশ পর্যটন এলাকায় অবস্থান নিয়েছে বলে জানা যায়। এ ধরনের সহিংস কর্মকাণ্ড পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি, স্থিতিশীলতা ও জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করার পাশাপাশি পর্যটনশিল্প এবং স্থানীয় জনগণের জীবন-জীবিকার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে নিরীহ পর্যটকদের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে ফেলা এবং সাধারণ জনগণকে জোরপূর্বক অবরোধ কর্মসূচিতে সম্পৃক্ত করার ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি, সম্প্রীতি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং স্থানীয় জনগণ ও পর্যটকদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বেসামরিক প্রশাসন ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। ভবিষ্যতেও পার্বত্য অঞ্চলের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে বলে বিবৃতিতে জানানো হয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস-সন্তু লারমা) ‘সশস্ত্র’ সদস্যদের সাজেক ভ্যালি থেকে সরিয়ে নেয়াসহ তিন দফা দাবিতে সেখানে আন্দোলন চালিয়ে আসছে সাজেক গণ-অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন। এরই অংশ হিসেবে বুধবার বিকালে সাজেক পর্যটন সড়কে তৃতীয় দফা অবরোধ ঘোষণা করে সংগঠন দুটি। সেইসঙ্গে সাজেক থেকে পর্যটকদের চলে যাওয়ার অনুরোধ করা হয়। এমন পরিস্থিতিতে পর্যটকদের নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে সাজেক ভ্যালি পর্যটন কেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করে জেলা প্রশাসন। পর্যটকদের বৃহস্পতিবার বিকাল ৪টার মধ্যে নিরাপদে সাজেক ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এ সময় গোলাগুলির ওই ঘটনা ঘটে।

এদিকে শনিবার রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলায় আধাবেলা সড়ক অবরোধ ডেকেছে ছাত্র-সংগ্রাম জনতার পরিষদ নামে একটি সংগঠন। গতকাল সন্ধ্যায় গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানিয়েছে ইউপিডিএফ ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত এই সংগঠনটি।

এসব কারণে জেলার পর্যটন খাতে বিরূপ প্রভাব পড়ছে বলে জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

সাজেকে পর্যটন ব্যবসায়ীরা বলছেন, এখানে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ১০০টি কটেজ আছে। ভরা মৌসুমে প্রায় আড়াই হাজার পর্যটক থাকেন এসব কটেজে। নভেম্বর থেকে জানুয়ারি এই তিন মাস মূলত সাজেকের পর্যটন মৌসুম। এ সময়ে কটেজ মালিকরা প্রায় ২৭ কোটি টাকার ব্যবসা করেন। তাদের খাওয়া-দাওয়ায় খরচ করেন প্রায় ২২ কোটি টাকা। এছাড়া ঘোরাঘুরি ও যাতায়াতে পর্যটকরা ব্যয় করেন আরও প্রায় ২৭ কোটি টাকা। সামনেই সাজেকের ভরা মৌসুম আসছে। এমন মুহূর্তে সশস্ত্র গোষ্ঠীর এই আন্দোলন ও হামলা খাতটিতে বিপর্যয় নিয়ে আসতে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

তারা বলছেন, বছরের সব সময় পর্যটন ব্যবসায় আয় হয় না। ঈদ, পূজা, সরকারি ছুটি ও শীতের মৌসুমে পর্যটকের সংখ্যা বাড়ে। এ সময়ের আয় দিয়ে বছরের অন্য সময়ের তুলনামূলক কম ব্যবসার ঘাটতি পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন তারা। ফলে পর্যটন মৌসুমে বুকিং বাতিল হওয়া এবং পর্যটকদের অগ্রিম অর্থ ফেরত দেওয়ার চাপ তাদের বড় সংকটে ফেলতে পারে। একইসঙ্গে পর্যটন কেন্দ্রটির ওপর নির্ভরশীল পরিবহন, রেস্তোরাঁ, স্থানীয় দোকানপাট ও অন্যান্য সেবা খাতও ক্ষতির মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ইতোমধ্যেই অনেক ব্যবসায়ী ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। গত কয়েক দিনের আন্দোলন ও সহিংসতায় সাজেক এখন পুরোপুরি পর্যটকশূন্য। এক ব্যবসায়ী জানান, তিনি বুকিং বাতিল করে প্রায় ১ লাখ টাকা পর্যটকদের ফেরত দিয়েছেন। অন্য ব্যবসায়ীদেরও প্রায় একই অবস্থা।

শুধু ব্যবসায়ী নয়, সাজেকে স্থানীয় মানুষের জীবিকার ওপরও প্রভাব পড়ছে। পর্যটন ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে সাজেকের স্থানীয় অনেক বাসিন্দা জীবন-জীবিকা নির্বাহ করেন। কিন্তু পর্যটকশূন্য হয়ে যাওয়ায় তারাও আর্থিক সংকটের মধ্যে পড়ছেন।

এমতাবস্থায় সাজেকের পর্যটন ব্যবসা সচল রাখতে প্রশাসনিকভাবে আলোচনা করে স্থানীয় বিরোধ ও অবরোধের বিষয়ে কার্যকর পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ী ও স্থানীয়রা।

/জেএইচ/