শিরোনাম

বন্ধ পাটক্রয় কেন্দ্রের জমি প্রভাবশালীদের দখলে

পাবনা সংবাদদাতা
বন্ধ পাটক্রয় কেন্দ্রের জমি প্রভাবশালীদের দখলে
ভাঙ্গুড়া উপজেলার বাংলাদেশ জুট কর্পোরেশনের পাটক্রয় কেন্দ্রটি দীর্ঘ দিন ধরে বন্ধ রয়েছে। ছবি: প্রতিনিধি

পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলার বড়ালব্রিজ রেলওয়ে খেলার মাঠ সংলগ্ন বাংলাদেশ জুট কর্পোরেশনের পাটক্রয় কেন্দ্র বন্ধ বছরের পর বছর। সেই সুযোগে বন্ধ পাটক্রয় কেন্দ্র বেদখল হয়ে যাচ্ছে। অথচ দেখার যেন কেউ নেই।

একসময় চলনবিল অঞ্চলের পাট চাষিদের আনাগোনায় মুখর থাকতো এই এলাকা। কিন্তু রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধের প্রভাবে থমকে যায় এই পাটক্রয় কেন্দ্রের কার্যক্রম। তদারকির অভাবে প্রায় সাড়ে তিন একর সরকারি জমি দখল, অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে।

ভাঙ্গুড়া পাটক্রয় কেন্দ্র ঠিক কবে নাগাদ বন্ধ হয় সেই বিষয়ে সঠিক তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে ৯০ দশকের শেষ নাগাদ পাটক্রয় কেন্দ্রটি বন্ধ হয় বলে জানা গেছে। ব্রিটিশ আমলে নির্মিত এই পাটক্রয় কেন্দ্রের বেশিরভাগ জমি এখন প্রভাবশালীদের অবৈধ দখলে। অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনের চোখের সামনে প্রকাশ্যে দখলবাজি চললেও ব্যবস্থা নেয়নি কর্তৃপক্ষ।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত এক দশকে পাটক্রয় কেন্দ্রের জমিতে অবাধে গড়ে উঠেছে আবাসিক ভবন, স্কুল ও মাদ্রাসা। অবৈধ স্থাপনা ভাড়াও দিয়েছেন কেউ কেউ।

২০২৩ সাল থেকে জুট কর্পোরেশন কাছ থেকে পাটক্রয় কেন্দ্রের ২ দশমিক ১৯ একর জমি বৈধ প্রক্রিয়ায় ভাড়া নিয়েছেন বিএম গোলজার হোসেন নামের এক ব্যক্তি। তবে শর্ত ভঙ্গ করে বিজেসির মূল্যবান যন্ত্রপাতি বিক্রি ও স্থাপনা সাব ভাড়াটিয়া বসানোর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

কলেজ

আলাপকালে চৌবাড়িয়া হারোপাড়া গ্রামের সত্তোর্ধ নুরুল ইসলাম বলেন, এই জায়গাটা এক সময় খুব জমজমাট ও উন্নত ছিল। ব্যবসায়ী কেন্দ্র এলাকা হিসেবে পরিচিত ছিল। ভালই চলছিল পাটক্রয় কেন্দ্রটি। কিন্তু এক দশক আগে হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে গেছে। এখন দেখি গোলজার হোসেন নামের একজন লিজ নিয়েছেন বলে দাবি করে দখল করে বসে আছেন।

চৌবাড়িয়া দক্ষিণপাড়া গ্রামের শাহীন আলম বলেন, আমার দাদা এই পাটক্রয় কেন্দ্রের সরদার ছিলেন। ওই সময় দেখেছি এখানে অনেক পাট কেনাবেচা হতো। তারপর আস্তে আস্তে বন্ধ হয়ে গেছে।

একই গ্রামের জহুরুল ইসলাম বলেন, এই পাটক্রয় কেন্দ্র বন্ধ হওয়ার পর অনেকেই বেকার হয়ে গেছে। যদি দখলমুক্ত করে আবার চালু করা যায় তাহলে এলাকার অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হতো। এলাকার পাটচাষিরা লাভবান হতেন।

দখল হওয়া জমির ঘরে ভাড়া থাকেন ষাটোর্ধ বিধবা আছিয়া খাতুন। তিনি বলেন, এখানে দুখু মিস্ত্রির কাছ থেকে জমি কিনেছেন জহুরুল ইসলাম নামের একজন। সে এখানে ঘর করে ভাড়া দিয়েছেন। আমাদের থাকার মতো বাড়িঘর নেই। তাই এখানে জহুরুলের কাছ থেকে ঘর ভাড়া নিয়ে চার বছর ধরে বসবাস করছি। প্রতি মাসে ১২০০ টাকা ভাড়া দেই।

পাটক্রয় কেন্দ্রের জায়গায় রয়েছে ভাঙ্গুড়া মডেল স্কুল এন্ড কলেজ, মিফতাহুল ফালা পিন ক্যাডেট মাদ্রাসা, একটি মসজিদ, একটি মন্দির। এছাড়া শওকত আলী ও আফরোজা বেগম নামে দুই ব্যক্তির জায়গা রয়েছে। যেগুলো তারা ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে দখল করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

দখলের বিষয়ে ভাঙ্গুড়া মডেল স্কুল এন্ড কলেজের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য আব্দুল হাই সিদ্দিকী বাচ্চু বলেন, আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি পাটক্রয় কেন্দ্রের জায়গার বাইরে। আমরা স্থানীয় ভূমি অফিস থেকে ৮ শতাংশ জায়গা লিজ নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি করেছি। আমাদের বিরুদ্ধে পাটক্রয় কেন্দ্রের জায়গা দখলের অভিযোগ সত্য নয়।

মিফতাহুল ফালাহ প্রি ক্যাডেট মাদরাসার পরিচালক হাফেজ ক্বারী গোলাম মোস্তফা রবি বলেন, অনেকেই জায়গা দখল করেছে। সেটা দেখে আমিও একটি মাদ্রাসা করেছি। আমি কোনো লিজ নিইনি।

অভিযুক্ত লিজ গ্রহিতা বিএম গোলজার হোসেন বলেন, পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয় থেকে আমি বৈধভাবে লিজ নিয়েছি। এরপর এখানে খামার করেছি। বিক্রি করার অভিযোগ সঠিক নয়। তার এখতিয়ারও আমার নেই। তবে দোকানপাট ও ঘর নির্মাণ করে ভাড়া দিয়েছি। বাৎসরিক দেড় লাখ টাকা লিজমানি দেই।

ভাঙ্গুড়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মিজানুর রহমান বলেন, ওই জমিটি বর্তমানে পাট মন্ত্রণালয়ে অধীনে আছে। রেকর্ডীয় মালিক জেলা প্রশাসন। তবে এ বিষয়ে পাট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে একটি মামলা চলমান রয়েছে। সর্বশেষ ২০২৫-২০২৭ সাল পর্যন্ত গোলজার হোসেন নামের একজনকে পাট মন্ত্রণালয় থেকে ইজারা দেওয়া আছে।

তিনি বলেন, পাটক্রয় কেন্দ্রের মোট জায়গা ৩ দশমিক ৫৫ একর। গোলজার লিজ নিয়েছেন ২ দশমিক ১৯ একর। এর বাইরে আরো জায়গা আছে পাটক্রয় কেন্দ্রের। সে জায়গা তো আমরা লিজ দিতে পারি না। কেউ যদি উপজেলা এসিল্যান্ড অফিস থেকে লিজ নেওয়া দাবি করে তাহলে সেটা সঠিক নয়।

ভাঙ্গুড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আরিফুজ্জামান বলেন, এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পাট অধিদপ্তর থেকে একটি চিঠি এসেছে। আমরা দ্রুতই সরজমিন তদন্ত করে উচ্ছেদে আইনগত ব্যবস্থা নেবা।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ জুট কর্পোরেশনের উপপরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান মাকছিম বলেন, এ বিষয়ে আমরা আন্তরিক। পাবনা জেলা প্রশাসনকে আমাদের চেয়ারম্যান মহোদয় একটি পত্র দিয়েছেন। জেলা প্রশাসনের সহযোগিতা নিয়ে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করা হবে।

/এসআর/