পূজার ছুটিতে কক্সবাজারে ১৫ লাখ পর্যটক

সিজেডএন ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
পূজার ছুটিতে কক্সবাজারে ১৫ লাখ পর্যটক
দুর্গাপূজার ছুটিতে কক্সবাজারে পর্যটকের ঢল

দুর্গাপূজা ও প্রবারণা পূর্ণিমার ছুটিকে কেন্দ্র করে পর্যটকে মুখর হয়ে উঠেছে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত। শহরের হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট ও গেস্টহাউসগুলোতে বেড়েছে অতিথির চাপ। পর্যটন ব্যবসায়ীদের দাবি, অনেক হোটেলের সব কক্ষ আগাম বুকিং হয়ে গেছে।

ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা, দুর্গাপূজা, সাপ্তাহিক ছুটি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছুটি মিলিয়ে টানা ১০ দিনের অবকাশে কক্সবাজারে অন্তত ১৫ লাখ পর্যটকের সমাগম হতে পারে। এতে পর্যটনসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন খাতে ৯০০ থেকে ১ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হতে পারে।

গত মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) থেকে পর্যটকের সংখ্যা বাড়তে শুরু করে। গতকাল বুধবার বিকেলে শহরের লাবণী ও সুগন্ধা পয়েন্টে দেখা যায়, সৈকতের বালুচর পর্যটকদের পদচারণে মুখর। একই চিত্র হিমছড়ি, ইনানী ও মেরিন ড্রাইভের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রেও।

পর্যটন ব্যবসায়ীরা জানান, মেরিন ড্রাইভ এলাকার তুলনায় শহরের হোটেল, গেস্টহাউস ও কটেজগুলোতে অতিথির চাপ বেশি। গত ১৭ অক্টোবর ইনানীর পাটুয়ারটেক এলাকার টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে ১০ জনের মৃত্যুর ঘটনায় পর্যটকের আগমন নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। তবে গত দুই দিনে পর্যটকের উপস্থিতি বাড়ায় সেই শঙ্কা অনেকটাই কেটেছে।

হোটেলের কক্ষ প্রায় পূর্ণ, ভাড়ায় ছাড় নেই

কক্সবাজার হোটেল-গেস্টহাউস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার বলেন, বুধবার লাবণী পয়েন্টে প্রতিমা বিসর্জন উৎসব ঘিরে তিন দিনে অন্তত পাঁচ লাখ মানুষের সমাগম হতে পারে। সব মিলিয়ে ১০ দিনের ছুটিতে ১৫ লাখ পর্যটক আসবেন বলে তাঁরা আশা করছেন।

তিনি জানান, তারকা মানের ২০টির বেশি হোটেলের প্রায় সব কক্ষ আগাম বুকিং হয়েছে। মাঝারি মানের হোটেল, গেস্টহাউস ও কটেজের প্রায় ৯০ শতাংশ কক্ষও বুকিং হয়ে গেছে। এবার কক্ষভাড়ায় কোনো ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। তবে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ঠেকাতে প্রশাসন নজরদারি করছে।

আবুল কাশেম সিকদার আরও বলেন, কক্সবাজার শহরের পাঁচ শতাধিক হোটেল, রিসোর্ট ও গেস্টহাউসে একসঙ্গে প্রায় ১ লাখ ৬৮ হাজার মানুষের রাতযাপনের ব্যবস্থা রয়েছে।

হোটেল কক্স টুডের সহকারী মহাব্যবস্থাপক আবু তালেব বলেন, তাঁদের হোটেলের সব কক্ষ বুকিং হয়ে গেছে। অক্টোবরের বাকি সময়জুড়েও অতিথির চাপ থাকবে বলে তাঁরা আশা করছেন।

কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আবদুল শুক্কুর বলেন, ১০ দিনের ছুটিতে ১৫ লাখ পর্যটক এলে হোটেল, রেস্তোরাঁসহ পর্যটনসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন খাতে ৯০০ থেকে ১ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হতে পারে।

বিসর্জন উৎসবে সম্প্রীতির মিলনমেলা

বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনকে ঘিরে কক্সবাজার সৈকতে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের সমাগম ঘটে। হিন্দু সম্প্রদায়ের পাশাপাশি মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীরাও উৎসবে অংশ নেন।

কক্সবাজার শহরের বাসিন্দা ইব্রাহিম বাবু বলেন, বিজয়া দশমী এখন শুধু হিন্দু সম্প্রদায়ের উৎসব নয়, এটি বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনারও প্রকাশ।

গাইবান্ধার বাসিন্দা ইমরুল আজিজ স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে শনিবার রাতে কক্সবাজারে আসেন। তিনি বলেন, সুগন্ধা সৈকতে মানুষের ভিড় দেখে পরিবার নিয়ে লাবণী পয়েন্টে এসেছেন। সেখানেও হাজারো মানুষের সমাগম দেখেছেন।

সিরাজগঞ্জ থেকে পরিবার নিয়ে প্রতিমা বিসর্জন দেখতে আসা স্কুলশিক্ষক রাজেন্দ্র রায় বলেন, কক্সবাজারের বিসর্জন আয়োজন দেশের অন্যতম বড় আয়োজন। তাই দেবী দুর্গাকে বিদায় জানাতে তিনি এখানে এসেছেন। আয়োজন ঘিরে প্রশাসনের ব্যবস্থাপনাও ভালো বলে মন্তব্য করেন তিনি।

নিরাপত্তায় প্রশাসনের নজরদারি

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, দুর্গাপূজার ছুটিতে প্রতিবছরই বিপুলসংখ্যক পর্যটকের আগমন ঘটে। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রতিমা বিসর্জন নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। পর্যটকদের হয়রানি বন্ধ ও সেবার মান নিশ্চিত করতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের নেতৃত্বে একাধিক ভ্রাম্যমাণ আদালত কাজ করছেন।

কক্সবাজার জেলা পূজা উদ্‌যাপন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি উদয় শংকর পাল মিঠু বলেন, প্রশাসনের সহযোগিতায় বড় এই আয়োজন শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে। দূরদূরান্ত থেকে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা প্রতিমা বিসর্জনে অংশ নিতে কক্সবাজারে এসেছেন।

প্রতিমা বিসর্জন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন বলেন, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে দুর্গাপূজা সম্পন্ন হয়েছে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি দেশের ঐতিহ্য। এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, কক্সবাজারের মতো পর্যটন নগরীতে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের নিরাপত্তা ও সুন্দর পরিবেশ নিশ্চিত করা সবার দায়িত্ব।

অনুষ্ঠানে কক্সবাজার জেলা বিএনপির সভাপতি ও সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী, সদর-রামু-ঈদগাঁও আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শামীম আরা স্বপ্নাসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও পূজা উদ্‌যাপন পরিষদের নেতারা বক্তব্য দেন।

এবার কক্সবাজার জেলায় ৩২৪টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে ১৫৫টিতে প্রতিমাপূজা এবং ১৬৯টিতে ঘটপূজা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ৭১টি মণ্ডপ রয়েছে চকরিয়া উপজেলায়। এ ছাড়া কুতুবদিয়ায় ৪৪টি, রামুতে ৩৭টি, কক্সবাজার সদরে ৩১টি, ঈদগাঁওয়ে ২৯টি, মহেশখালীতে ২৮টি, কক্সবাজার পৌরসভায় ২৬টি, চকরিয়া পৌরসভায় ২৫টি, পেকুয়া ও উখিয়ায় ৯টি করে এবং মহেশখালী পৌরসভা ও টেকনাফে ৬টি করে মণ্ডপে পূজা হয়েছে।

পাঁচ দিনের পূজা শেষে বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে দুর্গোৎসব। ভক্তদের প্রত্যাশা, অশুভ শক্তির বিনাশ এবং শান্তি, সম্প্রীতি ও সমৃদ্ধির বার্তা নিয়ে আগামী বছর আবারও ফিরে আসবেন দেবী দুর্গা।

/এমআর/