সৌদিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর, ছেলের মরদেহ দেখতে চান বাবা-মা

সিজেডএন ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
সৌদিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর, ছেলের মরদেহ দেখতে চান বাবা-মা
সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বাংলাদেশী নাগরিক নজরুল ইসলাম

পরিবারের অভাব ঘোচাতে ছয় লাখ টাকা ঋণ করে বড় ছেলে নজরুল ইসলামকে সৌদি আরবে পাঠিয়েছিলেন আবদুল বাছির। আশা ছিল, ছেলে আয় করে সংসারের হাল ধরবেন, ধীরে ধীরে শোধ হবে ঋণের টাকা। কিন্তু সৌদি আরবে যাওয়ার আট মাসের মাথায় গ্রেপ্তার হন নজরুল। এরপর কেটে যায় প্রায় তিন বছর। গত বুধবার (১৩ অক্টোবর) ছেলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর পেয়ে ভেঙে পড়েছে পরিবারটি। শোকে অসুস্থ হয়ে একই দিন মারা যান নজরুলের ফুফু। এখন শোকাহত বাবা-মায়ের একটাই আকুতি, শেষবারের মতো যেন ছেলের মরদেহ দেখতে পারেন তারা।

সৌদি আরবের পবিত্র মক্কা নগরের একটি মসজিদে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে দেশটির সরকার। গত বুধবার সৌদি প্রেস এজেন্সি (এসপিএ) দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানায়। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশি হলেন নজরুল ইসলাম ও সুইটি আখতার।

নজরুলের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার একটি গ্রামে। তার বাবা আবদুল বাছির ও মা রহিমা বেগম। দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে নজরুল ছিলেন সবার বড়। তাঁর বয়স হয়েছিল ২৫ বছর।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক মো. আবু সাঈদ প্রথম আলোকে বলেন, তারা বিষয়টি জানতে পেরেছেন। এ বিষয়ে সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী জেলা প্রশাসন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।

ঋণ করে ছেলেকে পাঠিয়েছিলেন সৌদি আরবে

নজরুলের বাবা আবদুল বাছির প্রায় ২৪ বছর সৌদি আরবে ছিলেন। কিন্তু দীর্ঘ সময় প্রবাসে থেকেও পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতি করতে পারেননি। ২০২০ সালে দেশে ফিরে কৃষিকাজ শুরু করেন তিনি। সংসারের অভাব দূর করার আশায় আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ছয় লাখ টাকা ধার করে ২০২২ সালের নভেম্বরে বড় ছেলেকে সৌদি আরবে পাঠান।

নজরুল ২০২০ সালে একটি মাদ্রাসা থেকে দাখিল পাস করেন। পরে সদর উপজেলার একটি কলেজে মানবিক বিভাগে ভর্তি হন। সৌদি আরবে গিয়ে মক্কার হারাম শরিফে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ শুরু করেন তিনি। তবে সেখানে যাওয়ার আট মাসের মাথায় পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন। গ্রেপ্তারের প্রায় এক মাস পর বিষয়টি জানতে পারে তার পরিবার।

এরপর থেকে সৌদি আরবের কারাগারেই ছিলেন নজরুল। মাঝেমধ্যে বাবা–মায়ের সঙ্গে ফোনে কথা বলার সুযোগ পেতেন। মাসে একবার, কখনো কয়েক মিনিট কথা হতো তাদের। গত ১১ অক্টোবর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তার শেষ কথা হয়। সেদিনও কথা হয়েছিল মাত্র দুই থেকে আড়াই মিনিট।

এর তিন দিন পর, গত বুধবার বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে সৌদি আরব থেকে এক ব্যক্তি ফোন করে নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর জানান।

নজরুলের বাবা আবদুল বাছির বলেন, সৌদি আরবে যাওয়ার প্রথম সাত–আট মাসে ছেলে প্রায় দেড় লাখ টাকা পাঠিয়েছিলেন। এরপর দীর্ঘ তিন বছর কারাগারে ছিলেন। ঋণের সাড়ে চার লাখ টাকার মতো তখনো বাকি ছিল।

ছেলের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকেই ভেঙে পড়েছেন আবদুল বাছির। তিনি বলেন, ছেলের এমন পরিণতির খবর শোনার পর তার বোনও হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। এখন ছেলের মরদেহ একবার দেখার অপেক্ষায় আছেন তিনি।

ছেলের মৃত্যুর খবর শুনে মারা গেলেন ফুফু

পরিবারের সদস্যরা জানান, নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর শোনার পর তার ফুফু আবেদা বেগম (৬৫) মূর্ছা যান। ওই দিন রাত দুইটার দিকে তার মৃত্যু হয়।

নজরুলের মা রহিমা বেগমও ছেলেকে হারিয়ে শোকে ভেঙে পড়েছেন। ছেলের সঙ্গে শেষবার কথা বলার স্মৃতি মনে করে কাঁদছেন তিনি।

রহিমা বেগম বলেন, ‘ছেলেই মাসে একবার ফোন করত। এক-দুই মিনিট কথা বলত। আমার ছেলের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তা মিথ্যা। আমি শেষবারের মতো ছেলের লাশ দেখতে চাই।’

নজরুলের ছোট ভাই স্থানীয় একটি দাখিল মাদ্রাসায় পড়াশোনা করে। দুই বোনের একজনের বয়স নয় বছর, সে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে। অন্যজনের বয়স মাত্র চার বছর। পরিবারের উপার্জন ও ভবিষ্যৎ নিয়ে এখন চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

অভিযোগ নিয়ে সন্দেহ স্বজন ও বন্ধুদের

নজরুলের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ বিশ্বাস করতে পারছেন না তার স্বজন, বন্ধু ও পরিচিত ব্যক্তিরা। তাদের দাবি, নজরুল ছিলেন শান্ত স্বভাবের ও ভদ্র। তার আচরণের সঙ্গে এমন অভিযোগ মেলে না।

নজরুলের দূরসম্পর্কের দুই চাচাতো ভাই মোস্তাকিম ভূঁইয়া ও ইমাম হাসান ভূঁইয়া জানান, সৌদি আরবে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করার সময় এক ব্যক্তির সঙ্গে নজরুলের বিরোধ হয়েছিল। বিষয়টি তিনি ফোনে বাবা-মাকেও জানিয়েছিলেন। ওই ব্যক্তি পাকিস্তানের নাগরিক ছিলেন বলে তাদের জানিয়েছিলেন নজরুল। সেই বিরোধের জেরেই ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে তার এমন পরিণতি হয়েছে বলে মনে করেন তারা।

নজরুলের বন্ধু রাহাত ভূঁইয়াও অভিযোগটি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন। তার ভাষ্য, নজরুলের চরিত্রের সঙ্গে এ ধরনের কর্মকাণ্ডের অভিযোগ মেলানো কঠিন।

নজরুল যে মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেছিলেন, সেই প্রতিষ্ঠানের সুপারিনটেনডেন্ট মাওলানা নাঈমুর রহমান বলেন, নজরুলের আচার-আচরণ ও চলাফেরা ভালো ছিল। দেশে থাকতে তার মধ্যে এমন কোনো আচরণ দেখা যায়নি, যা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।

শেষবারের মতো ছেলেকে দেখতে চান বাবা-মা

সোমবার সকালে নজরুলের বাড়িতে গিয়ে তার বাবা আবদুল বাছিরের সঙ্গে কথা বলেন এই প্রতিবেদক। ছেলের কথা বলতে গিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন তিনি।

আবদুল বাছির বলেন, আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন। ভেবেছিলেন, ছেলে আয় করলে সংসারের কষ্ট কিছুটা কমবে। কিন্তু সেই স্বপ্ন এখন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে।

ছেলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবরের পর পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। একদিকে বড় ছেলেকে হারানোর বেদনা, অন্যদিকে ঋণের বোঝা ও ছোট সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা। সবকিছুর মধ্যে এখন বাবা-মায়ের একটাই চাওয়া, সৌদি আরব থেকে ছেলের মরদেহ দেশে আনার ব্যবস্থা করা হোক, যাতে জীবনে অন্তত একবার শেষবারের মতো ছেলের মুখ দেখতে পারেন তারা।

/এমআর/