এমপির ছেলে, ভগ্নিপতি ও ভাগিনার স্ত্রী পেলেন সারের ডিলারশিপ

সিজেডএন ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
এমপির ছেলে, ভগ্নিপতি ও ভাগিনার স্ত্রী পেলেন সারের ডিলারশিপ
সংসদ সদস্য এম এ হান্নানের ছেলে আদনান সাদী (বাঁয়ে), ভগ্নিপতি আরক মিয়া (মাঝে) ও ভাগ্নের স্ত্রী নুরুন্নাহার আক্তারছবি

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে সারের নতুন ডিলার নিয়োগ নিয়ে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় সংসদ সদস্য ও উপজেলা বিএনপির সভাপতি এম এ হান্নানের ছেলে, ভগ্নিপতি এবং ভাগিনার স্ত্রী নতুন ডিলার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। এ নিয়োগে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও তুলেছেন স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতা-কর্মী। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সংসদ সদস্য।

গত শুক্রবার (৯ অক্টোবর) নাসিরনগর উপজেলায় সারের নতুন ডিলারদের তালিকা প্রকাশ করা হয়। এরপর থেকেই তালিকায় দলের ত্যাগী নেতা-কর্মীদের নাম না থাকা এবং সংসদ সদস্যের স্বজনদের নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা শুরু হয়।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক সাজিদুর রহমান ফেসবুকে এক পোস্টে সারের ডিলার নিয়োগে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করার অভিযোগ তুলে এ বিষয়ে প্রতিবাদ জানান। গুনিয়াউক ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক আমিনুল ইসলামও তার ফেসবুক পোস্টে অভিযোগ করেন, নাসিরনগরে সারের ও চালের ডিলার হতে বিএনপির কর্মী হওয়া জরুরি নয়; বরং অর্থের লেনদেনই মুখ্য।

তবে সংসদ সদস্য এম এ হান্নান এসব অভিযোগ নাকচ করেছেন। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, সরকারি আইন ও বিধি মেনেই তার ছেলে, ভগ্নিপতি ও ভাগিনার স্ত্রী ডিলারশিপ পেয়েছেন। সংশ্লিষ্ট তিন ইউনিয়নে যোগ্য প্রার্থী আবেদন করেননি বলেও দাবি করেন তিনি।

ডিলার নিয়োগে অর্থ লেনদেনের অভিযোগকে গুজব উল্লেখ করে এম এ হান্নান বলেন, এসব অভিযোগের কোনো সত্যতা নেই।

১৩ ইউনিয়নে ১৩ জন ডিলার

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয় ও প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী, নাসিরনগরের ১৩টি ইউনিয়নে একজন করে মোট ১৩ জনকে নতুন সারের ডিলার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

তালিকায় চাতলপাড়ে শামীমা আক্তার, ভলাকুটে ইয়াহিয়া খান, কুণ্ডায় রেনু মিয়া, গোয়ালনগরে নুরুন্নাহার আক্তার, সদর ইউনিয়নে আরক মিয়া, বুড়িশ্বরে জসিম মিয়া, ফান্দাউকে শারমীন আক্তার, গুনিয়াউকে আব্দুর রহিম, চাপরতলায় ছাত্তার খা, পূর্বভাগে ইসমাইল মিয়া, গোকর্ণে মোহাম্মদ আদনান সাদী, হরিপুরে আরিফুল ইসলাম এবং ধরমণ্ডলে মহিবুর রহমানের নাম রয়েছে।

স্থানীয় বিএনপির একাধিক নেতার ভাষ্য, গোকর্ণে নিয়োগ পাওয়া আদনান সাদী সংসদ সদস্য এম এ হান্নানের ছেলে। গোয়ালনগরের নুরুন্নাহার আক্তার তার ভাগিনা শরীফুল ইসলামের স্ত্রী। আর সদর ইউনিয়নের আরক মিয়া সংসদ সদস্যের আপন ভগ্নিপতি। আরক মিয়া নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের উপজেলা কমিটির সাবেক সভাপতি আসাদ চৌধুরীর ভাই।

বিএনপির কয়েকটি সূত্রের দাবি, শরীফুল ইসলাম গোয়ালনগর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হওয়ার পরিকল্পনা করছেন। এ কারণে তিনি স্ত্রীর নামে সারের ডিলারশিপ নিয়েছেন। নুরুন্নাহারের বাবা সাদেক মিয়া চাতলপাড় ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।

স্থানীয় বিএনপির নেতা-কর্মীদের অভিযোগ, তালিকায় থাকা অন্য কয়েকজনের রাজনৈতিক ও পারিবারিক পরিচয় নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তাদের ভাষ্য, বুড়িশ্বরের ডিলার জসিম মিয়া আগে যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি উপজেলা যুবলীগের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক মোজাম্মেল হক ওরফে দানার মিয়ার ভাগিনা।

চাতলপাড়ের ডিলার শামীমা আক্তারের স্বামী আলমগীর হোসেন উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক পদ থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন। ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সৈয়দ এ কে একরামুজ্জামানের পক্ষে কাজ করার কারণে তাকে বহিষ্কার করা হয় বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

এ ছাড়া কুণ্ডা ইউনিয়নের ডিলার রেনু মিয়া স্থানীয় যুবদল সভাপতি অনু মিয়ার ভাই। আগে অনু মিয়া নিজেই সারের ডিলার ছিলেন, পরে তার ডিলারশিপ বাতিল হয় বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি। ফান্দাউকের ডিলার শারমীন আক্তার ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি ফয়েজ আনসারির স্ত্রী। স্থানীয় নেতা-কর্মীদের ভাষ্য, তাদের কেউই আগে সারের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না।

গুদাম নিয়ে প্রশ্ন

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সারের ডিলার হতে কমপক্ষে ২৫ টন সার সংরক্ষণের উপযোগী গুদাম থাকতে হয়। গুদামের দৈর্ঘ্য ২০ ফুট, প্রস্থ ১৫ ফুট এবং উচ্চতা ১০ ফুট নির্ধারিত রয়েছে। তবে নাসিরনগরে নিয়োগ পাওয়া অনেক ডিলারের এমন সক্ষমতার গুদাম নেই বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় ব্যক্তিরা।

উপজেলা ছাত্রদল, যুবদল ও বিএনপির অন্তত ২০ জন নেতা-কর্মীর সঙ্গে কথা বলেছে প্রথম আলো। তাদের অভিযোগ, দলের দীর্ঘদিনের ত্যাগী নেতা-কর্মীদের কেউ নতুন ডিলার হিসেবে নিয়োগ পাননি। সংসদ সদস্যের নিকটাত্মীয়দের নিয়োগের বিষয়টিকে তারা স্বজনপ্রীতি হিসেবে দেখছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ছাত্রদল ও বিএনপির চার নেতা ডিলার নিয়োগে অর্থ লেনদেনের কথা শুনেছেন বলেও জানান।

তবে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ সম্পর্কে সরাসরি মন্তব্য করতে চাননি জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোস্তফা এমরান। তিনি বলেন, তিনি সরকারি চাকরি করেন এবং সংসদ সদস্যরা বিভিন্ন কমিটির উপদেষ্টা। এর বাইরে তার কিছু বলার নেই।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ইমরান হোসাইন প্রথম আলোকে বলেন, আবেদনকারীদের যাচাই-বাছাই করে তাদের নামের তালিকা জেলায় পাঠানো হয়েছিল। এরপর কীভাবে চূড়ান্ত নিয়োগ হয়েছে, তা তার জানা নেই।

নিয়োগপ্রক্রিয়ায় কত আবেদন

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ১০১টি ইউনিয়ন ও পাঁচটি পৌরসভায় ১০৬টি সারের ডিলারশিপের বিপরীতে আবেদন জমা পড়ে ৮২৫টি। সেখান থেকে যাচাই-বাছাই শেষে ২৯২ জনের আবেদন সুপারিশ করে সার ডিলারসংক্রান্ত কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা কমিটির কাছে পাঠানো হয়।

প্রতিটি ইউনিয়নে ডিলার নিয়োগের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তিনজনের নাম সুপারিশ করে জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি। তবে নাসিরনগরে চূড়ান্তভাবে ডিলার নির্বাচনের ক্ষেত্রে কী কী বিষয় বিবেচনা করা হয়েছে, তা নিয়ে স্থানীয়ভাবে প্রশ্ন উঠেছে।

/এমআর/