সালমানের স্টুডিওতে হামলা, চাঁদাবাজি নাকি জমির বিরোধ

সালমানের স্টুডিওতে হামলা, চাঁদাবাজি নাকি জমির বিরোধ
হামলায় ক্ষতিগ্রস্থ কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

নতুন স্টুডিও জুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে কাচের টুকরা। ভাঙা টিভি, ক্যামেরা, লাইট, সাউন্ডবক্স ও আসবাবপত্র। দরজায় ধারালো অস্ত্রের কোপের দাগ। কেটে দেওয়া হয়েছে সিসি ক্যামেরার বৈদ্যুতিক সংযোগ। রাজধানীর দক্ষিণ মানিকদীতে কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে ঢুকে এমনই তাণ্ডব চালিয়েছে একদল হামলাকারী। শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) রাতে ক্যান্টনমেন্ট থানাধীন দক্ষিণ মানিকদীর নিউ গিনি প্রোপার্টিজ লিমিটেডের আবাসন প্রকল্পের ভেতরে এই হামলার ঘটনা ঘটে। শুধু সালমানের স্টুডিও নয়, প্রকল্পের একাধিক স্থাপনা ও ভবনেও ভাঙচুর চালানো হয়। সেখানে থাকা শ্রমিক, নিরাপত্তাকর্মীদের টাকা, মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন মালামাল নিয়ে যাওয়ারও অভিযোগ এসেছে।

রবিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) সরজমিন ঘটনাস্থল ঘুরে এমন চিত্র দেখা গিয়েছে। স্থানীয় এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে পাওয়া গেছে দুই ধরনের বক্তব্য।

প্রকল্পের মালিকপক্ষ বলছে, জমি দখল ও চাঁদা দাবির বিরোধ থেকেই সংঘবদ্ধভাবে হামলা হয়েছে। অন্যদিকে পুলিশ বলছে, প্রাথমিকভাবে জমির দখল-বেদখলকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের বিরোধের তথ্য পাওয়া গেছে। চাঁদাবাজির অভিযোগের বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য তাদের হাতে নেই।

যেভাবে হামলা হলো

প্রত্যক্ষদর্শী ও নিউ গিনি প্রোপার্টিজের সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, শনিবার রাত সাড়ে ১০টার পর কয়েক দফায় লোকজন প্রকল্পের ভেতরে ঢুকতে শুরু করে। পরে দলবদ্ধভাবে হামলা চালানো হয়।

প্রকল্পের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো.পল্লব বলেন, হামলাকারীরা চার থেকে পাঁচটি পিকআপে করে আসে। সামনে যা পেয়েছে, তার কিছু লুট করেছে এবং যা নিতে পারেনি, সেগুলো ভাঙচুর করেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রকল্পের এক নির্মাণ শ্রমিক বলেন, রাতে কাজ শেষে আমরা ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। এ সময় ১৫ থেকে ২০ জনের একটি দল অস্ত্র নিয়ে প্রকল্পে ঢোকে। তাদের হাতে পিস্তল, রামদা, লাঠি ও চাপাতি ছিলো। কয়েকজন শ্রমিককে মারধর করে কক্ষ থেকে বের করে দেওয়া হয়। পরে শ্রমিকদের জমানো টাকা ও ১৬টি মোবাইল ফোন নিয়ে যাওয়া হয়।

প্রকল্পের নিরাপত্তাকর্মী আবদুল রাজ্জাক বলেন, রাতে পাঁচজন নিরাপত্তাকর্মী দায়িত্বে ছিলেন। হামলাকারীরা কয়েকজনকে মারধর করে। তাঁর দাবি, হামলার সময় পাঁচ থেকে ছয়টি গুলির শব্দও শোনা যায়।

নাম প্রকাশে স্থানীয় এক দোকানি বলেন, দুই পক্ষেরই ঝামেলা আছে। রাত ১০টার পর মুখে মাস্ক পরা কয়েকজনকে প্রকল্পের দিকে যেতে দেখেছি। পরিস্থিতি খারাপ মনে হওয়ায় আমি সেখান থেকে চলে যাই।

হামলায় ক্ষতিগ্রস্থ  কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর
হামলায় ক্ষতিগ্রস্থ কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

শুধু স্টুডিওকে টার্গেট করে হামলা হয়নি

ঘটনাস্থলে ঘুরে দেখা গেছে, প্রকল্পে প্রবেশের প্রধান ফটকেও ধারালো অস্ত্রের কোপের চিহ্ন রয়েছে। ফটকের পরের একটি ১০ তলা ভবনেও হামলার চিহ্ন দেখা গেছে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের দাবি, ওই ভবনের একটি ফ্ল্যাটে থাকা চিকিৎসক দম্পতিকেও মারধর করা হয়েছে। তাদের মালামাল লুট এবং এলাকা ছেড়ে যাওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এরপর হামলা হয় সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে।

স্টুডিওর প্রতিনিধি ইলা বলেন, ঘটনার সময় সেখানে আমরা দুজন ছিলাম। প্রথমে তারা আশপাশ হামলা করলে বুঝতে পারিনি, ভেবেছিলাম পাশের নির্মাণ কাজের শব্দ হচ্ছে। পরে হামলাকারীরা স্টুডিওতে হামলা করলে, আমরা দ্রুত ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ি।

তিনি বলেন, স্টুডিও থেকে একটি ক্যামেরা, তিনটি লেন্স, চারটি লাইট, চারটি সফটবক্স, সিসিটিভির সরঞ্জামসহ বিভিন্ন মূল্যবান জিনিস লুট হয়েছে। স্টুডিওর প্রায় পুরো অংশই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

তবে সালমান মুক্তাদির সঙ্গে কারও ব্যক্তিগত বিরোধ বা চাঁদা দাবির ঘটনা ছিল কি না, সে বিষয়ে তারা কিছু জানেন না বলে জানান ইলা।

তার ধারণা, প্রকল্পের মালিকপক্ষের বিরোধের জেরেই স্টুডিওটি হামলার শিকার হয়ে থাকতে পারে।

মালিকপক্ষের অভিযোগ চাঁদার

নিউ গিনি প্রোপার্টিজের মালিক মো. নাজিম উদ্দিন ভূঁইয়ার দাবি, হামলার পেছনে জমি দখল ও চাঁদা দাবির বিষয় রয়েছে।

তিনি বলেন, গত এক মাসে বিভিন্ন সময়ে আমার কাছে এক কোটি, ৫০ লাখ থেকে দুই কোটি টাকা পর্যন্ত চাঁদা দাবি করা হয়েছে। আমি টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছিলাম।

জমি নিয়ে বিরোধের ব্যাখ্যায় নাজিম উদ্দিন বলেন, সাবেক এক উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তার কাছ থেকে আমি ১০ কাঠা জমি কিনে রেজিস্ট্রি নিয়েছিলাম। পরে এর পাশের আরও কিছু জমি আমাকে দিয়ে মাটি ভরাট ও উন্নয়ন করানো হয়। পরে সেই জমি তিনি বিক্রি করতে চাইলে, আমরা টাকা দেই, কিন্তু রেজিস্ট্রি করে দেওয়া হয়নি। আর সেই জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়েছে।

তার অভিযোগ, জমিটি ফেরত চাওয়া ও দখলে বাধা দেওয়ার কারণেই আমাকে চাপে রাখতে হামলা চালানো হয়েছে। তবে তার এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা যায়নি।

পুলিশের বক্তব্য

ডিএমপির যুগ্ম পুলিশ কমিশনার মো. মাহিদুল ইসলাম ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে বলেন, কিছু লোক দলবদ্ধভাবে এসে ভাঙচুর করেছে। এ ঘটনায় পুলিশ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদে প্রাথমিকভাবে জমিকে কেন্দ্র করে বিরোধের তথ্য পাওয়া গেছে।

তিনি বলেন, এটি একটি হাউজিং ব্যবসা এবং রাতের বেলা দলবদ্ধভাবে লোকজন আসার ঘটনায় জমির দখল-বেদখলকে কেন্দ্র করে বিরোধ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে বিরোধটি কার সঙ্গে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

চাঁদা দাবির বিষয়ে পুলিশের কাছে কোনো নিশ্চিত তথ্য আছে কি না - এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এ মুহূর্তে তাদের কাছে এমন কোনো তথ্য নেই। তদন্ত শেষ হলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে।’

এদিকে হামলার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া ভিডিওতে সালমান মুক্তাদির তার স্টুডিও ভাঙচুরের কথা জানান।

তিনি দাবি করেন, স্টুডিওতে ক্লায়েন্টদের ফুটেজ ও শুটিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম ছিলো। হামলায় সেগুলো নষ্ট ও লুট হওয়ায় আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি কাজেও বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে হামলার জন্য বিএনপির লোকজনকে দায়ী করে চাঁদাবাজির অভিযোগ তুলেন সালমান মুক্তাদির। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে বিএনপির সংশ্লিষ্ট কোনো নেতাকর্মীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। পুলিশও এখন পর্যন্ত সালমানের এই অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করেনি।

/এসবি/