মেয়াদ বাড়ছে জাবির উন্নয়ন প্রকল্পের, অপরিবর্তিত থাকছে বাজেট

জাবি প্রতিনিধি
জাবি প্রতিনিধি
মেয়াদ বাড়ছে জাবির উন্নয়ন প্রকল্পের, অপরিবর্তিত থাকছে বাজেট
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পের মেয়াদ তৃতীয়বারের মতো বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের বর্তমান মেয়াদ ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বেশ কিছু অবকাঠামোর নির্মাণকাজ শেষ না হওয়ায় মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত করার প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। এদিকে, প্রকল্পের মেয়াদ বাড়লেও এর জন্য বরাদ্দ করা বাজেট অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত অর্থের মধ্যেই বাকি কাজ সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের আওতায় নতুন ২২টি স্থাপনা নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এর পাশাপাশি একটি বিদ্যমান ভবনের সম্প্রসারণ এবং পুরোনো কয়েকটি স্থাপনার সংস্কারকাজও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এসব স্থাপনার অধিকাংশের নির্মাণকাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। তবে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর কাজ তুলনামূলক ধীরগতিতে এগোচ্ছে।

প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী নাসির উদ্দীন জানান, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পটি ২০১৮ সালের ২৩ অক্টোবর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন পায়। বর্তমানে প্রকল্পটির আর্থিক অগ্রগতি প্রায় ৭১ শতাংশ এবং ভৌত অগ্রগতি ৮০ শতাংশ।

তিনি বলেন, প্রকল্পের প্রথম ধাপে ছয়টি আবাসিক হল নির্মাণ করা হয়। পরবর্তী সময়ে দ্বিতীয় ধাপে ১৪টি প্রধান কাজের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয় এবং ২০২২ সালে সেগুলোর কার্যাদেশ দেওয়া হয়। তবে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার কারণে নির্ধারিত সময় অনুযায়ী সব কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি।

প্রকল্প পরিচালক জানান, প্রথম ধাপের নির্মাণকাজ ২০২২ সালের জুনে শেষ হয়। এরপর পর্যায়ক্রমে ছয়টি আবাসিক হল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে দুটি হল, একই বছরের মার্চে আরও দুটি এবং ২০২৪ সালের অক্টোবরে বাকি দুটি হল হস্তান্তর করা হয়।

বর্তমানে প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপের কাজ চলছে। এ ধাপের অধিকাংশ কাজ ২০২৬ সালের ডিসেম্বর অথবা ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে কয়েকটি কাজ শেষ করতে ২০২৮ সাল পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। এ কারণে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

তিনি আরও বলেন, প্রকল্পের কিছু কাজ এখন থেকে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হবে। এসব কাজের দরপত্র আহ্বান, কার্যাদেশ প্রদান ও বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করবে অধিদপ্তর। অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এসব কাজের তদারকি করবে। এ পর্যায়ে জহির রায়হান মিলনায়তনের সংস্কার ও আধুনিকায়ন, সড়ক নির্মাণ, সাবস্টেশন ও জেনারেটর স্থাপন এবং আসবাবপত্র কেনাসহ বিভিন্ন কাজ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগুলোর মধ্যে রয়েছে ১০১ কোটি ৮৫ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন ছয়তলা কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার ভবন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলা এলাকায় নির্মাণাধীন এ ভবনের প্রায় ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। একই এলাকায় ৬৩ কোটি ৪৬ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত ছয়তলা লেকচার থিয়েটার কাম পরীক্ষার হলের কাজও প্রায় ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। দুটি ভবনের নির্মাণকাজই ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

টিচার্স কোয়ার্টার এলাকায় ৩৬ কোটি ৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন ছয়তলা গেস্ট হাউস কাম স্নাতকোত্তর ভবনের প্রায় ৭৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। একই এলাকায় ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন গবেষক আবাসনের কাজও প্রায় ৭৫ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে।

এদিকে, সমাজবিজ্ঞান অনুষদ ভবনের আনুভূমিক সম্প্রসারণকাজের অগ্রগতি প্রায় ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ। এ কাজের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৭০ কোটি টাকা। অন্যদিকে, জীববিজ্ঞান অনুষদ ভবনের সম্প্রসারণকাজের অগ্রগতি ৬৫ থেকে ৭৫ শতাংশ। এ খাতে বরাদ্দ রয়েছে ৪৮ কোটি টাকা।

তবে কয়েকটি অনুষদ ভবনের সম্প্রসারণকাজে অগ্রগতি তুলনামূলক কম। ৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন গাণিতিক ও পদার্থবিজ্ঞান অনুষদ ভবনের সম্প্রসারণকাজের অগ্রগতি মাত্র ২৫ শতাংশ। ভবনটির কাজ ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। একইভাবে ৪৭ কোটি ৪৩ লাখ টাকা ব্যয়ে কলা ও মানবিকী অনুষদ ভবনের সম্প্রসারণকাজের অগ্রগতি ২০ থেকে ২৫ শতাংশ।

প্রকল্পের আওতায় শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের আবাসন সুবিধা বাড়ানোর জন্যও বিভিন্ন ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। এর মধ্যে শিক্ষকদের জন্য ১১ তলাবিশিষ্ট আবাসিক টাওয়ার, কর্মকর্তাদের জন্য পৃথক ১১ তলাবিশিষ্ট আবাসিক টাওয়ার, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের জন্য আবাসিক ভবন এবং পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের জন্য আবাসিক টাওয়ার রয়েছে। এসব ভবনের অধিকাংশের নির্মাণকাজ ৭৫ থেকে ৯০ শতাংশ শেষ হয়েছে। ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে এগুলোর কাজ সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে।

এ ছাড়া ১৮ কোটি ১৭ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন ১০ তলাবিশিষ্ট প্রভোস্ট কমপ্লেক্স এবং ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন ১০ তলাবিশিষ্ট হাউস টিউটরদের বাসভবনের কাজও প্রায় ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে।

প্রকল্পের অন্যতম বড় অবকাঠামো হলো স্পোর্টস কমপ্লেক্স ও সুইমিং পুল। এম এইচ হলসংলগ্ন এলাকায় ১১৯ কোটি ৩৬ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন এ স্থাপনার প্রায় ৭৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে এর নির্মাণকাজ সম্পন্ন করার লক্ষ্য রয়েছে।

প্রকল্পের প্রথম ধাপে নির্মিত ছয়টি আবাসিক হলের প্রতিটির নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৭৭ কোটি ২৮ লাখ টাকা।

এদিকে, নতুন প্রশাসনিক ভবন নির্মাণের পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। শুরুতে ১০ তলাবিশিষ্ট ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা থাকলেও পরে তা কমিয়ে ছয় তলা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের টারজান এলাকায় ভবনটি নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এখনো এ কাজের দরপত্র আহ্বান করা হয়নি।

এ ছাড়া জহির রায়হান মিলনায়তনের সংস্কার, মুক্তমঞ্চের উন্নয়ন ও ফুটপাত সংস্কারসহ কয়েকটি কাজের দরপত্রও এখনো আহ্বান করা হয়নি। এসব কাজ শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে বাস্তবায়নের কথা রয়েছে।

প্রকল্প পরিচালক নাসির উদ্দীন বলেন, বিভিন্ন সময়ে আন্দোলন, বিশেষ করে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন, ধর্ষণবিরোধী আন্দোলন, পরিবেশবাদীদের আপত্তি, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, অর্থ ছাড়ে জটিলতা এবং নকশা পরিবর্তনের কারণে প্রকল্পের কাজ একাধিকবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

তিনি বলেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দীর্ঘ সময় প্রকল্পের বেশ কিছু কাজ কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। পাশাপাশি, ঠিকাদারদের বিল পরিশোধে বিলম্ব হওয়ায় নির্মাণকাজের গতিও কমে যায়।

প্রকল্প পরিচালক আরও জানান, গাণিতিক ও পদার্থবিজ্ঞান অনুষদ ভবনটি প্রথমে অন্য স্থানে নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। কিন্তু জমির উপযোগিতা নিয়ে সমস্যা এবং পরিবেশবাদীদের আপত্তির কারণে ভবনটির স্থান পরিবর্তন করতে হয়। একইভাবে, কলা ও মানবিকী অনুষদ এবং জীববিজ্ঞান অনুষদ ভবনের ক্ষেত্রেও স্থান পরিবর্তন ও পরিবেশগত আপত্তির কারণে নির্মাণকাজ পিছিয়ে যায়।

এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মহাপরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা, আগ্রহপত্র (ইওআই) আহ্বান, প্রশাসনিক নির্দেশনায় কাজ বন্ধ থাকা এবং অর্থ ছাড়সংক্রান্ত জটিলতার কারণেও প্রকল্পের অগ্রগতি বিভিন্ন সময়ে ব্যাহত হয়েছে বলে জানান তিনি।

প্রকল্প পরিচালক বলেন, মেয়াদ বাড়ানো হলেও প্রকল্পের মোট ব্যয় বাড়ানোর পরিকল্পনা নেই। বরাদ্দ করা অর্থের মধ্যেই সব কাজ শেষ করতে হবে। কোনো খাতে ব্যয় বেড়ে গেলে অন্য খাতের অর্থ থেকে তা সমন্বয় করা হবে। প্রয়োজনে কিছু কাজের পরিধিও কমিয়ে আনা হতে পারে।

তিনি আরও বলেন, এ ধরনের বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সম্ভব নয়। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার সমন্বয়ে প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নিতে হয়। ফলে বিভিন্ন প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, সিদ্ধান্ত ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কার্যক্রমের ওপরও প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি নির্ভর করে।

/এমআর/